ফুচকা

বারীন ঘোষাল



তমাল আজ অনেকক্ষণ হল বাড়িতে ঢুকেছে। জুতো খুলে প্রথমেই গিয়ে ডেটল দিয়ে হাত ধুয়েছিল সে। এটা মহুলের শাসন। কারণ এখন তমাল দশ মিনিট বিছানায় বসে টাকে হাত বোলাবে। তাতে আরাম হয়। ডাক্তারের অ্যাডভাইস। তা হলে টাক আর বাড়বে না। গিন্নী চা নিয়ে এসে ঠোঁট বেঁকালো। ‘ডেটলে হাত ধুয়েছো’ ? মহুলের শিক্ষা। স্কুলের টিচার শিখিয়েছে ডেটলে হাত ধোয়া। চুল বলে কথা। বন্ধুদের সবার বাবার মাথায় চুল আছে। কি সুন্দর লাগে। মহুল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলে হাত বোলায়। যদি বাবাকে তার চুল দেওয়া যেতো। তার তো রোজ বড়ই হতে থাকে। যাকগে, ডেটল ধরাতে পেরেছে, সে-ই ভাল।
তমাল চা খেতে খেতে বৌকে বলল --- ‘বাড়ি এত শান্ত কেন ? মহুল এখনো ফেরেনি’ ?
‘ফিরেছে। ঘরে আছে, গিয়ে দেখো। আজ আর নাচ হচ্ছে না। আজ কাগজ ছেঁড়ার পালা। ড্রইং খাতা আর একটা এনো তো কাল। কেবল আঁকিবুকি করছে আর ছিঁড়ছে। কি যে চায় ! বলছেও না। খালি বলছে --- দাঁড়াও না’।
তমাল মহুলের ঘরে ঢুকে কান্ড দেখে অবাক। ঘরময় ছেঁড়া কাগজ। বলল – ‘কী হচ্ছে মহুল সোনা। কি হল তোর ? কাগজের ওপর রাগ কেন’ ? কয়েকটা কাগজ মেঝে থেকে তুলে খুলে দ্যাখে – একটায় মাটিতে পড়ে থাকা ঘুড়ির পাশে বসে দুটো ছেলে সুতোয় মাঞ্জা লাগাচ্ছে। আর একটায় সমুদ্রে মাছ ধরার ছিপ ফেলে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, একটা কাগজে হেলিকপ্টার থেকে লাফ দিয়েছে একটা ছেলে। একজন বুড়ো লোক পা ওপরে তুলে দু হাত দিয়ে হাঁটছে ---- এরকম অদ্ভুত সব আঁকা। এখন আঁকছে একটা ছোট মেয়ে ফুচকাওলার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে ফুচকাটা ঢোকাতেই পারছে না। মুখে বিরক্তি। কিন্তু একমনে এঁকে চলেছে মহুল, নিঃশব্দে। ওর বিষয়গুলো অসম্ভব। অসম্ভবকে সম্ভব করার জাদু শিখছে মহুল সোনা।
তমাল বলল – ‘বাঃ, বেশ এঁকেছিস তো সোনা, কমপ্লিট করছিস না কেন’ ?
‘না বাবা, টিচার বলেছে যা আমি দেখিনি, শুধু ভেবেছি অর শুনেছি, যেখানে যাইনি কখনো, তাই আঁকতে হবে, আর যেন ... ... হি হি হি ... তোমার মাথায় চুল হবার মতো ... কি মজা হবে না বাবা’ ?
তমাল মহুলকে জড়িয়ে ধরে আদর করল। --- ‘আমার মাথাটা চুলকে দে তো মা’। এসব আদর খুনসুটির পরে মহুল আঁকা ছেড়ে উঠে রান্নাঘরের দিকে গেল। তমাল উঠে জামা কাপড় পালটে পাঞ্জাবী পাজামা পরে খবরের কাগজটা খুলল। রান্নাঘরে ঝগড়ার শব্দে উঠে এগিয়ে গেল সে। দ্যাখে --- গিন্নী লুচি বানাচ্ছে আর মহুল সেখানে ঠেলাঠেলি করে ছোট ছোট ফুলকো লুচি বানিয়ে তেলে ছেড়ে মায়ের সাথে ঝগড়া করে সেগুলো তুলে দিতে বলছে। বেশ কয়েকটা খুদে লুচি বানিয়ে একটা পলিপ্যাকে তুলছে মহুল। --- ‘কি হচ্ছে এগুলো মহুল’? তমাল বলল।
--- ‘কালকে স্কুলে গিয়ে ফুচকা খাবো। বড়গুলো পারি না। কেমন হয়েছে বাবা’?
মহুলের কান্ড দেখে খুশি হয়ে তমাল মহুলকে জড়িয়ে চুমু খেল। মহুল হিহিহিহি শব্দ করে গলে গেল।