মনস্টার আংকেল

শামীমা জামান



পশ্চিম নিউইয়র্কের এই শহরে যখন প্রথম এসেছিলো টুশিরা, দেশ ছেড়ে । পরিবারপরিজন আর স্কুলের বন্ধুদের ফেলে তখন ও এত মন খারাপ করত না তার । আসলে মন খারাপের সময় ও তেমন পাওয়া যায়নি স্কুল আর বেড়ানোর ব্যস্ততার জন্য। এইত বছর দুয়েক ও হয়নি ওরা এসেছে এই কনকনে ঠান্ডার শহর বাফালোতে । প্রায় প্রতিদিনই বাবা আর মায়ের সাথে কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাওয়া , বাইরে খাওয়া ,সব কিছু চেনা এসবই ছিল টুশির কাছে ভীষন রোমাঞ্চকর! সেদিন ও তারা শহরের জ্যাকসন এভিনিউতে খেতে গিয়েছিল একটা ইটালিয়ান রেস্তোরাতে মলবেরী স্মুদিটা কি মজার ছিল ! পাস্তা তার খুব পছন্দ । তবে মায়ের বানানো বোরিং পাস্তা নয় মলবেরী ক্যাফের রাধুনীর বানানো পাস্তা। বড় হয়ে সে রাধুনী হবে কি ? তাহলে সব মজার মজার খাবার খাওয়া যাবে । রেস্তোরায় বাবা আর মা খেতে খেতে কথা বলছিল মোবাইলে । সম্ভবত তারা কাউকে সাহায্য করতে চাইছিল। মা আর বাবা ফোনে তাদের বাসার এড্রেস বলছিল বার বার । কিভাবে আসতে হবে তাও বলে দিচ্ছিলো । টুশির ছোট্র হৃদয়টা আনন্দে নেচে উঠেছিলো। এই সুন্দর ঝকঝকে তকতকে হালকা সবুজ ঘাসের,গাঢ় সবুজ গাছের, নীল জল ঘেরা শহরে যেদিকে চোখ মেলে তাকানো যায় শুধু সুন্দর আর সুন্দর ! এতসব সুন্দরের মাঝে আপন মানুষেরা নেই বলে টুশির বুকটা এক অচেনা কস্টে হু হু করে উঠতো । মা আর বাবারও বুঝি তাই করে। যদিও বাফালোতে অনেক বাঙ্গালী ।একটা মিনি বাংলাদেশ বলা যায় । আর আছে প্রচুর হুজুরেরা । এত হুজুর এখানে কি করে এলো কে জানে ।
বাবার ফোনালাপে সে বেশ বুঝতে পেরেছিল তাদের বাড়িতে অতিথি হয়ে কেউ আসছে যে থাকবে তাদেরই সঙ্গে। এটা বেশ মজা হবে। স্কুল থেকে ফেরার পর প্রায় ই তাকে একা থাকতে হয়। বাবা আর মা তখনও কাজে থাকে বাইরে। সে স্কুল থেকে চলে আসে অনিতা আন্টির সাথে । তাদের হাউস থেকে তিনটে হাউস পর ই অনিতা আন্টির বাড়ি। কলকাতার বাঙ্গালী অনিতা আন্টি ওদের পাবলিক স্কুলে ই চাকরী করেন। তার ছেলে জুন ও টুশির ভাল বন্ধু। তারা বিকেলে লনের সামনে খেলা করে আরো সব নেইবার দের সাথে। পৃথিবী টা যে কত সুন্দর তা যেন বিকেল না আসলে টের ই পেত না টুশি।
অনিতা আন্টি ঠিক করে সিট বেল্ট বেঁধে দেন । তারপর তার চোখ কেবল সামনে রাস্তার দিকেই থাকে। জুন আর সে ছুটির আনন্দ আর ক্লান্তিতে ঝিমোতে ঝিমোতে পথ ঘাট দেখতে থাকে । অনিতা আন্টিকে টুশির খুব ভাল লাগে। বড় হয়ে সে এমন দেখতে হতে চায় । কেমন যেন অন্য মাদের থেকে আলাদা। জিন্স প্যান্ট আর সাদা ফতুয়ায় তাকে আরো সুন্দর লাগে অথচ সে তার মায়ের মত ফর্সা নয়। আবার জগ্লুল আংকেল এর মত কালো কুচকুচেও নয়। টুশির মন টা আবারো খারাপ হয়ে গেল। সে কিছু একটা ভুলে যেতে চায়। আবার অনিতা আন্টির শক্তপোক্ত চেহারাটা দেখে মনে হয় তার মনের সমস্ত কথা সে অনিতা আন্টিকে বলতে পারে। আচ্ছা মাকে কেন এমন মনে হয় না তার। অথচ মা ই তাকে সব কিছু কিনে দেয়। মা আসলে অনিতা আন্টির মত এত স্মার্ট নয়। আর বড্ড বেশি ভাল। সারাদিন বাইরে জব করে এসে বাসার কাজে ব্যস্ত থাকে । আগে রান্না নিয়ে এত ভাবত না এই জগ্লুল আংকেলটা আসার পর থেকে মাকে রান্না ঘরে অনেক বেশি সময় দিতে হয়। তার সাথে যে একটু ভাল করে কথা বলবে সেই সময় কোথায় আর । আচ্ছা সে কেন এসব ভাবছে। মন খারাপ করা চিন্তা করলে শরীর খারাপ করে। তাই সে এখন থেকে ভাল ভাল চিন্তা করবে। গাড়ীর সিটে হেলান দিয়ে চোখ বোজে টুশি। পৃথিবীর সব চেয়ে ভয়ংকর সুন্দর জায়গাটি তার সামনে ভাসতে থাকে। গত উইকেন্ডেই গিয়েছিল তারা সেখানে। তাদের হাউস থেকে গাড়িতে ঘন্টা খানেক এর পথ। ও এম জি! কি সাংঘাতিক ব্যাপার সেখানে! শুধু পানি আর পানি। কত উপর থেকে পড়ছে আর পড়ছে !সাদা ধবধবে পানি নিচে নেমে শান্ত নীলে মিশে সাদা ধোঁয়া পাকিয়ে চলেছে যেন ।এত পানি কোথা থেকে আসছে। আর কোথায়ইবা যাচ্ছে। চারিদিকে শো শো পানির শব্দ। এই ই হল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জল্প্রপাত নায়াগ্রা ! ইউ এস, কানাডা বর্ডারে যার এক তৃতীয়াংশের দেখা মেলে । বাকী দুই তৃতীয়াংশ কানাডার অন্টারিও তে পড়েছে।দেশ বিদেশ থেকে আসা কত শত মানুষেরা ছবি তোলায় ব্যস্ত। মা আর অনিতা আন্টিও কম যায়না । এক এর পর এক ছবি তুলতে তারা ব্যস্ত। জুন আর তাকে সামলাতে জগ্লুল আংকেল অতি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। উফ ! এরপরে আর কিছু ভাবতে তার ভাল লাগেনা। বাবা মা অনিতা আন্টি বা অন্য কেউ আদর করলে তার কত ভাল লাগে । কিন্তু এই জগ্লুল আংকেল তাকে আদর করতে এলে তার খুব বিচ্ছিরি লাগে। পৃথিবীটাকে তখন খুব খারাপ আর ভয়ানক একটা জায়গা মনে হয়। এটা নিশ্চয়ই ব্যাড টাচ ! অনিতা আন্টি গাড়ী থামিয়ে দিলেন। তাদের লন ঘেরা সুন্দর হাউসটি এসে গেছে। গাড়ী থেকে নেমে সে অনিতা আন্টির হাত ধরলো। অনিতা আন্টি ব্যস্ততার সাথে বললেন ‘ওয়াটস রং উইথ ইউ বেব ? ‘
আচ্ছা আন্টি তোমাদের বাসায় মন্সটার আসলে তুমি কি কর ?
মন্সটার বলে সত্যি কিছু নেই হানি সব ইমাজিনেশন। অনিতা আন্টি কাছে এসে তার ঝলমলে চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে বললেন ‘তোমার ভয় করে একা বেবী ? জগ্লুল আংকেল এসে পড়বেন তো আর একা ভয় করবে না ।
অনিতা আন্টি চলে গেলে সে বাড়িতে ঢুকে ব্যাগটা ফেলে চেঞ্জ হয়ে নেয়। টিভি ছেড়ে লম্বা সোফাটায় ঝাপ দিয়ে শুয়ে পড়ে একটা চিপসের কৌটা হাতে। টিভিতে একটা পুরনো মুভি দেখাচ্ছে। হোম এলোন। মুভিতে তার ই বয়সী একটা ছেলে একা একা নানান বুদ্ধি বের করে রবারগুলোকে ধরাশয়ী করছে ! হাসতে হাসতে টুশির পেট ফেটে যাওয়ার উপক্রম। একটু পরেই সে এসে পড়বে। মা আর বাবা আসার আগে। টুশি ফ্রিজ খুলে চিজ কেক আর সসেজ বের করে আয়েশ করে খেতে বসলো । গন্ধ পেয়ে কিটোটা ঘুম থেকে উঠে এক লাফে তার কাছে এসে মিয়াও মিয়াঁও করে অস্থির হল। অসভ্য বেড়াল। কোন ম্যানারস জানে না। সে তাকে এক স্লাইস সল্টেড বিফ কেটে দিল। কিটো চেটেপুটে খেয়ে টুশির কোলে এসে খাতির জমায়। মোটু বিল্লিটাকে কোল থেকে নামিয়ে কিচেনে যায় টুশি। মশলার কৌটোগুলো থেকে পেপরিকা খুজে নিয়ে পানিতে গুলে নেয়। আর সেটা তার প্লাস্টিকের বড় ওয়াটার গানটায় ভরে ফেলে। ফ্রিজ থেকে বাটার বের করে ওভেনে ঢোকায়। কিটোটা পায়ে পায়ে ঘুর ঘুর করছে। যেন সেও সব মতলব বুঝে নিচ্ছে।
জগ্লুল আংকেল ঘরে ঢুকতেই বাটার লাগানো পিচ্ছিল টাইলসে পা ফসকে চিৎপটাং। কিটো এক লাফে কোথা থেকে এসে ঝাপিয়ে পড়ল তার বুকের ওপর। সমানে তার ধারালো নখ দিয়ে মুখে গলায় আঁচড়াতে লাগলো। এই বুলশিটটাই তার ফ্লাফি লোমওয়ালা গায়ে পা দিয়ে গুতো দিত! টুশি একটুও সময় নস্ট না করে ওয়াটার গান তাক করল লোকটার চোখ বরাবর। খানিক পেপরিকা বৃষ্টি ঝরিয়ে খোলা দরজা দিয়ে ভো দৌড় দিল জুনদের হাউসের দিকে।
বাবার সাথে টুশি আর কোনদিন কথা বলবে না । জগ্লুল আংকেল বাবাকে সব নালিশ করেছে! বাবার সে কি বকা! বাবা টিভিতে নিউজ দেখছে। মা ও কিচেনে কাজ করতে করতে নিউজ দেখে। সে যে সোফায় উপুড় হয়ে কাঁদছে সেদিকে কারো খেয়ালই নেই! কিটো তার গা ঘেষে গুটি পাকিয়ে বসে। লেজ নাড়িয়ে সান্তনা জানায়।বাংলাদেশের চ্যানেলে দেখাচ্ছে পুজা নামে একটি মেয়েকে একটা দৈত্য প্রায় মেরেই ফেলেছে। কী ভয়ংকর ! মা কিচেন থেকে বলল বাবাকে। টুশি উঠে বসে দেখতে চেষ্টা করে আর অমনি বাবা রিমোট দিয়ে চ্যানেল চেঞ্জ করে দেয়।
‘বাবা পুজাদের বাসায় ও কি একটা মন্সটার আংকেল থাকত ? ‘
বাবা আর মা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। মা কাজ ফেলে ছুটে এসে তাকে বুকে চেপে ধরে!
সাহস করে টুশি তার মনের কথাটি বাবা আর মাকে বলতে পেরেছিল। তারপর থেকে টুশিদের হাউস এমনকি বাফালোর ঝকঝকে রাস্তাঘাট এর কোথাও আর মন্সটার আংকেল টাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্কুল আর বাড়ির চারপাশের বন্ধুদের সাথে টুশির দিনগুলো মন্দ যায় না। কিটো তার হুলো লেজ উড়িয়ে সর্বদাই সঙ্গে থাকে।