মা, অ্যাডিনোকারসিনোমা ও অন্যান্য চিৎকার

বিধান সাহা ও তমাল রায়



[সূর্যমূখী ফুল যেন, আমার মায়ের জোড়া চোখ]

০১.

কেউ এসো, কেউ সত্যিই এসো। এই উদভ্রান্ত সন্ধ্যার আবহ আমার বুকের ভেতর পর পর মোচড় দিয়ে উঠছে। যেন দমবন্ধ অবস্থায় একটা লাল সার্কেলের চারপাশে ঘুরছি শুধু ঘুরছি! পথ দেখাও, পথ দেখাও, নাথ! মাতৃমুখ ঘিরে অজস্র বিভীষিকা আজ বনবন করে ঘুরছে।

০২.

একদিকে মা, একদিকে তুমি— আমি মনভূমি মাড়িয়ে চলেছি যে কই! আকন্দ ফুলের মালা আর পড়া হলো না। সবুজ-পাখি, টঙ্কার কতভাবেই তো তোলা যায়। এই যে, এইদিকে চলে গেলো নৈঃশব্দ্যের মাঠ; আর ওই দিকে তুমি। জলের ভেতর আজ মা’র মুখচ্ছবিই বেশি স্পষ্ট। আমার পুরনো গোলাপ-বাগানে মা’র নামে নেমে আসছে থৈ থৈ মহাশূন্যের রথ। আমিও যাবো, আমি যাবো, আমায় রুখো না কেউ। কেন যে এতো ঢেউ এসে ভাসিয়ে নেয়! কেন যে মাতৃকণ্ঠ শ্রবণ আজ এতোটা ব্যথাতুর! আমিই জানি সেই গোপনতার কথা। আমিই জানি সেই অদৃশ্য রথের নীরব আগমনী বার্তা। আমার ঘুমের ভেতর, রে হলুদিয়া, তুই তো জানিস, কেন এতো ডার্ক-আওয়ার। তুই তো জানিস, কীভাবে পাজরের পাঁশ ঘেঁষে এতো এতো মরণ-মূর্ছা!

ওই তো, ওই যে আমার মা। তাঁর চারপাশে সহস্র আলোকবর্ষ আর বিকল আমার ছায়া। শোনো, পারো-তো মা'র ছায়ার পাশে একটা পাহাড় এঁকে দিও।

একাকী-মানুষ ফেলে এতো দূরে কীভাবে আছিস?

০৩.

দূর সম্পর্কের জানালা দিয়ে কতদূর তাকানো যায়, বলো? মিস-টাইমিং হওয়ায় ট্র্রেন ফেল! মিরাকলে বিশ্বাস করা ছাড়া এখন আর উপায় নেই, বাবু! এখনই অন্ধ হতে চাই। ড্রাগন, ড্রাগন, এদিকে ব্লাক-আউট। ছাতা নেই কোনো। প্রচন্ড রোদ রে ভাই! ত্বক পুড়ে যাচ্ছে। আমার ত্বক পুরে যাচ্ছে! হেই, এই সন্ধ্যেবেলা, তোমাকে মনে পড়ছে খুব। আর মাথার উপর থেকে মাতৃছায়া ধীরে ধীরে উধাও হবার উপক্রম। তোমার অর্ন্তদৃষ্টি কতদূর প্রসারিত? প্রশান্ত ঢেউয়ের উপর নৃত্যরত কোন সে ঐরাবত, পালাক্রমে তছনছ করে দিচ্ছে সব? সোনাভান, সময়টাই টালমাটাল। বেসামাল হয়ে পড়ছি কেবল। সর্ন্তপনে একবার ফিরিও যতনে।

আমার টাইম-আউট রে!

০৪.

রাখিও আমারে মাগো তোমার ছায়ায়!
রাখিও আঁচলে বেঁধে, ধুধু এ প্রান্তরে
যদি পথে নাহি পাই দিশা; তুলে নিও।
তুমুল বলক শেষে, বর্ষা বৃষ্টি দিও
দিও এক চন্দনের ফোঁটা, এ ললাটে।
আর কত ভাঙ্গনের হবো মুখোমুখি?
ছাই ভস্ম দিও, কাঠ ও কুড়াল দিও
অভিলম্বে দিও এক স্মৃতি-এপিটাফ!
অন্তরে কাঙাল রেখো, পাশে রেখো পথ,
ধবল জ্যোৎস্না রাতে, টের যেন পাই
নূপুরের রিনিঝিনি, কোমল আওয়াজ।
রাখিও আমারে মাগো ছায়া ও মায়ায়।

বিশল্যকরণী, ও মা, যদি নাই পাও
আমারে রেখো না ফেলে, কাছে টেনে নাও।

০৫.

তুমি ছাড়া আর কোনো পিছুটান নেই, মা। সব বন্ধন টুটে গেলে আমি পৃথিবী হবো।


০৬.

ও মানুষ, আমি ঘুমাতে পারি না, মানুষ! বহু বহু রাত আমার ঘুম আসে না, মানুষ! একটা আতঙ্ক ঘিরে রাখে। আমি স্পষ্ট টের পাই, কে যেন ভেতরে ভেতরে কাঁদে। কে কাঁদে? এই দুর্বিপাকে কে কোথায় আছো? এসো। ও মানুষ, ও মানুষ, আমার পাশে এসে আমার মাথায় হাত রেখে একটু দাঁড়াও।

******



আঙুলে আঙুল ছুঁলে জানিস ফুল জন্মায় যেন কী করে, অজান্তেই, রাতের আকাশের নীল ক্যানভাসে তাকা, ওই যে আঙুল ঘুরছে, দেখ অক্ষর তৈরী হচ্ছে, খুব ধীর যেভাবে সন্ধ্যে আসে নীল ঘোমটা পরে, আমাদের বাগানে, আর তারপরই ফুটে ওঠে সব রজনীগন্ধা একসাথেই, আমি ওই বাগান কে 'মা' বলেই চিনি। দ্যাখ সুগন্ধ আসছে।

কিছু আগেও সে ছিলো, এখন ছাই উড়ছে, বাগানের সব ফুল, ফেলে রাখা থালার ওপরও দ্যাখ কী করে যেন ছাই, কেউ যেন পাউডার স্প্রে করে দিয়ে গেছে, এত ছাই কেন? কেন এত বিভ্রান্তি, আলো তুমিও কি মুখ ঢেকেই বসে থাকলে আজ সারা দিনমান? নদীটার পাশ দিয়ে এঁকে বেকে যে পথ চলে গেছে, তাকে আমি মা বলেই চিনেছিলাম। নদী চিনতে এসে নৌকো, সকাল তখনো ভোরের কোল থেকে নেমে আসেনি,আর ঘুম ভাঙা চোখে, মার আঙুল ধরে হাঁটতে হাঁটতে, আচ্ছা বল তো? পথ কী করে হারায়?

তোকে বলেছিলাম সেই মাঠটার কথা, ফুটবল খেলতে গিয়ে বার বার পড়ে যাওয়া, মা তখন যেন কার একটা বই পড়েন, আমি তো অত জানি না, মা কেবল কানের কাছে বলতেন-আ সোলজার নেভার কুইটস বাবু... মানে কি আর বুঝি! কেবল কানে গরম হাওয়া, আর মার মুখের গন্ধ আসলেই আমি আবার উঠে দৌড়চ্ছি...আজও মাঠের মাঝেই, তবে অপেক্ষা, মা নামের ট্রেনটা চলে গেছে কিছু আগে, প্ল্যাটফর্ম জুড়ে এলোমেলো পড়ে আছে,শাড়ি, খাট, তোষক, আর হ্যাঁ বালিশ, বালিশে সেই তেল মাখা দাগটা অমলিন, এক পাশ ফিরেই শুতো, পেটে লাগতো তো খুব, জবাকুসুম তেলের গন্ধ! আর যা আছে তাকে তুই ভিখিরি বলতে পারিস, যেমন এই বাড়ি, ঘর, দোর, আমি... শ্বাস নিতেও কী কষ্ট বল তো, আকাশটা সোজা বুকের ওপর পা তুলে দিয়ে যেন এক্ষুনি বলবে- নে চল...আরে আমিও তো অপেক্ষায়, রেল লাইনগুলো কি করে যেন মিল্কিওয়েতে মিশে যাবে কিছু পর, তারপর পথ চলা... এ পাশে বোসেদের ওই বাগান, গোলাপ ফোটে সারাবছর, মামারবাড়ি, মাও তো গোলাপ, শীত ঘন হয়ে আসলে, বাগানে মা আসেন, আসতেন, ওর পাশে যে খিড়কির দরজা ওটা খুলে বেরুলে দেখিস, একটা শুঁড়ি পথ। অল্প কয়েক পা হাঁটলেই বুঝবি, পাহাড় না ছায়ার পাহাড়, প্ল্যাটফর্ম ছাড়লে মা-ট্রেন আমি ওই ছায়ার মাঝে ছায়া হয়ে পাহাড় হয়েই আকাশমুখী, এই গন্ধটা পাস? সুরভী জর্দা আর পানের, মার সাথেই আজীবন যে দোসর, পাচ্ছিস???

সম্পর্কগুলো আসলে জানিস এক একটা জাফরি কাটা ঘুলঘুলি। কোনোটা আলো দেয়, কোনোটা আঁধার, আর বাতাস ফেড আউট হতে থাকলে যখন শ্বাসকষ্ট খুব, উঠে গিয়ে দেখি আলো আর আঁধারে মা পাখী ডিমের ওপর তখনো ওমে, খড়-কুটো-শুকনো কুড়িয়ে আনা গাছের ডাল, ওরই একটা কুড়িয়ে এনে জোর শ্বাস নিই, আর আলোয় ভরে যাচ্ছে বুক, মা'র গন্ধ...অথচ দেখ কি গভীর অমানিশি, অথচ ছাই উড়ছে,আমি পুড়ছি...দগ্ধতাও জানিস এক অভিজ্ঞান, আকাশ থেকে যে মই নেমে এসেছে ওতে উঠে দেখছি,ট্রাপিজে আমিও...আর কত ক্লাউন...কেউ হাত ছুঁড়ছে, কেউ পা, আমি পা ফস্কালাম, নীচে কি নেট রাখা? ঘুম পায় তোর? এই সব সন্ধ্যের খেলাধুলো সেরে ফিরে আসার পথে আবার দিক ভুল, এত ভুল হয় কেন, তুই কোথায়? মাকে পাঠানো শেষ এস এম এস টা আর পৌঁছায়নি, সেটা কি ইথারেই ঘুরে ফিরছে? তুই জানিস? মার ফোন যেদিন যেখানে খোলা হবে,আছড়ে পড়বে আবার?
তোকে বলেছিলাম তো সেই গল্পটা, সেই যে লোকটা খুব নিন্দুক, আলোকেও অন্ধকার বলে, রাজাকে বলে অসুর। খুব শীতের রাতে কষ্টে আছে নিন্দুক জেনে রাজা পাঠালেন এক ব্যাগ ময়দা, এক ব্যাগ ঘি, আর এক ব্যাগ চিনি। তা নিন্দুক পুরোহিত কে ডেকে বললো, এসো উদযাপন করি, ঈশ্বরকে ছুঁইয়ে নিয়ে দাও এ সমস্ত আমার করে। দেখো দেখো আমি কত মহান, রাজাও ভেট দেয় আমায়! পুরোহিত বললেন- ময়দা তোমার ক্ষুন্নিবৃত্তির স্মারক, ঘি তোমার অন্তঃকরণ এর বিশুদ্ধির, আর চিনি তোমার জিহবার শুশ্রুষার, জানিস সেই নিন্দুক খুব লজ্জা পেয়েছিলো, আর মা বলেছিলো -রাজা হোস বাবু। আমি অনন্তপুর অভিমুখে যাত্রা পথে, এখন তেপান্তরের মাঠে, ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে মাঠ! আর আমি এখন জ্যোৎস্নাকেও রোদ ভাবছি। মা ট্রেন চলে গেলে খর অনন্ত দাবদাহ দুপুর,বিশল্যকরণী খুঁজছি, একটু ছায়া... রাজা বাবুর কী হাল ভাব, একটু ছায়া... মা....

কত দড়ি গামলা হাড়ি-পাতিল, ছিন্ন ভিন্ন, কাক আসে, এঁটো বাসনে মুখ দেয়, আমি বাসনে বাসনে ঠোকাঠুকি শুনে দৌড়ে আসি, না আমার উঠোন জুড়ে কেবল ছাই আর ভস্ম উড়ছে, এক দৌড়ে উঠে আসি ছাদে, এখান থেকে এই মহাশূন্যে একটা ঝাঁপ, এরপর পাখী হব, মহাপৃথিবীর ওপর উড়ে বেড়াতে বেড়াতে আমিও পৃথিবী হব, কেবল কক্ষপথে মাও ঘুরছে জেনেই এই ব্রহ্মান্ড বিশ্বে ঝাঁপ, বাসন থেকে বাসনা-মুক্ত জীবনের এই আলো ছায়া পথে মা আসবে কোনো এক পূর্ণিমা রাতে, দেখিস আমারও সারা গায়ে তখন জ্যোৎস্নার গন্ধ....
আর তখন নদীতে তখন খুব উৎরোল, দুপুর কাঁপছে দুপুর, সন্ধ্যেগুলো ঝোপ হয়ে প্রতীক্ষায়, রাত যখন রাত হয়ে উঠছে, রাতজাগা ডাহুক কাঁদছে, শালুক ভুলেই গেছে সকাল জন্মালে ফুটতে হবে, শিশির এসে থমকে দাঁড়িয়ে দূরের বারান্দায়, ঠিক একাকী তোর মত, আর আমি বিছানায় নিদ্রাহীন ছটফটাচ্ছি...
তুইও কি আমারই মত? পুড়ে যাচ্ছে হৃদয়, মোম গলে পড়ছে...জ্বালা খুউব... ছাই উড়ছে... ছাই এর গন্ধে এলোমেলো লাগছে সব... আসবি? হাত রাখবি হাতে?
লাস্ট ট্রেন চলে গেলে যতটুকু ছড়ানো ছিটানো, ওর মধ্যেই আকাশকে এনে কার্পেট পেতে দিই,জ্যোৎস্নার কানে কানে বলি, মাতৃমুখী সন্তান খুব দু:খী হয় গো, তুমি জানো? এরপর দেখিস মেঘ জমবে, বৃষ্টি আসবে আকাশ কালো করে, আর জলছবি মেখে চল আয়, আমরা মাকে খুঁজতে বেরুবো, যাবি?