প্রেম এক আলোছায়া ঘেরা বসফোরাস !

পিয়াস মজিদ ও ফারহানা রহমান



ঝরা পাতার সিংহাসন

ঝরে পড়া প্রেমের মতোই
তুমি মালঞ্চে চির-চৈত্রশীল।
ঘাতকের নিষ্ঠায়
রচনা করে তোলো
সহস্র রূপমৃত্যুর মঞ্জুষা-ফাঁদ।
মরচে পড়া আলোর ঝলকানি
তামাদি করে বেছে নিই
জীবনের সেইসব অন্ধকার নন্দন!
আর যত ফেরারি পুষ্পে ছিল
ফেলে আসা ফাল্গুনরাত্রির
সবুজ কন্সট্রাকশন।
হৃদয়ের বসন্তবনে গুঞ্জরিত
মরা পাতার দল
ফাঁপা ফসলের চেয়েও
জাগায় বেশি আনন্দধ্বনি।

অনন্ত অনাঘ্রাতার দিকে
রিক্তের এই চৈত্রযাত্রা
চলছে, চলবেই।


স্বপ্নমৃত্যুপ্রসা ণ

এই গ্রীষ্মেও
মুষলধারে কাঁদছে আকাশ;
কান্নাপ্রণালি
কোনো ঋতু মানে না।
দিগন্তপাতালে
রন্ধনশালার বিস্তার তার।
এর মাঝে আমি এক
ঋজুরেখ নক্ষত্রবাদি,
এই ক্রন্দনসিম্ফনির
কারুকাঠামো ভেদ করে
শুক-স্বাতী-অরুন্ধতীর
হৃৎমহলে যাই;
দেখে আসি
এক একটি নক্ষত্রের
নির্মাণশেষে
তোমার চোখের জল
কত যুগের
বর্ষা হয়ে
ঝুলে থাকে
অনন্ত
অন্তহীনে!

নীরক্তকরবী

বেঁচে থাকার অসুন্দর
পরিসর ঘিরে
নাচে তা ধিন, ধিন তা
সুন্দরী কমলা।
সাক্ষী শুধু
শোকার্ত দাঁড়িয়ে থাকা অশোকতরু ;
থোকা থোকা কান্নাপল্লব
প্রেতপুষ্পলোকের অনন্য আতুঁড়ঘর।
দেবদূত-মরা গন্ধে
যত উদ্যাপন
ক্যান্ডেল নাইট
আর বৃদ্ধা পরির নিঃশ্বাস।
এমন রিক্ত জীবনফাল্গুন
কোন এক অন্তর্গতার
আরও কোনো ভেতরমহলে
প্রয়াত বসন্তের
কণা কণা স্মৃতি হয়ে বাঁচে।
*******************



জলছাপ এঁকে এঁকে ঝরাপাতার মালঞ্চ গড়ে উঠছে কবিতার মতো অপরাহ্ণে। নৈঃশব্দ্যের নিনাদেও পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘের মতো ভেসে থাকে অনন্ত অনাঘ্রাতার আনন্দধ্বনি। তবু আলেয়ার মতো ফেরারি ফাল্গুনগুলোও তো মাঝে মাঝে জীবনের আলোছায়ায় মঞ্জুষা-ফাঁদ তৈরি করে রাখে।
‘ভালোবাসা, ঝরে পড়া প্রেমের মতোই তুমি মালঞ্চে চির-চৈত্রশীল।’
যেমন বসফোরাসকে ঘিরে থাকে আলোছায়ার এক বিষণ্ণ উজ্জ্বলতা। রঙিন প্রজাপতির মতো সিম্ফনি নিয়ে আসে বৃষ্টির ফোঁটা ফোঁটা ফুলঝুরি । চির- চৈত্রশীল জীবনেও আসে প্রেমের নীল বৃষ্টিপাত । প্রেম কি কোন ঋতু বোঝে ? কী শ্রাবণ, কী ফাল্গুন, কী আগুন ঝরা চৈত্র ? প্রেমের তাতে কী বা এসে যায়? গোধূলির সোনালি আভায় ভেসে আসে কাশফুলের মায়াবী দোলা শুক-স্বাতী-অরুন্ধতীর অনন্ত প্রেম ! মুষলধারায় কাঁদায়, হৃদয় আকাশের প্রতিটি নক্ষত্রকে সারারাত ধরে। প্রেমতো এমনি এক অন্তহীন নীরক্তকরবী , হৃদ মাঝারে কণা কণা স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকে অনন্ত নক্ষত্রবীথির পিয়ানোতে । হৃদয়ের বসন্তবনে গুঞ্জরিত হয় জীবনের পুষ্পোদ্যানে। প্রেম নিয়ে আসে সমুদ্রের লাইটহাউসে ঝলমল করা শ্যাওলা ঢাকা বার্জ, সাথে আসে কুয়াসার ভেঁপুতে বেজে বেজে রূপালী সিগাল । প্রেমময় স্রোত প্রভাবিত হয় আলসেমিভরা প্রমোদতরীতে। ঝিরিঝিরি বর্ষায় অনন্তে ভেসে যায় ময়ূরকণ্ঠী রাজহাঁসযুগল ! এমনি কোন গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় নিঃস্পৃহ সাদা-নীল মেঘদলে মিটিমিটি হাসে ক্যামেলিয়া- ম্যাগনোলিয়া। কামনার তীব্রতায় বসফোরাসের উপর দিয়ে উড়ে চলে প্রুসিয়ান বেগুনি লাইলাকের মাতাল করা ফ্রেগেন্স। ফ্লোরেন্স মাখা ক্যান্ডেল লাইটে বনফায়ার করেছিলো যে সুপ্রাচীন অশোকতরু , তাদের প্রেম কী কখনো তামাদি হতে দেয় নক্ষত্রের চোখের জল ? দুনিয়ার তাবত প্রেমের সাক্ষী হয়ে আছে পরাগরেণুতে উড়ে এসে বসা মধুসন্ধানী নীল প্রজাপতিগুলো। প্রেমহীনতায় তাদের ভস্ম-জীবাশ্ম পড়ে থাকে অন্ধকার নিষ্প্রাণ চিলেকোঠায়। শিশিরস্নাত আলোআঁধারিতে গভীর চুম্বনরত ছিল যেসব প্রেমিক জোনাকযুগল প্রেমের বেহালায় ভেসে কেয়াপাতার তরীতে লীন হয়েছিলো তারাও একদিন নিঝুম রোদ্দুরে !
‘এক একটি নক্ষত্রের নির্মাণশেষে ,তোমার চোখের জল কত যুগের বর্ষা হয়ে ঝুলে থাকে অনন্ত অন্তহীনে !’
পলেস্তারা খসে খসে পড়তে থাকে পেন্ডুলামের মতো দোল খাওয়া অমরাবতী প্রেমিকার ঝুলন্ত দোলনা হৃদয়ের দেয়াল থেকে। জীবন তো মৃত্যুকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ভালোবেসে যায় তবু চিলের ডানার গোপন ভাঁজে মিশে কেনো উড়ে যায় প্রতীক্ষার ঘুড়িটা ? পানকৌড়ির ডুবন্ত নিশ্চিন্দিপুরের নীল পদ্মপুকুরে গোল্লাছুট খেলে হাহাকারের হিম। প্রেমের দ্রাক্ষালতা আকাঙ্ক্ষার মৌসুম ফুরালে ঘুড়ির কাঁচেরগুড়োর মাঞ্জা দেওয়া সুতো কেটেও পালিয়ে যায় নীল নীলিমায়।
‘ এমন রিক্ত জীবনফাল্গুন কোন এক অন্তর্গতার আরও কোনো ভেতরমহলে
প্রয়াত বসন্তের কণা কণা স্মৃতি হয়ে বাঁচে। ’
বসফোরাসের বুকের উপর তখনো হয়তো কোন পানসি ভেসে থাকে ।তবে থাকেনা তাতে আর কোন সাক্সোফন আর পিয়ানোর গ্র্যান্ড মিশেল ধ্রুপদী। সুর-তাল-লয় সব কেটে গেছে। সান্ধ্যভ্রমণে বেড়িয়ে ছিল যে কোজাগরী চাঁদ ! সেও হয়েছে ঝলসানো রুটি; রঙিন আল্পনা হয়ে ওঠে অভিশপ্ত গোলকধাঁধা ! কারুকার্যময় কল্পচিত্র থেকে ভেসে আসে হারিয়ে যাওয়া ছিটগ্রস্ত গুপ্ত প্রেমিকের অট্টহাসি । নিমের তেঁতো বিষাদ আনে অনভ্যস্ত স্বপ্নহীন চোখের তাঁরায়। তাই অবারিত বিনাশেও খোঁড়া পায়ে হাটে সময়, সাথে টলমল পায়ে পা মেলায় আরেকটি অন্যরকম অথচ বন্যজীবন ।