চকলেট রঙের দিন

অনিন্দিতা গুপ্তরায়



বিকেল সাড়ে তিন । মানি রানি’র স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় । মানি আট, রানি সাত । মানি টুকটুকে ফর্সা , রানি ঝকঝকে উজ্বল । মানি কোঁকড়া চুলে ঝুপসি, রানি টানটান ববছাঁট। এছাড়া দুইবোন হুবহু একরকম । হরি কাকুর রিকশা করে দুই বোন ফিরছে বাড়ি, প্রতিদিনের মত ।বাড়ি ফিরে মানি-রানি’র জগৎ দিদুনময় । মা বাপি তো বাড়ি থাকেন না । মা বড়দিদিমনি একটা গার্লস হাই স্কুলে । পনেরো কিলোমিটার দূরে যেতে হয় মা কে বাস ধরে রোজ । ফিরতে ফিরতে সেই সন্ধ্যে হয়ে আসে ।আর বাপিরও কোর্ট থেকে বাড়ি ফিরতে বিকেল পার। তাই দুই বোনের সব ঝক্কি সামলানোর জন্য বাড়িতে মায়ামাসি আর দিদুন।দুইবোনে অবশ্য ভারি শান্ত আর বাধ্য মেয়ে । বিশ্বাস না হয় তো পাড়া ঘুরে জেনে এসো একবার । মস্ত উঠোন আর বাগান ঘেরা বাড়িটায় ওদের সারাদিন যে কত কিছু করার আছে তোমরা ভাবতেও পারবেনা । আছে চারবাক্স বৌপুতুল, খেলনাবাটি, ক্ষীরের পুতুল,গুপি বাঘা, আম আঁটির ভেঁপু, বুদ্ধুভুতুম, পাগলা দাশু। আছে পেয়ারা গাছে দোলনা বাঁধা, আছে মস্ত খাঁচাভরা মুনিয়া পাখি, বাগানে খরগোশের গেরস্থালি, লালু কুকুরের সাথে খুনসুটি, পোষা হাঁসেদের খাবার খাওয়ানো, রেডিওয় গল্প দাদুর আসর, দিদুনের উঁচু খাটটায় গদিওয়ালা বিছানায় শুয়ে ঠাকুরমার ঝুলি পড়া ---আরও কত কি ! সদ্য এসেছে নতুন পুতুল বানি---সে যে কি মিষ্টি একটা ডলপুতুল বলে বোঝানো যায়না। ফোলা ফোলা গাল, ঈষৎ বাদামি লম্বা চুল আর সামান্য বুচু নাকের একটা আদুরে গাবলু গুবলু পুচকে বোন মানি রানি’র। এখনো স্কুল যাওয়া শুরু হয়নি তার। আধোআধো কথায় আর দুষ্টুমিতে ভরিয়ে রাখে সারা বাড়িটা। ভাবছ টিভিতে কার্টুন বা ভিডিও গেমস নেই কেন ? সে কথা গল্পের শেষে বলব , কেমন ?
তা বাড়ি ফিরে সেদিন বাড়ির বড় লোহার গেটটার সামনে লাফ দিয়ে যেই না দুই বোন নেমেছে, ওমনি একটা এত্তটুকুন বেড়ালছানা ভিজে একেবারে টইটুম্বুর—ওদের পায়ের কাছে এসে খুব মিহি সুরে ডাকলো—মিঁউ।
ওমা, কি সুন্দর সাদা খয়েরি ছোপ ছোপ একটা মিষ্টি বেড়ালবাচ্চা !---ও মায়ামাসি, শীগগির এসো, ধরো না এটাকে---দুই বোনের মিলিত আবদার।
মায়ামাসি অবাক হয়----সেকি ? জানোনি বৌদিমনির বেড়ালে এলিজ্জি! দুই বোনে হেসে কুটিপাটি----এলিজ্জি কিগো মায়ামাসি? ----ওই হলো, বেড়াল দেকলেই লাঠিপেটা করতে দ্যাকোনি মাকে?
অগত্যা মানি ই ওটাকে গলার কাছে দুই আঙুল দিয়ে সাবধানে ধরে---ও মাসি, এটাকে পুষবো। মায়ামাসি রেগে গজগজ করতে থাকে---দিদুন বকবে যকন ঠিক হবে।
রানি মানি লাফাতে লাফাতে মায়ামাসির পেছন পেছন বাড়ি ঢোকে---মাসি গো মাসি, পাচ্ছে হাসি...ও মাসি হাসোনা একটু ।
দিদুন বারান্দার ইজিচেয়ারে আধশোয়া কাগজ পড়ছিলো। বেড়ালছানা সহ মানি-রানি কে দেখে দৌড়ে এলো----করেছিস কি তোরা? বউমা ফিরে তো কুরুক্ষেত্র করবে!
মানি-রানি’র মুখ ভার। অগত্যা দিদুন “আচ্ছা দেখছি” বলে মঞ্চে অবতরণ করেন। একটা ঝুড়ির মধ্যে কাগজ পেতে পুঁচকেটাকে রাখা হলো ভেতরবাড়ির লম্বা বারান্দার কোনে,টগরগাছের ছায়ায়।দুইবোনে খেতে বসে দিদুনকে হুকুম করে ওকেও খাবার দিতে। দিদুন একটা প্লেটে একটু দুধ ঢেলে সামনে দিতে সে বেচারি নাক ডুবিয়ে হেঁচে একশা।
আচ্ছা রানি, ওটার নাম কি দেওয়া যায় বলতো ?—মানি বলে। রানি একমিনিটও না ভেবে বলে—চকলেট ।
-----তুই আচ্ছা লোভী তো! খাবার জিনিস ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারিস না ?
-------মোটেই লোভী না । ওর গায়ে কেমন খয়েরী খোপ কাটা , ঠিক ক্যাডবেরি চকলেট এর মত । ওর নাম চকলেটই থাকবে ।--- রানি জোর গলায় বলে ।
-----ও দিদুন শুনছো, পুঁচকেটার নাম রাখা হলো চকলেট । বানি হাততালি দেয়---তক্কেত! তক্কেত!
সেদিন দুপুরে তো ঘুমের আর কোন প্রশ্নই নেই। চকলেট একবার করে ঝুড়ি থেকে নামে, মানি-রানি ছুটে গিয়ে ওদের ঝুড়িতে বসায়। বাবা কোর্ট থেকে ফিরে ডাকলেন---মানিমা, রানিমা---দুই বোন ছুটে আসে । কে আগে চকলেট বৃত্তান্ত বলবে তাই নিয়ে হুড়োহুড়ি।
-----বাপি , চকলেট কে কিন্তু আমরা পুষেছি। বাপি ছদ্মগাম্ভীর্যে চুপ---হুম্‌, কিন্তু তোমাদের মা তো ওকে ঘরে ঢুকতে দেবে না—কি করা যায়...! মানি-রানি কাঁদো কাঁদো-----ও বাপি, ও দিদুন, কি হবে এখন? বলতে বলতে সামনের গেট খোলার শব্দ, মা এলো। দিদুন কিছু না ভেবেই তড়িঘড়ি চকলেট কে খাওয়ার ঘরেই টেবিলের নিচে রেখে ঝুড়ি চাপা দিলেন। মা ঢুকে অবাক...সব এত চুপচাপ কেন? আমার কথা বলা পুতুল দুটো কোথায় ? বানি চোখ ঘুরিয়ে বল্ল—তক্কেত!! মা বানিকে কোলে নিয়ে আদর করে---না সোনা, এখন চকলেট খায় না! সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল—উফফ, হয়ে গেছিল এখুনি!
তারপর তো হাতমুখ ধুয়ে পোষাক বদলে মা বাপি খেতে বসেছে, দিদুন খেতে দিচ্ছে, এমনসময় সেই অবধারিত...মিঁউউউউ...মা চমকে লাফিয়ে চা উলটে চিৎকার---এই মায়া বেড়াল বেড়াল----লাঠি আনো শীগগির ! রানি-মানি একযোগে---ভ্যাঁ...! কি হলো, কি ব্যাপার? ঝুড়ি উলটে চকলেট বেড়িয়ে এসে চেয়ারে উঠে টেবিলে একলাফে মায়ের খাবারে মুখ দিয়েছে। হৈ চৈ চিৎকার মানি রানি’র কান্না সব মিলিয়ে হুলুস্থুল কান্ড যাকে বলে। তারপর একটা দিনকয়েকের ছোট্ট অধ্যায়ে দিদুনের মাকে বোঝানো, বাবার মেয়েদের হয়ে ওকালতি, মানি রানি’র আবদার কান্না, চকলেটের মা কে একবার আঁচড়ানো ----এসব আছে।
কিন্তু চকলেট রয়েই গেল। দিদুনের পুজোর সময় ঠাকুরঘরে মাছি তাড়িয়ে, রানি মানি’র পড়ার সময় বিছানার কোনে ঘাপটি মেরে, বাবার মক্কেলদের ছেড়ে রাখা জুতোর ওপর ঘুমিয়ে, বানির দোলনার ওপর লাফিয়ে, দেওয়ালে টিকটিকি ধরার চেষ্টা করে করে ক্লান্ত হয়ে, মায়ের পরীক্ষার খাতা দেখার সময় দরজার সামনে গুটিসুটি মেরে, মায়ামাসির বাসন ধোয়ার সময় মাছের কাঁটা চিবিয়ে, আর কিছু না করার থাকলে মুনিয়া পাখির খাঁচার সামনে পাখিগুলোকে ভয় দেখিয়ে চকলেট কবে যেন বাড়িটার একটা সদস্য হয়ে উঠলো। আর মায়ের এলিজ্জি? তার কি হলো?
কুড়িবছর পরে এখন দিদুন নেই । মালদহ শহর ছেড়ে মানি কলকাতায় আর রানি জলপাইগুড়িতে। সেদিনের সেই ছোট্ট রানি আজ স্কুলের দিদিমনি। মানি ঘোর সংসারী। বানি যে বানি সেও এখন কলেজের পড়া শেষ করতে চলল। তাদের ছোট্ট ছেলেদের নিয়ে ছুটিতে যখন বাড়ি আসে দুই বোন তখন দ্যাখে চকলেটের বংশধরেরা সারা বাড়ি সারা পাড়াময় হয়ে ওদের হারানো শৈশবটাকে বাঁচিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। টিভি কার্টুনের ভক্ত ওদের ছেলেরা বেড়ালগুলোকে টম বা সিল্ভেস্টার নামে ডাকলেও ওদের নাম আসলে পান্তুয়া, লাড্ডু, বরফি, জিলিপি, মালাই এইসব । বসার ঘরে ছোট্ট রানি-মানি-বানি-দিদুন আর চকলেটের গ্রুপ ফটোটা মা রোজ যত্নে মুছে রাখেন । মা বাবার নিঃসঙ্গ সন্ধ্যে আর নিঝুম মুহূর্ত এই প্রানীগুলোই ভরিয়ে রাখে তাদের দুরন্তপনায় । একলা বানির মনখারাপে অনেক চকলেটের আমেজ মিশে যায় ওর শৈশবের গন্ধ হয়ে। একমাথা পাকাচুল ফোকলা দাঁত মায়ামাসি হাসে আর বলে...বৌদিমনির এলিজ্জি সেরে গেচে গো !