শিখে নিই এই শস্যপ্রথা

স্রোতস্বিনী সেন ও প্রসেনজিৎ দত্ত

নরম নদীর নারী তার আত্মা আর অন্ধকারের ভেতর ডুবে আছে সে। একটি মধুপর্ক শূন্যে উড়ে বেড়ায়। মাটিপৃথিবীর স্রোতে তার ছায়া নামলে বলো কান্না, আলো নামলে বলো দখলদারি আর কিছুই যদি না নামে তো মধু বলো—মধু মধু মধু...যাতে ভ্রমর হে, তোমারও নির্জন, সারাক্ষণ, পুরুষপরাগে ছেয়ে যায়...
“সে যখন কাঁদত, মনে হত, তার কান্নার সময়
নিজে কেঁদে তাকে সমবেদনা জানাতে পারলে যথার্থ হত।
সে যখন কাঁদত, নদীতে সাঁতার কাটত নারী
তারপর, উপনিবেশের মতো আমাকে দখল করল।”

গেরস্থালি। হাঁড়িপাতিলের সংসার। মেয়েটি উনুনে কাঁচা কাঠ গুঁজে দিয়েছে আর গলগল করে ধোঁয়া উঠে এসে তাকে কাঁদাচ্ছে খুব:
—কেন কাঁদো মেয়ে, নিরীহ মেয়ে?
—আমার শিকারি ফেরার !
—তাই?
—না, আমার উনুন আনাড়ি।
—সত্য?
—ওগো না, আমার চক্ষু অলপ্পেয়ে এই ধোঁয়ার আড়াল গিলতে চায়।
—তবে চলো আড়ালে নামি, একত্র হয়ে জলে যাই...জল, তরঙ্গিণী, তুমি জানো কাঁচা কাঠ কখন ডুকরায়?
—জানি। যখন গলগল করে ধোঁয়া বেরোয়...পুকুরে সর ভাসে...যখন নিরীহ ব্রাহ্মণী হাঁসদুটি সাঁতরে পালিয়ে যায় তীরপূর্ণি ঘাটে...জন্মান্তর ! ওইখানে শীতঘুম শুরু। তবু শ্বাসের মুখ আগুনলোভী কাঁচা কাঠের দিকে ফেরানো...
—আর?
—কিছুই কিছুই নেই আমাদের আজ !
“এই দেখো, সোনা-রুপো জল পালিশ করে গেল তোমায়।
আহা ব্রাহ্মণী হাঁস তরুণী নদীর পথে উঠিতেছে...
তুমি যে ঘুরপথ ভালোবাসো !
যতদিন এ নিশ্বাস চলেছিল সম্প্রীতি ছিল
বস্তুত এখন শীতঘুম মরশুম
শীতঘুম তো প্রণয়বিহীন—সে পাড়ি দিল তরুণ-জলে
আহা ব্রাহ্মণী হাঁস, তরুণী নদীর পথে উঠিতেছে
এ চোখ কত যে ভুল দেখে !”

—ভুল কি নিজেকে শুধরে নেবে?
—না।
—ভুল নির্ভুলের সংলাপ শুনবে?
—হ্যাঁ।
—শোনো তবে ! কমলে কামিনী গন্ধ না লাগালে যে তুমি একাকী, আমি তার শ্বাস গুনে মৃত্যুহীন পিণ্ড; বেঁচে থাকি।
—অনলে আগুনরং না লাগালে যে তুমি চণ্ডাল, আমি তার কাঁচারং রক্তের কাঙাল।
—ধরিত্রী, ধারণ করো আমাদের অপঘাত...আর্ত আত্মা...শীৎকারের পাপ।
—সন্তান জন্মাস যদি শীর্ষবিন্দু তীর্থবিন্দু, সহ্যাতীত চাপ...
—দুর্যোগে হারাই তবু সুযোগের না করি অন্যথা...এসো ! শিখে নিই যৌথ শস্যপ্রথা।
“সাড়া দিও নাহলে শ্বাস থেমে যাবে
সাড়া দিও নাহলে হৃৎপিণ্ড একাকী।
সেই একাকী বিবাদ করে, বড় বিবাদ, শ্বাস থেমে যায়...
প্রথম যেদিন পোড়ামাটির মানুষ উপহার পেয়েছিলাম,
জেগেছিলে তুমি।
পুড়ে যাওয়ার রাত ছিল, পুড়ে গিয়েছিল বাড়িঘর
দাবিয়ে দিয়ে বলেছিলে,
‘হাত জড়ো করি দুজনে, ভয় কেটে যাবে’
তারপর ঘর উঠেছিল
ছাদ উঠেছিল
সন্তান
চেনা জীবনের জন্য আমরা পেতেছিলাম মস্ত চড়ুইভাতি।”

পাতারা উড়ে বেড়াচ্ছে বনময়...ঘন দেহগন্ধময় বৃক্ষের কোটরে জ্বলা চোখ দেখছে দস্যু হাওয়ায় উড়ে বেড়াচ্ছে থরে থরে এঁটো পাতারা...চড়ুইভাতি শেষ কিন্তু আহারের গন্ধ এখনও মিলিয়ে গেল না। উনুনের সঙ্গে পোড়া কাঠের আড়াআড়ি সম্পর্কে আর ধোঁয়া উৎপাদন হয়? না। আহার উৎপাদন হয়? না। তবু, গন্ধটুকু থাকে। স্বপ্নরং পিত্তরং আশারং রক্তরং বর্জ্যরঙে মিশে প্রসূতি হয় ভোর। তোমার ভোরবেলা। মন্ত্রপূত, যাতনা ভুলে যাও ! স্বপ্নে ভেসে আসা ছেলে আসা মেয়ে হিংস্রতার মুঠো খুলে ধরো...জবাকুসুমের জলে কিরণসম্পাত হলে আচমন করো...পুরুষপরাগ শেখো নৌকোখেলা তীব্র আরও তীব্র করো স্বাদু বৈতরণি...স্রোতে সে চুরমার আজ সিদ্ধা অপাপবিদ্ধা শিলাবতী ব্যাধের ঘরনি !
“আসলে এইসব নিয়ে আমাদের সংসার—
বউ সবসময় ভোরবেলা স্বপ্ন দেখত
একটা স্বপ্ন, দুটো স্বপ্ন, ছটা আশা নিয়ে পরিপূর্ণ সেইসব
ভোরবেলার স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়
আমার সান্ত্বনার সাথে ঘর করলেও এ ঘোর লাগত না ওর।
বহুদিন আগে একবার বলেছিল, ও পাড়ার বেনেদের কথা
ওদের গয়নাগাটি আমার কাছে ‘মড়া’ নামে পরিচিত।”

চিতা নেভেনি, এ শ্মশান সিদ্ধপীঠস্থান। শ্বাসটুকু রেখে গেলেন নৈরামণি, নইলে শব্দ বাঁচে না। স্পর্শটুকু রেখে গেলেন, নইলে আত্মা বাঁচে না। রাগটুকুও রেখে গেলেন বীণে, কেন-না ডোম্বীর স্বরলিপি তো বলবেই অকস্মাৎ—‘হে নূতন ! হে ছলনাময়ী !’
‘‘আমি তোমাতে বাঁচি, এ কথা বললে রেগে যাও।
অতি মধ্যবিত্ত এসব কথা, কথা তোমার সত্য।
সত্যমিথ্যা আর সহ্য করতে পারি না, বয়স হচ্ছে তো ! এসো না
একটু কথা বলি, তোমাকে চোখে হারাতে হারাতে অন্ধ হতে বসেছি।’’

অন্ধের জন্মান্তর অন্ধ আর তার স্রোত শুরু হচ্ছে এইমাত্র...নাও, নরম নরম নদীর নারী, তার আত্মা...

প্রসেনজিৎ দত্তের কবিতাগুচ্ছ: সংসারাৎসার (নারী, মরশুম, ঘর সংসার, বেনেবউ, বাক্-অন্ধ)।