রূপকথা

জয়ন্ত ভট্টাচার্য(অনুবাদ কবিতা) ও চিত্রালী ভট্টাচার্য

রূপকথা ( ১)
মিরোস্লাভ হোলুব (চেকোস্লাভাকিয়ার কবি)

ভাষান্তর – জয়ন্ত ভট্টাচার্য
তিনি নিজেই নির্মাণ করলেন একটা বাড়ি
গড়ে তুললেন নিজের ভিত
নিজের পাথর
নিজের ছাদ ,
নিজের চিমনি ও ধোঁয়া
জানলা দিয়ে দেখার মত নিজের দৃষ্টি।

তিনি নিজেই নির্মাণ করলেন একটা বাগান,
গড়ে তুললেন নিজের বেড়া,
নিজের পাতাময় সুগন্ধী গুল্ম। নিজের কেঁচো,
নিজের সন্ধ্যা- শিশির।
আভাবেই, তিনি ছিন্ন করে ফেললেন মাথার ওপর একটুকরো আকাশ।

বাগানকে তিনি মুড়ে রাখলেন আকাশের গভীরে,
বাড়িকে বাগানের ভেতরে
ও অদৃষ্টকে একটা রুমালে,
আর সুমেরীয় শিয়ালের মতো
অবিশ্রান্ত শীতল বর্যণের মধ্যে দিয়ে
একাকী চলে গেলেন
পৃথিবীর অভ্যন্তরে।
*********
শেষপর্যন্ত রূপকথারা (১)
কেউই ওনাকে দেখছিলেন না, দেখছিলেন মৃত্যুকে,যা একজন মানুষকে তাঁর রচিত সমস্ত সম্পর্ক,সমস্ত ভালোবাসা মুছে দিয়ে শুধুমাত্র অদ্ভুত কতগুলো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আর যদি সে মৃত্যু আত্মহনন হয় তবে তো কথাই নেই। এঁনার বেলায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সকাল থেকেই সকলে উদ্বিগ্ন ছিল, কি হয়েছে এঁনার? দরজা খুলছেন না কেন! বারবার দরজায় ধাক্কা দেওয়া হচ্ছিল। মোবাইলে ফোনও করা হচ্ছিল ঘন ঘন ,কিন্তু------! শেষে দরজাটা ভাঙ্গতেই -----!!!
উনি নিথর হয়ে পড়ে ছিলেন সোফায়। মুখ নেমে এসেছিল বুকের কাছে যেন তিনি হৃদয়কে সাক্ষী রেখে চলে গেছেন। হাতের মুঠোয় ধরা ছিল ট্রাংকুলাইজারের শিশি—তাতেই সাব্যস্ত হল যে উনি নিজেই ----। তবে কোন মৃত্যুকালীন স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি কোথাও শুধু একটা ক্লান্ত ছায়া ঘুরে ঘুরে বলতে চাইছিল কিছু যা কেউই শুনতে পায়নি।
মনেপড়ল প্রায়ই দেখতাম ওনাকে, একা একা বসে আছেন ব্যালকনিতে, দৃষ্টিতে শূন্যতা। সে প্রসঙ্গ উঠতেই উপস্থিত একজন বলে উঠলেন— ‘যত সব বাজে কথা। এরকম একটা মিসহ্যাপের পর কতজন যে কতকথা বলবে । কিন্তু আমি জানি উনি কতখানি স্ট্রং পার্সোনালিটির মানুষ ছিলেন,নিজের ক্ষমতায় একজন যে কতদূর যেতে পারে উঁনি তার নিদর্শন হতে পারেন’।
--কিন্তু তাহলে উনি কেন---- ?
--সেটাই তো মেলাতে পারছি না!
এইসব ছান বিনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমি আর জানাতে পারলাম না যে কিভাবে উনি ওনারই নির্মাণের মধ্যে বন্দি হয়ে পড়েছিলেন। আমি দেখেছি ওই তথাকথিত ভালোথাকার মধ্যে বসে উনি কিভাবে একটুকরো আকাশ খুঁজতেন। হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে –সাত তলার এই সুরম্য ফ্ল্যাট, এই গর্জাস লাইফ স্টাইল, এত বৈভব, এত ক্ষমতা এসবই তিনি নিজেরই দক্ষতায় অর্জন করেছিলেন কিন্তু এই করতে গিয়ে তিনি বাজি রেখেছিলেন তাঁর নিজেরই জীবন। যা ক্রমশ তাকে একা করে দিচ্ছিল।
কেউ একজন বলল- সাফল্যের একটা শূন্যতা আছে , উনি কি শেষপর্যন্ত সেই শূন্যতায়-----!
আমি চুপ করে থাকলাম কারণ জানিনা সমস্ত রূপকথাই শেষপর্যন্ত বিয়োগান্তক হয়ে যায় কিনা।
প্রতীক্ষা (২)
ফরাজ বউ অল ইশা (লিবিয়ার কবি)
ভাষান্তর- জয়ন্ত ভট্টাচার্য

এখনই হাল ছেড়ে দিওনা।
তোমাদের জন্য
পৃথিবীকে নতুন করে সাজাতে দাও আমাকে।
*******
অপেক্ষা (2)
বাচ্চাদুটো অধীর আগ্রহে বসে আছে সেই সকাল থেকে । অপেক্ষা যে কি সুন্দর হয় তা ওই বাচ্চাদুটোকে দেখলে বোঝা যায়। মাথার ওপরে পলিথিনের ছাদ, সামনে বাটিতে কয়েকমুঠো শুকনো মুড়ি, গায়ে জামা নেই, নিন্মাঙ্গে ছেঁড়া প্যান্ট,- চারিদিকে অভাবের করুণ ছবি অথচ ছোট ছেলেদুটোর চোখে কী অদ্ভুত দ্যুতি! কিছুক্ষনের মধ্যে ওদের মা আসবে। ভোর ভোর কাজে বেরনোর সময় ভাইটা খুব কাঁদছিল। মা কোলে নিয়ে আদর করতে করতে বলেছিল – কাঁদিস নে বাপ, অপেক্ষা কর। আজ ফেরার সময় তোদের জন্য খুশি নিয়ে আসব কথা দিচ্ছি।
_ খুশি কি মা ?- বড়টা জিগ্যেস করেছিল।
-খুশি খুব বড় জিনিস বাপ, আচ্ছা আচ্ছা লোকে তার নাগাল পায় নে।
- সেই খুশি আমরা নাগালে পাব!
-হ্যাঁ বাপ, শুধু আজকের সকালটুকু ভাইটারে একটু দেখে রাখিস?
সেই থেকে অপেক্ষায় আছে ওরা। মধুর অপাক্ষায়।যদিও ভাইটা মাঝে মাঝে বড্ড জালাচ্ছে , জিগ্যেস করছে —খুশি কিরে ? খাবার? মিঠাই? নাকি নাল রঙের জামা- প্যান?
-কি বলি? আমিই কি ছাই জানি, তবে মা যেভাবে বলছিল তাতে মনেহয় মস্ত একডা কিছু হবে। তারজন্যি অপেক্ষা করতি হবে নি?মা বলেচে অপেক্ষা জানতি হয়। ভালোকিছুর জন্যি সবুর শিখতে হয়।
এই কথা শুনে ছোটটাও চুপ মেরে যায়। সেও দাদার মত দূরের পানে চেয়ে অপেক্ষা শেখে। অ----পে-----------ক্ষা----------।