ছাই

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও কৌশিক দত্ত




উকিলপাড়া


মাকে



সে এক মেঘলা না থাকা
কোথাও না যাওয়া রাস্তাগুলো দিয়ে
টানা তিনদিন বৃষ্টির পরে রোদ
ক্রমশ নিমের মধুর রং জলে

তুমি ছাদে উঠেছিলে বালতি ও কাপড়
সাবান জলের মধ্যে সূর্য
তোমার রান্নাঘরের দেয়ালে ঠাণ্ডা হয়ে আসা চাটু

এসব দুপুরগুলো মিনার হয়ে ওঠে
শুধু একটানা বালকের মার্বেল পাথর নিয়ে ক্রিকেট
পরতে পরতে বৃষ্টির গরদে মিশে
ঝাপটা আসছে বিবিধ ভারতি

অথচ তোমার গ্যাস ক্রমশ নীল
ধাতব একটা চাকতি পাঠাচ্ছে মাথায়
হাঁড়ির গোল মুখ দিয়ে
আচ্ছন্ন সূর্যের হলুদ দেখা যাবে কি এবার

শুধু পুঁটি মাছ ভাজা ও বেগুনির
খয়েরিতে মিলিয়ে যাচ্ছে দুপুর দেড়টা
তোমার না কাঁপা হাত
বালকের মাথায় লেগে থাকা ছাই ঝাড়ছে



এত ছাই কেন ছিল বাতাসে?
আসলে তো নিম্নচাপের বৃষ্টি ধরার পর গোটা দুনিয়াটা একটা
শামুকের খোলে কাটা পা
ইঞ্জেকশানের পরে আসা জ্বর

এইভাবে দেশ শব্দটাকে বশ করি
কখন যে বাড়ির অসম্পূর্ণ অংশটা
বালক অচেনা মহাদেশ
চন্ডিচরণে ক্রমাগত স্কুল না যাওয়া সোমবার
শ্বাসকষ্ট বহুদিন পা না পড়া বাঁশপাতার জাঙালে
কিছু সাপ নড়ছে
তুমি জানতে অনুজ্বল দিন বা পশুতে ভয় নেই
যা কিছু নিজের মত বেড়ে উঠত তাই তো তোমার দুপুর
ফেরিওলাহীন মেঘে কি আহ্বান ছিল?
তোমার পিঠ ঠেকার দেয়ালের রং সাদা



ধরো এই বাড়িতে যারা এল তাদের আমি চিনি না
আমার ক্রমশ বাধা ছিন্ন হতে গিয়ে
বেরিয়ে এসেছে তার অভিপ্রায়
জলজ মিনার
আমি কিন্তু সরে আসছি
মেলে রাখা গতকালের ছাতার নিচে
একধরণের বসবাস আমি সানন্দে নিজেকে রক্ষা করছি
মাথার উপর ধাতব ডালপালা
কী অসীম দূরত্ব ও মাঝের রঙিন ছোপ
পুষ্প ও জঙ্গল পালিয়ে যাবার কথা
মৃত পোষ্যের মুখ বেড়ে উঠছে ক্রমশ
অব্যবহারের ছাদে চারা গাছ
অথচ বেরিয়ে আসা থাকে
ঘরভর্তি না বোঝা বাক্যের দিকে চোখ থাকে
ক্রমশ বৃষ্টিতে মিলিয়ে যাওয়া পাতা ও রঙিন ব্যাকরণ
স্পর্শ করে আমার চুল



ধরে নিলাম মাঠটায় কিছু নেই
দুপুর একধরণের জৈষ্ঠ্য
বিন্যস্ত ধুলোর ধাপে বাবর ও সৈন্যদল
একধরণের আত্মরক্ষার মত জমাট

আমি তো তোমাকে বলিনি
যে জাহাজ ছেড়েছিল গোপনে
থকথকে জল এসে রেখে গেছে তার
কাগজের মাস্তুল রোদে পুরনো ঘিয়ের ছিটে

এভাবেই ঋতু ও বদলের দাগ
ক্রমশ শেষ-কে তুমি বশ করেছো ময়দার সাদায়
যেভাবে অজানা ভাষার টিভি অনুষ্ঠান
সাদা কালোর গুঁড়ো ছড়িয়ে দিয়েছিল

একটু পরেই হাত স্পর্শ চাইবে
খিদে পেরনোর ছলে রাত
ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ রাখবে চুলে
**********************



ঠিক একটা নাগাদ বিশাল এবং পুরোনো এবড়ো-খেবড়ো ধূসর ছাদটার মাঝবরাবর খানিকটা অংশ ফেটে গেল আর সাতের বি মতিলাল বসু রোডের ছাদে আছড়ে পড়ল চকচকে রোদের চাঙড়, তিনদিন পর। অত উঁচু থেকে পড়ে ভেঙে ছড়িয়ে গেল আলোর টুকরোগুলো, ছাদময়। গুঁড়ো গুঁড়ো আলোর কোয়ান্টাম ভেজা ছাদে পিছলে পড়ে গড়াগড়ি যাচ্ছে, যেন শিশু আলো গর্ভের অন্ধকার থেকে খসে পড়ল সবে।

মেঘ কাটছে দেখে সুদেষ্ণা তাড়াতাড়ি কাপড়গুলো কাচতে গেল। আগে থেকে সার্ফ জলে ভিজিয়ে রাখলে হত, কিন্তু এখন আর ভেবে লাভ নেই। চট করে সাবান কাচা করে মেলে দিতে পারলে খানিক শুকোবে। সংসারের দীর্ঘ আর আপসহীন অভ্যাস তাকে প্রস্তুত করেছে এইসব মুহূর্তের জন্য, দিয়েছে মেঘ-বাতাসকে পর্যুদস্ত করার ক্ষিপ্রতা, যেন আবার বৃষ্টি নামার আগে কাচা কাপড় কটা শুকিয়ে ফেলতে পারার মধ্যেই তার জীবনের যাবতীয় সার্থকতা। উনপঞ্চাশ বছরেও প্রায় দৌড়ে ছাদে উঠে এমাথা ওমাথা টাঙানো নাইলন দড়ি আর ধাতব তারে চটপট... বালতি থেকে এক একটা কাপড় তুলে, আরেকবার নিংড়ে, দুহাতে তাদের মেলে ধরে উড়ে যেতে অক্ষম রাজহাঁসের ডানা ঝাপটানোর মতো দুবার-তিনবার, তারপর টানটান, তারপর নীল-হলুদ-লাল প্লাস্টিকের ক্লিপ, তারপর পুরোটা আবার — পরবর্তী কাপড়, শার্টের জন্য আছে পেতল রঙা লোহার হ্যাঙ্গার, যাতে ইস্তিরি করার আগেও কম কুঁচকে থাকে... এই দীর্ঘ অথচ সংক্ষিপ্ত কার্যক্রম যেন এক কোরিয়োগ্রাফি, এত নিপুণ ভাবে পরিকল্পিত, চর্চিত,যে অনভ্যস্ত দর্শকের মতো চেয়ে থাকতে থাকতে বিস্মিত মেঘ আরো খানিক জমি হারায়, প্রায় সম্পূর্ণ একটা সূর্য দুলতে থাকে বালতির তলানিতে কাপড় নিংড়ানো জলে।

ওদিকে ভাত ডাকছে। বালতি হাতে ছাদে ওঠার আগে টুক করে গ্যাস ওভেনের বাঁদিকের বড় বার্ণারের মুখাগ্নি সেরে এসেছে। প্রেশার কুকারটা বসানোই ছিল, তার পেট ভর্তি চাল জল খেয়ে ফুলছে ততক্ষণে। কাপড় মেলা শেষ করে পাশের ভেজা রাস্তাটার দিকে একটু তাকিয়েছে সুদেষ্ণা, এমন সময় প্রথম সিটি বাজিয়ে দিল কুকার। তিন নম্বর বেল বাজার সাথে সাথে মঞ্চে উঠে গ্যাস নিভিয়ে কুকার নামানোর দৃশ্যে অভিনয়টা সেরে ফেলতে হবে, নইলে ভাত গলে যাবে। নইলে “আবার গলিয়ে ফেললে!” তার বিস্ময়চিহ্ন আর অনুযোগের সুর সমেত গুমোট হয়ে থাকবে নিম্নচাপের আশ্বিনা বাতাসে, যে বাতাস খাবার ঘরের সব সুখ-দুঃখের গন্ধ শব্দহীন বয়ে নিয়ে যায় সামনের এই রাস্তাটা ধরে দূরের মেইন রোড পেরিয়ে রেল লাইনের দিকে।

এই রাস্তা, যার নাম মতিলাল বসু রোড, সুদেষ্ণার বাসা ছুঁয়ে যায়। মফস্বলে সবই রোড, যদিও দুসারি বাড়ির ফাঁক দিয়ে এঁকে বেঁকে চলে যাওয়া এই লম্বাটে গলির একমাত্র কৌলিন্য চল্টা ওঠা পিচের আস্তরণ। এই এলাকার ডাকনাম উকিলপাড়া, মতিলাল বসু ছিলেন ব্রিটিশ আমলের মস্ত ব্যারিস্টার। আশির দশকের শেষ অব্দি এখানে বেশ কয়েকজন ব্যস্ততা-পালানো উকিল থাকতেন সপ্তাহান্তে, আদালতের গ্রীষ্মে আর শীতে। তারপর কালো কোট, অ্যাম্বাসাডর, বিলিতি কুকুর, ভোর, সবকিছুই পাড়া ছেড়ে চলে গেছে। বেশীরভাগ পুরোনো বাড়ি আর বাগান খেয়ে ক্রমশ পাঁচতলা শহর হতে চেষ্টা করছে জায়গাটা। এখন সবাই তাড়াহুড়ো করে সকাল পার হয়। এই রাস্তার কালো ও ধূসর মড়িয়ে তারা দ্রুত চলে যায় বাসের দিকে, ট্রেনের দিকে। সকলেই চলে গেলে পড়ে থাকে সংকীর্ণ সড়কের ফুটপাথহীনতা, আচমকা বেঁকে যাওয়া, ক্ষত। আলুথালু দু-এক পাথর। বেনিয়ম কিশোরের পিঠে স্কুলব্যাগ, ঠোঁটে শিস, শিসে গান, গানে স্বপ্ন, মনে পলায়ন, মাথায় মেঘের গুঁড়ো, মেঘের শরীরে আকাশ পোড়া ছাই।

ভাত শিস দিচ্ছে চলে যেতে উদ্যত পুরোনো ইঞ্জিন, কবেকার তুফান মেলের সুরে। লোকাল ট্রেনের মতো সস্তা নয় সেই চলে যাওয়া, যে একটা গেলে দশ মিনিটে আরেকটা পাওয়া যায়। টুকুনের চলে যাওয়ার মতো বরং, এই “মা” ডাক অগ্রাহ্য করলে শরীর ছেড়ে যাবে ভাত, মরে যাওয়া ফ্যানের সাথে মাখামাখি স্যাঁতস্যাঁতে পড়ে থাকবে বর্ষার আলপথের মতো। মনে মনে স্কুল-ফাঁকি কিশোরের মাথা থেকে মেঘ ঝাড়তে ঝাড়তে রান্নাঘর গ্যাস ওভেনের কাছে ফিরে আসে সুদেষ্ণা। কুকার ছুঁতে গিয়ে দেখে হাতে ছাই। ছাই এল কোথা থেকে? কাপড় থেকে? বৃষ্টির থেমে যাওয়া থেকে? ছেলেটির মাথা থেকে, মেঘের গুঁড়ো থেকে, অথবা তার শিস দেওয়া গান থেকে? মনে করার সময় নেই দেখে আঁচলে হাত মুছে তাড়াতাড়ি নব ঘুরিয়ে আগুনের নীল বন্ধ করে সুদেষ্ণা, কুকার নামায়, খুন্তির হাতল দিয়ে সামান্য তুলে ধরে কুকারের ঠোঁটের ওপর বসানো ভারী স্টিলের টুপি, বের করে দেয় আরেকটু বাষ্প, আরেকটা সম্ভাব্য সিটির রসদ... এমনকি খুব বেশী গান জমতে দিতে নেই বুকের ভেতরে, গেয়ে ফেলতে হয়, গেয়ে বের করে দিতে হয়, নইলে সব গলে মাখামাখি একাকার, তখন আর সুর থেকে শব্দের শরীর আলাদা করা যায় না। অথচ সংসার চলে শব্দটুকু নিয়ে, সুরের সাথে তাকে ভেসে যেতে দিল বলে সরস্বতী লক্ষ্মী হতে পারল না।

ডাল গরম করতে করতে রাস্তার বাঁক ভাবে সুদেষ্ণা, সেই ছেলেটিকে ভাবে। আজ যদি রবিবার না হত, এ সময়ে রাস্তা দেখতে পারত সে। সকালেই রান্না হয়ে যায়, ওরা খেয়ে বেরোয়। দুপুরে নিজের জন্য আর সবকিছু গরম করতে ইচ্ছে করে না। বরং টানে ঐ রাস্তাটা, যার নাম মতিলাল বসু রোড, যা সাতের বি নম্বর বাড়ি আর তার একফালি বাগান ছুঁয়ে যায়, কিন্তু কোথাও যায় না আসলে। এই রাস্তা দিয়ে কেউ কোথাও যেতে পারে, কোথাও পৌঁছতে পারে, বিশ্বাস হয় না সুদেষ্ণার। টুকুন পারেনি। কেউ কী করে পারবে তাহলে? টুকুনের চলে যাওয়া ভাবতে ভাবতে ছাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। এত ছাই আসে কোথা থেকে? মেঘ জুড়ে, বৃষ্টির পরের আকাশেও এত ওড়ে! অথচ আশেপাশে তেমন কারখানা নেই, পুরসভার শ্মশানেও এখন ইলেক্ট্রিক চুল্লি। তবে? এই আশ্বিন মাস কি সত্যি শরতের? তাহলে কাশফুলের বাসায় এত আয়তক্ষেত্র এল কোথা থেকে? এত ইট জমে জমে পাঁচতলা, অথচ চড়াই পাখি নেই কোনো জানালায়!শুধু এয়ার কন্ডিশনারের দীর্ঘশ্বাস দেওয়ালের গা বেয়ে মাকড়সা-মানবের মতো রাস্তায় নেমে আসে ছাই মেখে। এই রাস্তা, যা আসলে কোথাও যায় না, শুধু যাবার ভান করে শুয়ে থাকে মায়ামৃগের মতো, সে কি শরৎকে কোথাও নিয়ে গেছে? অথবা জ্যৈষ্ঠকে? টুকুনকে?

এই বাড়িতে কি টুকুন ছিল একদিন? এই কি সুদেষ্ণার বাড়ি? তার ঘর? দেশ? স্কুলের ম্যাপ, প্রতিবছর পাল্টে যাওয়া রাজনৈতিক মানচিত্রে নাম আর আকৃতি আকার বদলানো অগুন্তি দেশের ভিতরে কোথায় মানুষের দেশের বাড়ি? ছোট গোল চিহ্নে দাগানো একটা শহরের উপান্তে কতটা সূক্ষ্মতায় এঁকে ফেলা যাবে উকিলপাড়া, তার ভেজা রাস্তা, স্কুল না যাওয়া কিশোর, সাতের বি, সুদেষ্ণা, টুকুন, প্রেশার কুকার, ভাত? মানচিত্রে কি মানুষ চিহ্নিত করা যায়? অথবা খিদে?

পিছনের বেশ খানিকটা জমি জুড়ে বাঁশঝাড় এখনো অক্ষত আছে, ওদিকে উন্নয়নের নজর পড়েনি। রাস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, সাতের বি আর সাতের এ, যারা একসময় একসাথে সাত নম্বর ছিল, বড়মানুষের বড়সড় সাত নম্বর। পিছনের বাঁশবাগানটাও মিত্তিরদেরই ছিল। সামনের বসতজমি দুই ভাগ করে বেচে দিয়েছিল সে অনেক বছর আগে, তখন সুদেষ্ণার সদ্য বিয়ে হয়েছে। বাঁশবাগানটার কী বন্দোবস্ত হয়েছিল, কেউ জানে না। দুপুরবেলা সুদেষ্ণার কানের কাছে বহুকাল আগে স্টেশন ছেড়ে যাওয়া তুফান মেলের মতো, কয়লার গুঁড়ো ছড়ানো ক্যানাডিয়ান ইঞ্জিনের মতো উ-উ-ঊ শিস দেবার জন্য তাকে রেখে গেছে ওরা। সন্ধেবেলা দু-একঘর সাপের গেরস্তালি থেকে মৃদু হিস হিস শব্দ, সবটাই প্রেশার কুকারের গান-বাজনা আসলে, মূলত ভাতের মর্জি মাফিক। ভাতের মর্জিতেই মানুষের জীবন চলে। টুকুনের ভাত খেয়ে যাওয়া হয়নি, ভাতের মর্জি হয়নি তাই। সামনের রাস্তা দিয়ে উ-উ-ঊ ঝিরিঝিরি অন্ধকার শিস ঠোঁটে নিয়ে টুকুন গেল, কোথাও গেল না যদিও। এই রাস্তা কোথাও যায় না, শুধু যাবার ভান করে শুয়ে থাকে। টুকুন শুয়ে থাকা শিখল রাস্তায়।

সাপের চলা উঁকি দিয়ে দেখে সুদেষ্ণা। সাপকে ভয় লাগে না তার, শ্বাপদকেও না। ভয়ের আঁতুর এই রান্নাঘর। সবচেয়ে ভয়ের জিনিস ভাত আর ঐ রাস্তা, রাস্তার পাশের দাঁড়িয়ে থাকা ভ্রূক্ষেপহীন দেওয়াল, যার গায়ে পিঠ ঠেকে গেলে আর পিছানো থাকে না জীবনে। টুকুনের পিঠ ঠেকে গিয়েছিল, আর তাকে দেখতে পেয়ে সেই একই দেওয়ালে সজোরে ঠেকে গিয়েছিল সুদেষ্ণার পিঠ। ইলেকশনের খেউড় লিখবে বলে তখন সবে সাদা রঙ করেছে পালবাড়ির দেওয়ালে।

ষোলো বছর পেরিয়ে গেল। টুকুন তখন সাড়ে বারো, বুকুন সাতের কাছাকাছি। তখনও ভাতের হাঁড়িটা ছিল, ফ্যান গালার দিনকাল। সারা গায়ে মাড় বসে যাওয়া ভাতে অরুচি ছিল ওদের বাবার। গ্রীষ্মের ছুটি শুরু হবার ঠিক আগের শেষ এলোমেলো স্কুলদিন টুকুনের, তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে যাবে। আগের দিন বিকেলে নতুন চাল এসেছে দু’ কিলো, দোকান থেকে বলেছিল এটাই ভাল, দামও এক টাকা করে কম। জলের আন্দাজ পায়নি সুদেষ্ণা, পৌনে নটার সময় দেখে সেদ্ধ হয়নি, কাঠি কাঠি শক্ত চাল হাড়ির ভেতর, তলানিটা লেগে ধরেছে। মিনিকিট চালে এমনিতেই গন্ধ থাকে না, এখন হাঁড়ির শরীর জুড়ে নীচের পুড়ে ওঠা ভাতকটার গন্ধ, কেমন যেন শ্মশান শ্মশান! মুখে দিতে পারবে না ছেলে।
“দশ মিনিট বোস মনা, দুটো রুটি করে দিই, খেয়ে যা।“
“না না, আজ দেরীতে গেলে বকবে।“
“কিচ্ছু বকবে না সোনা, আমি যাব না হয়।“
“না, আজ অ্যাসেম্বলি লাইনে ফাদার প্যাট্রিক আসবেন। তারপর হলিডে হোম টাস্ক দেবে।“
“বিদ্যুতের সাথে কিছু দুষ্টুমির প্ল্যান আছে, তাই বল।“
টুকুন জবাব দেয় না।
“তাহলে দুটো মুড়ি খেয়ে যা।“
“না মুড়ি খাব না। মা, কুড়ি টাকা দাও না।“
“কী করবি টাকা?”
“দাও না।“
“কী করবি আগে বল।“
“বিদ্যুৎকে একটা জিনিস খাওয়াব বলেছি।“
“কী জিনিস?”
“এগরোল”
“আচ্ছা, নে। নিজেও খাস একটা স্কুলে ঢোকার আগেই। প্যাট্রিক বাবা তো আর আসবে না। তাড়াতাড়ি ফিরিস। ফিরে ভাত খাবি।“
একটা বিস্কিট কোনোমতে চিবিয়ে খুশিয়াল বেরিয়ে গেল টুকুন। পকেটে এগরোল আর বন্ধুত্বের টাকা। হাত দিয়ে চেপে দেখল দুবার, পকেটে সদ্য বড় হয়ে যাওয়া কৈশোর। বড় রাস্তায় আসবে স্কুল বাস। কাল থেকে গরমের ছুটি। আজ জৈষ্ঠ্য, পকেটে বড়দের মতো দুটো কড়কড়ে নোট, ঠোঁটে সদ্য শেখা শিস, এখনো সুরে বসেনি। স্কুল-গেটের উল্টো দিকে সেই রোলের দোকান।

গ্রীষ্মের ছুটি অব্দি পৌঁছতে পারেনি টুকুন, স্কুলবাস অব্দি যেতে পারেনি। এই মতিলাল বসু রোড, যা সাতের বি ছুঁয়ে আসলে কোথাও যায় না, তার শুয়ে থাকা বেয়ে কিছুটা উজান গিয়ে, টুকুন... ঠোঁটে শিস, পকেটে কুড়ি টাকা, যা আসলে দুটো এগরোলের দামের চেয়েও চার টাকা বেশী... দোস্তি, বড় হওয়া আর গরমের ছুটির দিকে এগিয়ে চলা কিশোর দেখতে পেল জ্যৈষ্ঠের রোদে সকাল সকাল ঘেমে ওঠা এক অসুস্থ এলোমেলো মারুতি ভ্যান, ফুটফুটে গায়ের রঙ। সেই রঙ পেরিয়ে, সেই অসুস্থতা পেরিয়ে, জ্যৈষ্ঠ পেরিয়ে আর এগোতে পারেনি কৈশোর। তার পিঠ ঠেকে গিয়েছিল সদ্য চুনকাম হওয়া দেয়ালে, তার শিস দিতে শেখা ঠোঁট ক্রমশ নীল। দুমড়ে, ভিজে আর লাল ছোপ ধরে নষ্ট হয়ে গেল দুটো দশ টাকার নোট।

টুকুনের বাপ খুব দাপাচ্ছিল “অ্যাম্বুলেন্স অ্যাম্বুলেন্স... ডাক্তার হাসপাতাল...” বলে হাত-পা ছুঁড়ে, গলা ফাটিয়ে, চোখ প্রায় কোটরের বাইরে বের করে ফেলে। কেউ তাকে বোঝাতে পারছিল না, এসবে আর লাভ নেই। বুকুনকে এর মধ্যে আসতে দেওয়া হয়নি, তাকে খুব সামলেছিল কাজের মাসি মেনকা। পাড়ার ছেলেরা ব্যস্ত ছিল মারুতি ড্রাইভারকে আধমরা করার কাজে। সবাই দেখছিল টুকুন মরে গেছে, এক বেসামাল চালক তাকে মেরে ফেলেছে। শুধু সাদা দেওয়ালটাকে পিঠ দিয়ে প্রাণপণ ঠেলতে ঠেলতে সুদেষ্ণা ভাবছিল, ছেলেটার খাওয়া হল না।

দেওয়াল পেরিয়ে আর পিছনে যেতে পারে না মানুষ। সাদা দেওয়াল ফাটিয়ে অসম্ভব কালোর কাছে, খুব টুকুনের কাছে চলে যেতে পারল না সুদেষ্ণা, দেওয়ালের পিছনে দেওয়াল হয়ে দাঁড়ালো বুকুন আর তার বাবা। মর্গ থেকে ছেলের শরীর নিয়ে, পুড়িয়ে এসে, টানা দুই সপ্তাহের মৌন পেরিয়ে টুকুনের বাবা ক্রমশ বুকুনের বাবা হয়ে গেল। বুকুন আঁচল ধরল, সুদেষ্ণার কোথাও যাওয়া হল না। কৃষ্ণচূড়া রক্ত লাগে, তবু নিজের নিজের কাজে ক্রমশ দ্রুত আর নিখুঁত হতে লাগল বুকুনের পিতা-মাতা, প্রায় স্বাভাবিক। বাবা রোজ অফিস যায়, এমনকি সন্ধে-রাতে ছেলের সাথে গল্প করে, হাসে। মা হেঁসেল ঠেলে, ছাদে কাপড় মেলে, ছেলের গালে চুমু দেয়। মা সাপের নড়াচড়া দেখে, রাস্তা দেখে, স্কুল পালানো কিশোরের শিস শুনতে ছুটে যায়, যেন নিজে সে কিশোরীটি। শুধু সে ভাতকে ভয় পায়। মানুষের জীবন বড় বেশী ভাতের মর্জিতে চলে। চাল বদলেছে। বুকুন আর তার বাবা ঝরঝরে ভাত পছন্দ করে। আঠা হয়ে গেলে অনুযোগ করে। কেমন করে পারে? টুকুন চলে যাবার পরেও কী করে ওরা ভাত ভালবাসে, ভয় পায় না? আসলে এক সুদেষ্ণা ছাড়া দুনিয়ার কেউ মনে রাখেনি, মরার দিন ছেলেটা ছিল অভুক্ত। ভাত সেদ্ধ হয়নি সেদিন।

ষোল বছর হয়ে গেল। বিদায়ী জাহাজের মতো ডাক ছেড়ে মাঝরাতে একটা মালগাড়ি যায় দূরের লাইন দিয়ে, দিনে-রাতে ঐ একটাই, বাকি সব সস্তা লোকাল, তাদের বাঁশির টান নেই। বাড়ি-ঘর বেড়েছে, সেখানে যারা থাকে সকলেকেই অচেনা লাগে আজকাল! জ্যৈষ্ঠ্য এসেছে ষোলোবার, অবিন্যস্ত ধুলো কোলে নিয়ে। মিউনিসিপালিটির শ্মশানে ইলেকট্রিক চুল্লি, ভাতের হাঁড়িটা ফুটো হয়ে বিদায় নিয়েছে। প্রেশারের কুকারে আজ অব্দি শ্মশানের গন্ধ লাগেনি ভাতের শরীরে। তবু ছাই এসে জমা হয় বুকুনের মাথায়, সুদেষ্ণার হাতে, ছুটি পাওয়া কিশোরের ঠোঁটে। মাঝরাতে মালগাড়িটা একবার ডেকে যায় ঝড়ের মুখে পড়া জাহাজের মতো, প্রেশার কুকারের বাঁশির মতো। সেই ডাক ফেরাতে পারে না সুদেষ্ণা। টুকুন কি শেষ মুহূর্তে তাকে ডেকেছিল? “মা, আমার খাওয়া হল না!” সেইসব দূরপাল্লার ছেড়ে যাওয়া, একটা গেলে দশ মিনিটে আরেকটা পাবার জো নেই, সেইরকম ডেকেছিল টুকুন? যেরকম প্রেশার কুকারটা ডাকে!

দিনে তিনবার নিয়ম করে খিদে পায় বুকুনের। দুপুরের খিদেটা দেখতে পায় না সুদেষ্ণা, বাকিদুটো সে পেরোয় সযত্নে। খিদে পেরোনো সংসারের পরমতম আর্ট। খিদে পার হলে বার্ণার নিভিয়ে ফেলে তার নীল চাকতি, বাগানের এক কোণে পড়ে থাকা বহু পুরোনো ভাঙা উনুনের বুকের ভেতর নিভে যায় কয়লা। শুধু ছাই মাখে রাঁধুনীর হাত। নৈশাহার পেরোলে তবেই রাত একাকী হয় আর চুপি চুপি ছাই মাখে চুলে। ধূসর হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তার গৃহহীন নাবিক আর হতভম্ব সৈন্যদল।

অথচ গ্রীষ্ম একদিন কৃষ্ণচূড়ার কাছে আগুন বন্ধক রেখেছিল।