সুবেহ তারা

রিমঝিম আহমেদ ও ডাল্টন সৌভাত হীরা

একদিন মন ভালো হলে তোর কাছে যাব, সুবেহ তারা। মধ্যমায় মমতা জমেছে, তর্জনীতে ভুল। সবটুকু উপুড় করে দেব- তোর চোখে। কড়ই কাঠের দরজা থেকে চুঁইয়ে পড়ছে পাতার ঘ্রাণ। বড় ছায়াকীর্ণ পথ, ধুলোয় মাখামাখি। যেন ধুলো ঝাড়লেই সহস্র পাখি উড়ে যায় নিশ্চিন্তিপুর বনের দিকে। কাঠের দেরাজে রাখা মায়াবড়ি, কত শত ভ্রূণের কান্নায় জমে গিয়ে গোল হয়ে গেছে ! রমণীরা জানে, তারচে বেশি জানে ইচ্ছেমৃত্যুর রাত। আমারও মা ছিল- কেবল মায়ের জরায়ুটা বিক্রি হয়ে গিয়েছে নাকফুলের দামে।


আশরীর শীতলতা নিয়ে কবিতা আমায় ছেড়ে যাচ্ছে
ছেড়ে যাচ্ছে ধীরেধীরে বাম হাত থেকে ডানহাত হয়ে
বন্ধ ঘড়ি থেকে খুলে পড়ছে সময়
বন্ধ ঘড়ি থেকে ছেড়ে যাচ্ছে প্রাণ
আমি ও আমরা; আমাদের কাদামাখা চোখ

পুরনো দরজা খুলে যাচ্ছে শব্দময়
এত হাওয়া! কেঁপে উঠে পাতা
তুমুল নড়ছে পর্দা ডানে আর বামে
দক্ষিণ বাঁধন খুলে নেমে আসে তাগা ও তাবিজ

নিজেকে নিজের কাছে গচ্ছিত রাখি রোজ
নিজেকে হারিয়ে ফেলি মদির বিকেলে
যুগল পায়ের কাছে নদী এসে থামে, অন্ধ নদী
বিশ্বাসী হাতের জন্য অর্ঘ হয়ে বয়ে চলে জল
নদীও পালিয়ে যাবে কবিতার শব্দের মতোন...
হে সুবেহ তারা!


জলা ও জঙ্গল পেরিয়ে রাস্তাটি হেঁটে আসে মানুষের কাছে, একা।
মনে হয় বহুদিন ঘুমের পর সমস্ত অতীত ভুলে গেছে, ভুলে গেছে
ব্যক্তিগত শোক; মৃত্যু ও মড়ক। মৃত পাথরের স্মৃতিফলকে যুগল
হাতের ছাপ অস্ফুট কাঁদে। অনাভ্যাসে আমাদের হাওয়া খাওয়া
রোগ সারে না! অগ্রাহ্য করে যাই মাদকাসক্ত দিনের কথা।

সুবেহ তারা, কারাগার ছাড়া আমার কখনো মেন্টাল এসাইলাম দেখা হয়নি।


দূরে ওই নদী, ফালা ফালা করে কেটে ভাসিয়ে দিই নিজের গতর। সুবেহ তারা, অংকগুলো ভীষণ কঠিন! মরিচাধরা মগজে সোনালি মাছের আঁশটে গন্ধ জড়িয়ে আছে। কার দিকে যাবো, কোন পথে যাবো ভেসে নিজেকে নিয়ে! স্রোতোবহা নদীও জানে না দিক। একাশি বছরের বৃদ্ধা ঝুলেপড়া ওষ্ঠ নিয়ে গান গায় অতিগূঢ় অসুখের। তার পায়ের কাছে এসে বেঁকে গেছে পথ দক্ষিণ মেরুর দিকে।






দি ফেক আইডি

ডাল্টন সৌভাত হীরা

আমি জিজ্ঞেস করলাম,আপিনি কিভাবে কবিতা লেখেন। এটা কি স্বতঃস্ফূর্ত? '

আমার ইনবক্সে জবাব আসার জন্য আমি কিছুটা ওয়েট করছি। আজকাল ফেসবুকে সিন অপশন আছে।তাতে কেউ কিছু দেখে সেটার উত্তর না লিখলে রীতিমত মেজাজ খারাপ হয়। বোঝা যাচ্ছে ওপাশে সেটা কেউ দেখেছে। এবং তিনি লিখছেন। টাইপিং মানে আরেকটা অপশন। সেটা দেখে আমি বুঝতে পারছি এই লেখালেখির পর্যায় চলছে।

আমি যাকে প্রশ্ন করলাম, তিনি কে? সেটার উত্তর আমিও খুঁজছি। আপাতত আমার ইনবক্সে যে নামটা দেখা যাচ্ছে, সেটার নাম ইনগ্লোরিয়াস বাস্টার্ড। এ আইডি টা আমার আরেকটা আইডি হওয়ার কথা। ছয় মাস আগে প্রায় বিরক্ত হয়ে ফেসবুক ডি একটিভ করেছিলাম। এ নিস্তব্ধতায় এক ধরনের শান্তি আছে। তাছাড়া কবিতা যা লেখার তা লিখে ফেলেছি বলেই আমি মনে করি। তাই আপাতত ফেসবহি ব্যবহার মানে কবিকুলের শতাব্দী প্রাচীন ক্যাচালে অতি অনিচ্ছা সত্ত্বেও জড়ানো। তবে অজ্ঞাতবাস থেকে মসনদ, বা দান করা সাম্রাজ্য দেখার একটা আনন্দ আছে। এটা আনন্দবোধ হিসেবে উচ্চতম পর্যায়ের; তাছাড়া আপনার অনুপস্থিতিতে আপনাকে নিয়ে কেউ কথা বলছে, সেটা দেখাটা আনন্দের। প্রায় অক্ষয় কীর্তিধারী মানুষের যেমন হয়। তাদের নিয়ে কথা বার্তা শুরু হয় তাদের মরনের পর। কিংবা ধরুন, জীবনানন্দ ঘারানার কবি, স্পিনোজা ঘারানার দার্শনিক। একবার ভাবুন তো জীবনানন্দ বেঁচে আছেন, ঠিকমত বুঝছেন, সুঝছেন, তার কবিতা সবাই পড়ছে, তাকে নিয়ে কথা বলছে! অথচ ঐ অর্থে যারা তাকে নিয়ে কথা বলছে তারা জানে তিনি অনুপস্থিত। তাকে নিয়ে কথা বলার অনুসঙ্গ গুলোর সমস্ত দায়ভার তিনি মুক্ত।তিনি শুধু শুনে যাচ্ছেন। কিছু বোঝার বা বলার দায়ভার তার নাই!

আজকালকার কবিদের ট্রেন লাইনে মৃত্যুর চেয়ে এই অতি সাময়িক কোয়েট বেশি আনন্দ দায়ক। আপনাকে মরতে হচ্ছে না, কিন্তু প্রস্থানের আনন্দ টুকু আপনি পাচ্ছেন।

ছ মাস আগে নিজের উপর প্রায় বিরক্ত হয়ে ফেসবুক কোয়েট করলাম। কতটা সহ্য করা যায় বলেন তো? প্রতিদিন এক শব্দ, এক কলহ, এক ক্যাচাল; সবচেয়ে বড় কথা প্রতিদিন এক প্রেমিকার লেখা শেয়ার। হ্যা,আমারও প্রেমিকা আছেন একজন। প্রেমিকা না বলে অন্তর্জালিক প্রেমিকা বলা; প্রেম ট্রেম সব ওই ইনবক্সে। আমি এমনিতে থাকি দেশের বাইরে। সেটাকে আমার প্রেমিকা বলেন বৈদেশ। কাজেই তার সাথে দেখা হওয়ার সুযোগ হয় নাই। ছবি টবিতে যা দেখেছি, সে টুকুই। তাছাড়া এ মেয়ে বয়সে ঠিক আমার অর্ধেক। আমার বিয়েটা টিকলে,আমার এরম বয়েসী একটা মেয়ে থাকতে পারত। সেও কবি; দশক হিসেবে আমার ঠিক দু’দশকের জুনিয়র। হয় কি! খুব সদ্য কবিতা লিখতে শুরু করা মেয়েদের প্রতি আমার এক ধরনের আকর্ষণ আছে, সেটা দোষের কিছু না। রবীন্দ্রনাথের ও ছিল, একেবারে শেষে রানুতে গিয়ে ঠেকেছিল। কিন্তু আমার প্রেমিকা নিভৃতা মেহজাবীনের মত এতটা বিরক্তিকর রানু নির্ঘাত ছিলেন না। কোন কুক্ষণে যে এর লেখা আমি শেয়ার দিতে গিয়েছিলাম। সেই থেকে অসীম ধৈর্যের সাথে আমার পিছে লেগে আছে। আর এই জামানার স্কাইপি, হোয়াটস- য়্যাপ আর দুই বিরক্তিকর জিনিস। ধরুন এখানে মধ্যরাতে কাজ থেকে ফিরে শুয়েছি টুয়েছি, বা এখন যার সাথে থাকি মারিয়া এনসেলেস্তার সাথে একটু ঝগড়া করছি, এই নির্ভৃতা ওরফে নিভু তখনই এফ বি তে নক দেবে। এই বাচ্চাদের নিয়ে যন্ত্রনার একশেষ! কিন্তু তার পরেও নিভু প্রেমিকা হিসেবে ভাল। রীতিমত বড়লকের মেয়ে; আমাকে মাঝে মধ্যে গিফট টিফট পাঠায়। কিন্তু গত ছ মাস ধরে সেটা নিয়েও আমি বিরক্ত। বাংলাদেশে আমি যত বড় কবিই হই, এখানে রীতিমত গতর ভেঙে খেতে হয়। কাজেই ফলোয়ার আর ভক্ত পরিবেষ্টিত এফ বি আমার জন্য সব সময় সুখকর না!

তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, একাউন্ট ডি একটিভের। আরেকটা একাউন্ট খুললাম ইনগ্লোরিয়াস বাস্টার্ড নামে। সেটা যে আমি সেটা কেউ জানে না। এই বাস্টার্ড সাহেব, মানে আমার নতুন আইডিটিও কবি। তবে তিনি আমার লেখা ঘোরতর অপছন্দ করেন! সেটার মানে হয়ত আমিই আমার লেখা অপছন্দ করি। কিংবা বিহন কবির অর্থাৎ সত্যিকারের আমি খুব খারাপ লোক, এটা বলে সত্যিই জানতে চাই ; আমি আসলে কেমন।

যেটা ভেবেছিলাম সেটাই। আমার অতি উৎসাহী ভক্তদের প্রশংসা আসলেই লোক দেখানো। এই যেমন কবি অনিল মুস্তফা। সে নাকি আগে সবাইকে বলে বেড়াত, বিহন দা মানে আমাকে দেখেই কবিতা লিখতে আসছে, বাস্টার্ড আইডি থেকে একটু ফুস মন্তর দিতেই সে বলে দিল, বিহন কবির নাকি সব কোলকাতার নকল করে লিখেছে।

আমি অর্থাৎ ইনগ্লোরিয়াস বললাম, 'সেটা ত ভাই আমি ছাড়া কেউ ধরতে পারি না।'
-আমরাও পারছি,কিন্ত, এরা হইল সাহিত্য মাফিয়া টাইপ। এদের কিছু বলা রিস্কি।

আমি বুঝলাম,আমি বিহন কবির সাহিত্য মাফিয়া!

ইনগ্লোরিয়াস একাউন্ট থেকে রিপ্লাই আসতে শুরু করেছে

বিহন: বললেন না তো আপনি কিভাবে কবিতা ল্যাখেন

ইনগ্লোরিয়াস : এইটা ত বলা যাবে না। তবে এইখানে আবদুর রহিম খানের তরিকাটা ভাল। আপনি তার গল্পটা জানেন?

-না বলেন তো

-উনি বৈরাম খানের ছেলে। কিন্তু ঐ জংবাজ বাপের ছেলে হইছিলেন মহা পন্ডিত। তুলসী দাসের কাছের দোস্তান। তো ওনারে আকবর বাদশাহর মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীর কয়েদ করল। কয়েদ করল, মিন পোস্তন গোলা খাওয়াইওয়া স্মৃতি ভুলাইয়া দিল। উনি সেই স্মৃতি ভ্রংশ অবস্থায় কবিতা লিখলেন। কবিতা লিখতে হলে নিজেরে ভোল'

-ঠিক নিজেরে ভোল।

আবদুর রহিমের এই গল্প কি আমি জানতাম? আমি না জানলে ও জানল কি ভাবে? কিংবা ধরুন আমরা দুজনেই জানি। কিংবা ধরুন আমরা দু জনেই ভুলে গেছি।

সমস্যাটার হচ্ছে, ইনগ্লোরিয়াস আইডিতে আমি বেশ কয়টা ছবি দিয়ে রেখেছি। ছাব্বিশ সাতাশের একটা ছেলের। সে স্বাভাবিক ভাবে বিহন কবিরের মত প্রাজ্ঞ নয়। কিন্ত সে এই জ্ঞান কই পেল। কার কাছে ধার করল।

ইনগ্লোরিয়াস আইডিটা অল্প কদিনেই জনপ্রিয়। এটা নিয়ে প্রথম প্রথম আমি মজা পেয়েছি। আসলে এখানে যে লিখছে সে ত বিহন কবিরই। কিন্তু সে লিখছে বিহন কবিরের মত না। সে লিখছে তার মত। অথবা বলা যায় রহিম খানের মত।

নিভু খুব অল্প কদিনের মধ্যে আমার ভক্ত। আমিই যে বিহন কবির সেটা সে বুঝতেই পারে নি। বা আমি বুঝতে দেই না। আমাদের প্রায় রাতে চ্যাট হয়। প্রথম প্রথম বলি'' আপা,আপনি যে আমার সাথে কথা কন, এইটা বিহন ভাই জানে? উনি ফেসবুকে ফিরলে কিন্তু খবর আছে!"

আরে না সে জানতেই পারবে না। আর এই বুইড়া জিনিস কতদিন ভাল লাগে কন!

আচ্ছা, আমারে আপা বলতেছেন কেন? আমি ত আপনার বেশি বড় না!
-আচ্ছা,আচ্ছা,সজনীপ্রিয় ে, তোমারে তুমিই কমু!
-সজনী প্রিয়ে, এইটার মানে কি?
-যার সাথে রাতে অভিসারী হয় রাই

আমাদের কথা আগায়। কবি বিহন কবিরের এটা জানার কথা না। অথচ সে জেনে যায়। অথবা আমি জেনে যাই। ফলাফল স্বরূপ স্কাইপিতে নিভু কল দিলে তারে প্রচুর পরিমানে গালাগালি করি। সেইটা বিহন কবির করে, ইনগ্লোরিয়াস তার মত থাকে।

আমার ইনগ্লোরিয়াসের সাথে আবার কথা আগায়

বিহন:আমার কবিতা আপনার কেমন লাগে
ইনগ্লোরিয়াস :আপনি কিংবদন্তী, আপনার কবিতা ভাল লাগার কারন নাই। আপনি যা লেখেন চুরি করে লেখেন। কিন্তু আপনার প্রেমিকাকে আমার ভাল লাগে।

আমার কবিতা ভাল লাগে না, কিন্তু আমার প্রেমিকাকে ভাল লাগে; এ কথা যিনি বলছেন, তিনি আসলে আমি। কিংবা অন্য কেউ। অথবা ট্রাম এক্সিডেন্টের পর আমার প্রেমিকা যার হস্তগত হবে তিনিও আসলে আমি। এ ত বিরাট এক' আমির' চক্কর।

-আপনি আমাকে পছন্দ করেন না, ভাল কথা কিন্তু আমি মরে গেলে আমাকে নিয়ে, এবং আমার কবিতা নিয়ে একটা অবিচুয়ারি লিখবেন প্লিজ।

ইনগ্লোরিয়াস এর উত্তর নেই অনেক সময়।

একটু পরে ম্যাসেঞ্জারে উত্তর আসে।

-সেইটা ত এখনই লিখতেছি। কাল স্টাটাস হিসাবে আপ কইরা দিব। নিজেরে নিয়া লিখতে কার না ভাল লাগে বলেন।'

আমি বিহন কবির, ওরফে ইনগ্লোরিয়াস বাস্টার্ড কালকের অপেক্ষায় থাকি, এবং পাকাপাকি একটা ডি এক্টিভেট একাউন্ট হওয়ার প্রতীক্ষা করি।