লাল স্রোত এবং হালখাতা

সিলভিয়া নাজনীন ও স্বরলিপি

১.
গুজবের আদিপর্ব
অপাঠ্য বিষণ্ন রাত অথবা ভেঙে যাওয়া এক জনহীন দীর্ঘ জংশন
রংহীন পতাকা উদ্বিগ্ন উন্মত্ত এক নগরীর প্রত্যাশায় যখন হেঁটে যায়;
জললগ্ন উপত্যকায় আর্দ্র ব্লাকবোর্ডের ছবিময় ইচ্ছামৃত্যুর ঘ্রাণে
ভেসে যাই অভিশাপের চোরা মেঘ-মৃন্ময় ঝংকারে।
মুখোশের প্রশ্নবাণে বিবর্ণ সমুদ্রে ডুবে যাওয়া নীল তিমিদের কাছে শুনেছি
মানুষেরা একা-
লোকালয়ে...
নির্জনে..
কৃষ্ণচূড়ার মতো বিক্ষত আত্মার শীতাকাল
...
২.
পারিবারিক প্রাচীন ধুলোচশমা
সবুজ স্নানঘরে বিগত শীতের মলিন সূর্যমুখী
শেষরাতের জলপিপি হয়ে শব্দহীন ট্রেনে আত্মহননে বিভোর।
থিমচুং ঘুমচোখ কৃষ্ণপক্ষ এড়িয়ে আগোছালো দোপাটিতে
আশ্বিন খোঁজার উতরাই।
অস্পষ্ট বিষাদেরা কবিতা লেখে
কাশবনের শিথিল ইস্কুলে রাতভাঙা নির্জনতার জোয়ার।
...

হারানো রক্তের কবুতর
হালখাতা নেই
রৌদ্রহীন হরিত বনচারী বৃক্ষ
শূন্যতায় খুঁজে বেড়ায়
ইছামতীর জোছনা নবাঙ্কুর।
মাতাল সোমেশ্বরীর স্কেচবুকে
মেঘ এঁকে যায় যাযাবর সময়ের শিলালিপি।
***************

রাত দ্বিপ্রহর। মানুষের হাঁটা-চলার কোন শব্দ নেই কোথাও। খোলা জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে কয়েক খণ্ড আকাশ। মেয়েটা ভাবতে শুরু করে তারও শরীর বেয়ে নেমে যাচ্ছে একখণ্ড লাল মেঘ।
এক ধরণের সুভাস। এই সুভাস অনেকটা স্রোতের মতো বয়ে যায় ওর মনের জলজ খণ্ডে। হঠাত মেয়েটি জোয়ারের টান অনুভব করে। তাকে যেনো টেনে নিতে চাইছে কেউ। সে মনে করতে পারে না, কবে কোথায় জোয়ার দেখেছিলো। সে বুঝতে পারে না, যে টানছে সেই বা কে।
চোখ বন্ধ করে মেয়েটি। ততক্ষণে স্রোতের রঙও লাল হয়ে গেছে। কিন্তু সে লালকে মেনে নিতে পারছে না। কারণ, লাল তার কাছে অভিশাপের মতো।
মেয়েটি উন্মাতাল হয়ে নাচতে শুরু করে। সে আসলে অভিশাপ মুক্ত হতে চায়। একের পর এক নাচের মুদ্রা শেষ করে। হঠাত খুলে যায় দরজা। মেয়েটি বুঝতে পারে এ ঘরে সে একা নয়! গোপন আত্মা আছে এখানে। হয়তো তারই আত্মা, যে আত্মা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে অবহেলায়।
একের পর এক প্রশ্ন দানা বেঁধে ওঠে। নিজের নাচের মুদ্রাগুলো নেরে-চেরে দেখতে চায়। তাদের সঙ্গে কথা বলতে চায়।
তারপর নিজেই বিরবির করে বলে;' মেঘগুলোতো আজ নীল তিমিও হতে পারতো, কিন্তু লাল হতে গেলো কেন?'
না, শব্দ নেই। কোন দিক থেকেই কোন শব্দ আসে না।
সকাল থেকে মনটা খারাপ ছিলো ওর। কৃষ্ণচূড়া ফুলের উৎসবে যেতে পারেনি তাই। ওকে বলা হয়েছে, 'মেয়েরা বড় হলে কৃষ্ণচূড়ার উৎসবে যেতে নেই। কারণ, মেয়েরা বড় হলে ফুল হয়ে যায়।হাঁড়ি হাঁড়ি লাল জমে শরীরে। ছুঁয়ে দিলে চুইয়ে পড়ে। একবার এমনটা হলে তার পরিবার সমাজে মুখ দেখাতে পারে না।'
এই নিস্তবদ্ধতায় সমাজও ঘুমিয়ে গেছে বলে মনে হয় ওর। এবার পা বাড়ায় মেয়েটি।
ক্রমে পেছনে পরতে থাকে ঘর-বাড়ি আর উঠানের দূরত্ব। ক্লান্ত হয়ে ওঠে। অবসাদ তাকে আকড়ে ধরে । মেয়েটি নিজেকে ছুঁয়ে দেখে, ও মনে করতে পারে না, কোথাও কোন ক্লান্তি আছে, নাকি নেই। ধীর পায়ে হেঁটে যায়, শৈশবের সাক্ষী যে নদীটি তার কাছে। ও নদী তাকে বেড়ে উঠতে দেখেছে। নদী জানে, প্রাচ্যের মেয়েরা জোয়ারে যতদূর যায়, সংখ্যায় তার অধিক পড়ে থাকে ভাটিতে।
মেয়েটি নিজের ভেতরে ছলাৎ-ছলাৎ শব্দের পুনরাবৃত্তি শোনে। শব্দকোষগুলো গেঁথে যায় ওর নাকে-মুখে। এমন সময় কেউ একজন সাইকেলের বেল টুং-টাং বাজিয়ে পাশ দিয়ে চলে যায়। শব্দের রেশ কেটে গেলে উঠে বসতে চায় মেয়েটি কিন্তু শরীরের ওপর তার আর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
নিজের শরীরের বাইরে আর কোথাও কিছু আছে কি না, মনে করার চেষ্টা করে না মেয়েটি। ও কেবল প্রাণপণ চেষ্টা করে যায়, নিজের কণ্ঠনালী থেকে কথা বের করে আনার জন্য। নিজের কপালটা ওর কাছে এতোটাই প্রসস্ত মনে হয় যেনো, কপাল হয়ে গেছে পৃথীবির সম্মুখের উপরিভাগ।
এতোক্ষণে ঘেমে উঠেছে ওর নাক। এক চোখ আরেক চোখকে বলে, 'আলো দাও'। মেয়েটি তাপ অনুভব করে একটু একটু করে নড়ে ওঠে কণ্ঠনালী।
উঠে বসে। নদীর পানিতে হাত ডুবিয়ে বলে, 'আমার নাম শিলালিপি। গুহা সাক্ষী, সাক্ষী অন্ধকার পিপাসার দাপটে আমার কণ্ঠস্বরের ক্ষত গভীর হয়ে যাচ্ছে। একটু পানি দাও।'
আবার বলে, ' এই যে নদী তুমি আমার গন্ধ নিচ্ছ, আমার কান্না দেখছো; কিন্তু আমার কান্নার জল আর ঘামকে পৃথক করতে পারছো কি না; তা আমি জানতে চাইবো না। চৈত্রের শেষ বেলায় শরীরের সোঁদাগন্ধ বেণীর মতো পাকিয়ে উঠছে, এবার একটু জল দাও।
নদী কোন সাঁই দিল হয়ত! মেয়েটি মুচকি হেসে দুহাতে একটু পানি তুলে মুখে দেয়। তার চোখে পড়ে, নদীর স্রোতে অসংখ্য কৃষ্ণচূড়া ভাসছে। দূর থেকে আসা ডালপালা একই রকম ঝুপ-ঝাপ শব্দ করে চলে যাচ্ছে দূরে কোথাও।
চৈত্রের শেষিদন এলে গাছে আর কোন কৃষ্ণচূড়া রাখা হয় না। ফুলগুলো কেটে ভাসিয়ে দেয়া হয় নদীতে। এই ফুলের সঙ্গেই নাকি সামাজিক সকল অমঙ্গল ভেসে যায়।
মেয়েটি এতক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে ফুলগুলো ভেসে যেতে দেখে। ওর উচ্ছাস নেই, কান্নাও নেই। শূন্যতার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিকস্বরে বলে 'তোমার সকল কাজের পুনরাবৃত্তি হলে, তুমি যেটুকু মহান থাকো তারও বেশি হয়ে ওঠো নিভৃতচারী।'
নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসে। এই নদীতে প্রায়ই ভোর রাতে স্নান করতে আসে মেয়েটির মা। লুকিয়ে ঘরে ফেরে। পরে, ধূপ জ্বেলে রেখে নামাজ পড়তে বসে। আরো পরে যখন পূবের আকাশ লাল হয়ে যায়, মেয়েটির মা ব্যস্ত হয়ে পরে সংসারের কাজে। তাগাদা নিয়ে একাজ ওকাজ করে বেড়ায় দিনভর।
মেয়েটি সব জানে। আজ সেও নদীতে স্নান করেছে। লুকিয়ে ঘরে যাবার লোভ হয় ওর। মেয়েটির মাও নদীতে আসে।
একটু দূর বেজে ওঠে সাইকেলের বেল। মেয়েটি যেনো নিজেকে পরিপূর্ণরূপে ফেরত পায়। ও মায়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে সাইকেল চালিয়ে লোকটিকে চলে যেতে দেখে।
মায়ের প্রশ্ন : ছেলেটি কে?
: পাশের গ্রামের। আমরা একসঙ্গে পড়তাম। এখন ও আর পড়ে না। ফুলচাষ করে। ছেলেটা ভার্জিন, মা।
: ভার্জিন! তুই কি করে জানিস?
: ওর একটা পলকের সঙ্গে আরেকটা পলকের কোন মিল নেই। ও মিলিয়ে যাবার আগে গঠিত হয়।
: সর্বনাশ। এ তুই কি বলছিস।
: কেন?
: একবারের বেশি বাঁচা যায় না এখানে। চন্দ্রগ্রহণের শক্তি তোকে গিলে ফেলেছে, আমি দেখতে পাচ্ছি। তোর মুক্তি নাই। আজনমের কারাদণ্ড পাবি তুই। কিন্তু, আমি তা সহ্য করতে পারবো না। আমি মা। তোকে মুক্তি দেবার ক্ষমতাও আমার দুবার হবে না। তুই বরং সত্য হয়ে যা। এই সমাজ সত্যকে পুরোপুরি পড়তে শেখেনি এখোনো। আর আমি ভেসে গেলাম।
পলকে নদীর স্রোতে ধূপের ধোঁয়ার মতো ভেসে গেলো মা। মেয়েটির দুই হাত প্রার্থনারত। কিন্তু, সে কিছু চাইতে পারে না। কিছু সময় বাদে, নিজের চুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নদীর স্রোতের ওপর কলমের মতো করে লিখে চলে,
'আমি জানি, নদীর ঘূর্ণিস্রোত আর নাভীর গড়ন একই/ তবু কৃষ্ণচূড়া আর নীল স্নান মানুষের কাছে প্রিয়/ তোমাকে না লিখলে এসব মুখস্ত হতো না আমার।'
প্রতিটি অক্ষর গঠিত হতে হতে মিলিয়ে গেলো। স্রোতের পর স্রোত একই রকম একা একা গেয়ে উঠল এই সব কথা- গানের সুরে।
কাল হালখাতা। মেয়েটির কাল ১৯তম জন্মদিন।ফুল নিয়ে আসবে ছেলেটি...