ঝিনির বন্ধু

চিত্রালী ভট্টাচার্য



ঝিনির ভীষণ মনখারাপ, খালি খালি চোখ জলে ভরে উঠছে, রুমাল দিয়ে বার বার মুছতে মুছতে চোখের তলাটা লাল হয়ে উঠেছে, কিন্তু তাতে মায়ের কি? মা একবারও কি ওকে আদর করেছে নাকি? বরং চোখ কট্‌ মট্‌ করে বলেছে—ঝিনি, অবাধ্যতা করো না, তাড়াতাড়ি চোখ মোছো, সবাই কিন্তু দেখছে তুমি কেমন ক্যাবলার মত কাঁদছ।
-দেখুক, তাতে আমার কি? আমি কি ইচ্ছে করে কাঁদছি নাকি?
-ঝিনি, মা ধমকে উঠতেই ঝিনির আরো কান্না পেতে শুরু করল, তবু জেদ করে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকল।
মা বলল- জানলা দিয়ে মুখ বাড়িও না, প্লাটফর্মে সবাই দৌড়দৌড়ি করছে, লেগে যেতে পারে। তবু ঝিনি মুখ বাড়িয়ে খুঁজতে লাগল। কিন্তু ফুচুকে কোথাও দেখতে পেল না। তাহলে কি ও আসবে না? কিন্তু ও তো বলেছিল আজ ষ্টেশনে আসবে। তাহলে এখনো আসছেনা কেন?
ঝিনি আবার চোখ মুছল। তা দেখে মা আবার ধমকে উঠল- ঝিনি তুমি কিন্তু বাড়াবাড়ি করছ। এরপর আমি কিন্তু ভীষণ রেগে যাব, আর তুমি জানো রেগেগেলে আমি কেমন বাজে মা হয়ে যাই?
-আমি তো কিছু দুষ্টুমি করছি না, শুধু ফুচু আসছে কিনা দেখছি।
-না, দেখবে না। ওই ছেলেটাকে তোমার কি দরকার?
-ও যে আমার বন্ধু।
-ওই ছেলেটা তোমার বন্ধু হল কি করে!
-হ্যাঁ, আমি ওর সঙ্গে বন্ধু পাতিয়েছি, দিদুনও বলেছে ও খুব ভাল ছেলে। স্কুলে পড়ে, আবার মায়ের সঙ্গে দিদুনের বাড়িতে কাজও করে। জানো মা ও কতকিছু জানে—মাটি কেটে ফুলগাছ লাগাতে পারে, দুধ দুইতে পারে, আর কি সুন্দর কাঁসর বাজাতে পারে! ওর বাবা যখন পুজোয় দূরে কোথাও ঢাক বাজাতে যায় তখনও ফুচু বাবার সঙ্গে কাঁসর বাজাতে যায়, -কি ভাল না মা! জানো মা ও বলেছে আমাকে বাজানো শিখিয়ে দেবে।
-ছিঃ, তোমার তিতি, মিতিন, জোজোর মত বন্ধু থাকতে তুমি কিনা ফুচুকে বন্ধু করতে চাও!
এই কথা শুনে ঝিনির আরো কান্না পেতে থাকে। মা তো জানেনা তিতি, মিতিনরা কতোটা দুষ্টু! ওরা কেবল ঝগড়া করতে জানে, কথায় কথায় চিমটি কাটে আর বলে, তুই ম্যাথ- এ ভালো না ,তোর সঙ্গে খেলবো না। কিন্তু আমি তো বাংলায় ভালো, কত কবিতা মুখস্ত বলতে পারি সেটা বুঝি কিছু না? ফুচু কিন্তু ওদের মত একটুও নয়। ও কতরকম খেলা জানে। এমনকি গাছে উঠে পেয়ারা পেড়ে ঝিনিকে খাওয়াতেও জানে। কত সুন্দর কবিতা বলে-‘ কাঠবেড়ালী--- কাঠবেড়ালী—পেয়ারা তুমি খাও?”---- আরো কত—কত --। কিন্তু মা কেন যে------!
ঝিনি আবার মুখ বাড়ায়। মা বলেছে ট্রেন ছাড়তে আর মাত্র পাঁচ মিনিট আছে। বাবা গেছে জলের বোতল কিনতে । ওই তো বাবা এগিয়ে আসছে, হাতে জলের বোতল। জানলা দিয়ে ঝিনির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল- ধরো তো শক্ত করে, আর এই নাও তোমার চকলেট।
ঝিনি ভয়ে ভয়ে মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে ডাকলো- বাবা---
বাবা বলল—আছে আছে, সারপ্রাইজ আছে, আগে চোখ বন্ধ করো।
ঝিনি মনখারাপ নিয়েই চোখ বন্ধ করল।
-হুঁ, এবার চোখ খোলো।
ঝিনি চোখ খুলতেই দেখে সামনে ফুচু দাঁড়িয়ে। বারে তুই এসেগেছিস?
-হুঁ, একেবারে ম্যাজিক করে এনেদিলাম-বাবা বলল।
মা তো অবাক! ও এখানে? কিকরে?
বাবা বলল- নিয়ে এলাম। ঝিনির খুব মন খারাপ হচ্ছিল, তো মা-ই বলল নিয়ে যা ছেলেটাকে। পড়াশুনা করতে চায় , স্কুলে ভর্তি করে দিস। ঝিনিরও খেলার একটা সঙ্গী হবে আর তোরও সমাজ সেবা হবে।
কিন্তু ওর বাড়ির লোক? বাবা ?মা?
--কথা বলেছি কাল রাতেই, তোমায় বলিনি এই সারপ্রাইজটা দেব বলে।
-কিন্তু ছেলেটা কেমন না জেনেই---?
-সে নিয়ে তুমি চিন্তা করোনা। আমাদের বাড়িতেতো ওরা কম দিন নেই। আর ছেলেটা সত্যি সত্যিই পড়াশুনোয় খুব ভালো, বিশেষ করে অংকে। ওর সঙ্গে থাকলে ঝিনিও দুদিনে অংক শিখে যাবে। কি ঝিনি তাইতো?
ঝিনির চোখে খুশির ঝিলিক। বড় করে ঘাড় নেড়ে বলল- হ্যাঁ, আমি এবার থেকে খুব ভালো হয়ে থাকবো দেখো। মায়ের কথা সব শুনব। পড়াশুনা করব আর তারপর আমি আর ফুচু খেলবো । কি রে তাইতো?
ফুচু হাসি হাসি মুখ করে বলল—হ্যাঁ। তারপর ওর ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা পেতলের কাঁসর বার করে বলল- এটা বাবা বোনের জন্য পাঠিয়ে দিয়েছে। গতবার যখন পুজোয় বাজিয়ে ছিলাম তখন একজন খুশি হয়ে দিয়েছিল। আজ থেকে এটা ঝিনির।
ঝিনির খুশি আর ধরেনা। হাতে নিয়ে বার বার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিল ওটাকে, কি সুন্দর ঝক্‌ ঝকে! কাঠি ছোয়াতেই টং করে উঠল। আর এমনি হুইসল দিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিল।
ঝিনি দৌড়ে গিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে , কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল- মা , ফুচু আমার বন্ধু হলে তুমি রাগ করবে নাতো?
-কিন্তু ওর নামটা---?
ফুচু হাসতে হাসতে বলল—ও তো আমার ডাক নাম, ভালো নাম তো আদিত্য। আদিত্য কর্মকার। ক্লাস –ফাইভ ,বাংলা মিডিয়াম।
ওর কথা বলার ভঙ্গিতে মা –বাবা দুজনেই হেসে উঠল আর ঝিনি হাততালি দিয়ে উঠল জোরে।
ট্রেনও তখন গতি পেল।