গ্রামটি মিছিলে যাবে

স্বরলিপি



মাঠের দিকে তাকালে মনে হয় নদী। বন্যার পানি উঠে এসেছে বাড়ি পর্যন্ত। বাড়ির গরু-ছাগল নিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে রেললাইনে। অনেক বাড়িতে নৌকার জোগাড় করা হয়েছে। আর যে সব বাড়িতে নৌকা নেই তারা বানিয়ে নিয়েছে কলাগাছের ভেলা। এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাবার জন্য বানানো হয়েছে সাঁকো।
হিমির মা প্যারালাইস্টড হয়ে পড়ে আছে বিছানায়। কয়েকদিন হলো হিমির বিড়ালটা ওর মায়ের কাছ কাছে থাকে। আর আছে দুইটা হাঁস, সেগুলো সারাদিন কোথায় কোথায় থাকে, তার ঠিক নেই। সন্ধ্যা হলে ঠিক ঠিক বাড়ি চলে আসে।
আর হিমি ভেলায় চড়ে একবেলা রেললাইনে যায়। সবার রান্নার কাজ কয়েকদিন ধরে ওখানেই চলছে। ট্রেন চলার ভয় নেই। কবে কখন এই লাইনে ট্রেন চলতো তাও জানে না হিমি। এই কয়েক দিনে সাঁকো পাড় হওয়া যেমন সহজ একটা ব্যাপার হয়ে গেছে আবার ভেলা চালানোও শিখে গেছে ও।
কিন্তু ঘরে জমানো চাল-ডাল শেষের পথে। যদিও মাছের অভাব নেই। অভাব পড়েছে চাল-ডাল আর তেল-মসলার। কেউ আর ধার দিতেও রাজী হয় না। ঘরের লাকরিও শেষের পথে।
ভেলা নিয়ে বাজারে যায় হিমি। রঞ্জুর দোকানে গিয়ে বলে বাকীতে কিছু মসলা দিতে। রঞ্জু জানিয়ে দেয়, টাকা না দিলে কিছু দিতে পারবে না। সবকিছুর দাম বেড়েছে। তার হাতে টাকা পয়সাও নায়।
হিমি জানায়, হাঁস বিক্রি করে সে সব টাকা শোধ করে দেবে।
রঞ্জু জানিয়ে দেয়, হাঁস নিয়ে গেলে সে চাল আর মসলা দিয়ে দেবে।
কিছু না জানিয়ে চলে আসে হিমি।
বাজার–সদাই সেই সব সময় করে। মা ওকে অনেকবার বলেছে, ‘যদি তোর বাপ থাকতো তাহলে আর এইসব কাজ তোর করতে হইতো না।’
কথাটা হিমির কাছে বেশ পুরোনো। কিন্তু কিছুদিন হল, ওর মা এসব কিছু বলে না। চুপচাপ থাকে। ঘরে ফিরে মাকে জানায়, চাল নাই। একটা হাঁস বিক্রি করতে হবে। মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় ওর মা।
হিমি ওর মাকে বলে, মা জানো, দুইদিন আগে তোমার হাঁসগুলোরে আর খুঁইজে পাইতেছিলাম না। তোমারে কইও নাই। আমি ভাবছিলাম হাঁসগুলো হারাইছে। সারারাইত ঘুম আসে নাই। দেহি সকালে বাড়ি ফিরছে। ধইরে রাখছি। কই না কই যায়… তার ঠিক নাই।
: খাবার দিছিস কিছু
: দিছি। ছোট মাছ।
:একটারে বেইচে দিলি আরেকটা ক্যামনে থাইকবে?
হিমির মা আর কোন কথা বলে না। হিমি ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছু সময়। হঠাৎ মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে।
পরদিন একটা হাঁস নিয়ে রঞ্জুর দোকানে যায় হিমি। দোকানের টেলিভিশনে তখন খবর প্রচারিত হচ্ছিল। খবরে কি বলছে সেদিকে খেয়াল নেই হিমির। সে দেখছে আলোর মিছিল নিয়ে অসংখ্য মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে অনেক শিশুও আছে। হিমি রঞ্জুকে প্রশ্ন করে, এভাবে হেঁটে গেলে কি হয়।
রঞ্জু হেয়ালী করে বলে ওঠে, ওরা সবাই আলোর দ্যাশে যাইতেছে।
এ কথা শোনার পর হিমি জানতে চায়, সে দেশে কি দোকান, কলার ভেলা আর অসুস্থ মা আছে? ঘরকুনো বিড়াল আছে? সে দেশে কি কারও বাবা হারিয়ে যায়, সে দেশে কি ক্লাস ফোরে যারা পড়ে তারা সবাই একই রকম জামা গায়ে দেয়?
রঞ্জু জানায়, সেদেশে সবাই সু্স্থ। হাসিখুশি। কারো কোন অভাব নাই। বাবার হাত ধরে মেয়েরা স্কুলে যায়, স্কুলের সবাই একই রকম জামা পরে আসে।
এরপর রঞ্জু রাগ করে বলে ওঠে, ‘এসব বাদ দে। আজ অল্প চাল-ডাল নিয়ে যা। আবার পরে নিস। একবারে নিলি তো সব শেষ কইরে ফেলবি।’
মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় হিমি।
গ্রামে ত্রাণ দেওয়ার জন্য তালিকা করা হচ্ছিল। হিমির নামটাও উঠানো হলো ওই তালিকায়। দুইদিন পর গ্রামে ত্রাণ দিতে এলো লোকজন। ত্রাণ দেওয়ার সঙ্গে সমান তালে চলছে ছবি তোলার উৎসব। পত্রিকা আর টেলিভশনের সাংবাদিকরাও জড়ো হয়েছে সেখানে।
ত্রাণ পাওয়ার পর কারো কোন অভিযোগ আছে কিনা সাংবাদিকরা জানতে চাইছিল, ভিন্ন ভিন্ন লোকের কাছে। হিমি হাত তোলে, ‌'আমি কিছু কইবার চাই।'
: কি?
: আমিও একখান ছবি বানাইছি।
নিজের আঁকা ছবিটা সে দেখিয়ে দেয়।
একটা পুরোন কাপড় কেটে পিঁড়ির সঙ্গে বেঁধে পোর্ট্রেট-এর বানিয়ে নিয়েছে ও। তার ওপর লাল আর সাদা শাপলার পাঁপড়ি ঘঁষে ঘঁষে একটা ছবি এঁকেছে। ছবির সব মানুষ লাল। কেবল একটা মানুষ সাদা। যে মানুষটি সাদা, তাকে শুয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। সবুজ পাতা দিয়ে কয়েকটি গাছের ছবি আকাঁ। আর খালি জায়গায় লেখা, 'গ্রামটি মিছিলে যাবে'। পুরো ছবিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হলুদ রঙ।
সাংবাদিকরা হিমির ছবি তুলতে চাইলো। এবার সে একটু সময় চায়। কারণ সে তার সঙ্গে বিড়ালটাকে নেবে। এর কারণ জানতো চাইলো এক সাংবাদিক।
হিমি জানায়, রাতে যখন তার মা ঘুমিয়ে যায়, তখন সে অনেক রকম শব্দ শুনতে পায়। আর ভয় লাগে। কিন্তু ঘরে আলো থাকে না। বিড়ালটা তখন হিমির সামনে এসে বসে। ওর চোখ থেকে আলো বের হয়। হিমির ঘুম না আসা পর্যন্ত জেগে থাকে বিড়ালটা।

এখন প্রশ্ন করা হল, ছবিতে তাহলে বিড়াল নেই কেন?
ওর উত্তর, বিড়ালের চোখের আলো সে পুরো ছবিতেই ছড়িয়ে রেখেছে। আর এই ছবিতে যে সব মানুষ আছে তাদের মধ্য হিমির ছবিও আছে। আর নিজের ছবির ভেতর খুব যত্ন করে এঁকে রেখেছে বিড়ালটাকে।