সবুজ রঙয়ের দরজা থেকে খোলা দরজার ওপারে

সাঁঝবাতি ও অলোকপর্ণা


সবুজ রঙয়ের দরজা:১
এই রোদের মত লোকজন আর ভাল লাগছে না। তবুও কিছু একটা উষ্ণ তার জন্যে অপেক্ষা করছি।
সেই অস্বস্তি মত তোকে কখন থেকে ডেকে যাচ্ছি; জীবন। আর জীবন যেন কাকে নালিশ করে যাচ্ছে-
ওই মেয়েটা আমায় পাত্তাই দিচ্ছে না।
খোলা দরজার ওপারে ঃ ফাটুলা টপ
একটা জ্বর বয়ে নিয়ে আসার কথা ছিল। কথা ছিল চোখ বুজে শুয়ে থাকার। চোখ খুলতে দেখতে পাওয়ার কথা ছিল,- জীবন। চোখে চোখ রাখার মত জীবন। যেখানে সব থাকার কথা ছিল, সেখানে পৌঁছে দেখি, কিছুই নেই। না আছে ঘুম, না আছে জ্বর। শুধু মাথার মধ্যে ঢুকে পড়া সূর্যটাকে নিভিয়ে দেওয়ার মত একটা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে,- ফাটুলা টপ। আর আমরা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে দেখছি, কবে যেন নিজেরাই একেকটা সূর্য হয়ে গেছি,- একেক করে।
চারদিকে রোদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতে দিতে আমরা বুঝি, আমাদের জন্নত এরকমই, আমাদের জাহান্নম এটাই। একগাদা হাওয়া আমাদের চুলে হাত রেখে চলে যায়।


সবুজ রঙয়ের দরজা ঃ৫
কেউ এই বেঞ্চের গায়ে লিখে গ্যাছে- এ অপেক্ষা ফেরত দেবো না। দেখলাম তার আশেপাশে সুন্দর সুন্দর মেয়ে, ভাল ভাল ছেলে, পরিষ্কার করার লোক, লাল চা। সব্বাই হেঁটে চলে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ বেঞ্চে বসার সাহস পাচ্ছে না।

খোলা দরজার ওপারে ঃ প্যাংগং সো
কাওয়া থেকে গন্ধ ঢুকে পড়ছে ভিতরে। পৌঁছে যাচ্ছে তুই পর্যন্ত। যতই চেষ্টা করছি তোর থেকে কাওয়া, চাং লা, এমনকি প্যাংগং লেককেও দূরে দূরে বসাবো, ততই তোরা একসাথে এসে বসছিস। তুই আর পাহাড় এক হয়ে যাচ্ছিস, তুই আর বরফ এক, তুই আর ওই বিরাট হা মুখ খাদ এক হয়ে গেছিস। অপেক্ষার মত দীর্ঘ পাকদন্ডী তোকে আষ্টেপিষ্টে নিচ্ছে। এখানে আমার আর কিছুই করার নেই। পনেরো হাজার ফুটে এসেও আমি আবার তোকেই দেখছি, তোকেই পর্যটন করছি। শুধু তফাৎ, এবারে কোনো এন্ট্রি ফি নেই।
এ সফর অবারিত।

সবুজ রঙয়ের দরজা ঃ ৯
টানেলের নিচ নিয়ে এত রাগ নিয়ে কোন নদী চলে গ্যাছে; আমি উপর থেকে বুঝতে পারিনি। ওরা নামটাও বলতে পারল না। আমিই হয়ত ভাষা বুঝতে শিখিনি। তাই ছবি তুলতে গেলাম। ওরা বলল, মানা। আমার আনন্দপথ পিছল হলে আমি ছাতা ধরে ফিরে আসি।
আর কিছু না হোক... থেপচাদের চান করাই দেখবো না হয়। ভাববো আমরা সবাই মিথ্যে স্বপ্ন দেখতে ভালবাসি। দেখাতে ভালবাসি। নামহীন রাগ করা নদীদের নাম দি, এ্যালবাম।
খোলা দরজার ওপারে ঃ নুব্রা ভ্যালি
সন্ধ্যে নেমে এলে নদীরা আমার পাশে এসে বসে। আমার পায়ে হাত রেখে কোথায় যেন চলে যায়। ঠান্ডা লাগলে আমি নদী থেকে উঠে আসি। ঠান্ডা লাগলে আমি দূরে চলে যাই। যতটা দূর সম্ভব। তারপর একটা সময় যখন দূরত্বের থেকে ঠান্ডা কিছুই আর হয় না, তখন আমি থেমে যাই।
দূর থেকে দেখি তুই শপিং মলে ঘুরছিস, দূর থেকে দেখি তোর স্কুটি চালিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। দূর থেকে তোর চুলের গন্ধ আমি পর্যন্ত পৌঁছোতে পারেনা।
অথচ দূরই আমার ভালো লাগে, আমার আমার লাগে
সবুজ রঙয়ের দরজা ঃ ১৪
আমাকে ঝর্ণা থেকে উঠে আসতে বলছে। কুম্ভকর্ণের মত ছাইছাই মেঘ মাথায় উঠে বসছে। পায়ের নিচের পাথর কাঁপছে। আমি ভাবছি নদীর আত্মা কার কার ভিতর অব্দি ভর করলো। নুড়িপাথর কুড়িয়ে নিয়ে একটার ওপর আরেকটা বসিয়ে পাহাড় গড়ছি। ‘আপনাকে এই লুকিয়ে রাখা- ধুলায় ঢাকা’ পা আমার সি গ্রিন জলে জবুথবু। তাই আমিও যাবো না বলে চিৎকার... সেসব ‘না’... গান ছড়িয়ে পড়ছে, তাকে আগে শুনিনি।

আমি তো জানতামই কেন শক্তিবাবুর যাওয়া নিয়ে যথেষ্ট দ্বিধা ছিল...
খোলা দরজার ওপারে ঃ রোহটাং লা
পশমিনা গোট হেঁটে চলে গেছে এখান দিয়ে। আমি শুধু পায়ের ছাপ দেখি। যেখানে আমার যাওয়া হবে না কখনও, সেখানে আমি আমাকে লুকিয়ে রেখে আসি। বরফ বরফ ছোঁয়াচ নিয়ে বেঁচে আছে রোহটাং লা। এভাবেই কেউ শৈত্য নিয়ে বেঁচে থাকে। কেউ বেঁচে থাকে দূরত্ব নিয়ে। কারো আবার সমস্তটাই অপেক্ষা।
শৈত্য, দূরত্ব না অপেক্ষা...
দ্বিধা নিয়েও তো জীবন কাটানো যায়।