সাপে

রঙ্গন রায়



রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় হারুবাবুর মনে পড়লো আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজা হয়নি। এরকম বেয়াক্কেলে ভুলে যাওয়ার বাতিক হারুবাবুর বংশপরম্পরায় রোগ। এ থেকে নিষ্কৃতি নেই ভেবেই হারুবাবু আর গাঁটের কড়ি খরচা করে ডাক্তার - বদ্যি দেখাননি। যদিও এমন গোলমেলে রোগ কোন ডাক্তার সারাতে পারবে কিনা সে বিষয়ে বড্ড সন্দেহ আছে , তবে এখন ঘুমোতে যাওয়ার সময় সকাল বেলার ক্রিয়াদি সম্পন্ন করবার কথা মনে পড়ায় বড্ড দ্বিধায় পড়ে গেলেন তিনি। আচ্ছা সকালের দাঁতমাজার কাজটা এখনই করে নিলে কেমন হয়? যেমন সকালে পেপার পড়তে ভুলে গেলে তা রাতে পড়ে নেওয়া যেতে পারে , কিন্তু দাঁত মাজাটা কি সেভাবে পূরন করা সম্ভব? উহুঁ , ভারি খচখচ করছে মনখানা।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে সমস্ত রকম আড়ষ্টতা ঝেড়ে ফেলে হারুবাবু তড়াক করে বিছানায় উঠে বসলেন। বাইরে চাঁদের আলো। বেড়ার ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকে বিছানায় দিওয়ালী করে দিয়েছে একেবারে। হঠাৎ মনে পড়লো ইশ!এখনো তো তার বিয়েটাই সেরে নেওয়া হলোনা! হবেই বা কিকরে? এমন 'আখাম্বা'পাত্তরের হাতে কি আর মেয়ের বাপ মেয়ে তোলে? কোনদিন হয়তো বউ আছে এটাই বিলকুল ভুলে মেরে দিয়ে আর একটা বউ এনে হাজির করলে! নাহ , আবার উলোট পালোট চিন্তার স্রোত চলে আসছে। দাঁতটা মেজে নেওয়ার কথা। এবার ভুললে মুশকিল!
হ্যারিকেনটা কি নিভে গেলো? তেল শেষ বোধহয় , অগত্যা 'চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে কে'ই সম্বল করে দরজা খুললেন তিনি। বাড়িখানা পাতলা বেড়ার হলে কি হবে , দরজাটা একদম খাস শালকাঠের তৈরী , বেজায় মজবুত। বেশ শখ করেই দরজাটা বানিয়েছেন হারুবাবু। এটা করতে গিয়েই তার ঘরটা হয়ে গিয়েছে 'বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেড়ো।' তবে সেসব ব্যাপারে ভ্রুক্ষেপ করেননা তিনি। তার আছেটাই কি যে চোরে নেবে? দরজা খুলে বাইরে এসে রাত্রির রূপ দেখে তিনি কিছুক্ষণ চুপ মেরে গেলেন। ভাগ্যিস হ্যারিকেনে তেল ছিলনা! তাই তো এমন রাত্রির রূপ দেখা গেলো! তিনি আবার দাঁত মাজার কথাটা ভুলতে যাবেন এমন সময় উঠোনের বাইরে যে নিমগাছটি রয়েছে তার কয়েকটা ডাল নড়ে উঠলো। অমনি ঝড়াম করে দাঁত মাজার কথা মাথায় ফিরতেই তিনি একটা অসম্ভব দৃশ্য দেখে ফেললেন। একটা লোক গামছা পড়ে গাছে উঠছে আর নামছে! কি সব্বনাশ! কি ওটা! ভূত নয়তো? এইজন্যই কি গাঁয়ের লোকে বলতো যে হারু বাড়ির পাশেই নিমগাছ রাখা ঠিক নয় হে , অমঙ্গল হয়। এই কি তাহলে সেই 'অমঙ্গলের' প্রকৃষ্ট উদাহরণ? তবে এ এখনো কোন মঙ্গল অমঙ্গল ঘটায়নি যদিও। তবে ভূতে কি গামছা পড়ে থাকে? তিনি তো জানতেন তেনারা যেমন ইচ্ছে তেমন রূপ নিয়ে যেমন ইচ্ছে তেমন পোশাক পড়ে ঘুরে বেড়াতেই ভালবাসে। তবে কি এই ভূতটা কিঞ্চিৎ কৃপন? যেই জন্য গামছা পড়েই পরকালের জীবন কাটিয়ে যাচ্ছেন। মনে হয় পরকালের জীবনেও ইচ্ছেমত ম্যাজিক করার পেছনে ট্যাক্স-ফ্যাক্স রয়েছে। যার জেরে এই গরীব ভূতটার এই হালত। ভূতটাকে দেখে প্রথমে তিনি যতটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন , এখন আর ততটা পাচ্ছেন না। বোধহয় দুজনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মিলে যেতেই হারু বাবুর কাছে ভূতটি গুরুত্ব হারিয়েছেন।
দাঁতন হিসেবে বেড়ে দেখে একটা নিমের ডাল ভাঙার কথা হারুবাবুর , তবে এই গামছা পরিহিত ভূতখানি যত নষ্টের মূল। এখন অবিশ্যি সে ব্যাটাকে আর দেখাও যাচ্ছে না , বোধহয় ভ্যানিশ ট্যানিশ হয়ে গিয়েছে। তেনাদের কীর্তিকলাপ বড় সুবিধার নয়। তবে নিমগাছে এখন আর হাত দিতে ইচ্ছে করছেনা হারুবাবুর্। ভূতটা ছুঁয়ে অশুচি করে দিলো কিনা কে জানে। কাল মোড়লকাকার সাথে একটু শলাপরামর্শ করতে হবেক্ষন। কিন্তু দাঁত টা যে মাজা হলোনা ... সারাটা দিন বিনা মাজা দাঁতে তিনি কাজকর্ম করে গিয়েছেন , এবং বেশ স্ফুর্তির সঙ্গেই করে গিয়েছেন। অন্যান্য দিন যেমন সামান্য কারনে রাগে দাঁত কিরমির করে ওঠে , কিংবা কাউকে কিছু কাজ করতে বললে সে ব্যাটা দেঁতো হাসি দেখিয়ে পগাড়পার হয়ে যায় , নিদেনপক্ষে মাঝেমধ্যে যে দাঁত কটকট করে প্রচন্ড ব্যাথায় সেসব কিছুই আজ হয়নি! বরং সুন্দর কেটেছে আজকের দিনখানা! তারমানে দাঁত না মাজলেই তো উপকার দেখা যাচ্ছে! উঠোনে দাঁড়িয়ে এমন চমৎকার সলিউশন পেতেই হারুবাবু আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠতে যাচ্ছিলেন এমন সময় নিমগাছ থেকে গামছা পড়া লোকটি সশরীরে ভূমিতে নেমে এসে হারুবাবুর গালে একটা ঠাটিয়ে চড় কষিয়ে হাতে একটা নিমের দাঁতন ধরিয়ে দিলে।
হারুবাবুকে এত জোরে চড় এর আগে কেউ কখনো মারেনি। চড়ের চোটে তিনি কিছুক্ষন চোখে সর্ষে ফুল দেখে ফেললেন। ধীরেধীরে মাথাটা যখন কাজ করতে শুরু করলো তখন একটা জলদগম্ভীর কন্ঠস্বর শুনতে পেলেন তিনি , অনেকটা দৈববাণীর মত " সকাল বেলা দাঁত না মাজা ঘোরতর অন্যায় হারু , মহাপাতকি হবি তুই।"
হারুবাবু চোখ মেলে প্রথমে চারিদিকে কিছুই দেখতে পেলেননা , তারপর সেই গামছা পড়া লিকলিকে লোকটাকে নজরে এলো। হারুবাবুর থেকে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আছে। কুচকুচে কালো রোগা চেহারা , মাথায় টাক , সেখানে চাঁদের আলো পড়ে বেশ চকচকে দেখাচ্ছে , যার জন্য মুখটা হয়ে গিয়েছে অন্ধকার্। শুধুমাত্র গামছা পড়ে লিকলিকে ভাবে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা বা ভূতটা। ওই সরু দেহটা থেকে এত বাজখাই গলা আসছে! হারুবাবু একটু অবাকই হলেন। মাথাটা এখনো ভোঁভো করছে।
-" কিরে , কথা কানে গেলোনা? "
হারুবাবু এবার ভয়ে ভয়ে বললেন , " তা গেছে , তবে আ -আপনি কে? ঠিক চিনলাম না ... "
-" ওরে ওরে নরাধম পামর , আমি তোর ক্ষুরশ্বশুরের বড় শালা , সাপে। "
'সাপে'? একিরকম অদ্ভুত নাম! সাপ হলেও কথা ছিল , কিন্তু সাপে? উহুঁ ,নামটির কোনো মানেই তো পাওয়া যাচ্ছে না! আর তাছাড়া হারুবাবুর ক্ষুর শ্বশুরই বা আসবেন কোত্থেকে? তিনি তো বিয়েই করেননি , তায় আবার ক্ষুরশ্বশুরের বড়শালা! নাহ, ব্যাপার টা ঠিক সুবিধার ঠেকছেনা। লোকটা বড্ড গোলমেলে।
-" আজ্ঞে আমার যে কোন ক্ষুর শ্বশুরই নেই সাপে দাদা ..."
-"কি , এত্ত বড় আস্পর্ধা! আমার সামনে মিথ্যে কথা। আগে দাঁত মাজ, বাসি মুখে মিথ্যে বললে আরও পাপের ভাগী হবি তুই। "
হারুবাবুর এবার প্রচন্ড রাগ হলো। রাতদুপুরে একটা উচ্চিংড়ে এসে তাকে ধমকধামক দিয়ে কথা বলছে , তুইতোকারি করছে , আবার মিথ্যে সম্পর্কের প্যাঁচও দেখাচ্ছে , এতো আর মেনে নেওয়া চলেনা -
- " আজ্ঞে আমি আপনার কথা শুনবো কেন?দাঁত না মেজেই আমার আজকের দিনখানা ভালো কেটেছে -"
-" ওরে পাপিষ্ঠ! দাঁত মাজলে মন ভালো থাকে কিনা , এই জন্যই তো অপগন্ড তোকে এত করে বলছি, এই যে তোর দিনখানা ভালো কেটেছে - তা বলে কি আর রাতখানাও ভালো কাটলো? রাতদুপুরে আমি এলুম যে - এখন কি আর ভালো যাচ্ছে সময়? শিগগির দাঁত মেজে নে , তারপর তোকে একটা ম্যাজিক শিখিয়ে দেব ক্ষন। "
হারুবাবুর মেজাজ এবার সপ্তমে চড়লো। তিনি কি ছোট বাচ্চা নাকি! যে ম্যাজিক শেখানোর লোভ দেখিয়ে ... নানা , এবার বাড়াবাড়ি হচ্ছে। সাপে এবার হঠাৎ বললেন , " গাছ যেভাবে সূর্যের আলোয় নিজের খাবার তৈরী করতে জানে , মানে যাকে আমরা সালোকসংশ্লেষ বলি , সেটা কি কোন মানুষ করতে পারে?"
প্রশ্নটা যেহেতু হারুবাবুর উদ্দেশ্যেই তাই তিনি রাগ ও বিস্ময় মিশিয়ে বললেন , " না। যদ্দুর জানি -"
- " এইতো? কিন্তু আমি সেই পদ্ধতিটি জানি। এবং এইজন্যই আমি এখন আর কোন খাদ্য গ্রহণ করিনা। সালোকসংশ্লেষ জানি বলেই আমার নাম 'সাপে' - সালোকসংশ্লেষ পারে যে ..."
এমন অদ্ভুত কথা ও নামের এমন অদ্ভুত বর্ণনা শুনে হারু বাবু কিঞ্চিৎ হকচকিয়ে গেলেন। তারপরেই মনে হলো যে তিনি কোনো মাতালের সাথে বা পাগলের সাথে বৃথা বাকবিতণ্ডায় লেগে নেই তো? এই রাতদুপুরে উদ্ভট যতসব আপদ , এ ব্যাটা ভূত নয় এটা শিয়োর্। নয়তো এতক্ষণে ভয় দেখাবার চেষ্টা করতো ...
- " কি হলো?বিশ্বাস হলোনা তো? ওরে হতভাগা দাঁত মেজে নে _ দাঁত মেজে নে _ দাঁত মেজে নে ..."
হারু বাবু হঠাৎ কেমন যেন সম্মোহিত হয়ে গেলেন। একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়ে 'সাপে'স্পর্শ নিম দাঁতন সকালের বাসি দাঁতে স্পর্শ করলেন। অমনি কে যেন প্রচন্ড চিৎকার দিয়ে তাঁকে একটা ধাক্কা মারলো।
-" উফ্! আঙুলটা জ্বালিয়ে দিলে , বাবাগো তুমি এ কার সাথে আমার বিয়ে দিলে , প্রথম রাতেই আঙুল কামড়ে - ওরে বাবারে উহ্ ..."
হারুবাবু চোখ খুলে দেখলেন তিনি সকালবেলার বিছানায় শুয়ে আছেন। জানলার বাইরে গাছগুলো সালোকসংশ্লেষে লেগে পড়েছে ইতিমধ্যে , এবং তার সামনে সাপে নয় বরং একটি বিবাহিতা বউ। এ কার বউ? হাতে নিম দাঁতন ফাতন কিচ্ছু নেই। মহিলাটি প্রচন্ড জ্বালায় নিজের আঙুলটা কেন জানি ঝাড়ছে। কিন্তু সাপে কোথায় গেলো? আর সকালই বা হলো কেমন করে? হঠাৎ মনে পড়লো যে কালকেই তো তার বিয়ে হয়েছে , তারমানে এই মহিলা তাঁরই বিবাহিতা স্ত্রী! কেলো করেছে! ছি ছি কি মিশটেক!
-" এ তোমার কেমন আক্কেল অ্যাঁ , বিনা মতলবে আমার আঙুল কামড়ালে যে বড়! "
হারুবাবু এসব বকুনি কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছেন না। মনে হচ্ছে আচ্ছা একে মানে বউকে কি জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে যে ওর কাকার বড়শালার নাম সাপে কি না? এবং তিনি সালোকসংশ্লেষ ... নাহ! তার আগে বরঞ্চ দাঁতটাই মেজে নেওয়া যাক। নাহলে এবার ভুললে ---