ব্যাঙের জিভ……… ও ইত্যাদির আলেয়া

অভিষেক ঝা ও অর্ক চট্টোপাধ্যায়



। ১।
আমার গল্পটা
বুড়ো কাছিম হয়ে
আরও বুড়ো জলের তল হয়েছে
অনেক অনেক বছর পর রোদ পোয়াতে এলে
গল্পটা তোমার

। ২ ।
এই তো নিরলস বাঁকসহ মুখে নিয়েছি
----দুপুর----
গরুর পা ফেলে হারিয়ে ফেলেছি
----ঘর----
এখন সন্ধ্যা লাগুক
আমাকে খুঁজতে আসুক কেউ
চিবুতে চিবুতে চোখে লেগেছে
মরে যাওয়ার গন্ধ
আঁশটে এক প্রেম
সরসরে বাঁশপাতা
----আর----
এক থাল শব্দ
। ৩ ।
নিখাদ মেহগনীর মাদুরে
ঘুঘুর মত দুপুর হয়ে আছো
গাছে ধরে আছে পিঁপড়ের সময়
এখানে ঠাকুমাকে পাতার মত দেখি
সবুজ তেজপাতায় পায়েসের ফোড়ন হয়ে
আমরা গল্প করি…………………………………………… ………………………
---রান্না
---অসুখ ও
--- চাঁদের


। ৪ ।
এসব আকাশরেখায়
গল্পের খাঁজে পাহাড় হয়েছ আমার অস্থায়ী সব গাছগাছালি
দূরে সে রেখা টানে সর পড়া চোখ
সেখানে না’হয় জল হয়ে ভেসে থাক
পুঁজে বাঁচা মাছ
ফ্যাদানো দুপুর
বিকেল হয়ে আসা মড়া-মা
সব জুড়ে ছুঁয়ে থাকে
সারি সারি দোপাটির ঘুম

। ৫ ।
………………. চখুই রঙের বিকেলে…………….
চড়াই পাখির ঘুম লাগে চোখে
টলমল পায়ে বাঁশের গাঁট থেকে বেড়িয়ে পড়ে
নীলফামারির না-জন্মানো সবকিছুরা
ঘাসে ঢাকা কবরগুলিতে গড়াগড়ি খায়
মরে যাওয়া মানুষগুলো কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়
হুটোপুটি থামাতে গল্প শুরু
রাতভর গল্প
রাত----ভোর গল্প
গল্পের শেষপ্রান্তে
.........নীলফামারির বেঁচে থাকা মানুষরা বাঁশঝাড় হতে শুরু করে.....................

*********


ভোরের প্রথম আলো দেখছিলাম। তারপর সন্ধ্যের শেষ আলো। দিক বদলালেও রঙের বিশেষ বদল নেই। দুই আলো একে অপরের দোসর । চেনে না, হয়ত কোনদিন দেখাও হয়নি, তাও দোসর। এখনকার প্রযুক্তিতে কি আর বন্ধু হতে গেলে দেখা করতে হয় নাকি? কিন্তু দোসর? দোসর মানে কি শুধু বন্ধু নাকি দুটো আলাদা স্বর যারা জোড় জানে, বিজোড় জানে, সমাহিত হতে জানে, অপাব্রিত হতেও জানে। যারা সহ–যাপন করে, কেউ কবিতার মধ্যমায়, কেউ গদ্যের তর্জনীতে। এই সহযাপন কি প্র-যুক্তির আগে প্র-কৃতিতে ছিল না? কৃতী তো সেও ছিল, অথচ আমাদের যুক্তি দরকার হল। অতয়েব...

পদ্যের পীঠে গদ্য লিখতে বসেছি। এই গদ্য গল্প হবে না কারণ এই গদ্য অনাবশ্যকভাবে কবিতা হতে চায়। এই গদ্য গল্পে পৌছোবে না কারণ এই গদ্য কবিতা হতে পারবে না। এই হতে চাওয়াগুলো যেভাবে না পারা উথলে দেয় সেই অসমাপ্তির মধ্যে দিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে এক দোসরত্ব গড়ে ওঠে। কে কার দোসর? হতে চাওয়া না পারার নাকি না পারা হতে চাওয়ার? নাকি তাদের দোসরত্ব নির্ভর করে থাকে তৃতীয় ঐ অসমাপ্তির ওপর? দোসর কি দুই না তিন? গদ্যের বড়ো প্রশ্ন আর কবিতা উত্তর দিতে ভালোবাসে না। লেখা নামক স্রোতপ্রবাহে এসে মিশে যায় দুজন। স্রোতের প্রত্যেক আয়োজন সম্ভ্রান্ত সৈকতে অসহায়তা ফিরিয়ে দেয়।

সারাদিনের অঝোর বর্ষণের পর চোখ নরম করা এই হলুদ আলো, যেন অন্ধকার নামার আগে শেষবারের মত সব দেখে নিতে চাইছে। টর্চ ফেলে খুঁজে নিতে চাইছে ভোরের অনুরূপ ঐ আলোকে। কিন্তু আনুরূপ্য মানেই যে মিলন নয় স্বালোকসংশ্লেষ তা জানে। অবমিলন আর নিমীলনের সন্নিকর্ষে তাদের দোসরযান, গউহরজান। আমার জানলার বাইরে সবুজ পাতার গাছটায় কয়েকদিন ধরে দেখছি সাদা সাদা ফুল ফুটছে। আমি ওদের নাম জানি না। ওদের কোন ফেসবুক প্রোফাইল নেই, নেই টুইটার হ্যান্ডল। ওরা খালি সময় হলে ফোটে আর সময়মত ঝরে যায়। একেকটা সময় চলে গিয়েও চলে যেতে চায়না ।
পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে গেলে স্থলজীবীর বড় ভয়। সেই ভয়কে সে গদ্য দিয়ে ঘিরে রাখে আর ভোরের আলো সারাদিন ধরে গলতে গলতে সন্ধ্যের সময় তরলায়িত হয়। কবিতা ডোবে না ঐ নিভন-জলে আর গদ্য আত্মহত্যার যুক্তি সাজায়।
আমি কোনোদিন কচ্ছপ পুষিনি। আমার এক বান্ধবী পুষেছিল। পুচকে সেই কচ্ছপেরা তার হাত বেয়ে ঘাড়ে উঠে যেত। রক্তমাংসের ওপর ভেসে বেড়াত। ওর বর্ণনা শুনে আমি যে ছবিটা পেয়েছিলাম তা গলনের। ওর শরীর-গলা জলে ভেসে আছে একজোড়া উভচর কচ্ছপ। শরীরকে ডাঙা থেকে জলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। না, ওদের ভয় নেই। কবিতার ভাসমানতা ওদের অনুশীলনে।

সারারাত কান পেতে আছি ফুল ফোটার শব্দ শুনব বলে। সারারাত বৃষ্টি অধিকার করে রেখেছে আমার শ্রবণযন্ত্র। ছোটবেলার মফস্বল শেষ যৌবনের শহর হতে চেয়েছে বলে পাড়ায় আর গরুর গাড়ি ঢোকে না। ইট এখন ট্রাকে চড়ে আসে। গরুর দায় নিয়েছে জনৈক রাজনৈতিক দল। তাও মরণকামড়ের মত এই গদ্য আঁকড়ে ধরে আছে সময়ের অপস্রিয়মানতাকে। গল্প না বলে ঝোপঝাড়ে হারিয়ে যাওয়া কৈশোরের সান্ধ্য ক্রিকেট বলগুলোকে অকারণে খুঁজে চলেছে। এই অন্বেষণ অপ্রাপ্য দোসরত্বের। দুদশক ধরে ক্রমে ক্রমে জঙ্গল হয়ে ওঠা বাস্তুভিটায় জাবর কাটছে সেইসব ফেরারি বল। সন্ধ্যাবেলা আলো পড়ে আসলে আবার খেলতে ডাকছে। ততক্ষণে বোতাম-বুড়ি ম্যাগি নিয়ে রেডি।

তুমি অভিভাবকত্ব চাও, যে অভিভাবক নিয়ন্ত্রন নিয়ে আসে। লেখা কিন্তু শব্দের নিয়ন্ত্রণ মানে না, সে কাগজের ওপর কলম পেষার খশখশই হোক বা হালের চাবি পেষার কটকট। মায়ের নামের ভেতরেই মা শব্দটা ছিল, আর নামের মানে জুড়ে ছিল শরীর যে সারাজীবন অপদস্থ করেছে। ভোরের আলো থেকে সন্ধ্যের আলো পর্যন্ত শরীর জুড়ে শব্দের আনাগোনা, সহবাস, অনুবাস, দানোয় পাওয়া মুখের জায়মান ভয়গুলো পলান্ন হয়ে ফুটে থাকে যাপনগদ্যের শরীরে। দুপুর হলেই বাক্স প্যাঁটরা খুলে বসা। কি যেন খুঁজে যাওয়া। আলমারির তলা থেকে বের করা পত্র-পত্রিকায় ধুলো হয়ে রয়ে গেছে সেইসব দুপুর। আবিষ্কারের সাংকেতিক সময়। বাড়িতে ক্রম-জটিলায়িত সাংসারিকতার মত জড়ো হওয়া নানা ব্যবহারহীন জিনিসের সমারোহ এই গদ্য। ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যা ব্যবহারকে রুখে দিতে পারে সেইসব অর্থহীন সামগ্রীর উদযাপন। দোসররা সহ- কর্তা হলেও একে অপরকে ব্যবহার করেনা। করতে চায় না। ভাষার ব্যবহারিকতার বিস্মরণ যদি কবিতা সৃষ্টি করে তবে গদ্য যেখানে গল্প না বলে শুধুই গল্প করে যেতে চায়, সেখানে শুধু কবিতার কেন, সে গল্পেরও দোসর হয়ে ওঠে ।

বলা হয় আলো দিয়ে শুরু হয়েছিল। আলো ধরে শুরু করা যায়, তেচোখো মাছেদের এমনটা মনে হয়। ওরা জানে সব আলো একদিন জল হয়ে যাবে আর চোখের উজানে খেলা করবে আঁশটে গন্ধ। আমার শরীর গন্ধ পেতে ভুলে গেছে মৃত্যুর বেজন্মা শব্দ শুনতে শুনতে। লিখন-শব্দের হননসন্ধ্যা থেকে মৃত স্মৃতির দহনদুপুর। নাহ, এখানে এখনো ইলেকট্রিক চুল্লী হয়নি। তাই দেওয়াল জুড়ে আগুনের দাউ দাউ দাগছাপ। পিঁপড়ে থেকে মানুষ—মাড়াতে মাড়াতে বড় হওয়া, দৃশ্য আর শব্দ — শ্বাস রোধ করতে করতে লিখে যাওয়া যদি কোন এক অসম্ভব সন্ধ্যায় চোখের কোণে দেখা দেয় সেই সমাদৃত সমাধি। সে সন্ধ্যা সন্ধ্যাই থেকে যাবে। তার অস্থি স্পর্শ করে রাত আর নামবে না। অতিপ্রাকৃতিক সেই সন্ধ্যায় সকাল, দুপুর, বিকেল যখন অবহেলার শব্দ শুনে বাড়ি ফিরে যাবে তখন কোন এক প্রাচীন গদ্যের সংগ্রহশালায় তোমার আমার দেখা হবে। তুমি আমাকে তোমার কবিতার কবরখানায় নেমন্তন্ন করবে আর আমি অপাপবিদ্ধ রাত্রির জন্য অপেক্ষা করবো। তোমার কবিতায় ভোরের আলো গুনবো আর আমার গদ্যে দোসর হওয়ার অন্ধ বশীকরণ নিয়ে সন্ধ্যের আলো রয়ে যাবে।