বিকেলের ঠিক যেখানে

প্রদীপ মজুমদার ও প্রবুদ্ধ ঘোষ

বিকেলের ঠিক যেখানে সন্ধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে, ঠিক যেখানে কোনো এক অশ্বত্থ অপেক্ষা ক’রে থাকে পাখিদের, সাজিয়ে রাখে বাসা; সেখানে নিশ্চুপ বিষাদের স্বগতঃকথনে মিশে যায় ঝিঁঝিঁদের সংলাপ। কোনো এক কিশোরবেলা সেখানে ফেরে কোনো এক কবিতাপাওয়া মুহূর্তে। একাই ফেরে। শোকপ্রস্তাবে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, মুখ থেকে মুখে ধোঁয়া। ধোঁয়ার মতোই ছুঁড়ে দেওয়া, ছুটে আসা কথন। সেসব স্পষ্ট ছিল। সেসবে মিশে যেত খেলাশেষে ঘাম, ধূলো আর উদ্‌যাপনের ঘ্রাণ। আজ প্রগাঢ় দূরত্ব, অভিমান ঠাণ্ডা চা’য়ের ভাঁড়। স্বাদ নেই; ছিল। সেসব উষ্ণতার আলাপনে মূহুর্ত রাখে এখন। এখন সেই রেলট্র্যাকের ওপরে ভারসাম্য রেখে হাঁটতে হাঁটতে ফেরে বন্ধুবৃত্তে। কল্পনার বৃত্ত সব, জুড়ে যায়, খুলে যায়, পূর্ণ হয় একার ভিতরে আরো একা আরো একা পথে। এখন জানে, সেসব বন্ধুমুখ দেখা যায় রোজ; ফেসবুকে, হোয়াটস্‌অ্যাপে। কিন্তু, সে দেখায় আখ্যান তৈরি হয় না আর। জন্মায় না উদ্‌যাপনের ঘ্রাণ বয়ে আনা সন্ধ্যের আবশ্যিক দূরদর্শনের খবরের সাথে মিশে যাওয়া সংলাপ। কী কথা চ্যাট্‌বক্সে? একটা দু’টো বাক্যের পরে, প্রয়োজনীয় কুশলাদির পরে হাতড়াতে হয় কথা। নিশ্চুপ বাক্যেরা জানে অপ্রয়োজনীয় কথনে নির্মিত সংলাপঘোরে বন্ধুত্বের আদল আসত। এখন মেঘের নিচে বসে, এখন সেই বিকেলের রংপাল্টানো সময়ে ফেরে কিশোরবেলার কাছে হাত পেতে। জানে, বৃষ্টিরা হয়ে গেছে, বৃষ্টি ঝরে গেছে। মেঘের রেশে কবিতাপাওয়া মুহূর্তেরা শ্লোক লেখে। সারারাত আলো ঝরে। হিম হিম...
(কবিতা ৭)
আজ সারারাত
খোলা আকাশের নিচে শুয়ে থাকব,
কেউ ডাকলেও উত্তর করব না
ফোন, ফেসবুক, গান, মেসেঞ্জার সব বন্ধ।

মনে মনে ভাবব,
আমি আজ গায়ে পড়া মেঘ
যে মেঘ শুধুই উড়ে
বৃষ্টি ঝরায় না।

স্তব্ধতা বিষয়ক কিছু জানতে চেয়ো না আমার কাছে
ফুল বিষয়কও না
শুধু সন্ধ্যার তামাটে রঙ নিয়ে কথা বলা যেতেই পারে


ব্যর্থতার মেঘের রঙ গাঢ়; সারাটা দিন মুখভার। পরিজন, আত্মীয়দের মতো। ঘুম ভেঙ্গে ওঠা, খাওয়া, স্নান, কাজ, কাজ, কাজ, ফেরা সবই নিয়মমাফিক। হাসি, উদ্বেগ চেনাছকে আটকে। ব্যর্থতার মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, ছায়া হচ্ছে, আদল পাল্টাচ্ছে। সন্ধ্যের পাতলা অন্ধকার ছড়িয়ে থাকছে দিনমান। এই যে এত আলোর মধ্যে ফিরছে সে, এত আলোর জমকালো সাজে চিনে ফেলছে পথ কিন্তু আলোর সাথেই আঁকা হয়ে থাকছে ব্যর্থতার অনুসরণ। ছায়ার মতো ফিরে ঘুরে লেগে থাকছে সাথে। মাপা পদক্ষেপে ছায়াও গড়ে নিচ্ছে তারই আদল। সে অফিসে, যে অফিসে সংবাদ বানানো হয়। জমকালো কথা-প্রতিকথার ভেকে গেলানো হয় সংবাদ। সে তো চায়নি সংবাদ কারো ব্যক্তিগত মতাদর্শের ছায়া হোক। সে তো চায়নি সংবাদ নিজেকে মুড়ে-বেঁকিয়ে দলা পাকিয়ে ঢুকিয়ে নিক বিক্রির খোলনলিচায়। তবু, তাকেই তো নিজে হাতে লিখে রাখতে হয় সংবাদের এপিটাফ। তারপর যেটা ঝকমকে আলোয়, শব্দে, স্যাটেলাইটে, দিকান্তরে ছড়িয়ে পড়ে, তা তো প্রকৃত সংবাদের ভূত মাত্র। প্রতিটা সত্যি খবরের কিছু ব্যর্থতা থাকে, প্রকৃত প্রস্তাব হয়ে না উঠতে পারার ব্যর্থতা। সেই মৃত খবরের ছায়া, সেই না-প্রকাশিত খবরের ছায়ারা তাকে সঙ্গ দেয়। সঙ্গে যায় নিঃসঙ্গ মুহূর্তেও। বহু রাতে খবর-অফিসের গাড়ি তাকে ছুঁড়ে দিয়ে যায় বাড়ির কাছে; সে হাঁটে আলো বুঝে বুঝে। ছায়ারাও তার সঙ্গে ফেরে। অন্ততঃ ফিরতেই হয়। নয়তো তাদের কী দায় পড়েছে, আলো বুঝে বুঝে তাকে এঁকে দেওয়ার? কখনো কখনো সেই অসহ ব্যর্থতাভার সে নামিয়ে রাখে শব্দে, তার নিজস্ব শব্দে। ডায়েরির পাতায়। সেখানে কী লেখা থাকে? সেইসব ছায়াদের খাঁটি কথাটা আজও কী লিখতে পেরেছে? নাকি, শুধুই খবরের ট্র্যাজেডি? দিনলিপি, জানো?

(কবিতা ৮)
আজ সন্ধ্যায়
আমাদের অফিস ক্যাম্পাসে
হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম
আমার ছায়াটিও সমানে সমানে চলছে।
একবার ভাবি অন্য রাস্তা ধরব
ছায়াটির জন্যে খুব মায়া হল।
তার দিকে মৃদু হেসে হাত নাড়ি,
সেও হাত নাড়ে।
একটু বাঁকা হলে সেও বাঁকা হয়।
দম দেওয়া পুতুলের মতো
আমরা দু’জনেই খুব খেলি।

ক্রমে ক্রমে সন্ধ্যা জমে ওঠে,
মাথার পিছনে আরো তীব্রতর হয়
ফ্লুরোসেন্ট লাইট।
ছায়াটিও ধীরে ধীরে আরো জমকালো।

মনে মনে তাকে বলি,
জানি একলা ঘরের কোণ তোমারও রয়েছে,
যেমন আমারও।
শুধু দু ফোঁটা চোখের জলে আমিই ধনী।

(কবিতা ৩)
কত কিছুই তো বলা হলো না
শূন্যের ভিতরে ঝাঁপিয়ে পড়া সেই সহিসের কথা
কিংবা বিশ্রীভাবে হেসে ওঠা সেই পাঁড়মাতালটি
যাকে বিগত বসন্তে শেষ দেখা গিয়েছিল।

গোধূলির মগ্নতায় বেজে ওঠা সেই বাঁশিটির কথা
লেগে থাকা মেয়েটির ঠোঁটে।
পিপাসাই বাড়ে শুধু,
কিছুতেই আর কিছু বলা হয়ে ওঠে না।

বৃষ্টিস্নাত এই রাতে আজ শুধু ফিরে ফিরে দেখি
আহত তন্দ্রায় পড়েছে আমার পা, দোজখে যাব?

কতটা ঘূর্ণিঝড় জমে আছে, কতটুকু দূরে? কেন্দ্রে সঞ্চিত অভিমান ঘন। ক্রমশঃ উপকূল থেকে সরে গেছে মাছচাষী। একা একা ডুবে গেছে সূর্য। আর, ঘূর্ণিঝড় এগিয়ে এসেছে হৃদয়ের দিকে। যেখানে শূন্যতা, সেখানে বাতাস আসে। যেখানে যত বেশি শূন্যতা, সেখানে ততো বেশি বাতাস ঝাঁপায়। এই তো ঝড়ের জন্ম। প্রবল দাপটে তার স্থিতি ভাঙ্গে। টলমল কথন ভাঙ্গা ভাঙ্গা সেতু থেকে ঝরে যায় মুহূর্ত বিলাস। আর, কথা দেওয়া ঠোঁট? থরথর ক’রে কাঁপে উচ্চারণ। এসব ঝড়ের সন্ধ্যে জনপদ স্তব্ধ করে দেয়। দৈনন্দিন যাপনে এক ভারী কিছু আটকে থাকে। ঝড়ের শেষেই হাজার হাজার অশ্বারোহী বর্গীর মতো ধেয়ে আসে বৃষ্টি। তখন স্থিতি বিপন্ন আরো। বুঝেছ কি প্রকাশভঙ্গি, তুমিও কতটা বিপর্যস্ত? যা কিছু সাজানো ছিল অক্ষরে, তারা জটিল যুক্তাক্ষর হয়ে গেছে। শব্দের মাঝে মাঝে বেড়ে গেছে দূরত্ব। মাতালভঙ্গি কিছু আলো দিন রেখে গেছিল, টলমল করে ফিরে গেছে নক্ষত্রহীন ঘন রাতে। অন্ধকারেও লিখে রাখা যেটুকু সযত্নবাক্য, তারা সতর্কবাণী হয়ে গেছে। ঝড়ের মুহূর্তে সমুদ্র থেকে ফিরে আসতে হয় তীরে। তবু যে নোনাস্বাদ, তবু যে নুনবালি জড়িয়ে থাকে? এত জল আকাশ থেকে মাটি ভিজিয়ে, উত্তাপে বাষ্প হয়ে আকাশে ফেরে? ফের নামে। তারা কী পিপাসা বোঝে? অগ্যস্তপিপাসা? শুধু ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রে জড়ো হয়। শূন্যতা ঘিরে হা হা ক’রে ছুটে আসা কথাঢাকা ঝোড়ো হাওয়া। খোয়াবে বসন্ত। বৃষ্টিরাতের ভিজে ঘুমে খোয়াব গাঢ়, ঝড়ে বিপর্যয়ে লগ্নতার আখ্যান কথা-দেওয়া ঠোঁটে নিবদ্ধ হয়। আসবে হে, মেয়ে? এই বিষাদস্বাদু জীবনকে চেটেপুটে ভাগ করে নিতে, আমার সাথে?


(কবিতা ১১)
হিসেব করি
পাহাড় থেকে পাহাড় কতো দূরে
ঋতু বুঝি পা ফেলে সঙ্কোচে
শরীর থেকে খসে পড়ে জন্মে জমা ধূলো
একটু আগুন পাখির ডানায় বিদ্যুৎ চমকালো।

আমি দেখি,
ফুল ফুটেছে পথের বাঁকে বাঁকে
নাম না জানা বিচিত্র অর্কিড
প্রতিদিনই দিচ্ছে প্রমাণ দিব্যি বেঁচে আছে
জীবন এবং শরীর।

এই তো জীবন,
পা ফেলি পাপোশে
একটু একটু ডুবছে দিনের আলো
রঙ ঝরাচ্ছে সন্ন্যাসী গোধূলি
শরীর ছোঁবে হাওয়ার মাতলামি
রান্নাঘরে ঘুরছে কিছু শব্দ
বাড়াচ্ছি হাত শূন্যে

প্রাণপণে ধরতে একটি পংক্তি।
স্বাগত, বিষাদ, ফের স্বাগত তোমায়। ধূলোঝাড়া, আনাচকানাচ থেকে, প্রতিদিন। তবুও সরোনি। বাস্তুসাপের মতো গভীর বাসায় বসে আছ, অবয়বে। সমস্ত অবশেষ এমনকি সমাধিফলকে বসে আছ আর ভিত কুরে কুরে ধ্বসিয়ে দিচ্ছ সব মজলিশ, দিবানিদ্রা, লেখা। আমি সাজিয়ে নিচ্ছি, আমিই নির্লিপ্ত দেখে যাচ্ছি। কেন ফিরে আস? কেন রোজ আমার সঙ্গে এমনকি স্নানঘরে, বিছানায় আঁকড়ে থাকো? অমোঘ সন্ধ্যের মতো বিকেলের গায়ে, অমোঘ মিথের মতো লোককথার হৃদয়ে। তবুও সব গল্পকথা তোমাকেই, দিনের হিসেব আর, কাউন্টার শেষটুকু তোমার সাথেই। বিষাদ, বেড়ে বেড়ে পাহাড়প্রমাণ। তোমার সাথেই সেই পাহাড়ে ভ্রমণ। এই যে শহরের পুজোগন্ধে ছাতিম, ট্র্যাফিকশব্দে কোলাহল সব যেন কেউ কাঠের বাঁশিতে পুরে দিয়েছে; আর, মিথ্‌ ছুঁয়ে আসা অন্ধ বাঁশিওয়ালার চুমুতে তা এক মায়াময় সুর হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এখানেই কী সেই প্রিয় বিষাদের জন্ম হয়? এখানেই ভালবাসা প্রেম হয়ে যায়? এখানেও আঙ্গুলে আঙ্গুল জড়ায় না কী কেউ? এক সুখের তাবৎ সন্ধানে বাড়ানো হাত, সে হাতের স্পর্শে লাগে আরেক হাত। বাস্তবতার আখ্যানে মিশে যায় উড়ানের আখ্যান। সন্তর্পণ। আদুরে হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে অভিমানের রঙ, সাদা-কালোয় মিশে যাচ্ছে সাংসারিক টুংটাং, উমম্‌ উমম্‌। বিষাদসম্ভোগের আখ্যানে ওতপ্রোত জড়িয়ে জলের গন্ধ, ক্রিম ক্রিম নিঃশ্বাসের ভাপ আর, জ্বরের ঝিমঝিমে তাপ। বিষাদ, ভালবাসাও জড়িয়ে আছে গো। হ্যাঁ, বিষাদেরও সুখের আখর থাকে।


কবিতা- প্রদীপ মজুমদার,গদ্যে-প্রবুদ্ ঘোষ