চলাফেরা/ টিয়াআলো, অচেনা চিয়ার্স

ধীমান চক্রবর্তী ও চিত্তরঞ্জন হীরা

গান

বিষাদ এবং অন্ধকার,-
অপেক্ষায় যারা থাকে তারাও
প্রতিদিন রঙ লাগা দেখে
পাপড়িতে, পালকের জিয়ানো আয়নায়।
এই রাতে কয়েকটা ঘুমবড়ি জেগে,
কাঁটাতারে থুৎনি রেখে তারা
গেয়ে ওঠে জলাশয়।
কাল কেউ আসবে,-
একথা জোর দিয়ে আজ আর বলা যায় না।
আহা অর্ধেক চাঁদ,
সড়কের বয়ে আনা ক্যালসিয়াম।–
এরা যদি বাজিমাত করে, তবে
শুয়ে থাকা হাত, মানুষের গাছ,-
অনেকটা মোলায়েম হয়ে ডেকে নেবে
সমুদ্রে উড়ে যাওয়া হরিণের চোখ।

তোমরা আজ প্রশ্বাস কথা বলো,
তাহলেই আলর পাণ্ডুলিপি দুলে দুলে
গাইবে কুয়োতলা, সোহাগী রক্তবাস।


চিত্তরঞ্জন হীরার রুপান্তরে ধীমান চক্রবর্তীর কবিতা
গান/পাখিদের রোববার


বিষাদ রয়েছে এবং অন্ধকারও।অথচ রক্ত লেগে যাচ্ছে পাপড়িতে, যে পালক আয়না জিইয়ে রাখে তার গায়েও। যারা অপেক্ষায় থাকে তারাই দেখতে পায় অন্ধকারের মধ্যে সেই রঙের বর্ণলিপি।

সেই রাতে কয়েকটা ঘুমবড়ি জেগে কাঁটাতারে থুৎনি রেখে সীমান্তের গায় নৈঃশব্দ্যকে দেখছে আর গুনগুন করে গেয়ে উঠছে জলাশয়, জলাশয়...।স্বরপ্লাবনে জলের সরগম।

সেই গান এক অমোঘ সময়, সময়ের অপেক্ষা।কাল কেউ আসবে এটাই প্রত্যা শা।কিন্তু কেউ
যে আসবে, হয়ে উঠবে সহযাত্রী- একথা জোর দিয়ে, আর বলা যায় না।

তবু চাঁদ জেগে আছে। আধখানা চাঁদ। সে যে পথ দিয়ে এসেছে সেই পথই বয়ে এনেছে ক্যালসিয়াম ও আরোগ্যতা।

এসবের মধ্যে সম্ভাবনাগুলো আমাদের জানিয়ে দেয়, এরা যদি বাজীমাত করে তাহলে শুয়ে থাকা হাত আবার উঠে দাঁড়াবে। মানুষের গাছ আবার মোলায়েম করে ডেকে যাদের চোখ হরিণ হয়ে উঠেছিল অথচ উড়ে যাচ্ছে সমুদ্রের দিকে, তাদেরকে।

তোমরা আজ প্রাণ ভরে শ্বাস নাও, নিঃশ্বাসে- প্রশ্বাসে কথা হোক, প্রাণের কথা, তাহলেই দেখবে আলর পান্ডুলিপি দুলে উঠছে , আর দুলে দুলে তোমায় ডাকছে।হাতছানি দিয়ে কুয়োতলা গাইছে, তাল মেলাচ্ছে একটু আদুরে, সোহাগী রক্তবাস। লাল হয়ে উঠেছে রাতের দিগন্ত ও জলের বিহুতান।
============================================================ =

পরিবর্তন


মাথা থেকে নেমে এল ভাঙা সেতু।
মৃত্যুর কাছে
নিরাপত্তা চাইতে চাইতে
কে যেন তার দীর্ঘছায়া উপুড় করে দিল
বেজে না ওঠা বেহালায়।
শিশুরা এখন টিভি সিরিয়ালের-
পাশে বসে অঙ্ক কষছে।
শরীরে কিছু জল ছিটিয়ে
শুনশুন গান আস্তানা নিল হেমন্তে।

এই ত প্রথম জীবন,
হয়তো সেশ জীবনও। জানিনা।

পুরনো বাড়ির পাশে
কিছু ধারণা এবং অপেক্ষা
পাল্টে দিল সবুজ শস্যের জীবন।
তুমি কি তা জানো
ওগো গ্রাম জীবনের শঙ্খচূড়?

আর আজকাল রাস্তায়
আমি না দেখার ভান করে
এড়িয়ে যাই রবিবার,
দু’চারটে জানলা খোলা সন্ধ্যা।


পরিবর্তন/ জেব্রা পারাপার থেকে
চিত্তরঞ্জন হীরা


মাথা থেকে নেমে এলো পারাপারের দীর্ঘ শূন্যতা, একটা ভাঙা সেতু। মৃত্যুর কাছে নিরাপত্তা চাওয়া, আর চাইতে চাইতে অপেক্ষা বোনা। কে যেন এই চাওয়ার মধ্যেই বেজে না ওঠা বেহালায় উপুড় করে দিল সাঁকোটির দীর্ঘছায়া।

আমাদের পারাপার সময়ের এই ভাঙা সাঁকো দিয়েই।শিশুরা শিখে নিচ্ছে টিভি সিরিয়ালের পাশে বসেই অঙ্ক কষা। কোনোকিছুই লেগে থাকবেনা, কিছুটা জল ছিটিয়ে নিলেই শুদ্ধ হয়ে হয়ে যায়
শরীর, তারপর গুনগুন করে আশ্রয় নেয়, হেমন্তের কিছুটা নিরাপদে। কিছু ঝরে পড়ার কাছে।

এই হল ব্যক্তিজীবনের প্রথম ধাপ। দ্বিতীয়, তৃতীয় বা অদ্য কোন জীবন হয়ত সকলের আসেনা, ফলে প্রথম জীবনই শেষ জীবন হয়ে উঠতে পারে। জানিনা শেষ পর্যন্ত কোথায় থামব! শেষ কোথায় ?

কিছু ধারণা আর অপেক্ষাই হয়তো হয়তো পুরনোর পাশে আমাদের নতুন করে তুলতে পারে, পাল্টে দেওয়া কিছুটা সবুজ, কিছুটা সবুজ শস্যের জীবন। জীবনের মধ্যের জীবন।

জীবনের নানা পরত থেকে উঁকি দেয় একটা গ্রামজীবনও। যে পেচিয়ে পেচিয়ে উঠছে শঙ্খচূড়ের মত। তাকেও করতে ইচ্ছা হয় মনে মনে- তুমি কি এই জীবনের পরত গুলো খুলতে পার কখনও!

জীবন পেরিয়ে যাচ্ছে মাথা থেকে নেমে আসা সেই ভাঙা সেতুর অপর পা রেখেই। আর ভেতরে ভেতরে আরও অনেক কিছু দেখা-নাদেখার পথ চলে যায় অনেক কিছুকে এড়িয়ে। এড়িয়ে যায় ছুটিকেও। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলো আরও এড়িয়ে যেতে চায় সেইসব সন্ধ্যাকে, যারা মনের জানলা খুলে রাখে।

============================================================ =
চলাফেরা

স্মৃতি কত কিছু চায়।
যা কখনো ঘটবেনা সেরকম গল্পও।
হয়তো চায় সন্ত্রাস এবং চৈতন্য।
মাঘের বিনয় লাগা আলো,
কিছুদিন হল বদলে গেছে
আলজিভ বিন্যাসে। মানুষের
কিছু অভ্যাস কখনও বদলায় না-
একথা বলবে বলে
পাড়ার সমস্ত গাছ আজ শর্মিলা।
দূরে অন্ধ জিভ অ বুড়ো আঙুল
ধীরে ধীরে চু-কিত-কিত খেলছে
উড়ন্ত মাকড়সার সঙ্গে।
তেপান্তর পেড়িয়ে জতবার দুর্ঘটনায় আহত
পৃথিবীকে দেখতে যাই,
পোড়া হাত গুনগুন করে ওঠে-
প্রেজেন্ট প্লিজ বলে।

মধ্যরাতে এক-আধদিন তেষ্টা পেলে
উঠে দেখি, - অকারণে
জ্বলছে নিভছে আয়নার চোখ।
টিয়াপাখির পাঁচ-সাতজন পালক।

চলাফেরা/ টিয়াআলো, অচেনা চিয়ার্স
চিত্তরঞ্জন হীরা


স্মৃতির মধ্যে নানারকম প্রত্যাশা, তাকে জাগিয়ে রাখে। যেমন যা কখনও ঘটবেনা তেমন গল্পও। কখনও সন্ত্রাস চায় আবার চেতনা। কখনও একসঙ্গে এই সবকিছু তাকে আরও আলোড়নের দৈর্ঘ্যতা দেয়।

মাঘের যে আলো তার গায়ে বিনয় লেগে থাকে। কিন্তু ইদানিং দেখা যাচ্ছে তার বিন্যাসের বদল ঘটেছে, আলজিভ থেকেই। কিন্তু মানুষের কিছু অভ্যাস কখনও বদল হয়না- এই কথাটা বলবে বলে পাড়ার সমস্ত গাছ এক চেনা নারী হয়ে ওঠে, যার নাম শর্মিলা। দূরে, উরন্ত মাকড়সার সাথে চু-কিত-কিত খেলছে জিভ এবং বুড়ো আঙুল।

আমার পেড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে তেপান্তর আছে, পৃথিবী আহত হচ্ছে।তেপান্তর পেড়িয়ে দুর্ঘটনায় আহত সেই পৃথিবীকে জতবার দেখতে পাওয়ার কথা ভাবি – হাত গুনগুন করে ওঠে আর বলে- আমিও আছি, আমিও আছি, প্রেজেন্ট প্লিজ।

কখনও কখন মাঝরাতে তেষ্টা পায়। উঠে দেখি আয়নার চোখ আমায় দেখছে, সে জ্বলছে, নিভছে, অথচ কোনও কারণ নেই। টিয়ার পাচ-সাতটি পালকও রয়েছে আপন অস্তিত্ব নিয়ে, সত্তা নিয়ে।
============================================================ =
কর্ম

কাউকে বিশ্বাস করলে,
একটা গাছ পুঁততে ইচ্ছা করে।
সাদা পোস্ট কার্ডে।
বেতের ঝুড়িতে অন্ধকার হয়ে এলো।
কাচের পোশাক পরা একঝাঁক পাখি।
শেষ রাস্তায়।
তিনতাস খেলে আর অটোগ্রাফ দেয় নাটমন্দিরকে।
কিছুই শেষ হয়না।
কুড়িয়ে নিই চোখের ভাঙা টুকরোগুলো।
স্নানঘরের সমস্ত কল
আপনা থেকে খুলে যায় রাত্রিবেলা।
সেই জল। -
আগুন জ্বালিয়ে নেয়,
ড্রেসিং টেবলের আধপোড়া মুখ।


কর্ম/ অপ্রকাশিত
চিত্তরঞ্জন হীরা


সাদা পোস্টকার্ডে তখনই গাছ বস্তু হয়ে ওঠে যখন কারও প্রতি বিশ্বাস গাঢ় হয়। বেতের ঝুড়িতে একটা পৃথিবী অন্ধকার হয়ে এলো। একঝাক পাখিদের দেখছি কাঁচের পোশাক পরা।শেষ রাস্তায় এসে ছবিগুলো মিলে যাচ্ছে একে একে অন্যের সাথে।ওরাই কি নাটমন্দিরে এসে তিনতাস খেলে আর অটোগ্রাফ দেয়। দিচ্ছে নাট্মন্দিরকেই।

কিছুই শেষ হওয়ার নয়।চোখ ভাঙছে আর ভাগ টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিই। রাত বাড়ে, স্নানঘরের সমস্ত কল আপনা আপনি খুলে যায়, সেই জলে ড্রেসিং টেবিলের আধপোড়া মুখ আগুন জ্বালিয়ে নেয়।

============================================================ =
দূর বহুদূর

ছুরি বেয়ে উথে আসা সেমিকোলন।
মুন্নি চিঠির বিকেলে।
বিশ্বাস শেষ হল।–
এই শব্দটার শুরু খুঁজছে, যার
বাবার নাম খগেন।
ছুট ছুট মানুষজন।
কিছুই না দেখার ভঙ্গিমায়।
সেলাই দেওয়া মাস পয়লা ভোর।–
যখন সায়ার দড়ি দাঁতে চেপে হেঁটে আসে,
তাকে তার মা’র মতো দেখায়।
বনবাস চুপ করে থাকে।
রোদ দুরত্ত।
নিজের জীবনের খোল-নলচে, টুকরো।
এখনও কুড়িয়ে তুলতে পারলে না পুরোপুরি। -
একথা বলে
ভুশুন্ডির মাঠ হেলমেট মাথায় উড়ে যায়।



দূর বহুদুর/অপ্রকাশিত
চিত্তরঞ্জন হীরা




চিঠির বিকেল মুন্নি করে তোলে।, ঠিক তখনই ছুরি বেয়ে উঠে আসে সেমিকোলন গুলো। তুমি বিশ্বাস করো আর নাই করো এটা আমার বিশ্বাস। এর শেষ এবং শুরুর মধ্যে অনেক চেনা সর্বনাম আছে, তার বাবার নাম খগেন হতে পারে, সে যেই হোক কিছুই না দেখার ভঙ্গিমায় সবাই ছুটছে।

মাস প্রথমের সকালটা সেলাই দেওয়া। ছেরাফাটা দিনের শুরু থেকেই একেকটা দিন, একেকটা মাস ফুরিয়ে যায়, চেনা দৃশ্যগুলো কখনও ফুরোয়না। সেই চেনা ভোর যখন সায়ার দড়ি দাঁতে চেপে হেঁটে আসে তাকে তার মার মতো দেখায়। প্রতিটি রেখার মধ্যে একধরনের বনবাস লুকিয়ে আছে, আবার রোদ্দুরও। বাকিটা দূর বহুদূর...।

খলনলচে ভেঙে টুকরো করতে করতেও এই জিবঙ্কে এখনও পুরোপুরি কুড়িয়ে তলা গেলো না। একথা জিজ্ঞেস করে ভুশুন্ডির মাঠ। তার প্রশ্নের মধ্যেই উত্তর পরে থাকে, আর সে উড়ে যায় হেলমেট মাথায় জড়িয়ে বহুদূরের দিকে।



=========================================