রোদ এনে দাও

বাবলী হক



হেমন্তের শেষ বেলা। সুস্মি বনানীর তিনতলা ফ্ল্যাটে নিজের বিছানায় বসে ছবি আঁকছে। কী খেয়াল হতে খাবার ঘর থেকে একটা প্লেটে কয়েকটা কমলালেবু এনে রাখল চাদরের উপর। খাটের প্রান্ত থেকে নীল চাদরটিকে টেনে তাঁবুর মতো করে ঝুলিয়ে, একটা চেয়ার এনে আটকে দিল। জানালার কাছে পর্দা একটু সরিয়ে রাখল। পেলব ফুরফুরে ভাব নিয়ে এসব করছে। মা, রেবতী ঘরে ঢুকে কমলালেবুর দিকে চোখ পড়তেই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল- তুমি কি এই এতোগুলো কমলা খাবে এখন?
-না খাব না, আমি ছবি আঁকব।
রেবতী একটু হেসে চলে গেল ঘর ছেড়ে।
পড়ন্ত বিকেলের এক টুকরো রোদ গ্রিল গলে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ছে। ঝকঝকে পিতলের মতো আলো এসে পড়েছে কমলালেবুর গায়ে। সুস্মি রং-তুলি ছড়িয়ে অতিমাত্রায় মন দিয়ে আঁকছে এক-একটা মুখ, কমলালেবুর মতো। মুখগুলো লাল, নীল, হলুদ, সবুজ হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। কমলালেবুগুলো নাক, মুখ, চোখের অবয়ব পেয়ে কথা বলতে শুরু করে দেয় তার সঙ্গে। সুস্মি তুলি হাতে বলে,
-অহনা তোমাকে কতবার বলেছি এভাবে পেন্সিল ধরবে না। রঙ কেনো দাগের বাইরে চলে যাচ্ছে? ঠিক করে রঙ করো বলছি।
মেঝেতে চোখ পড়তেই সুস্মি ছবি আঁকা ছেড়ে, অহনাকে ছেড়ে গড়িয়ে পড়া রোদের মাঝে এসে দাঁড়ায়। ফ্রকের দুই প্রান্ত ধরে ঘুরে ঘুরে রোদের সীমানা ধরে নাচে আর গাইতে থাকে,
‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি। আহা,হাহা,হা। আজ আমাদের ছুটি ও ভাই, আজ আমাদের ছুটি। আহা,হাহা,হা’। কিছুক্ষণ পর পড়ন্তবেলার রোদ গ্রিলের ফাঁক গলিয়ে চলে গেল গাছপালা মেঘের আড়ালে। গ্রিলের ছায়াও মেঝে থেকে পিছোতে পিছোতে হারিয়ে যায়। শীত বাতাসের স্পর্শ গায়ে লাগতেই সুস্মি হটাৎ নাচ থামিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে চিৎকার শুরু করে দেয়।
এই আতঙ্কিত চিৎকারটা রেবতী সবসময় ভয় পায়। কম্বলটা পায়ের কাছে টেনে নিয়ে সুস্মির গান শুনতে শুনতে মাত্র চোখ দুটো ঘুমে জড়িয়ে আসছিল তার। এক লাফে বিছানা থেকে নেমে ছুটে এল সুস্মির ঘরে। কানে দু-হাত চেপে তারস্বরে চিৎকার করে যাচ্ছে মেয়ে। রেবতী বুকের কাছে চেপে ধরে চেষ্টা করল থামাতে। -বলো মা কী হয়েছে? কেন চিৎকার করছ? এই একটু আগেও তো গান করছিলে, কী হল এখন?
কানের কাছ থেকে হাত জোর করে সরিয়ে দিলে আবারও দু-হাত দিয়ে কান চেপে ধরছে। অসহায়ের মতো রেবতীও শব্দহীন কেঁদে যাচ্ছে। সুস্মির বাবা এখনো অফিস থেকে ফেরে নাই। কাজের ছুটা মেয়েটাও কাজ শেষ করে চলে গিয়েছে। এই মুহূর্তে কাকে ফোন করবে, কীভাবে মেয়েকে শান্ত করবে ভেবে পাচ্ছে না। দু-হাত দিয়ে মেয়ের মুখটা চেপে ধরে কপালে চুমু খেতে খেতে বলে- আমাকে বলো, কী হয়েছে তোমার? মাকে বলো কী হয়েছে?
কান্নার ফাঁকে রেবতী শুধু সুস্মির একটা কথাই উদ্ধার করতে পারল।
-আমার রোদ এনে দাও।
চিৎকার থামিয়ে মাঝে মাঝে একটা কথাই বলছে, – আমার রোদ এনে দাও।
কোনো উপায়ন্তর না দেখে রেবতী সুস্মির বাবাকে ফোন করে। অন্তত জানা তো যাবে কতক্ষণে বাড়ি ফিরছে। এরপর মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বিছানায় নিয়ে এসে বসে থাকল। মেয়ের জেদ কান্নাকাটি অনেক দেখেছে। এই দশ বছরে রেবতী অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছে মেয়ের জেদ, চিৎকার আর কান্নাকাটিতে। ফুটফুটে মেয়ে জন্মানোর পর পরিবারে সবাই কী যে খুশি হয়েছিল! কারণ, দুই পরিবারেই এই প্রজন্মে কোনো মেয়ে ছিল না, প্রথম মেয়ে সুস্মি। কিন্তু জন্মের পর থেকে খুব একটা তাকায় না। যদিও তাকায় তো চোখের দিকে তাকায় না। কতদিন মাকে বলেছে, -মা দেখো, আমার মেয়েটা হাসে না, কাঁদে না, একটুকুও বিরক্ত করে না। মা বলত,- তোর মতো হয়েছে, তুইও ছোটোবেলায় খুব শান্ত ছিলি।
কেউ গুরুত্ব দিত না রেবতীর দুশ্চিন্তাকে।
পাঁচ মাস বয়স থেকে ডাক্তার দেখানো শুরু করেছে। আজও যখন কোনো ডাক্তারের সন্ধান পায়, ছুটে যায় মেয়েকে নিয়ে। ওকে দেখে কিছু বোঝা যায় না, আর দশটা শিশুর মতোই স্বাভাবিক। কিন্তু চোখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারে সবাই। ভীত হরিণীর মতো মায়ের আঁচল ধরে হাঁটে। সামান্য শব্দে কেঁদে উঠে। একটু জোরে শব্দ হলেই কানে হাত দিয়েই চিৎকার করতে থাকে। ডাক্তার তো বলেই দিয়েছে। তারপরও মন মানে না, যদি কেউ আশা দিতে পারে। এমন কোন চিকিৎসা-পদ্ধতি যদি থাকে... সুস্মি আর দশটা শিশুর মতোই স্বাভাবিক আচরণ করবে।
কী সব ভাবতে ভাবতে মেয়েকে ধরে প্রায় দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। কলিংবেলের শব্দে ঘুম ছুটে গেল। রেবতী দরোজা খুলে সুস্মির বাবাকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
-দেখো কিছুতেই থামাতে পারছি না। শুধু বলছে আমার রোদ এনে দাও।
তখনো সুস্মি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর একই কথা বলছে- আমার রোদ এনে দাও।
বাবা-মা দুজনে অনেক চেষ্টা করল বুঝাতে, খাওয়াতে। কিন্তু কিছুতেই থামছে না।
ঘণ্টা-দুয়েক পরে ক্লান্ত হয়ে মুখে বুড়ো আঙুল পুরে ঘুমিয়ে পড়ল সুস্মি। রেবতী টেবিলে খাবার গুছিয়ে দিল কিন্তু নিজে কিছু খেতে পারল না।
পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙল রেবতীর। খিদেও ছিল। চা আর টোস্ট নিয়ে জানালার কাছে বসে মনে হল, সুস্মি বারবার এই জানালার দিকে তাকিয়েই বলছিল রোদ এনে দাও। কী এমন দেখেছিল যে রোদ এনে দিতে বলে? গতকাল ওই মুহূর্তে মনে হয় নাই কিন্তু এখন ভাবছে সুস্মির টিচারকে ফোন করলে হয়তো বুঝতে পারতেন, কোনো সামাধান দিতে পারতেন।
মেয়ে আজ খুব ঘুমাচ্ছে। বেঘোর ঘুম। শরীরটাকে গুটিয়ে একটা পোঁটলার মতো করে শুয়ে আছে। রেবতী ভয় পাচ্ছে; ঘুম ভাঙলে আবার হয়তো রোদের জন্য কান্নাকাটি শুরু করবে। সুস্মির বাবা অফিসে চলে গেল। বলল- আজ আর স্কুলে নিয়ে যেয়ো না, যতক্ষণ ঘুমাতে চায় ঘুমাতে দাও।
নয়টা বাজতেই স্কুলে ফোন করল রেবতী। সুস্মির টিচারকে গতকাল যা ঘটেছিল সব গুছিয়ে বলল। শুনে উনি বললেন- ওকে ওর মতো করে বুঝিয়ে বলব আমি। আপনি এখন ওকে ঘুমাতে দিন। নিজে থেকে ঘুম ভাঙলে আমি ওর সঙ্গে কথা বলব।
সুস্মি দশটা পর্যন্ত ঘুমাল। ঘুম ভেঙে বারবার জানালার দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু কান্নাকাটি করছে না। রেবতী কপালে হাত দিয়ে দেখল, কপালটা একটু গরম। চোখদুটো ফুলে আছে। গোসল করিয়ে নাস্তা খাইয়ে সুস্মিকে জিজ্ঞেস করল, – তুমি কি তোমার মিসের সঙ্গে কথা বলবে?
-বলব।
ইচ্ছে করে রেবতী কলটা স্পিকারে দিল যাতে সে-ও শুনতে পায় দুজনের কথা।
-কেমন আছ সুস্মি?
-ভালো।
-নাস্তা করেছ?
-করেছি।
-দুধ খেয়েছ?
-না দুধ খাই নাই।
-কালকে কাঁদছিলে কেন?
-রোদের জন্য। রোদ আমার সঙ্গে খেলছিল, চলে গেল।
-সুস্মি রোদের তো যাবার সময় হয়ে গিয়েছিল তাই চলে গেল। তুমি যেমন সময় মতো স্কুলে আসো, আবার সময় হলে স্কুল থেকে বাসায় চলে যাও।
-রোদ কী স্কুলে চলে গেল?
-হয়তো। ওইটাই রোদের স্কুলের যাবার সময়। তুমি কিন্তু আর কখনো রোদের জন্য কান্না করবে না।
-ঠিক আছে। আর কান্না করব না।
-আজকে স্কুলে আসবে?
-আসব। এখুনি আসব।
রেবতী সুস্মিকে স্কুলের জন্য তৈরি করতে করতে ভাবল মেয়ের মনের পৃথিবীতে সে কবে জায়গা করে নিতে পারবে! সুস্মির মতো সেও এমন করে ভাবতে শিখবে!