“হঠাৎ নিরুর জন্য”

বিতৃষ্ণ নীল বাউল ও শুভ্র ভট্টাচার্য

বর্ণমালা বিপর্যয়
ক্লান্ত নক্ষত্রের মত জ্বলজ্বল করছে বর্ণমালা
বাস্পের ধ্বনি ফুটছে হৃৎপিণ্ডে নিরুপমা,
একাকী আমি সাক্ষী এই গোলকধাঁধার
মুগ্ধ শেষ নিশাচর উড়ে গেল এইমাত্র
অপেক্ষা কেবল,
হাইফেন থেকে হাইফেন অতিক্রম করার।

এভাবেই শেষ হয় পাণ্ডুলিপি
দাড়ি কমা সেমিকোলনে যদি না আটকায় অর্থ,
বিপরীত শব্দবন্ধ এখনো আমাদের পরিপূরক
আয়োজন খালি ষড়রিপু উৎসবের।

ঘুমের ভিতর কাটিয়ে দিয়েছি আলাদা আলাদা পৃথিবী
এখন কেবল অপেক্ষা বর্ণমালা বিপর্যয়ের।

“যে কোনো চতুর্ভুজ”

যেকোনো চতুর্ভুজের দিকে তাকালেই এখন দরজা
আর যেকোনো সমুদ্রের দিকেই মৃত্যু।
হলুদ আলোতে ভরে যায় যাবতীয় মগজের গলিঘুঁজি
আর বাইরে তখন কুকুর কুকুরীর ভরা ভাদ্র মাস।
মৈথুন কি তবে কী তবে আজানুবাহুলম্বিত কালসঞ্চয়
নাকি কেশর ফুলিয়ে বেড়ে চলা মৃত্যু আয়োজন।
যেকোনো চতুর্ভুজের দিকে তাকালেই
এখন শুধু আলো আঁধারি গতিপথ আর রমণবেদনা।
জেব্রার মত শাদা কালো হয়ে আছে বিছানা
আর ঘোড়ার মতো দুলছে নিভছে সাঁকো,
আর আলোর মিনারে চড়ে বসে আছে নিরুপমা।
আপাতত নিরুপমা হতে পারে যেকোনো গৃহবধূ
তরুণী কিশোরী যুবতী বেশ্যা কিংবা অ্যাসিড আক্রান্ত
ক্রমিক নারী।
তবে নিরুপমা হিসেবে আমার পছন্দ কোনো জারজ জায়মান,
যে কিনা অকপটে ধুলোবালি ঈশ্বর ভাগাড় সমস্ত একাকার করে দেবে
মেঘের মতন করে। গড়্গড়িয়ে বলে যাবে আমাদের ছিন্নমূল যাপনের
কথা, আর দরজার ওপারের লাল সূর্যের উত্তাপ
এখন যেকোনো চতুর্ভুজের দিকে তাকালেই...
*************

১)
কলম আর অক্ষরের মধ্যবর্তী ব্যবধান মুছে গেল। সাদা কাগজের উল্টোদিকে বিকেল ফুরোনো মনখারাপের অলিগলি। সব গলিই কানাগলি, সব মাটিই নো ম্যানস্ ল্যাণ্ড। তবু ফিরে আসতে হয়;
ঘুরে ফিরে সেই একই চেনা রাস্তায়, চেনা ছকের ছকবন্দী খেলা। গলির মোড়ে ভাঙ্গাচোরা লেটারবক্সে আজও আমার জন্যে কোনো চিঠি আসেনি। জানিস নিরু, তোকে নিয়ে একটা গল্প লিখেছি, মস্ত বড় গল্প। তোকে একদিন শোনাব। কবে আসবি তুই?
কলম থেমে গেল। শেষ পাতার শেষ লাইনে শেষতম শব্দের শেষে দাড়ি টেনে দিলাম। গাঢ় হয়ে বসে গেল অন্তিম যতিচিহ্ন। আপাতত শেষ এ পাণ্ডুলিপির অক্ষর পরিক্রমণ। খুব ক্লান্ত লাগছে। জানলার বাইরে থমকে আছে মাঝরাত। নিঃসঙ্গ কতগুলো তারা ফুটে আছে। হয়ত অরাও ক্লান্ত আমারই মত । হয়ত কোনো কোনো তারা মরে গেছে অনেক অনেক বছর আগে। তাদের মৃত্যুপথগামী শেষ দীর্ঘঃশ্বাস আলো হয়ে এসে পড়ে আমার পান্ডুলিপির ওপর। এলোমেলো হাওয়ায় ওড়ে পান্ডুলিপির পাতা। তারাদের নরম আলোর নীচে ক্ষতচিহ্নের মতো অক্ষরগুলো দগদগে হয়ে ফুটে আছে। আর ঠিক তখন আমার বুকের ভিতরে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে তোর মুখ। নিরু, আমার শরীরের ভেতরে জেগে উঠছিস তুই।
এইঘর, জানলার বাইরে ওই থমথমে রাত, ক্লান্ত বা মৃত তারাদের শরীর পোড়ানো আলোয় আমি আর নিরু ওরফে নিরুপমা, আমাদের জায়মান অন্ধকার বিনিময় করি। ষড়রিপুর আদিম উৎসবে ভেসে যায় আমাদের অক্ষরজন্মের বিষাদ-পান্ডুলিপি।

২)
মুঠোফোন থেকে ঝরে পড়ছে পাতাঝরার শব্দ। মুহ্যমান এই শহরকে ছুঁয়ে থাকে পরিযায়ী শীত। কেমন নিঃসাড়ে খোলস পালটে ফেলছে প্রতিটা নেশার ঠেক। নিরুর হাত ধরে আমি সমুদ্রের দিকে হেঁটে যাই। সারারাত সমুদ্র মাখি দুজনে, বিষণ্ণ সেই সমুদ্রমন্থন। নাহ, আসলে এসব কিছুই হয় না। আমি একলা অসুখ নিয়ে খোলা দরজার মুখোমুখি বিছানায় শুয়ে থাকি সারাদিন। দরজার বাইরে আলোর রঙ বারবার পালটে পালটে যায়। সেই রঙ্গিন পটপরিবর্তন আমাকে বর বিষণ্ণ এক অসুখ ফেরত দেয়। আমি তখন চোখ বুজে সমুদ্রের কথা ভাবি। ভাবতে ভাবতে উন্মুখ অস্থির হয়ে উঠি সমুদ্র দেখব বলে। আমি জানি, ওই খোলা দরজার ওপারে আমার জন্যে একা অন্ধকারে নিরু একবুক সমুদ্র নিয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। অথচ আমি ওই সমুদ্রের কাছে, নিরুর কাছে পৌছতে পারি না কিছুতেই। শুধু সমুদ্রের গন্ধ, সামুদ্রিক হাওয়া, ঢেউ এর শব্দ আছড়ে পড়ে আমার শরীরে। ঐ অন্ধকার সমুদ্র পেরিয়ে নিরু, নিরুপমার দীর্ঘশ্বাস লাগে আমার গায়ে। মগজের গলি ঘুঁজিতে ঢুকে পড়ছে ঢেউভাঙ্গা ফসফরাসের আলো। আমি একা খোলা দরজার মুখোমুখি বিছানায় শুয়ে থাকি অসুখ নিয়ে। আর দরজার ওপারে নিরুপমা এক সমুদ্র অপেক্ষা নিয়ে...
নিরু ওরফে নিরুপমাকে নিয়ে একটা গল্প লিখতে লিখতে এভাবেই কখন যেন সমুদ্রের গল্প আর আমার ব্যক্তিগত অসুখের গল্পে ভরে যায় পাণ্ডুলিপি। সময়ের কালচক্রি অভিশাপ ফুঁসে ওঠে বুনো ঘোড়ার আগুন রঙ্গা কেশরের মতো। আলোআঁধারি গলিতে পড়ে থাকে ধর্ষিতা সময়ের লাশ। আমার অসুখ বিছানা হয়ে যায় সাদা কালো জেব্রা ক্রসিং। এই যে নিরু বলে যাকে ডাকছি, কে সেই নিরু বা নিরুপমা? কোনো উচ্ছল কিশোরী, যুবতী গৃহবধূ, বেশ্যা নাকি অ্যাসিডের পোড়া চিহ্ন মুখে নিয়ে ...? নিরু, এই নিরু, নিরুপমা-!
একদিন নিরুর হাত ধরে আমি সমুদ্রের কাছে যাব। ঐ বিছানা থেকে উঠে অনেক অসুখ পেরিয়ে, ঐ দরজাটার ওপারে সব আলোকিত নিষেধ না মেনে সমুদ্র দেখতে যাবো। ডুবে যাবো সমুদ্রের অতল অন্ধকার নীলে, শুধু আমি আর নিরু। যেখানে বালির মধ্যে একটা পরিত্যক্ত সাঁকো, ভাঙাচোরা সেই সাঁকোর পাশে আমার পাণ্ডুলিপির ছেঁড়া পাতাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে... নিরুকে শোনাব ওকে নিয়ে লেখা আমার গল্প।