ঘাসুড়ে মেঘ

জিনাত জাহান খান



আদর্শপীঠ উচ্চবিদ্যালয়, সপ্তম শ্রেণি, স্কুলের সবাই জানে এই ক্লাসে ৪/৫ টা বিচ্ছু আছে, যেইসেই বিচ্ছু নয়, একেবারে বিষকাঁটাযুক্ত। অনেক ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে। একটা ঘটনা বলাই যায়... স্কুলের হেড স্যার বাবু গৌতম বিশ্বাস, নিঃসন্তান, খুব অল্প বয়সেই স্ত্রীকে হারিয়েছেন। স্কুলের একটা রুম নিয়ে সুন্দর করে পরিপাটি করে সাজিয়ে বেশ আরামেই থাকেন। সারাদিন স্কুল আর রাতভরে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ডুবে থাকেন। ভীষণ রাগী ও নিয়মের বাইরে একচুলও নড়েন না। যাইহোক যা বলছিলাম, বিচ্ছুবাহিনী, যার লিডার হলেন রেহান রেজা সবাই যাকে রেজা নামেই চেনে। যার মগজে প্রতিনিয়ত চাষ হয় বিভিন্ন বাঁদরামো, আর তাতে বীজ-সার-মই দেয় অন্যান্য বিচ্ছুরা। রোজ স্কুলে আসার পথে পথেই রেজা পাখির বাসায় ডিম গুণে আসা, ফুলগুলো ছুঁয়ে আসা আরো অনেক রাজকাজ করেই স্কুলে আসে। একদিন ঘণ্টা পড়ে যাবার পরে স্কুলের পকেট গেট দিয়ে মাথা বাড়ালো অর্থাৎ নুইয়ে, অমনি টের পেলো কে যেন তার মাথাটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে ভেতরে নিয়ে গেলো, ঘটনাটি এতই দ্রুত ঘটে গেলো যে রেজা কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। পরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো হেডস্যার।
- আদাব স্যার
- কি ব্যাপার, তুই জানিস না ঘণ্টা পড়ে যাবার পরে স্কুলে প্রবেশ নিষেধ!
- স্যার রাস্তায় একটা এক্সিডেন্ট হলো, একটা বাচ্চা রিক্সা থেকে পরে গেলো, তাকে উঠিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে আসতে একটু দেরি হয়ে গেলো।
- শোন, তোর মতো অবাধ্য বাচ্চা আমি যখন তখন
- স্যার, আপনার ছেলে-মেয়ে কয়জন? মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রেজা
হেডস্যার ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে, কানে ধর’ বলে চিৎকার করে উঠলেন। রেজা কানে ধরে তিনবার উঠবস করতেই বললেন, যা ক্লাসে যা
- জ্বি স্যার, আদাব ... রেজা ক্লাসে গিয়ে ঢোকে, ক্লাস টিচার আসেনি তখনো। চুপ মেরে যায়, বন্ধুরা রেজাকে দেখে অবাক, কী ব্যাপার? তুই, আচ্ছা তোর কী শরীর খারাপ? রেজা মাথা নাড়ায়, বলে , আরে না না , এমনিই মন খারাপ, একটা এক্সিডেন্ট দেখে এলাম পথে, তাই। আসল ঘটনা চেপে যায়। কিন্তু মাথার ভেতরে এই কান ধরার চাপ বড্ড চেপে ধরে আছে, রেজা ওর দলে যে কয়জন আছে ওদের নিয়ে লেইজারে সিঙ্গাড়ার কোণা ভাঙতে ভাঙতে বলে, ধুর ভালো লাগছে না রে, বন্ধুরা কিছুটা অবাক হয়েই বললো, কেন রে! রেজা বলে, দেখিস না কতদিন হলো সন্ধ্যার বাতাস গায়ে লাগাই না , বাসায় এত চাপ, ভাবছি আজ সন্ধ্যার পরে স্কুল মাঠে আসবো, তোরা কী বলিস! বন্ধুরা প্রথমে অবাক হলেও পরে রেজার কঠিন মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো প্রশ্ন না করেই, ডান! ব্যস ... আনন্দে একদম বিগলিত, চল ক্লাসে, ঐ কথাই রইলো। আচ্ছা হেডস্যার কী এলাউ করবেন, সন্ধ্যার পরে স্কুলে আড্ডা? রেজার চোখ চকচক করে ওঠে, বলে, আরে করবে করবে... যথারীতি চারটায় স্কুল শেষে যে যার বাড়ির পথ ধরে, রেজা বাসায় গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে খেতেখেতে মা’কে বলে, আমাকে স্কুলে যেতে হবে। মা বললেন, স্যার যখন বলেছেন অবশ্যই যাবে, কিন্তু বাপু বেয়াদবি করে বসো না যেন, উনি তোমার গুরুজন। রেজা চুপ করে খেয়ে হাতটা ধুয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো।

তখন সন্ধ্যা, মাগরিবের আজান শেষ, নামাজ আদায় করতে অনেকেই মসজিদের উদ্দেশ্যে এবং অন্যান্যরা যার যার সান্ধ্য কাজ গুছিয়ে নেয়ায় ব্যস্ত। ঠিক পাঁচজন না ওরা এখন চারজন, আস্তে আস্তে এদিক ওদিক তাকিয়ে ঢুকে পড়লো স্কুল ক্যাম্পাসে। যে গেট থেকে স্যার আসা যাওয়া করে সেই গেট দিয়েই, মনে হয় স্যার নেই চা পান করতে পাশের দোকানে। রেজা ওদের ভালো করে বুঝিয়ে দিলো কেন এখানে ওদের আসা, ওদের মুখ দেখে মনে হলো ভয় পেয়েছে, হাতে মৃদু চাপ দিয়ে ওদের আশ্বস্ত করলো রেজা। বেশ কিছুক্ষণ পরেই হেডস্যার ঢুকলেন, কিন্তু গেটে তালা দিলেন না, ভাবলেন অনেকেই তো আসে তার সাথে গল্প করতে, একা থাকেন জেনে। রুমে ঢুকেই কোথায় কোথায় যেন ফোন করলেন, স্কুল সংক্রান্তই হবে, কিন্তু এত জোরে কথা বলছিলেন যে রাস্তা থেকে গেটের পাশে কান পাতলেই সব শুনতে পারবে, জানালার কাছে নিচু হয়ে বসা ওরা ওদের কান চেপে ধরলো। এরপর স্যার আয়েশ করে একটা গদি চেয়ারে পা তুলে টেবিলে বসলেন, ছেড়ে দিলেন তার শাস্ত্রীয় সেই সুর, যার সুরে স্যারের চোখ মুদে আসছিলো, আর স্যারকে ফলো করছে আট আটটি চোখের লেন্স। স্যার মগ্নচিত্তে গান শুনছিলেন, হঠাৎ মনে হলো ঘরের যেন পর্দা নড়ছে, বাতাসহীন। উনি ভাবলেন মনের ভুল। জামার নিচে রেজা মায়ের একটা লাল শাড়ি নিয়ে এসেছিলো, আর আগে থেকেই সৈকতকে বলা যেন তার বোনের একটা বড় পুতুল নিয়ে আসে। ব্যস, পুতুলটাকে শাড়িটা একহাত ঘোমটা দিয়ে পরিয়ে জানালায় দাঁড় করিয়ে নিচ থেকে ওরা ধরে রাখে । এদিকে হেডস্যার আগেরবার পর্দা নড়তে দেখে মন থেকে কিছু সায় না দিলেও বার বার চোখ যাচ্ছিলো জানালার দিকেই। বেশ অস্বস্তি লাগছিলো তার, উঠে গিয়ে প্রেশারের ওষুধের পাতটা ও এক গ্লাস পানি আনলেন, কিন্তু ভাবলেন বসেই খাবেন তাই বসার সময় চোখ গেলো জানালার দিকে, এক লাফে উঠে দাঁড়ালেন! কে... কে...কে ওখানে! হঠাৎ আওয়াজ মাধবীগো, আমি মাধবী...( ওদের মধ্যে নিখিল মেয়েদের কণ্ঠে কথা বলতে পারে) আমাকে ভুলে গেলে... হেডস্যার আরো পাঁচহাত দূরে সরে গেলেন, না না মাধবী তুমি কী করে আসবে! মনে হচ্ছে শাস্ত্রীয় সুরের আওয়াজ আরো বেড়ে যাচ্ছে...ভয়ে মাধবী মাধবী বলে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন...

আর ওরা ডাক দিয়েই আর দাঁড়ায়নি, এক দৌড়ে গেট টপকিয়ে রাস্তায়। রিয়াজ বললো, হ্যাঁ রে রেজা, স্যারের বউ এর নাম যে মাধবী ছিলো তুই জানলি কিভাবে? রেজা একটু বিজয়ের হাসি ঠোঁটে ধরে রেখে বললো, আসলে আজ অংক স্যারের কাছেই ক্লাসে দেখলি না হেডস্যারকে নিয়ে জানতে চাইলাম, উনি কথা প্রসঙ্গেই বলেছিলেন আর অংক স্যার এই স্কুলের অনেক পুরাতন। আবিদ বললো, রেজারে আমার ভয় করছে, যদি স্যারের কিছু হয়ে যায় ভয় পেয়ে! রেজা একটু ভাব নিয়ে, আরে নাহ, আর আমরা কি ই বা করলাম, শুধুতো, আচ্ছা তোরা কাল ক্লাসে এইসব ভুলেও বলবি না, চল যে যার বাড়ি যাই।

পরদিন সকালবেলা রেজা আনন্দচিত্তে স্কুলে আসে ঠিক সময়মতো। ভেতরে ঢুকেই দেখে বেশ থমথমে পরিবেশ, দপ্তরীকাকুকে জিজ্ঞাস করতেই জানতে পারে, হেডস্যার খুব অসুস্থ, কাল রাতে স্ট্রোক করেছেন, অবস্থা ভালোনা, ডাঃ নাকি বলেছেন ভয় পেয়ে বা শক পেয়ে এই স্ট্রোক ঘটে। রেজার হাত পা অবশ হয়ে আসছিলো, ক্লাসে গিয়ে বসে পড়লো, এখন কী করবে? শুধুমাত্র ভয় দেখাতেই তো ও এমন করেছিলো, যদি স্যারের কিছু হয়ে যায় পারবে নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে। দুপুর নাগাদ খবর আসে স্যারের হার্টে ব্লক থাকতে পারে, এন জি ও গ্রাম করতে হবে, শহরে যেতে হবে। কিন্তু অনেক ব্যয়বহুল নাকি, তাই স্যার যেতে চাইছেন না। অনেকেই দেখতে গিয়েছিলো স্যারকে, তাদের সাথে রেজাও ঢুকে পরে, চোখদুটো ফোলা ফোলা, বুকের মধ্যে মোচর দিয়ে উঠলো। কেন যে এমন করলো! মনে হচ্ছিলো পা দুটো ধরে বসে থাকে, স্যার আপনি চিকিৎসা করান, সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন। ক্লাসে ফিরতেই ওর বন্ধুরা যারা সাথে ছিলো, কি রে রেজা এখন কী করবি, এত দুষ্টু বুদ্ধি ভালো কিছু জানিস না ?

ভেবে ভেবে ঐদিন গেলো, পরের দিন স্কুলে এসেই রেজা সহকারী প্রধান শিক্ষকের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে, স্যার ভেতরে আসবো? বেশ বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা আমিনুল ইসলাম নাম, হ্যাঁ এসো, কী ব্যাপার ক্লাস চলছে আর তুমি এখানে? স্যার আমি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি, আমার একটা আর্জি ছিলো যা কাগজে লিখে দেয়ার মতো সময় হাতে নেই, তাই আপনার কাছে চলে এলাম। হ্যাঁ বলো, কী জানতে চাও? স্যার, আমাদের স্কুলে এত ছাত্র-এত শিক্ষক-এত অবিভাবক-এলাকার এত এত সুধীজন সবাই যদি অন্তত এক টাকা করেও দেই তাহলে কী খুব অল্প টাকা হবে স্যার? আমরা পারিনা কী কিছু টাকা তুলে হেডস্যারের পাশে দাঁড়িয়ে যেতে, তাকে উন্নত চিকিৎসা করিয়ে আনতে? তাকে হারাতে দিতে পারি না স্যার বলেই রেজা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। স্যার উঠে দাঁড়ালেন, কাছে এসে ওর মাথায় হাত রাখলেন, বেঁচে থাকো বাবা, পারি পারি আমরা অবশ্যই পারি, এবং এ জন্যে যা যা ব্যবস্থা নিতে হয় আমি নেবো, তুমি নিশ্চিন্তে থাকো বাবা, যাও ক্লাসে যাও , শান্ত হও।

পর্দা ঠেলে বাইরে এসে রেজা দেখলো আকাশটা অনেক নীল, দূর থেকে হেডস্যারের রুমটা দেখা যাচ্ছে , যেখানে শুয়ে আছেন তিনি, আচ্ছা স্যার কী গান শুনছেন ? জানিনা, তবে স্যার যদি আবার কান ধরিয়ে উঠবস করায় সেদিন খুব ভালো লাগবে, খুব। মাঠের সবুজ ঘাস রেজার পায়ের চাপে শুয়ে পরলেও ঠিক উঠে দাঁড়ায়... মনে হয় আসলে বেঁচে থাকাটাই অনেক সুখের ।