মানুষ

রিমঝিম আহমেদ



স্কুল থেকে ফেরার পর পিকু সেই যে নিজের পড়ার ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়েছে আর বের হয়নি। বালিশের উপর শুয়েছে উপুড় হয়ে আবার শোয়া থেকে উঠে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। ছোট্ট মুখটাতে অস্থিরতা খেলা করছে। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরেই তুবলুর সাথে কথা বলে, এটা পিকুর প্রতিদিনের অভ্যাস। তুবলু পিকুর পোষা কুকুর। একবার বাজার থেকে ফেরার পথে এইটুকুন কুকুরছানাটা বাবার পিছু নিয়ে চলে এসেছিল। লাল রঙের উপর পিঠের অংশ সাদা। আর সারা শরীরে ঘা, সে যে কী গন্ধ! মা তো বাবার উপর খুব রেগে গিয়েছিল সেদিন-- এই ঘা-গন্ধে ভরা কুকুরটা কেন আনলে, তাড়িয়ে দিতে পারনি? বাবা হেসে বলেছে-অবুঝ প্রাণি, মায়া হয় বুঝলে না! মাও বাবার উপর রাগ দেখিয়েছে ঠিকই, পরে নিজেই রান্নাঘর থেকে খাবার এনে খেতে দিয়েছে। পরের দিন পিকুকে কুকুরের গায়ে গায়ে লেপ্টে থাকতে দেখে কসকো সাবান দিয়ে স্নান করিয়েছে। পিকুর সে যে কী আহ্লাদ ! কুকুরটাও সারাক্ষণ পিকুর পেছন পেছন ঘোরে। আর পিকু না থাকলে মায়ের সাথে সাথে থাকে। মা বকা দেয় কিন্তু সে বকার মধ্যে যেন একটা প্রশ্রয় থাকে। তুবলু নামটাও তো মায়ের দেওয়া। যেমন করে মা পিকুর সাথে কথা বলে , তুবলুর সাথেও তেমন করে কথা বলে। স্কুল থেকে ফিরে সারাদিনের গল্পসব তুবলুকে বলে পিকু, রাজু আজ কার পেন্সিল হাতিয়েছে, রণি কয়জনকে মেরেছে,পুরবী দিদিমণি কাকে বকা দিয়েছে অথবা স্কুলের সে বটগাছটাকে কত রঙের পাখি দেখেছে, সব। না বলতে পারলে পিকুর যেন পেট ফুলে যায়। আজ সেই যে ঘরে ঢুকে বসে আছে মুখ নিচু করে আর বের হয়নি। ঘরের জানালা সকালে মা খুলে দিয়েছিল কিন্তু আলো ভালো লাগছে না তাই জানালা বন্ধ করে বসে আছে। মা দেখেছে পিকু ফিরেছে কিন্তু কাজে ব্যস্ত থাকায় কিছু জিজ্ঞেস করেনি। কল তলায় হাড়িপাতিল ধুচ্ছে মা, পিকু ঘরে বসে পানি আর বাসনের শব্দে বুঝে ফেলেছে মা কী করছে। মায়ের প্রতিটি কাজ শব্দ শুনেই পিকু বুঝতে পারে। মা তো বলে-ই সব সময়--আমার পিকুসোনা কত বুদ্ধিমান!

পিকু আদর্শ প্রাইমারি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রণিতে পড়ে। এসেম্বলির আগে পুতুল, রণি , ইন্দিরা, রাজু ও মিতুর সাথে দৌড় খেলে। সে খেলায় সবসময় জেতে রণি, দ্বিতীয় হয় ইন্দিরা। ইন্দিরার একটা গোপন নাম আছে-হিরিম্বা, সেটা দিয়েছে রাজু। হিরিম্বা কে পিকু জানে না, রাজু বলেছে- সে মায়ের কাছে শুনেছে হিরিম্বা হল রাক্ষসী ,আর মা দিলি দিদিকে হিরিম্বা রাক্ষসী বলে ক্ষ্যাপায়। ইন্দিরাকেও মাঝেমাঝে সবাই হিরিম্বা বলে ক্ষ্যাপায় ওরা। ইন্দিরা তখন সারামাঠ জুড়ে তাদের তাড়া করে, কিন্তু দিদিমণির কাছে নালিশ জানায় না। আজ স্কুলে গিয়ে এসেম্বলির আগে কেউ খেলেনি, ইন্দিরা আসেনি স্কুলে, রাজু আসেনি। রণি বলেছিল আজ ইন্দিরা, রাজুদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে মুসলমানরা। শুধু তাদের ঘর নয়, পুরো সাহাপাড়ায় আগুন দিয়ে দিনদুপুরে জ্বালিয়ে দিয়েছে। রণি আজ মন খারাপ করে বটতলায় বসেছিল, পিকুকে দেখে অন্যদিনের মতো দৌড়ে আসেনি। রণির সাথে কথা বলতে গিয়ে দেখে সে কথা বলে না, পিকুর খুব মন খারাপ হল তাতে। অনেকবার জিজ্ঞেস করার পর রণি বলেছিল- পিকু তোরা তো মুসলমান? আজ থেকে তুই আমার বন্ধু নয়। পিকু অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল রণির মুখের দিকে। মুসলমান হলে বন্ধু হওয়া যায় না কেন? কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না পিকু। রণি বলে- জানিস, পিকু, মুসলমানরা খুব খারাপ ; আমরা হিন্দু বলে আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। মন্দিরেও আগুন দিয়েছে। মন্দিরে না ঈশ্বর থাকে! বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছে রণি। ইন্দিরা, রাজু ওদের বই পুড়ে গেছে, ঘরের সাথে সব পুড়ে গেছে। রণির সাথে বটতলা থেকে সাহাপাড়ায় গিয়ে দেখে এসেছে পিকু, উঠোনে বসে আছে মানুষজন, ছাই আর পোড়া টিন এলোমেলো পড়ে আছে। ধোঁয়া উঠছে, সবার হাঁটে মুখে কালি। সবার মন খারাপ, কেউ কেউ কপালে হাত দিয়ে বসে আছে, আবার কেউ কাঁদছে।

পিকুকে ঘরে মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে মা নিজেই এল। কী রে পিকুসোনার কী হয়েছে? মাকে দেখে পিকুর থমথমে মুখখানা আরো ফুলে উঠল অভিমানে। কাছে গিয়ে ছুঁতেই কেঁদে ডুকরে মাকে জড়িয়ে ধরল পিকু। মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল--মা'কে কি বলা যায় পিকু বাবু কাঁদছে কেন? মা তো পিকুর বন্ধু, তাই না? আচ্ছা মা, আমরা কেন মুসলমান হলাম? মা হকচকিয়ে যায় পিকুর কথা শুনে। কী হয়েছে মাকে বল সব ! পৃথিবীতে তো অনেক মানুষ, প্রত্যেকের আলাদা আলাদা নাম আছে ,না ! আছে তো! তেমনি আলাদা আলদা ধর্ম আছে সবার। কেউ মুসলমান, কেউ হিন্দু, আবার কেউ বৌদ্ধ, খ্রিস্টান। কিন্তু ঈশ্বর একজন, কেবল মানুষ আলাদা আলাদা নামে ডাকে। যেমন তুমি বল আল্লাহ, রণি বলে ভগবান-- এরকম? কেন বল তো? মুসলমান খুব খারাপ তাই না? এম্মা, এ কথা কেন বলছ? মা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে। তুমি জান না, মুসলমানরাই তো ইন্দিরা, রণি, রাজুদের ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, মন্দির পুড়িয়ে দিয়েছে। ওদের সব পুড়ে গেছে। সবাই এখন বাইরে ঘুমায়। ঈশ্বর একজন হলে কেন মানুষ হিন্দুদের ঘর পুড়িয়ে দেবে? মা অবাক হয় পিকুর কথা শুনে। এই প্রশ্নের উত্তর কী দেবে ভেবে পায় না। বলে- মানুষের মধ্যে ভালোলোক যেমন আছে, কিছুদুষ্টু লোকও আছে । ভালো লোক সবসময় ভালো কাজ করে আর দুষ্টু লোক মানুষের ক্ষতি করে। যারা হিন্দুদের ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে তারা দুষ্টুলোক। তারা যতই খারাপ কাজ করুক না কেন, সকল ভালো মানুষ এক হলে তারা ভয় পাবে আর খারাপ কাজ করবে না। ঈশ্বরকে তুমি যে নামেই ডাকো, ঈশ্বর ভালো লোকের পাশে থাকেন। তাহলে কি ইন্দিরা, রণি আমাকে খেলতে নেবে, আমার বন্ধু হবে? অবশ্যই হবে, মা বলে। তুমি যদি ওদের পাশে থাকো একদিন ওরা ঠিক বুঝতে পারবে তুমি ওদের বন্ধু। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে থাকাটাই বড় ধর্ম। পিকু মায়ের কথায় ভরসা পায়, মা তুবলু কোথায়-বলে ঘরের বাইরে গিয়ে ডাকে "তু--বলু"... মাও বুঝতে পারে না, এই বড় বড় বুদ্ধিমান প্রাণীগুলো কেন আগুন নিয়ে খেলে, আগুন তো সব ছারখার করে দেয়!