সন্ধ্যা-ডুবুরি অথবা হারানো পাখির ভাষা

মুক্তি মণ্ডল ও প্রণব আচার্য্য



নদীলগ্ন হাওয়ায় কাছের মানুষ নাই,বন্দরে ভিড়ছে একা সত্য কথকের তরি, সন্ধ্যার মোহনীয় আভার শুদ্ধ ঝুঁটি থেকে উড়ে এসে একটু বসো পাতার নকশায়, দৃশ্য থেকে উঠে আসা ছিন্ন অবসর সরে যাক দূরে ঝলকানো মন মহুয়ায়। ধরা দিতে চেয়ে যদি দগ্ধ হয়, ওকে ধরতে যেওনা, নির্জনে অহিংস ছত্রাকে ছড়িয়ে যাক মুগ্ধ ধারণা। হৃদালয় ভরে উঠুক সহস্র উপহাসে।

বনমর্মর ছড়ানো নিমগ্ন প্রহর
বাঞ্ছাতলেই খুলে দেয় স্পর্শের সীমা
দূরে ধ্যানমগ্ন রাত পাহাড়ের চূড়া
আশ্চর্য বিনয়ে
দেহ থেকে ছিন্ন করে স্নিগ্ধ মুধুরিমা
কেঁপে ওঠে আমাদের সকল চাওয়া
অজস্র কান্নায় ফোটে ক্ষণপরিত্রাণ
মুগ্ধচোরা ঘূর্ণিতে ডুকরে ওঠে প্রাণ
মনুষ্যসমুদ্রে
ফেঁপে ওঠে প্রণত প্রফুল্লের হাওয়া

ক্ষণকালের হাওয়ায় পাতার সাথে
উড়ে যাওয়া মর্মরে
তাঁর সঙ্গে দেখা –
সেই ধুলো মুছে দেখালো রক্তের দাগ
মনে হল ওটাই বোবানদীর মায়া
বন্ধনের
শুকনো গতিপথে
পড়ে আছে কারো মন ভাঙ্গা নৈশসিঁড়ি

পথ ভুলে রোদ্রকুমারীর তলপেটে
ঘুমের ভঙিমা ভেদ করে
উঠে এসেছি বুনোফুলের তল্লাটে
আমার সামাজিকতা নাই
কদমের ঘ্রাণে ডুবুরি নামিয়ে খুঁজি
দেহের সরল স্থিতি
সময়ের সহস্র ডালিমে হেসে ওঠে
অযথা দেবীর কৃপা
বুঝতে পারি না কীভাবে মেলে ধরব
শরীর
অধর
স্থিতির পরমা বুঝতে পারে রহস্য
তার শিরার ভিতর আমারই ঘ্রাণ
বুনোফুলে ছদ্মবেশে অঘোরে ঘুমাই

**************


আকাশে একাদশীর চাঁদ। যমুনার তীরে বসে আছেন এক তরুণ। মায়ের দিক থেকে যিনি তৈমুরের বংশধর। পিতা বাবরের পঞ্চম অধস্তন পুরুষ সম্রাট শাজাহান; সাত বছর আগে হিন্দুস্তানের মসনদে অভিষিক্ত হয়েছেন তিনি। সেই থেকে মমতাজপুত্র অঘোষিত যুবরাজ। শাহজাদা দারা শিকোহর বয়স বিশ বছর পূর্ণ হয়েছে আজ।
*
যমুনার পাড়ে আসলে এমন হয়; নদীর স্রোত, গম্ভীর মেঘ, বাতাসের তোড়ে ঘোরের মধ্যে ঢুকে পড়েন তিনি। রাজ্য পরিচালনার কূটনীতির চেয়ে আরাম বোধ করেন সাহিত্য পাঠে, সংগীতে, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে। প্রায়ই চলে আসেন যমুনার তীরে। সঙ্গী কেবল বিশ্বস্ত অনুচর মাহমুদ। যমুনা তাঁকে ডাকে—সেই ডাক উপেক্ষা করার শক্তি নেই এই মুঘল-জাদার।

যমুনার যে অংশে তিনি নিরিবিলি সময় কাটাতেন সেখানে এখন ইটপাথরের কোলাহল। সম্রাটের আদেশে দারার জননীর সমাধির উপর নির্মিত হচ্ছে সৌধ—বিশাল কর্মযজ্ঞ। এই কোলাহল থেকে অনেক দূরে যুমনাকূলে বসে আছেন তিনি। অনেক্ষণ ধরে একটি পাখিকে লক্ষ্য করছেন। গোলগাল ছাই রঙের পাখি, লেজের গোড়ায় টকটকে লাল। ঠোঁট আমপাতার বোঁটার মতো। এরকম ঠোঁট আর কোনো পাখির দেখেননি। সাধারণত খুঁটে খেতে হয় বলে পাখির ঠোঁট সুঁচালো হয়। বিষয়টা বেশ অদ্ভুত লাগছে তাঁর।

মাহমুদকে দেখা যাচ্ছে; পার্শ্ববর্তি একটা গ্রামে গিয়েছিল একজনের খোঁজে। সেই খবরই শাহজাদাকে দিতে এসেছে। দারা ইশারা করলেন, মাহমুদ দাঁড়িয়ে পড়ল। যুবরাজের মনযোগ এখন পাখিটির দিকে। এ পাখির নাম তিনি জানেন না। নিমবাগানে একা একা উড়ছে—মাঝে মাঝে কৌতুহলী হয়ে তাঁর দিকে তাকাচ্ছে। বেশ কয়েকবার দারার খুব কাছাকাছিও চলে এসেছিল। তিনি লক্ষ্য করলেন, এতক্ষণ হয়ে গেল পাখিটি একবারও ডাকলো না। যুবরাজের খুব ইচ্ছা পাখিটির গান শুনবেন।

যুবরাজ মাহমুদকে ডাকলেন—সে জানালো, মেয়েটির নাম অদিতি। আজ রাতে তাকে যুবরাজের কক্ষে আসার আদেশ পৌঁছানো হয়েছে। রাজপুত্র হওয়ার এই আনন্দ, ভাবলেন দারা, যা চাওয়া হয় তাই হাজির হয়ে যায়। ভোগবিলাসের কোনো কমতি ঘটে না জীবনে। এই ক্ষুদ্র জীবনে কত নারী শয্যায় উঠেছে তার। যাকে চেয়েছে সেই এসেছে, কিংবা আসতে বাধ্য হয়েছে। প্রত্যেকের ঘ্রাণ, শরীরের ভাষা আলাদা; বিছানায় শীৎকারে, আলিঙ্গনে, গোঙানির মুহূর্তে জেনেছে তা। কারো শরীর কথা বলেছে যমুনার স্রোতের মতো, কেউ বা ছিল হরিণীর চোখের মতো চঞ্চল, কেউ বলেছে ধূপের ঘ্রাণে; কারো অনিচ্ছুক শরীর বলেছে গুমোট বিকেলের কথা। মানুষের কত ভাষা, কত মুহূর্তে, কত ভাবে প্রকাশ তার! পাখিরও কি এরকম ভিন্ন ভিন্ন ভাষা আছে?

দারা দেখছেন পাখিটি একদৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। অথচ ঠোঁটে কোন শব্দ নেই। তবে ভাষা আছে তার দৃষ্টিতে, ওড়ার ভঙ্গিতে। তিনি লক্ষ্য করলেন মাহমুদ আসার পর পাখিটি খানিকটা দূরে চলে গেছে। এই পলায়নও কি ভাষা নয়? তিনি মাহমুদকে চলে যেতে বললেন। সে তবু উসখুস করছে, আরো কিছু বলতে চায়। তিনি বলতে ইশারা করলেন, মাহমুদ জানালো, শাহজাদা আলমগীর বেশ কয়েকবার তাঁকে দেখে গেছেন; তাঁর কিছু অনুচর সবসময় দূর থেকে যুবরাজের দিকে লক্ষ্য রাখে।

বেশ কয়েক বছর ধরেই বদলে গেছে দারার প্রতি আলমগীরের আচরণ, আলমগীর বেশ রহস্যময় হয়ে উঠেছে। নদীর উপর বিকেলের তীর্যক রোদ—কেমন সোনালি ঢেউ, তার উপর মাঝে মাঝে মেঘের ছায়া। রহস্যময় হয়ে উঠেছে যমুনাও। হঠাৎ নদীকে মনে হলো অদিতির ছলো ছলো শরীর; স্বর্ণাঢ্য হাসিতে ঝলমল করছে। যমুনার দুই পাড়ে সবুজ বন, গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে কুঁড়ে ঘর। দারার মনে হল, এমনই এক কুঁড়ে ঘরে বাস করে অদিতি—সেই ঘরের ভেতরটা কেমন? কী সুগন্ধ লুকানো সেই অন্দরে? নিজেকে খুব দীনহীন মনে হলো তাঁর। দাসদাসী বেষ্টিত রাজপ্রাসাদ, সবই দারুণ অর্থহীন।

যেদিন প্রথম যমুনার উপর জ্যোৎস্নার ঢল দেখেছিলেন, সেদিন এরকম হয়েছিল তাঁর। হঠাৎ বাতাসে উড়ে আসা পাতার মতো উন্মূল মনে হয়েছিল নিজেকে। এ জীবন বেদনা ছাড়া কিছু নয়। তারপর কত জ্যোৎস্না দেখেছেন তিনি রাজপুরীতে। ভীত-বাধ্য নারীর শরীরের মতো প্রাণহীন মনে হয়েছে তা। পাখিটি এখনো কাছাকাছি উড়ছে। দারা অপেক্ষা করছেন তার ডাক শোনার জন্য। হয়তো এটিও তাঁর মতো নিঃসঙ্গ। তাঁর কেবলি মনে হচ্ছে পাখিটি কিছু বলতে চায়—কী বলতে চায়?—হয়তো নিজের একাকীত্বের কথা, হয়তো অদিতির কথা।

*
সন্ধ্যা নেমেছে যমুনায়, আকাশে অপূর্ণ চাঁদ। মাহমুদ তাড়া দিচ্ছে। কিন্তু আজ তিনি তীর ছেড়ে উঠবেন না। তাঁর মন বলছে পাখিটি কিছুক্ষণের মধ্যে ডাকবে। সেই ডাক তাঁকে শুনতে হবে। চাঁদের আলোয় আরো মায়াবি লাগছে যমুনাকে; যমুনা নয় অদিতিকে, তার তলপেটে ঢেউ জেগেছে। ঝিমঝিম করছে দারার শরীর। নিমবাগানের অন্ধকারে পাখিটিকে আর দেখা যাচ্ছে না। জ্যোৎস্নার তোড়ে চঞ্চল হয়ে উঠেছে অদিতি—থৈ থৈ ফুলছে যমুনা। মৌনমোহিনী নদীর সামনে দারা যেন আজ সন্ধ্যা-ডুবুরি। নিমবাগান থেকে ভেসে আসছে কান্নার সুর; দারার শরীরে ফেটে পড়েছে সহস্র ডালিম। দূরে, অদিতির ঘরে শঙ্খ বাজছে; তিনি শুনতে পাচ্ছেন সেই ধ্বনি। আত্মমৈথুনের দিনগুলির মতো জ্বলে উঠলেন দারা শিকোহ—

মাহমুদ দ্রুত এসে ধরে ফেলল মূর্ছিত যুবরাজকে। তিনি তখনো অস্পষ্ট স্বরে বলছেন:
তার শিরার ভেতর আমারই ঘ্রাণ
বুনোফুলে ছদ্মবেশে অঘোরে ঘুমাই।