হে জীবন অভিষিক্ত হও

দেবাশিস মুখোপাধ্যায় ও অনরণ্য

আমার প্রতিদিন


একটা পুরনো বাড়ির ছাদ আর হাই টেনশনের তারে থাকা পায়রারা
একদিন সঙ্গী ছিল নিঃসঙ্গবেলায়
মাঝেমাঝে ডানার ইচ্ছে সফল না হলে গুটিয়ে রাখতাম সবকিছু
খাতায় কবিতা নেই সেইসব দিনের
শুধু কিছু অসুখ এখনও তাড়া করে বেড়ায় আর ডানা কাটা আমি
এই চতুর্থ ফ্লোরের ব্যালকনি থেকে
আত্মহত্যার স্বরলিপি লিখি
আর ঝিঁঝিপোকারা চুরি করে সারারাত গান শোনায় ...




মাঝরাতে বাথরুমে গিয়ে
চুপরাতের সাথে কথা সারি
সব কবিতা কেউ চুরি করে
নিলেও কিছু করার নেই
চোখকে পাহারাদার করার ইচ্ছে নেই

আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে দেখে যাবো
অনন্ত কালপুরুষ স্তদ্ধ প্রহরের
বোবা ভাষায় কতো শব্দের জন্ম হবে

জল ঢেলে দিলেই কি সমস্ত লবণ
ধুয়ে যায় !

ঘুমন্ত তোমার ঠোঁটে দ্যাখো
কিছু একটা রেখে এসেছি




আমাদের এই মফস্বলের বাসস্ট্যান্ড
অনেক পাগল অনেক অটো
কিন্তু বাস কই
ফলওয়ালা ফলের দাম হাঁকছে
আমি নিস্তেজ নিস্ফলা হয়ে
একটা বাস খুঁজছি
শান্তিপুরের বাস
আর আমাকে লোকে পাগল ঠাওরাচ্ছে



কিছু একটা খুঁজছি সারাদিন
সারাবাড়ি হাঁ হয়ে গেছে
এতোটা অগোছালো দেখে নি
কেউ কোনদিনও
সব এদিক ওদিক চিৎ হয়ে পড়ে
জঙ্গী আক্রমণের পর
নিজেকে গুছিয়ে নিতে
আরো একটা জীবন লেগে যাবে



রাত্রি এলে আর বেরোতে ইচ্ছে হয় না
ঘুমন্ত গাছেদের যদি ঘুম ভেঙে যায়
জানালা দিয়ে পাশের বাড়িতে ঢুকে
গেল পোষা বিড়াল অদ্ভুত হিংস্র চোখ নিয়ে
হিংসাকে আজকাল বেশ ভয় হয়
বরং বিছানায় রাত্রির চুল দেখি
চুলের উপর নীল আলো
কিন্তু ছুঁতে পারি না
অসম্ভব ব্যথা জেগে ওঠে হাতে
চোখের পাতা বুজে এলে বুঝতে পারি
কেউ আসছে অনেক আদর নিয়ে
এতো নিঃশব্দে আসে যে বালিশও
মরমিয়া হয়ে পড়ে .....




সুনীলের বাড়ির কাছে স্কুলে আঁকার খাতা ফুলভরা গাছ হরি মন্ডলের পুকুরের নিষিদ্ধ কথা বলে আর কোনো এক রাজরোগীর মৃত্যুর পর
প্রদীপ হারিয়ে গেলে জলের দোষ
আর মেঘের দরদ দুধের সর

উপমার কথা বলে সে একটি বাঁশি
নামিয়ে আনে কৃষ্ণকথার
চোখ জানে সেই মেয়েটির নাম শ্রাবণী ছিল হারিয়ে যাবার আগে ...


আমাদের পুরনো বাড়িটা সেই কবে থেকেই মৃদু হাসি মুখে,অন্ধকার মেখে বসে। যা হয় আর কি,পলেস্তারা খসা,পাপ বিন্দুথেকে বেরিয়ে আসা দাঁত নখ ,আর যা হয়,আলোর পিঠে আলো,আঁধার লম্বা হলে কেমন জানি নিস্তব্ধ রাত চিলে কোঠার ছাদে বসে মিল্কিওয়ে ধরে ভ্রমণোদ্দত হলে,কে যেন জামা ধরে টানে,সেই বাচ্চাটা,একক অথচ বড় হয়ে যাচ্ছে দ্রুত,গান ভেসে আসছে...এ যেন তেমন কোনো উপত্যকা,যেখানে আলো নেই,প্রচ্ছায়া অঞ্চল। কেবল হাইটেনশন থেকে পাখী উড়ে এলে তার ডানায় ভর করে উড়াল,আত্মহত্যা এক বোধ,সুর শেষ হয়ে আসলে কি করে যেন অপরাধবোধ এসে দর্পণ হয়ে সামনে। প্রস্তাবিত এ আঁধার বৃত্ত জুড়ে বেজে চলেছে রাত সঙ্গীত,খাতায় লেখা অক্ষরমালারা উড়তে উড়তে ভ্যানিস। কেবল গুটিশুটি গুপ্তকথারা অসুখ হয়ে ইলেকট্রিক পোস্টের মত ঠায় দাঁড়িয়ে একাই,ধর বৃষ্টি এলো...
এ যেন স্বপ্নসম বেদনার সিম্ফনি আলাপ। ঘর বা বাহির, বাথরুমে মৃদুতায় চুপকথা জ্বলে থাকে,যেভাবে কার্নিশে তেলকুচা ফল ও পাতা। আমাদের এ জীবনে আনখশির অস্তিত্ত্ব বিলোপ,গান মুছে যাচ্ছে,ছবি,শান্ত পুকুরে ভেঙে যাচ্ছে মুখচ্ছবি,কাল দ্রোহীতার প্রত্যঙ্গ জুড়ে প্রচ্ছন্ন,অশান্ত রাত,নামলে কোমরে বেল্ট আর তরবারি,পায়ের কাছে লুব্ধক কুকুর,তবু দেখো পুরুষ তো এক পাহাড়ের নাম,বেড়ে ওঠা জীবন, অস্থিরতাকে সঙ্গী করে,ওষ্ঠে অভিমান রাখলে নীচের জনপদে ছড়িয়ে পড়ছে আলো...ধীর শান্ত,কিন্তু আলোড়ন প্রবল।
মফস্বল এক আড়ম্বরহীন যাপন,যে পারে,সেই পারে। তবু আক্ষেপ রেখোনা কোনো। শহর আর মফস্বলের পার্থক্যে দাঁড়িয়ে আছে শান্তিকুটির,কিছু পর যেখানে প্রবেশিলো তুমি বা আমি,আমাদের উত্তরপুরুষ,মৃদুভাষ্য কি করে যেন নিস্ফলা জীবন খুঁজে যাচ্ছে,বেদনার ক্রমহ্রাসমান জার্নি,সিগারেট পুড়ছে,মুঠোয় পুড়ছে জীবন,যাত্রা পথ সে কোনো ভুস্বর্গের খুঁজতে গেলে,সুস্থ ও নীরোগ ভাইবোন,দুয়ো দিচ্ছে,আর তুমি বা আমি বা আমাদের পূর্বের পাখীপুরুষ পুরাণ থেকে ফিনিক্স পাখীর মত জ্বলে উঠতে চাইলে,লোকায়ত পাগল। কম বা বেশী মানুষ আদতে পাগলজন্মেরই একমাত্র বাহক,হে অশান্তি জায়মান থেকো,সৃষ্টি কেও তো স্থান দিতে হয়।
সন্ত্রাস এক আড়ম্বর চর্চা। শৈশব ভেঙে গেলে পড়ে থাকে,জঙ্গী আক্রমণ,উপদ্রুত অঞ্চলবর্তীতায়,কিছু বিষণ্ণা টুকরো ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা। রক্তস্নাত এ বৈধব্যে পড়ে আছে নি:সঙ্গ জীবন,যা একক,আধিভৌতিক এক অধিত্যকা যাপনপ্রণালী,সুয়েজ থেকে লোহিতসাগরে ভেসে চলেছে খোলামকুচির মত মোচার খোলা,যা জীবন,অগোছালো প্রাসঙ্গিকে ব্রাত্য,রুদ্ধ,অস্পষ্ট রেখাচিত্র..
এ কোনো নৈশযাপন,গাছ আছে গাছ হয়ে,গাছেদের ও প্রাণ আছে জানো,হিংসার অ-পরে যে শান্তির আপাত বিন্যাস মাথার কাঁটা,বা এলায়িত ফিতের বিস্তৃত উপশমমালা,বেড়াল এক তপস্বী জীবন,লেপ,তোশক আদুরে উষ্ণতা জুড়ে কি করে যেন অবিশ্বাস বৃষ্টিস্নাত গাছ,পাতা বাড়িয়ে দিলো শয়নযানের জানালায়,এরপর বালিশ লিখবে বালিশ,মরমিয়া উপন্যাসে ছড়ানো থাকবে নুন আর মরিচের আবর্তন আহ্নিক স্বপ্ন,আলোর সন্ধানে,ছুটে যাচ্ছে অণু,পরমাণু আদর উপাখ্যানমালা...
ড্রয়িং খাতায় পাহাড় এসে বসলে,নদী এসে হাত ধরে,সুর্য অকরুণ শিখা সর্বস্বতা নিয়ে অক্লান্ত ইচ্ছায় আঁকে গাছ,পায়ে চলা পথ,প্রদীপের পাশে আঁকা হয় গ্রাম,সলাজ বৌমণি উপন্যাসিকা,বাঁশি বাজলে বাঁশ বন জুড়ে নি:সঙ্গতার হাহুতাশ ইথার তরঙ্গমালা,শ্রাবণী কোনো পূর্ণিমার নাম,অথবা নারীর,হারা বা জেতা আসলে এক অনভ্যাসজনিত নামানুষী উপমা,রাত নামলে আলো বিচ্ছুরণে যেখানে গান ভেসে আসছে,হাইটেনশনের পাখীজন্ম থেকে স্বকৃত সন্ন্যাস,আলো আর আঁধারিয়া মধ্যপথে হেঁটে চললো,নিরুদ্দেশে, হা জীবন তুমি অভিষিক্ত হও