টিটোর কুমির শিকার

বিশ্বদীপ দে



ঘুম থেকে উঠে টিটো দেখল খাটের কাছে কুমির বসে আছে! ভাগ্যিস সে পা দিয়ে ফেলেনি। তাহলেই হয়েছিল।
কেমন কায়দা করে খাটের কাছে এসে ফাঁদ পেতে বসে আছে! চোখ পাকাচ্ছে! আর কী বিচ্ছিরি হাঁ! যেন সামনে যা কিছু পাবে সব গিলে খেয়ে ফেলবে। নেহাত সে খাটের ওপরে, তাই তার নাগাল পায়নি। টিটো এরকম হাঁ আগেও দেখেছে। অ্যানিম্যাল প্ল্যানেটে।
টিটো আলতো করে হাই তুলল। মনে হল কুমিরটা তার হাই তোলা দেখে অবাক হয়ে গেল। নির্ঘাৎ ভাবছে পায়ের কাছে কুমির বসে আছে, এই অবস্থায় কেউ হাই তোলে নাকি? এই বিপদের মুখেও হাসি পেয়ে গেল টিটোর। কিন্তু হাসতে গিয়েও সে গম্ভীর হয়ে গেল। একবার উলটো দিকের আয়নায় দেখে নিল তাকে ঠিকঠাক গম্ভীর দেখাচ্ছে কিনা।
‘এটা হাসির সময় নয়।’ নিজেই নিজেকে বলল টিটো। বাবা অফিসে গেছে। মা দূরে ব্যালকনিতে ঘুরে ঘুরে কারও সঙ্গে ফোন করছে। বোধহয় বাবা ফোন করেছে। কিংবা মধ্যমগ্রাম থেকে দিদা বা গুজরাট থেকে মামা। যেই হোক, মা এখন গল্পে জমে আছে। টিটো যে আলতো করে বলবে, ‘মা, পালাও! কু-মি-র!’ তার উপায় নেই। শুনতে পাবে না। আবার জোরসে বলতে গেলেই... কুমির ব্যাটা টের পেয়ে যাবে আরও একটা শিকার আছে বারান্দায়। অমনি চোঁ করে দৌড়ে যাবে মায়ের দিকে। উফ! কী বিপদ রে বাবা!
টিটো মাথা চুলকোয়। ভাবে, কী করে নামবে খাট থেকে। এদিক দিয়ে তো নামা যাবে না। উলটো দিক দিয়ে অবশ্য নামা যায়। কিন্তু কুমিরটা তো তক্ষুনি দৌড়ে চলে আসবে! তাহলে উপায়? মাথা চুলকোতে চুলকোতে এদিক ওদিক তাকায় সে। কী করা যায়। আচমকাই নিজেকে চিমটি কেটে নিল। উফ! লেগেছে। নাহ্‌, তাহলে তো স্বপ্ন নয়। আগে অনেকবার এই ধরনের স্বপ্ন দেখেছে সে। কিন্তু এটা স্বপ্ন নয় মোটেই। একদম জলজ্যান্ত সত্যি!
আচ্ছা, কুমিরটা এল কোথা থেকে? নির্ঘাৎ হাইড্রেন সাঁতরে এসে তারপর সিঁড়ি বেয়ে উঠেছে। টিটোর মনে পড়ল, সেদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে যখন টিটো আইসক্রিমের কাঠিটা হাইড্রেনের খোলামুখে ফেলতে যাচ্ছিল, মা তখন ধমক দিয়ে বলেছিল, কক্ষনও হাইড্রেনের কাছে যাবে না। ওখানে কুমির আছে।’ এখন বোঝা যাচ্ছে মা ভুল কিছু বলেনি। ওখান দিয়েই এসেছে ব্যাটা।
অনেকদিন ধরেই টিটো ভেবেছে একটা অ্যাডভেঞ্চার করবে। আজ সেই সুযোগ এসেছে। কিন্তু বেশি সময় নেই। মা যখন তখন ব্যালকনি থেকে ঘরে চলে আসতে পারে। এখন টিটোর স্নানের সময়। স্কুল থেকে ফিরে প্রতিদিন সে একটু রেস্ট নিয়ে নেয় খাটে শুয়ে। তারপর স্নান করে ভাত খেয়ে নেয় টিভি দেখতে দেখতে। আজও তাই করছিল। কিন্তু ভাবতেও পারেনি এমন একটা কাণ্ড ঘটবে।
ক’দিন আগে বাবার সঙ্গে বসে কম্পিউটারে একটা সিনেমা দেখেছিল টিটো। সেখানেও এরকমভাবে একটা অজগর সাপ ঢুকে পড়েছিল একটা হোটেলের ঘরে। সবাইকে খেয়ে নিচ্ছিল সাপটা। তারপর একটা হেভি চেহারার ন্যাড়া মাথা লোক বন্দুক দিয়ে...
টিটো আয়নার দিকে তাকিয়ে আরেকবার নিজেকে দেখে নিল। মা খালি তার চেহারা দেখে বলে, ‘এহ্‌! কী চেহারা নিচ্ছে দিন দিন। ছোটোবেলায় কেমন গাবলু গুবলু ছিলিস। আর এখন দ্যাখো...’ মনে পড়ল মা’র বন্ধু অন্তরামাসিও একদিন তাই শুনে হাসতে হাসতে বলছিল, ‘সত্যিই রে। তুই দিন দিন প্যাংলা সিং হয়ে যাচ্ছিস। মা আর তুই যখন একা থাকিস, বাড়িতে ডাকাত পড়লে মা-কে কী করে বাঁচাবি?’
টিটোর বাবার কথা মনে পড়ল। বাবা কিন্তু কখনও তাকে এসব বলে না। এই তো সেদিন, মা বলছিল, ‘ফাইভে উঠে তো দূরের স্কুলে যাবি। তখন খাটুনি আরও বাড়বে। এই লিকলিকে চেহারা নিয়ে চলবে?’ তাই শুনে বাবা বলেছিল, ‘ধুসস। টিট ইজ এ চ্যাম্পিয়ন। রোগা না হলে লাফ-ঝাঁপ করবে কী করে?’ তারপর মা’র দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলছিল। ‘তুমিই তো বলো টিটো আমাদের বুড়ো বয়সের লাঠি। তা, লাঠি যত ছিপছিপে হয় ততই তো ভালো...’
বাবার কথাগুলো মনে পড়ে যাওয়ায় টিটোর হাসি পেয়ে গেল। কিন্তু হাসতে গিয়েও সে গম্ভীর হয়ে গেল। ছি ছি! খাটের পাশে কুমির কটমট করে তাকিয়ে আছে, আর সে কিনা হাসছে! টিটো রাগী রাগী মুখ করে কুমিরটার দিকে তাকাল। দাঁড়া, তোকে মজা দেখাচ্ছি। টিটো খাটের ওপর উঠে দাঁড়াল। ডাকাতের চেয়েও ভয়ংকর বিপদ আজ তাদের ঘরে ঢুকে পড়েছে।
খালি হাতে তো আর কুমিরের সঙ্গে লড়াই করা যাবে না। কোণের টেবিলে রাখা বন্দুকটার দিকে তাকাল টিটো। বন্দুকটা পেলে কুমিরের সঙ্গে ফাইট করা যাবে। কিন্তু মেঝেতে নেমে ওদিকে যাওয়া যাবে না। টিটো পাশের চেয়ারে পা দিল। তারপর লাফ মারল টেবিলের দিকে। খানিকটা সিনেমার ঢঙে আওয়াজ করল, ‘ই-ইয়া-য়া...’
টেবিলের খুব কাছে পৌঁছে গেছে টিটো। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল কুমিরটাও একদম কাছে এসে গেছে। টিটো টেবিলের ওপর থেকে বন্দুকটা তুলে নিল। ব্যাস, আর ভয় নেই। কুমিরটাও বুঝে গেছে টিটো গুলি চালাবে। সেও বিরাট লাফ দিল প্রকাণ্ড হাঁ করে...!
টিটো গুলি চালাল। ঢিঁচু ঢিঁচু ঢিঁচু!
কুমিরটা জিভ উলটে ছিটকে পড়ল দূরে। টিটো বন্দুকের ধোঁয়া ওঠা মুখে ফুঁ দিল। আর আলতো হাসল।
ঠিক তখনই মা ঢুকে পড়ল ঘরে। ঢুকেই চেঁচিয়ে উঠল, ‘আবার হুড়ুমযুদ্ধি শুরু করেছিস! ইস, বিছানার চাদরটা একদম ঝুলিয়ে দিয়েছিস। টেবিলের ওপরেও হাটকেছিস... ওহো, এই ছেলেটা না...!’ বলতে বলতে টিটোর কাছে চলে এল। তারপর হাত থেকে বন্দুকটা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘চল চল, স্নান করবি।’
তারপর কুমিরটার কান ধরে টেনে তুলে খাটের ওপরে তুলে ফেলে দিয়ে বলল, ‘এটাকে মেঝেতে ফেলে রেখেছিস কেন? কী সুন্দর খেলনাটা! নোংরা হয়ে যাবে...’ টিটো বলল, ‘মা আমি ওটাকে গুলি করে...’ মা পুরোটা না শুনেই বলল, ‘থাক খুব হয়েছে।’
স্নান করতে করতে হাসি পাচ্ছিল টিটোর। মা ভেবেছে এটা চঞ্চলকাকুর এনে দেওয়া খেলনা কুমিরটা। মা তো আর জানে না, এটা একটা সত্যিকারের কুমির। কিন্তু মা তার কথা শুনে বেশি না বকে হাসছিল কেন?
মামাবাড়ি গিয়ে মায়ের খেলনার বাক্সে একটা বড় বন্দুক দেখেছিল টিটো। কিন্তু কোনও কুমির দেখেনি। হয়তো ছিল। হারিয়ে গেছে। কুমিরও হতে পারে। আবার বাঘও হতে পারে। কিংবা গণ্ডার। সে যাই হোক, কিছু একটা যে মা-ও শিকার করেছিল ওই বন্দুক দিয়ে, সেটা একদম শিওর।
না হলে মা ওরকম করে হাসছিল কেন? যেন একটা কবেকার কথা মনে পড়ে গেছে...