আমার ট্রেন সিরিজ

জিনাত জাহান খান ও বৃতি হক




সেদিনও খুব বৃষ্টি ছিলো
________

আমরা সেখানে কিছুক্ষণ বসে ছিলাম। আমাদের চোখ ততক্ষণে দূরবীক্ষণের মতো, দূরে ছুটে আসা ট্রেনকে ছোটো থেকে বড় হয়ে যাওয়া দেখছিলো.....কাছেই দুইএকটা অনড় শামুকের পীঠে চোখের জলের দাগ লেগেছিলো... আমাদের সহজ চাতুর্যমণ্ডিত গল্প শেষের শুরুতেই আকাশের আলো কমে এলো, দাঁড়ালাম।
সেদিন মেঘের অর্গাজমে আমরা যখন ভিজেছিলাম, ঘাসফুলগুলি হেসে উঠেছিলো .....


সুর
____________

ব্লু'মিং ব্লু'মিং কী বিকেল-রোদের মাঠ?
ব্লু'মিং ব্লু'মিং কী শরৎ আসার গান?
কোনো এক শীতকালে
কোকিলশাবক সুর তুলেছিলো...
বসন্ত-উত্তাপে যেন বাষ্প হয় শিশিরজলের বিন্দু ।
(কথিত আছে)
ঋতুযুগ নাকি কোথাও লুকানো ছিলো,
সে অতীত!

স্টেশনে যখন ট্রেন থামে খুব বৃষ্টি হয়,
আর লণ্ঠনসহ আলো কেন কাঁপে?

দূরত্ব
____

কত দূর যাবে? কত দূর যাওয়া...নিবিড় হতে? দূরত্ব আসলে কত দূর?
নখের লুকানো জল - তুলে দেই পায়রাদের ঠোঁটে।
একটা মোরগের মতো হেঁটে গেছে কেউ
পাহাড়ের ওপাড় থেকে আলো এসে পড়ছে...
এইখানে বোধহয় একটা স্টেশন, আমি থেমে আছি
তখনো কোনো ট্রেনের হুইসেল শুনিনি,
কিংবা দেখিনি, সিংহের মুখে হরিণের নিতম্ব...

সময়
____
১.
রাত ঠিক একটা বাজলেই বন্ধ ঘড়ির কফিন ভেঙে ট্রেন ছুটে আসে
রাত ঠিক একটা বাজলেই পানশালার দেয়ালে ঠুমরী কেঁপে ওঠে
রাত ঠিক একটা বাজলেই ঈশ্বরের ঝুলন্ত জিহ্বায় হুতুম পেঁচা কাঁদে

২.
একটি খুন লবণটিলায়
একটি কবিতা ডিম্বাশয়ে
একটি হৃদয় ধুতুরা বিষে

ট্রেন
____
মধ্যরাত, দাঁড়িয়ে আছি
ট্রেনের অপেক্ষায়-
আমি কখনওই মধ্যরাতের
ট্রেন ধরতে পারিনি

***



যাত্রা
বৃতি হক

ঘন্টি বাজছে। বিছানায় শুয়ে আছি-- শরীরের দু'পাশে অসার পড়ে থাকা হাতের তালু ঘামছে, আমার পায়ের নিচে কোলাহল কাঁপছে। আমি এখন ঋভুর দেশে যাবো।
কুউউউউ... ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক।
মধ্যরাতে এক ট্রেন এসে ঠিক ঠিক বুকের ভেতর ঢুঁকে পড়ে।
সবুজ মাঠের বুক চিরে এগিয়ে যাওয়া গ্র্যাভেল-বিছানো আঁকাবাঁকা পথ। যাত্রার এই পর্বে একদল লোকের সাথে হাঁটছিলাম। বয়স্ক বৃদ্ধ থেকে শিশু-- কোন এক অজানা কারণে সবাই যুথবদ্ধ হয়ে হাঁটছি। দূরে নদীর মত নীলচে শীত শীত জল দেখা যায়। দীপ্যমান সূর্যটা পশ্চিমে হেলে আমাদের ছায়াগুলোকে ক্রমশঃ দীর্ঘায়িত করে তোলে।
লালচে রঙা ছোট স্টেশনে সে পথটি শেষ হলো। স্টেশনের নামটা কোথাও লেখা আছে নিশ্চয়ই, দেখতে পেলাম না যদিও। একটা শাদা বেড়াল গেটের প্রাচীরে বসে, মাথা নিচু করে নিমগ্ন হয়ে কিছু দেখছে। প্রজাপতি ? ঢলঢলে সোয়েটারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে প্ল্যাটফর্মে ইতস্ততঃ ঘুরি, আমার প্রলম্বিত ছায়াটার সাথে অন্যমনস্ক হয়ে এক্কা দোক্কা খেলি। এই ভ্রমণে আমার চেনা কেউ নেই। কথা বিনিময় না হলে খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা সহযাত্রীদের সম্পর্কে তেমন কিছু জানাও যায় না। শুধু এক যাত্রার মুখ-দেখাদেখির বন্ধুতা তৈরি হয়। খোলা আকাশের চাঁদোয়ায় অষ্টাদশী মেয়েটি দাঁড়িয়ে, বাতাসে তার নীল কামিজের প্রান্ত ওড়ে। ধূসর চাদরটা মাথায় টেনে দিয়ে ছলছল চোখে দূরে তাকিয়ে আছে এখন। সে কি তার প্রিয়তমের কথা ভাবছে ? জানা হয় না। আমার দিকে আনমনে একবার তাকালো মেয়েটি। বিষন্ন, অথচ কি মিষ্টি চেহারা তার। সে কি আমাকে নিয়ে কিছু ভাবলো ? জানা হয় না অনেক কিছুই।
স্টেশনের অপরপাশে উন্মুক্ত ধানক্ষেত। প্ল্যাটফর্মের কিনারে এসে ঝুঁকে দেখছিলাম, রেললাইনটা দূর থেকে এসে অমায়িক ভঙ্গিতে বাঁক খেয়ে দিগন্তের দিকে এগিয়ে গেছে, আবার বহুদূর। তার সর্পিলতা আমায় মোহাবিষ্ট করে।
"সাবধান !" মা জোরে কথা বলে উঠল। "পড়ে গিয়ে ব্যথা পেতে পারো।"
মাথা ঘুরিয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না। মা এখানে থাকার কথাও নয় অবশ্য-- মা থাকে আমার ঘরের দেয়ালের রুপালী ফ্রেমে। সেখান থেকে মাঝেমধ্যে আমাকে কিছু উপদেশ টুপদেশ দেয়। কখনো কান দিই, কখনো দিই না। তবে এ মুহূর্তে প্ল্যাটফর্মের কিনারা ছেড়ে কিছুটা পিছিয়ে আসি।
ট্রেন আসছে। হুল্লোড় পড়ে গেলো চারপাশে। বেশ ক'জন ঠেলাঠেলি করে আমার সামনের দরজাটা দিয়ে উঠতে চাইছে। কিছু বোঝার আগে পিছনের ধাক্কায় এগিয়ে যাই-- সিঁড়িতে পা রেখে দরজার হাতলটা ধরবো, কেউ একজন পুরুষালী গলায় ধমক দিলো, "সরে যাও ! এ তোমার ট্রেন নয়।"
এ আমার ট্রেন নয় ? হাতল ছেড়ে দিয়ে ভিড় থেকে বেরোতে চেষ্টা করি। এভাবে পিছিয়ে আসাও দুরূহ। পার্শ্ববর্তী ফলওয়ালার ঝাঁকাটা কোমরের কাছে গুঁতো দিচ্ছে বেশ। কেউ একজন হেঁচকা টানে বের করে নিয়ে আসে আমাকে। লম্বা শ্বাস নিই-- এ আমার ট্রেন নয়। হুইসেল বাজিয়ে ধীরে ধীরে গতি বাড়ালো ট্রেন, ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক !! রজত ঘন্টায় হু হু বাতাস অযথা পাক খায় আমাকে ঘিরে-- রিং অ্যারাউন্ড দ্যা রোজি। ধু ধু স্টেশনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি, প্রাচীন অশ্বত্থের মতো আমার পায়ে শেকড় গজায়। আমার ট্রেন আর আসে না।
"পৃথিবীটা সাপ-লুডোর বোর্ড। সাবধান !" সাত সকালে ঘর থেকে বাইরে পা ফেলার আগে মা দেয়াল থেকে মাথায় ফুঁ দিতে চেষ্টা করে। নিচে নেমে রহিম ভাইকে গাড়ি বের করতে মানা করি। ভার্সিটিতে যাবার পথে এক গাড়ি অযথাই আমার রিকশাকে আজ ধাক্কা দিয়ে বাঁ হাতের কনুইয়ের চামড়া ছুঁলে দিলো। অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিইনি বলে নিয়াজ স্যারের বকাঝকা, এর রেশ কাটার আগেই মিথিলার সাথে তুচ্ছ কারণে রাগারাগি করে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। পথে দুই সাড়ে বদমাশ ছোকরা আমার চুলের ব্লুয়িশ কালার নিয়ে হাসাহাসি করলো-- ইচ্ছে হচ্ছিলো, ঘুষিতে দাঁত ফেলে দেই ! আমাকে বাড়ী ফিরতে দেখে মা'র মুখে মৃদু হাসি ফোটে। বিপন্ন ফ্যাকাশে মুখটা মা’র থেকে কোনোভাবে লুকিয়ে বিছানায় শুয়ে বসে হরেক ভঙ্গিতে সেলফি তুলি-- ডাকফেস, ফিসগেইপ, স্মিয, স্কুইঞ্চ। রমিজা খালা খাবারের জন্য কয়েকবার দরজা ধাক্কিয়ে যায়। কালো নেইলপলিশ লাগিয়ে দুই হাত দুই পা টান টান করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখি। আমার ক্ষুদ্র দূর্বল দুই হাত-- যাবতীয় রাগ, হতাশা, কান্না, বিরক্তি, ক্লিন্নতা, তাচ্ছিল্যের ভারি বোঝা একসাথে ধরে রাখতে পারে না। আঙুলের ফাঁক বেয়ে পড়ে যায় সব—আমার তাবৎ দুনিয়া নিরুপায় হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে চারপাশে। ঘরের মেঝেতে উল্টে থাকা বই, কাপড়, কসমেটিকস, ট্যাব, কর্ড, আধপোড়া সালেম আর স্যারিডনের ব্লিস্টারের সাথে।
হুইসেল বেজেছে আবার। চোখ বন্ধ করি। ওম শান্তি !
ধোঁয়াশাচ্ছন্ন এক সিঁড়ি বেয়ে ওয়েটিংরুম থেকে প্ল্যাটফর্মে নেমে আসি। পায়ের নিচের মৃদু কাঁপুনি অস্তিত্ব বেয়ে বেয়ে পুরো শরীরে ছড়ায়। কোথাও গমগমে আওয়াজ হচ্ছে নিশ্চয়ই। গলা শুকিয়ে আসছে আমার, তবু চীৎকার করে বলি, “ঋভুর কাছে যাচ্ছি, হেটেরোগ্লোশিয়ার পৃথিবী। চাও !”
আজ ট্রেনে ভিড় নেই। জানালা দিয়ে দূরের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, আনন্দযজ্ঞে মেতেছে ভুবন। কমলারঙা সূর্যটা সারিবাঁধা কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোর সাথে রঙের পাল্লায় নেমেছে। চুপিচুপি তারা নেমন্তন্ন জানিয়ে গেলো-- আজ যে ভালবাসাবাসির দিন। বসন্তের উত্তপ্ত কাম-মদিরতা আমাকেও আনমনা করে। আই উইশ, ঋভু ওয়্যার হিয়ার উইথ মি ! আমার হাতে একটি কবিতার বই ছিল। ঋভু কবিতা ভালবাসে।
পঁয়ত্রিশোর্ধ এক ভদ্রলোক টেবিলের অন্যপ্রান্তে আমার মুখোমুখি বসে। কিছুটা কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন,
-হ্যালো।
-হাই।
-শোয়েব মাসুদ, নাইস মিটিং ইউ।
-নুয়েরী। তড়িঘড়ি ছোট করে হাত নাড়ি। হাত মেলাতে পছন্দ করি না।
-আপনার সাথে কোন লাগেজ দেখতে পাচ্ছি না।
-জ্বি, ঠিকই দেখেছেন।
ভদ্রতাবশতঃ বেশি কৌতূহল দেখানো যায় না-- ভদ্রলোক অগত্যা ল্যাপটপে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, আমি ইয়ারফোন কানে গুঁজি। জনাব মাসুদের ম্যানিকিউর করা একছাঁচে কাটা নখ, কড়া আয়রণের স্যুট, জেলমাখানো চুল, ম্যানলি পারফিউম, ঝকঝকে জুতো, অ্যাটাশে, বাঁ-হাতের অনামিকায় প্লাটিন্যাম রিং, ‌সবকিছুই প্রকটভাবে বাবার কথা মনে করিয়ে দিতে থাকে। “ব্যাক অফফ, দ্য সাকসেসফুল ! আমার থেকে দূরে থাকো, নিজের কাজেই ব্যস্ত থাকো। আমার বোকা জীবন নিয়ে মাথা ঘামিয়ে তোমাদের মহার্ঘ সময় নষ্ট কোরো না।”
ধুলোমাখা কনভার্স সিটের ওপর তুলে আয়েসি ভঙ্গিতে ট্রেনের দেয়ালে পিঠ ঠেকাই।
-উড ইউ কেয়ার ফর সাম কফি? বুফে কারে যাচ্ছি। আপনি চাইলে এক কাপ নিয়ে আসতে পারি।
-নো, থ্যাংকস দৌ । আমার তন্দ্রা কেটে যায়...
In my thoughts I have seen
Rings of smoke through the trees
And the voices of those who standing looking
Ooh, it makes me wonder
Ooh, it really makes me wonder...
Ooh Ooh... ট্রেন থেমে যায়। এটিই নাকি শেষ স্টপেজ। কিন্তু এ তো ঋভুর শহর নয়, ঠিকানা ভুল ছিলো কি ? আমার কেবলই দেরি হয়ে যায়। কেন যে আমার দেরি হয়ে যায় ! বই ছুঁড়ে ফেলে ভুল স্টেশনের কাঠের বেঞ্চিতে বসে ফোঁপাতে থাকি, ঋভুর সাথে আজ দেখা হলো না।
পৃথিবীর নিগূঢ় অন্ধকারে সুমেরুপ্রভা এক মাহেন্দ্রক্ষণে দীপ্তি ছড়ায়। অপরযাত্রায় ঋভুকে পেয়ে যাই, যেখানে উপুড় আকাশের নিচে অনন্তের ধূপছায়া। যেখানে কিছু ভাবতে গেলে শূন্য এক বিরতি। আর ঋভু। আমার স্মৃতিতে ঋভু ছাড়া যে অন্য কেউ নেই। পৃথিবীর আদিমতম নরনারী কি আমরাই ছিলাম, ঋভু ?
নিশ্চুপ সন্ধ্যায় আমরা দুজন এক বড় পাথরের ওপর বসেছিলাম। সামনে বিস্তৃত প্রান্তর। ঋভুর বুকে অলীক ঘুঙুরের ছন্দ, প্রাচীন মাটির গন্ধ। অলসভাবে সেই বুকে মাথা পেতে রাখি, খেয়ালী আশ্রয় আমার-- একজন্ম এভাবে কাটিয়ে দিতে সাধ হয়। শুষ্কতপ্ত দিনের প্রথম পশলা বৃষ্টিতে ঘাসের বুকে যে সোঁদা গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, কোজাগরী চাঁদটাও থেকে থেকে ঠিক সেরকম-- সোঁদা ভেজা আলো ছড়ালো সে রাতে। আমাকে স্পর্শ করো, ঋভু ! স্পর্শ করো বিষন্নতাকে, আনমনা আমাকে, ঊনিশের এই একাকীত্বকে দূর করে দাও।
ঋভু আমাকে ছোঁয়, বিদ্যুৎচমকে শরীর জুড়ে শতখানেক ফুল ফোটে। আকাশে আশ্চর্য মেঘদল হয়ে আমরা ভাসতে থাকি, সাঁতার কাটি। ইউনিকর্নের ক্ষুরে মেঘের রেণু ওড়ে, সময়ের কাঁটা অনায়াসে থমকে যায়। ঋভু, তুমি কি আমার প্রেমিক ? ঋভু অনায়াসে মনের কথা পড়ে, অনায়াসে তার ঠোঁট আমার ঠোঁটে মিশে যায়, "না, আমরা প্রেম। আমরা কবিতা।"
ধোঁয়াটে বাষ্পভরা পৃথিবীর জঞ্জালে আবার ফিরে আসি-- কিন্তু ঘাসের পালাগান আমি কি করে ভুলি, গায়েন? ঋভুকে নিত্য খুঁজে চলি-- রাস্তায়, বাজারে, শহরের কোনায় কোনায়, আমার আলমিরার ড্রয়ারে। বালখিল্য ট্রেনটা কখনো দ্বিধামন্থরে আসে-- উঁকি দেয় ঘরে, কখনো আসে না। কখনো অযথাই আমাকে উল্টোপাল্টা পথে নিয়ে চলে। সেদিনকার ভ্রমণে বিশাল এক অন্ধকার টানেল বেয়ে দুষ্টুটা চক্রাকারে বেশ কয়েকবার ঘোরালো আমায় ! দৈনিক সংবাদপত্রে একদিন পড়লাম, কোথায় যেন, শুকনো গাছ কাটতে গিয়ে দুটো অপরূপ সবুজ বসন্তবৌরির ছানা খুঁজে পেয়েছে এক কাঠুরে। দল বেঁধে বসন্তবৌরিরা হারিয়ে গিয়েছিল এদেশ থেকে সে কবেই নাকি, তারপর অনেকদিন কেউ তাদের গান শুনেনি। দৈনিক সংবাদপত্রে তো সব খবর পাওয়া যায়, সেখানে ঋভুর নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি দেবো কিনা ভাবতে থাকি। ভার্সিটিতে সে ক্লাস করতে যাচ্ছে না অনেকদিন হলো। কাজের জায়গায়ও তার কোন খবর নেই। পুলিশ বেশ ক’দিন আগে একটি মৃতদেহ আবিষ্কার করেছে ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে। চেহারা বোঝা যাচ্ছে না তেমন, যুদ্ধের ছবিগুলোতে ঠিক যেমনটি দেখা যায়, সেরকম অষ্পষ্ট মুখ। তার বুকে একটি ক্ষত, ঠিক যেমনটি আমিই আশংকা করছিলাম ক'দিন ধরে ! সেই ছবি দেখে বুক নিদারুণ কাঁপে। কে যেন খবর দিলো, ঢাকায় এক কবি ও কবিতা সম্মেলনে ঋভুকে কবিতাপাঠ করতে দেখা গেছে। রমিজা খালা গ্রামে ঈদের ছুটি কাটিয়ে গল্পের ঝুড়ি খুলে বসে—তার কাছে জানলাম, বাউল হয়ে গাঁয়ের পথে পথে ঘুরছে ঋভু, লালনের গান গাইছে। পরনে তার গেরুয়া কাপড়, বুকে আশ্চর্য সোঁদা গন্ধ। খালার হাত আঁকড়ে ধরে অধীর আগ্রহে আমি সেই গল্প শুনি। মেলবোর্ন থেকে মিলা ফোন করেছিল। সে বললো, ডাউনটাউনের এক নাইটবারে বন্ধুদের সাথে ঋভুকে স্বচক্ষে ড্রিংক করতে দেখেছে সে। টিভির নিউজে মাউন্টেইনীয়ারদেরকে দেখাচ্ছিল যেদিন-- রিপোর্টারের সাথে হাসিমুখে কথা বলছিল ঋভু, আমি নিজেই দেখলাম। ফুলোফাঁপা লাল জ্যাকেট আলাভোলা সেই মুখকে আড়াল করতে পারেনি। আশেপাশেই আছে ঋভু, অথচ তার কাছে পৌঁছাতে পারছি না মোটেও !! কোনো মানে হয় এর ?
স্টার্ট ওভার ! রিভোট্রিলের স্ট্রিপটা উন্মুক্ত বুকে একা পড়ে থাকে মেঝেতে। দেয়াল থেকে মা'র উদ্বিগ্ন কন্ঠ ভেসে আসে। সাবধান, নুয়েরী ! মা আমার !
আমি চোখ বুজি।
ট্রেন আসছে।