উজানোফোন

প্রকল্প ভট্টাচার্য



ছোটমামার আসার কথা ছিল বিকেল বিকেল, তা এসে পৌঁছল প্রায় সন্ধ্যে ছ’টায়। আর এসেই এমন তাড়া লাগালো ‘চল চল এক্ষুণি বেরোব’ বলে, যে উজান ব্যাগে ভরবে বলে যে বারোটা বই রেখেছিল, তার দুটো ভরাই হল না। আর ছোটু তো চিরকালের ছটফটে, স্কুলের ব্যাগেই দু’দিনের জামা প্যান্ট ভরে সেই দুপুরের খাওয়ার পর থেকে ‘মা, ছোটমামা কখন আসবে?’ বলে ব্যস্ত হচ্ছিল।
তবে তার কারণও আছে। এই প্রথমবার তারা একা একা মামারবাড়ীতে যাচ্ছে, আর পুরো দু’দিন থাকবে! ভাবা যায়! বাবা বকাবকি করবে না, মা পড়তে বসাবে না... সারাদিন শুধু দাদুর সাথে গল্প, বড়মামার মেয়ে তিতলির সাথে খেলাধুলো আর সেইসঙ্গে দিদার বানানো চকলেট পুডিং... আহা, ভাবতেই ছোটু আর উজানের মন ভরে উঠল আনন্দে!
তবু, তাড়াহুড়োর মধ্যেও ছোটু একটা জিনিস ভোলে নি। বেরোবার আগে ফিসফিস করে উজানকে জিগ্যেস করল, ‘দাদা, তোর সেই যন্ত্রটা নিয়েছিস তো?’
উজান কম কথার মানুষ, বুকপকেট চাপড়ে বলল, ‘হুঁ’।
মা কে টাটা বাইবাই করে দুই ভাই ট্যাক্সিতে ওঠার আগে ছোটমামার নজর পড়ল উজানের বুকপকেটের দিকে। ‘হ্যাঁরে উজান, তুই ক্লাশ ফাইভেই সেলফোন নিয়ে ঘুরছিস নাকি?’ উজান কিছু বলবার আগেই ছোটুর জবাব ‘সেলফোন নয়, ওটা উজানোফোন! জানো, ওটা দিয়ে...’ উজানের ইশারায় সে থেমে গেল।
উজান বলল, ‘কিছু নয় ছোটমামা, ওটা একটা ভিডিও গেম।‘
-‘ভিডিও গেম? কই দেখি?’ অগত্যা বার করে দেখাতে হল। আর সাথে সাথে ছোটুর মন্তব্য, ‘জানো ছোটমামা, এই যন্ত্রটা দাদা নিজে বানিয়েছে বই পড়ে পড়ে! ওটা দিয়ে যে কোনও মানুষকে কাতুকুতু দেওয়া যায়!’
উজানকে যারা চেনে তারা কেউ এই কথায় আশ্চর্য হবে না। খুব ছোটবেলা থেকেই উজান প্রচুর বই পড়ে, আর নানাধরণের এক্সপেরিমেন্ট করে। নিজের হাতে ক্যামেরা বানিয়েছে, ঘড়ি বানিয়েছে। স্কুলে সে প্রতিবছর ইনোভেটিভ সায়েন্টিস্ট এর পুরষ্কার পায়, আর অনেক বন্ধু তো তাকে এডিসন বলেই ডাকে! ছোটমামার ও সে কথা জানা, কিন্তু তাই বলে মানুষকে কাতুকুতু দেওয়া!
-‘ কীরে উজান? বুঝিয়ে বল তো?’
ভাইয়ের দিকে কটমট করে তাকিয়ে উজান বলল, ‘চলো ছোটমামা, ট্যাক্সিতে যেতে যেতে বলছি।’
উজান সহজভাবে ব্যাপারটা বোঝালো। একটা অচল রিমোট কন্ট্রোল আর কিছু মাইক্রোচিপ, এই দিয়ে সে মানুষের ওপর রেডিয়েশন ফেলে তাদের শরীরের একটা হর্মোনকে উত্তেজিত করতে পারে। ফলে সেই ব্যক্তির মনে হয় যে যেন কেউ তাকে কাতুকুতু দিচ্ছে।
-‘জানো ছোটমামা, দাদা এটা একবার আমাদের পাড়ার ভুলো কুকুরের দিকে তাক করে চালু করতেই, সে বেচারা কেঁউ কেঁউ করে যা দৌড়টা লাগালো...!’ নাঃ, ছোটুটা কোনো কথাই চেপে রাখতে পারে না! তবে দৃশ্যটা মনে পড়তে উজানও হাসি চাপতে পারলো না।
ছোটমামার সন্দেহ তখনো যায় নি। ‘সত্যি বলছিস? কই, আমাকে কাতুকুতু দিয়ে দেখা তো?’ অনিচ্ছাসত্ত্বেও উজান তার পকেটের যন্ত্রটা বার করে ছোটমামার দিকে তাক করল। ট্যাক্সির ভিতরেই ছোটমামার মনে হতে লাগল যেন তার কাতুকুতু লাগছে।
-‘এঃ এই উজান, ওরে, থামা, হা-হা... থামা রে, হে-হেঃ, হি-হিঃ...’ তারপর উজান যন্ত্রটা বন্ধ করতে ভাগ্নে কে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ওরে তুই করেছিস কী! তোর তো নোবেল পুরষ্কার পাওয়া উচিত!’
গম্ভীর স্বরে উজান বলল, ‘আরে দাঁড়াও, এখনো কোনো গোমড়া মানুষের ওপর পরীক্ষা করা হয় নি।’
ছোটু সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘আরে বড়মামাই তো আছে!’
উজানের বুক শুকিয়ে গেল। সর্বনাশ! বড়মামাকে সে যমের মতো ভয় পায়! ‘না ভাই! আমার অতো সাহস নেই!’
কথায় কথায় তারা মামার বাড়ি পৌঁছে গেল। তাদের দেখতে পেয়ে ছোট্ট তিতলিও দৌড়ে বেরিয়ে এল। ‘উজানদাদা এসে গেছে! ছোটু এসে গেছে!’ ব্যাস, দাদুর ঘরে গিয়ে গল্প, সঙ্গে দিদার বানানো গরম গরম মাছের সিঙ্গারা, আর কি যন্ত্রপাতির কথা মনে থাকে কারো!
রাতে খাওয়ার পর ছোটু ফিসফিস করে বলল, ‘দাদা, চল, বড়মামা এখন কাগজ পড়ছে, আড়াল থেকে এক্সপেরিমেন্টটা করে আসি!’
-‘তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? ধরা পড়লে...’
-‘ধরা পড়বো কেন! চল না, এমন একটা জায়গা দেখিয়ে দেব, কেউ খুঁজেই পাবে না!’
ছোটুর ওপর সত্যিই ভরসা করা যায়। বড়মামা চেয়ারে বসে একমনে কাগজ পড়ছে দেখে তারা উল্টোদিকের জানলার তলায় দাঁড়িয়ে উজানফোন তাক করল। বড়মামা নড়েচড়ে বসল, মোটা গোঁফের তলায় একটু হাসিও দেখা গেল। তারপর ‘উফ, এই, আরে,’ বলে বিড়বিড় করতে করতে হঠাত ‘হা-হা’ করে জোরে হেসে উঠল।
বড়মামা হাসছে!!
মামী তো ভয় পেয়ে রান্নাঘর থেকে ছুটে এল, ‘কী হয়েছে তোমার? এভাবে হাসছ যে?’
-‘হা-হা, কেন জানি না, খুব হাসি পাচ্ছে, হে হে হে, মনে হচ্ছে যেন কেউ সুড়সুড়ি।। হি-হি-হি...’
-‘কী জানি বাবা, বুড়ো বয়সে আবার কী হল তোমার!’ এই বলে মামী চলে গেল।
ছোটু উজানও তাদের আনন্দ চেপে রাখতে পারছিল না, কোনওমতে ঘরে ফিরে এসে, উত্তেজনায় দু’ভাই সারারাত ঘু্মোতেই পারল না।
-‘হ্যাঁরে দাদা, নোবেল প্রাইজে কী দেয় রে? অনেক টাকা?’
-‘হ্যাঁ টাকা দেয়, তবে বইপত্রও দেয় মনে হয়।‘
-‘কবে পাবি রে? কাল সকালে যদি ওদের জানাস...’
-‘দূর পাগল, ওভাবে হয় নাকি! অনেকে দেখতে চাইবে, জানতে চাইবে এটা দিয়ে মানুষের কী উপকার হবে...’
-‘কী উপকার হবে রে দাদা? লককে হাসানো?’
এবার উজানও চিন্তায় পড়ে গেল। সত্যিই তো, কেউ হাসলে মানুষের কী উপকার হবে? নাঃ, ছোটমামাই ভরসা। সকাল হলেই জেনে নিতে হবে।
কিন্তু সকালে তাদের ডেকে তুলল বড়মামা। ‘চল রে বাজারে যাই, ইলিশ মাছ কিনবো আজ!’ ইলিশ মাছ শুনেই ছোটু উজানের জিভে জল এসে গেল, কিন্তু বড়মামার সঙ্গে বাজারে! অথচ উপায়ও নেই। দুই ভাই মামার বাইকে চেপে বসল। বেরোবার আগে মামী বলল, ‘তোমার হেলমেট টা নিয়ে যাও’
-‘আরে এই তো যাব আর আসব, হেলমেট লাগবে না।’
তারা বেরল বটে, কিন্তু এমনই কপাল, মোড়ের মাথাতেই একটা মোটা পুলিশ ধরল। ‘হেলমেট?’
-‘না, মানে, তাড়াহুড়োতে...’
-‘ছোটদেরও এই শিক্ষাই দিচ্ছেন? আবার অজুহাত দেখানো? আসুন এদিকে!’
কাঁচুমাচু মুখে বড়মামা গাড়ী থেকে নেমে পুলিশটার দিকে এগোল। ছোটুর মাথা কিতু বিপদে দিব্যি খেলে। সে উজানের কাছে ঘেঁসে বলল, ‘দাদা, বার কর ওটা!’
বড়মামা অবাক হয়ে দেখল, ফাইনের কাগজপত্র বার করবার আগেই মোটা পুলিশটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ‘হাঃ-হাঃ’ করে হাসছে! তারপর কোনওমতে হাত নেড়ে মামাকে চলে যেতে বলল। ওরা যখন চলে গেল, তখনও সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হেসেই যাচ্ছে!!
কিন্তু ছোটু থাকতে কি কোনও কথা চেপে রাখা যায়! দুই মামা, মামী, তিতলি, দাদু, দিদা সক্কলে ভীষণ খুশী হল উজানের আবিষ্কার দেখে। আর পুলিশের হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে তো বড়মামা ওদের একটা প্রাইজ দেবে বলেই দিল!!
-‘কী বলছিস! মানুষকে হাসানো কি কম কথা! সেটা উপকার নয়! এতে সকলের মন ভাল থাকবে জানিস! রাগ, হিংসা কমে যাবে, নাঃ, তোর সত্যিই নোবেল পাওয়া উচিত!!’
তা উজানের নাম শুনছি পাঠানো হবে নোবেল কমিটিতে। এর মধ্যে আমি ভাবছি, একবার উজানোফোনটা চেয়ে নেব, একদিনের জন্যে। আমাদের স্কুলের হেডমাস্টারমশাই বড্ড গোমড়া আর বকাবকি করে। স্কুলের প্রেয়ারের সময় সকলের সামনে ওনাকে একবার আমি হাসাতে চাই, হা-হা করে, প্রাণখুলে। কেমন হবে বলো তো, দারুণ মজাদার, তাই না?