অবস্থান

প্রবীর রায় ও ঊষসী কাজলী

১।
ঘুমের মধ্যে চাষ হচ্ছে চাষীকরন হচ্ছে
উদ্বেগফসলগুলো ফেনাময় হাতে মুখে
কথাগুলি কথাময় উঠছে নামছে নিঃশব্দ
না ভাঙার ঘুম
কালো ফুলের ঘুম
সাদা রাস্তার ঘুম
দীর্ঘ হচ্ছে

২।
বৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছে আর অপেক্ষা আলগা হয়ে আসছে ছবি থেকে
মুখ ছবির মধ্যে থাকছেনা
তারা আমার কাছে সর্বনাম হয়ে আছে
সে সে সে
তুমি তুমি তুমি
কে নেই নেই কে কে
ছোট ফোঁটা থেকে বড় ফোঁটা বাড়ছে আরও

৩।
চলতে বলি নিজের পা’কেই বলি
ঘাসের মধ্যে লম্বা হয়ে আছে ভয়
তারতো পা নেই তাকে বলবে যেতে
আমার পা বলতে সে গড়িয়ে চলে গেল
লম্বা ঘাসে কিসের গোপনতা
তার খুটিনাটি পা’ই জানে
তার ঝুঁকি আমি নেইনা
তবু যাই তাকে যাওয়াই বলে
নিরাপদ কালো রাস্তার দিকে

৪।
আমিকথা লেখার বর্ন যেই খুঁজে পাই
অমনি লিখতে বসে যাই সেই চিহ্ন
পরপর হামাগুড়ি থেকে স্কুলমাঠে হারিয়ে যেতেযেতে
সঙ্কেত লোভে দেখি সব অন্যলিপি
এবার যা লেখা হয় তা আমি নয় আমিকথা নয়
***************
আমারই সাথে থাকা আমার বয়েসি আয়না। রোজ রোজ গড়ছে। প্রতিচ্ছবি। অধিচ্ছবি। হারিয়ে ফেলছে ছেলে বয়স, মেয়ে বয়স, উলের বন, খেলার বল। মুঠোর রুমাল আয়না ভুলে গেছে। অথবা জমিয়েছে কুটো দিন, জামার ফিতে স্মৃতি ও জল।
এইভাবে রোদ, বৃষ্টি, মেঘের সাথে পাল্লা দিয়ে আমার আয়না হয়েছে ভারি। 'আমি' বললে বাদ যায়না কেউই। ডায়েরি, পর্দা, ফুটপাথ ও মাছের বাজার। রেলপথ, চায়ের দোকান, হাত ব্যাগ ও কিছু অচল আধুলি। সমস্ত দিয়ে আমি আরও অবয়ব হই। গম্ভীর নাদ ব্রহ্ম হতে শব্দ তুলে দেন। করতল লিখে রাখে স্পষ্ট ও অস্পষ্ট রেখায় দীর্ঘ ,সুদীর্ঘ আখ্যান।
চলার ধর্মে পা অবিচল। কোথায় কীভাবে যাত্রা, তার নির্দেশ আসে। পা কেবল একনিষ্ঠ আজ্ঞাবহ। নরক বললে নরক। চাইলে ধর্মসভা। কোত্থাও যদি না পাও তবে তেতলার ছাদ। পা পা করে কম নয় তবু মাঝের স্টেপ জাম্প। চলে এসেছি কফি কাপে এসপ্রেসো। দেওদারু, মেহগনির গন্ধ প্রাচীন মেহফিল। নিকোটিন ছায়া অধিকার করে নিয়েছে আঙুল। ঠোঁট। ফুসফুসের ঘর। তার দান ধোঁয়ায় বিলীন। অস্তগামী একঘেয়ে দিন ভোরের ট্রেনে ফের চলে আসে। লেখা হয় প্রারম্ভ, ঊষাকাল।
ভাদ্রের শেষ বেলায় গুমোট বিকেল। যেন অনিচ্ছায় কিছু জল ঝরিয়ে আকাশি মেঘ। এখন নির্ভার। সামান্য কচুপাতায় চেনা দৃশ্যজল। পাতার সবুজ ঠিকরে আসছে তার ভিতর দিয়ে। অথচ মাখামখি নেই। স্পর্শও এখানে স্পর্শাতীত। এইভাবে পথ, পথপ্রান্ত আমার যাওয়া ও আসাকে কোলন-সেমিকোলনের কারুকাজে সাজিয়ে দেয়।
খাতার পাতায় অক্ষর হেসে যায় অদৃশ্য হাসি। আমি তার আভাস পাই। রঙে-রূপে তার নাগাল পাইনা। সন্ধের ঝিঁঝিঁরা বুঝি কবির দোসর। অকারণ বুকের প্রকোষ্ঠে শুরু সৌধ নির্মাণ। গ্রিলে, আলিসায় কখন জমে ওঠে ধূলি। স্মৃতি, সত্তা, পাকদন্ডি। বৃত্ত পূর্ণ হয়না।
শ্বাপদ শঙ্কা আমাকে রোজ নিচু হতে বলে। বলে মিশে যেতে, খর্বকায় দেশে। মিশে যাওয়া মানে মুড়ি বা মিছরি! ল্যাম্পপোস্টের দিকে চেয়ে ঘাসের জমিতে আমার নখ বিঁধিয়ে দিই। আমার আঙুল সাইপ্রাস। আমি ঘুমের ভিতর উৎকণ্ঠার গায়ে ঠেস দিই। হয়ে উঠি দীঘল গাছ। তিরতিরে হাওয়া বয়ে আসে। দিয়ে যায় ঘুরে ঘুরে সুসংবাদ।
স্থির শব্দে পাথর রেখে চলে যাই দ্বিধায়। আমি হয়ে উঠি তুমি। তোমাকে সাজাই স্কন্ধকাটা নৃপতি। আর আয়না আড়ালে হাসে। সেসবকে তোয়াক্কা করলে ঘুমের বাইরে জেগে ওঠে অগণিত থ্যাবড়া মাথা ও মুখ। ধড় ও থাই। দেখি মাংশল দিনের পর রক্তাভ রাত জড়ামড়ি করে নদী পার হচ্ছে। ভয় আমাকে অন্ধকারের কাছে এনে ছেড়ে দেয়। একাকী হারমোনিয়ামের কড়ি ও কোমল, সাদা ও কালোয়। আমিও ছুঁয়ে থাকি কাঁপাকাঁপা পজিটিভ ও নেগেটিভ ইথার।
ঘটনা প্রতিঘটনার পরের পর্বে মুষড়ে আসা চিবুক। বালি দিয়ে বাঁধ রচনার খেলা। সিদ্ধি বলে কিছু নেই। শরীর জুড়ে বালি বালি আর নোনা স্বাদ। বাসি সেই ঘ্রাণ আর একটু ঘন হয়ে এলে তারপর ব্রুটাস কথিত সযত্ন আঙুল তুলে নেবে ছড়। অথবা রাইফেল। দুই দিকে একাদশ রকমের ডাক। তাকে উপেক্ষা করে মেরুদণ্ড বরাবর উঠে যাব ভাবি। নামপদ হারানো ভূখন্ডে। মানুষের স্মৃতি যেখানে রঙচটা, হরিণ আর মেষ শাবকের ভিড়ে। চেনা চেনা পরগনা, দেশ, বিভাজিকা যেখানে অতি ছোট বিন্দু হয়ে, নক্সা হয়ে ফুটেছে আকাশ আয়নায়।