অচেনা আকাশ

পিয়ালী বসু



ছেলেবেলা থেকেই রানা কাকার ন্যাওটা , যদিও অচিন কাকা তার নিজের কাকা নন তবুও নিজের কাকার থেকে খুব কমও নন, নিজের কাকাকেও বোধহয় রানা এতটা ভালবাসে না , আর অচিন কাকা তো এখন তার নিজেরই কাকা , যে যাই বলুক না কেন ।
হাসি ঠাট্টা করে কখনও যদি বন্ধুরা অচিন কাকাকে পাড়াতুতো কাকা বলে ডাকে , তখন কিন্তু রানার বেশ রাগই হয় , পাড়াতুতো শব্দ টাতেই তার বড্ড আপত্তি , পাড়াতুতো বললেই কেমন যেন এক অজানা দুরত্ব তৈরি হয় , যেন জোর করে আব্দারহীন ভাবে অন্যকে আপন করে নেওয়া , অনেকটা ভাগ চাষির ফসলের মতো ।
“ঠিক আছে মানলাম অচিন কাকা তোর পাড়াতুতো কাকা নন, তবে কোন সম্পর্কের কাকা শুনি” ? সেবার গোল দীঘির ফুটবল টুর্নামেন্টে গ্যালারীতে বসে থাকা অচিন কাকাকে দেখে শিবু আর বুড়ো এমন বেঁকা প্রশ্ন তুলেছিল। কিন্তু ঘাবড়াবার পাত্র নয় রানা, প্রশ্নের প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ তাকে বিব্রত তো করেই নি বরং তার মধ্যে অদ্ভুত এক জেদ তৈরি করেছিল, “অচিন কাকা আমার পাড়াতুতো কাকা নন ঠিকই , আসলে অচিন কাকা আমার পাশবাড়িতুতো কাকা , অচিন কাকা আমার এক উঠোনতুতো কাকা, অচিন কাকা আমার একই মনতুতো কাকা!!” কথাগুলি বলেই আচমকা থেমে গিয়েছিলো রানা, কিন্তু তার অব্যক্ত গোঙানির শব্দ শুনতে পেয়েছিলো শিবু আর বুড়ো। সেদিন থেকে কেউই আর রানা কে অচিন কাকা কে নিয়ে কিছু বলতে সাহস করে নি।


এ পাড়ার সকলেই অচিন কাকাকে শ্রদ্ধা করে , ভালোবাসে, আর ঘুড়ি ওড়াতে আসা ছেলে ছোকরারা তো কাকা কে গুরু মানে। লোকে বলে ঘুড়ি লগ্নে জন্ম হয়েছিলো কাকার , কাকার বাবা নাকি ঘুড়ি ওড়াতে পারতেন না , সেবারবিশ্বকর্মাপুজোয় মালিবাগানে একটা বিরাট ঘুড়ি এসে পড়েছিলো , কাকা র বাবা দৌড়ে গিয়ে দেখেন ঘুড়ির সাথে একটা একরত্তি বাচ্চাও বাঁধা , তা দুধের বাচ্চা কে তো আর ফেলে দেওয়া যায়না , তাই সেই লগ্নেই জন্ম হয়েছিলো অচিন কাকার। সারা আকাশ জুড়ে কাকার ঘুড়ি রাজত্ব, এক আকাশ ঘুড়ির মাঝেও কিন্তু অচিন কাকার লাল দোত্তা ঘুড়িটা সব্বাই চিনে ফেলতে পারে।
কাকার এই আকাশ জোড়া দাপটহীন শাসন সবাই মেনে নিলেও অনেকেই কিন্তু কাকার ওপর বেশ বিরক্ত, প্রতিবার বিশ্বকর্মা পুজয় একনাগাড়ে হেনন্সথা হতে কারই বা ভালো লাগে ? ঘুড়ি বেড়ে দু দণ্ড বেখেয়াল হওয়ার জো নেই , খাম খেয়াল হলেই ভোকাট্টা!! সারাদিন ভয়ে তটস্থ সকলে।সকাল হতে না হতেই সবাই ছুটত ছাদে, এক লাটাই সুতো আর এক গোছা ঘুড়ি! চড়চড় করে সুতোয় টান পড়তো, ঘুড়ি গুলো ওপরে আরও ওপরে উঠত, সারা আকাশ জুড়ে তখন শুধুই কাকার ঘুড়ি। লাল ঘুড়ি , নীল ঘুড়ি , মুখপোড়া, চাদিয়াল , ময়ুরপঙ্খী আর হরেক রকমের ঘুড়ি! চউতা, দোত্তা , তেতা সব রকমের ঘুড়ি! আর মাঝে মাঝেই কাকার গলা ফাটানো ভোকাট্টার আওয়াজ! কাকার পাশে দাড়িয়ে চার বছরের রানা অবাক বিস্ময়ে সব লক্ষ্য করতো ।
“ওরে ও খোকা ! ঘুড়ি নাবিয়ে নিস নি , না খেললে খেলা শিখবি কি করে ?” চেঁচিয়ে উঠতেন ঘুড়ি পাগলা মানুষটা ।
তিনটে বাড়ি ছাড়িয়ে শিবুদের বাড়ির ছাদে লাটাই হাতে শিবু আর বুড়ো , শিবুর কোনোদিকে হুঁশ নেই , আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে থাকে সে , কাকার লাল ঘুড়িটার সীমানার বাইরে তাকে যেতেই হবে , কিন্তু ...... ..!!
মাঝ আকাশ থেকে একটানে মাটি মুখো নেমে আসছে কাকার ঘুড়ি , হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে, এদিক ওদিক তাকায় আর লাট খেতে থাকে , তারপরই ওপরে উঠতে থাকে ঘুড়িটা আবার...বাজ পাখির মতো ।
“ওরে বাঁচবি নে , কেউ বাঁচবি নে রে” উত্তেজনায় থরথর করে উঠতেন কাকা।
মুহূর্তে বাপ মা হীন ঘুড়ি গুলো দে দোল দে দোল বাতাসে গা ভাসিয়ে দিতো।
“খেয়েছি , খেয়েছি , আরও খাবো”
“ওঃ! বুড়োটার হাত থেকে আর নিস্তার নেই”
আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠত রানা , জ্বলজ্বল চোখে হাত বাড়িয়ে ধরার চেষ্টা করত লাটাইটা !
সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ছাদে ছোটেন অচিন কাকা , সকালের আকাশ আর ভোরের বাতাসের আদ্রতা দেখে নাকি বলে দেওয়া যায় সারাদিন বৃষ্টি হবে কিনা ।
রানাও লাফিয়ে ওঠে। “উফফ সাড়ে চারটে বেজে গেছে”, আড়মোড়া না ভেঙেই সে ছোটে বাথরুমে , আজ বিশ্বকর্মা পুজো যে !
ছাদে পা দিয়েই থমকে দাঁড়ায় রানা। পুবের রেলিং ধরে কাকা দাঁড়িয়ে। আপন মনে কি যেন খুঁজছেন। তবে যাই খুঁজুন না কেন কাকা, এই ছায়া ছায়া তমঘন আঁধারে তা কি খুঁজে পাওয়া সম্ভব? ভাবতে থাকে রানা।এখনও আকাশ অপরিষ্কার, দুধের সরের মতো একটা ছায়ার প্রলেপ রানাদের এই তিনতলা বাড়িটাকে ঘিরে রেখেছে। সামনের পার্কের ওদিকে সদ্য গজিয়ে ওঠা বিশতলা বাড়ীগুলিও অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে।নিশব্দে কাকার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় রানা।ঠাহর করার চেষ্টা করে কাকার না খুঁজে পাওয়া বস্তুটি কি , রেলিঙে হাত দিয়ে অচিন কাকার মতই দূরে আরও দূরে দৃষ্টি ভাসিয়ে দেয় রানা।
“হ্যাঁ রে আকাশটা দেখতে পাচ্ছিস” ? জমাট বাঁধা নিস্তব্ধতা ভেঙে কাকার গলা কানে আসে রানার, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় সে।
“সূর্যটা কি উঠে গেছে” ?
অবাক হয়ে কাকার দিকে তাকায় রানা।কাকার আজ হল কি ? কাকার কি দৃষ্টি বিভ্রম হল?আজকের ঘুড়ি ওড়ানোটা মাটি হবে না তো ?
শূন্য দৃষ্টিতে পাগলের মতো লোকটা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, আর এলোমেলো ভাবে মাথা ঝাঁকাচ্ছে।
ফিকে হয়ে আলো ফুটছে, নতুন সূর্যের সোনালী আভায় আস্তে আস্তে রঙিন হচ্ছে বহুতল বাড়িগুলি এবং তার আশ পাশের বাড়িগুলি। গজিয়ে ওঠা নতুন ফ্ল্যাটবাড়িগুলি দৃষ্টির ব্যাসার্ধ সঙ্কুচিত করলেও রানা বুঝতে পারে সূর্য উঠে গেছে পুরোদমে । তবে কাকা এমন করছেন কেন?
“কাকা আজ আর ঘুড়ি বাড়বে না” ? মরিয়া উত্তেজনায় প্রশ্নটা করেই ফেলে রানা।
রানার দিকে শূন্য দৃষ্টি মেলে তাকান মানুষটা, ঘোলাটে চোখ নিয়ে কিছু যেন বলতে চান , শেষে আবার দৃষ্টি ঘোরান আকাশের দিকে । আশপাশের বাড়িগুলি একবার দেখেন চোখ ঘুরিয়ে , আস্তে আস্তে উন্মীলিত হয় কাকার চোখের পাতা।
“ঘুড়ি ?নিশ্চয়ই বাড়বো এত বছর বেড়েছি এবারও বাড়বো।“ কাকার অসংলগ্ন কথাগুলি কানে আসে রানার।
“লাটাইটা নিয়ে আয়,আর নিয়ে আয় লাল রঙের দোত্তা ঘুরিটা। লাল সূর্যটার সাথে আজ পাল্লা দেবো।দেখি আজ কে আগে আকাশটার দখল নেয়” ।
মুহূর্ত বিলম্ব না করে নিচে ছোটে রানা।পলক ফেলার আগেই ঘুড়ি নিয়ে ছাদে পৌছায়।
এই লাটাই সুতো হাতে কাকা প্রস্তুত, ঘুড়িটা রানা এগিয়ে দেয় কাকার হাতে। কপালের ঘামে ভেজা চুলে ঘুড়িটা একবার ঠেকিয়ে কোন এক অনাম্নী ইস্ট দেবতাকে পুজো করেন কাকা।
“নে ঘুড়িটায় বার দে তো!”
ছাদের উল্টো মুখে ছোটে রানা। ঘুড়িটাকে শক্ত হাতে ধরে আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘুড়িটাকে ভাসিয়ে দেয় মাথার ওপর ।
সুতোয় টান পড়ে , স্পষ্ট অনুভব করে রানা , ঘুড়িটা আলতো ধাক্কায় ওপরে উঠেই গোঁত্তা খায় , নেমে আসতে থাকে নীচের দিকে ।
অবাক বিস্ময়ে কাকার দিকে তাকায় রানা, বেদনার্ত চোখে বিমুঢ় বিস্ময়ে তিনি তখনও লাটাই হাতে ধরে দাঁড়িয়ে।চোখাচুখি হতেই চোখ নামিয়ে নেন অচিন কাকা, গরম দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে ছাদের মাটিতে ।
পিঠে সান্তনার স্পর্শ পেয়ে ঘুরে তাকান কাকা, দশ বছরের ছেলেটার চোখে স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা।
“কেন এমন হল কাকা ? কেন আজ তুমি হেরে গেলে”?
আর চুপ করে থাকতে পারেন না কাকা, নীল শিরাগুলি কাঁপিয়ে অতর্কিতে চীৎকার করে ওঠেন, “ওরে আর আমাদের সেই আকাশ নেই রে !! আজ আমাদের আকাশ বড়ই ছোটো !! সেই ছোটো আকাশে আজ আর ঘুড়ি ওড়ানোর জায়গা নেইরে” !! তাঁর বুকফাটা হাহাকার ধ্বনিত হতে থাকে চারদিকে, আকাশে, বাতাসে।
চারপাশের বাড়িগুলি থেকে সদ্য ঘুম ভাঙা মানুষগুলি ছুটে আসে বাইরে তাঁর চীৎকার শুনে, আর রানা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে গজিয়ে ওঠা আকাশছোঁয়া ফ্ল্যাট বাড়িগুলির দিকে , যেগুলির সীমানা পেরিয়ে দেখতে পাওয়া আকাশটা আজ সত্যি বড় ছোটো !!