যুদ্ধ ও সূর্যাস্তের ধর্ম

প্রান্ত পলাশ ও ফজলুল কবিরী

রুমু, এসো ছাদে উঠি

আমরা দুজন হাঁটি, পথে পথে দেখি রান্নাবাটি। ফুটপাত থেকে পঁয়ত্রিশ টাকা দিয়ে দুটি আংটি কিনি। চা খাই, বলি কম চিনি। আমরা আবার হাঁটি, একে অন্যকে আংটি পরাই। কারুর কপালে চুল নেমে এলে আঙুলে সরাই। আমাদের কোনো ধর্ম নাই। হাসতে হাসতে দুজনেই বলি হায় খোদা, দুজনেই হায় ভগবান। তবু লোকে ভিনধর্মী বলে, বলে প্রেম কাফেরসমান। আমাদের কোনো দেশ নাই, একফালি ভূখণ্ডে নিবাস। সেখানে রাখি পা, মাথা তুলি, সুনীল আকাশ। আমরা আবার হাঁটি, পথশিশু দিয়ে যায় ফুল। মালাও বদল করি। আমরাও করি কত ভুল। আমরা বিবাহ করি মনে মনে, হেসে হেসে দিয়ে দিই তালাক। আমরা নিকটে এলে লোকে বলে নাপাক নাপাক!


‘ঘুমোবার আগে তোমাকে এত সেক্সি লাগছে কেন?
রাতের বিনুনিছেঁড়া এখনও বালিশে
কেমন ধোঁয়ার গন্ধ, ঠোঁট পুড়েছিল?’

চুলোয় গরম জল তখনও ফুটছে, কখন নামাবে?
—এই বলে ছাদে উঠি। ভাড়া বাসা। মাহির বয়স দুই
এ বয়সে কত কথা বলে! আমরাও বলি
তোমার পাপাই কত রাতে ফেরে?

সেদ্ধ ফুলকপি, চিলি সস, আমাদের রাতের খাবার

‘ঘুমোবার আগে তোমাকে এত ন্যাস্টি লাগছে কেন?
রাতের ঝগড়াঝাটি এখনও বালিশে
চোখের জলের গন্ধ, মন পুড়েছিল?’

বাথরুমে ট্যাপ খোলা, জলশব্দ শীতল করুণ
—এই বলে ছাদে উঠি। ভাড়া বাসা। মাহির নতুন বোন
সারারাত কান্নাকাটি করে। আমরাও করি
তোমার মামণি ঠিক কত রাতে শোয়?

আমাদের বেবি নেই। বাবা ডাক নয়া উৎপাত?
আমাদের বেবি নেই। মা ডাকলে ক্যারিয়ার লস?

চুপ করে ছাদে উঠি। ঘোলাটে আকাশ দেখি
দেখি, আতর ছিটিয়ে তারা যায় গোরস্তানে, সূরাধ্বনি কানে
ঘন ঘন উইকেট পড়ে কেন, শব দেখে বলে ওঠে পাড়ার ছেলেরা
দূরে চাঁদ, কেউ কেউ এঁটে দেয় জানালার গ্লাস

ছাদ থেকে নামি, মনে মনে বলি সাবাশ সাবাশ...


বালিশ নরম, কানে তবু ব্যথা দিচ্ছে শিমুলের বিচি

হ্যাঙারে ঝুলছে জামা, তেলাপোকা সামান্য কেটেছে
পেন্সিল কাটার মতো ঘুরিয়ে দেখছি—দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে
অ্যাশট্রের ছাই, রোদস্পর্শহীন হাফপ্যান্ট—বকুল স্প্রে দিয়ে
এসব ঢাকছি। দরজা খুললেই চিৎকার—‌‘কী হবে মানুষ ক’রে
ছেলেপুলে, ধর্ম নেই, চক্ষু নেই, উচ্ছন্নে গিয়েছে’।
আমার দু’ঠোঁট শুভবুদ্ধিজাত, এঁটে দিচ্ছি ছিটকিনি বৃথা শব্দহীন।

অনাদরে বেড়ে ওঠা চুল ভালই পেকেছে। ‘সরকারি পরিচয়পত্রের মতোই
যাচ্ছেতাই হয়েছে চেহারা’, রুমুর বন্ধুরা ব’লে টিএসসি পেরুচ্ছে।
কেন এই গ্রন্থসম্পাদনা, কেন এই অন্তঃস্থিত ভুল?
বইপোকা মগজ কাটছে। আলোপোকার উড়ন্ত নাচ শিকারি ডাকছে।
—আমিও ছুটছি, হরিপদ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার ফেলে বেকারির পাউরুটি

ছাদে দুই দেবশিশু একাগ্রে খেলছে, শখে রাখা ডাকনাম দিতি ও অদিতি




বহু দূরে বৃষ্টি হচ্ছে, সেই ধ্বনি কানে এলো মালিবাগ মোড়ে
ভিজে যাচ্ছে লাল ইট, সরু রাস্তা; ঝাউপাতা সামান্য দুলছে
মুরগির হাড় চেটে খাচ্ছে রুগ্ন বাঘ দুপুরের খিদেলাগা ঘোরে
ডুলাহাজরা পেরিয়ে, এ দৃশ্য থেকেও দূরে সমুদ্র ফুলছে

মন বলছে খরুলিয়া খুব দূরে নয়

কী আছে তোমার বুকে? প্রশ্নে চোখে ভাসে শীতের জ্যাকেট
মৌচাকে কে ছোড়ে ঢিল, মিশে থাকা ভালো মানুষের ঝাঁকে?
বিলবোর্ডে রেডি ফ্ল্যাট, যাত্রাবিরতির পিল রোজেন আঠাশ
তেজগাঁও লাভ রোড, হেঁটে যেতে কখন যে ভুলে গেছি তাকে!

ট্রেন বলছে খরুলিয়া খুব কাছে নয়





করলডেঙার ফুল, বুকের কোথায় তুমি লুকিয়ে রয়েছ?

বহদ্দারহাট টার্মিনাল থেকে ছুটে যাচ্ছে ভাঙাচোরা বাস।
আমরা দুজন হেসে জানালার কাচ ভেঙে সোনালু দেখছি
মোহরার মোড়ে। বরইবিক্রেতা ছোট, পরনে স্কুলের শার্ট,
সেও জানে, ভুল পায়ে জুতো পরে কীভাবে কুড়োতে হয়
মানুষের হাসি। তোমারও কামিজ শাদা, ভেতরটা আরও
গাঢ় না কি, এইসব ভেবে মুখে তুলে নিয়েছি বরই। আর
হাতের বেষ্টনী ছিঁড়ে বলো তুমি, ‘কতদূর মুনির পাহাড়?’

ছাদে, টবের গোলাপে পৌষ, রেলব্রিজে নিভে যাচ্ছে দ্যুতি

ফের যাত্রা শুরু, অস্পষ্ট কালুরঘাট ব্রিজ। রুমু, হাত ধরো,
দেখো, প্রতিশ্রুত মেঘ দূরে সরে যায়—পোকার আস্তানা
ছেড়ে ফুলের শাবক লাফ দেয় পরিত্যক্ত জলে। ছাদ থেকে
সব দেখি—পাহাড় পেরিয়ে ঋষিকচ্ছপের আয়ু নিয়ে ছুটে
আসে সেই ফুলদানা—ভাবি—একদিন পাখি খাবে খুঁটে!





তোমার না-থাকা দিনে ছাদে ঝোলে নীলাভ কামিজ
সেখানে জড়িয়ে আছে ছোট ছোট শাদা বৃত্ত, ফুল
মাথার চুলের ফাঁকে উঁকি দিয়ে বলছে হাসিতে
‘মনে পড়ে ম্যাচ করা ওড়নার রং, অন্তর্বাস?’

অন্তরে লুকোনো যে রং সে এক শান্ত রাজহাঁস

ধাতব পাখির মতো ঠোঁট খুলি, রেকর্ডের গান
গাই, ‘একদিন ভুলে ডেকেছিলে’... জ্বলন্ত সূর্যের
টিপ কপালে না, লেগে আছে ধূসর দেয়ালে—রুমু
ইচ্ছে করে লাফ দিই, মুখ গুঁজে পড়ে থাকি জলে
রাস্তায় ছুটছে বাস, অ্যাম্বুলেন্স আরও দ্রুত চলে

টবের ভেতর শুনি শেকড়ের মিহি আর্তনাদ
নিজেই লড়াই করে চোখ মেলে দেখে খর্বকায়া
সব চিহ্ন মুছে ফেলে ঢুকে যাব ভ্রমের বাজারে—
এই ভাবি, কুয়াশায় ভিজে যায় আমাদের ছাদ।

*******************
একদিন এক তাৎপর্যময় দুপুরে আমরা ফাঁকা রাস্তা ধরে হাঁটার কথা ভেবেছিলাম। আমি ও ছায়া। আমার ইচ্ছার কথা প্রথমে তাকে জানাই। বলি যে তার দু-হাত মুঠোয় নিয়ে কোনো এক বিষণ্ণ দুপুরে আমি পাকা রাস্তায় হাঁটব। সেদিন আমার মনে সুখ ভর্তি থাকবে। পায়ে হাঁটার প্রবল জোর থাকবে। আর আমরা হাঁটতে হাঁটতে একে অন্যের গায়ে ঢলে পড়ব। দুপুরের পড়ন্ত রোদের তেজে পথচলতি মানুষগুলোর ঘুম-ঘুম চোখে ক্লান্তির চিহ্ন দেখেও আমাদের ঢলে পড়া থামবে না। আর এসব উপেক্ষা করেও যারা এখনো আমাদের দেখবে, তাদের ঈষৎ বাঁকানো দৃষ্টির উত্তাপ আমাদের গায়ে ধাক্কা মারবে। আমরা হেসে উঠে বলব, এত গরম! আমরা পুড়তে পুড়তে হাঁটব। হাঁটতে হাঁটতে হাসব।
এসব যখন ভাবি আর একে অন্যের গায়ে ঢলে পড়তে পড়তে হাঁটি তখন পুড়ে যাওয়া টায়ার থেকে বের হওয়া ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখে আমরা খানিকটা থমকে দাঁড়াই। দুপুরের এমন ফাঁকা রাস্তা খুব সহজসাধ্য ছিল না জেনেও আমরা এমন একটি দিনের জন্যই অপেক্ষা করেছিলাম। তবু আমাদের তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে যে আজ হরতাল। আমাদের মনে পড়ে যায় অনেক অনেক বছর আগের যুদ্ধের নৃশংসতার কথা। হয়তো এই রাস্তা তখনো পিচঢালা হয়নি। এমনকি হাঁটার মতো এত প্রশস্তও হয়নি। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তের ধারায় ডুবে গিয়েছিল সেদিনকার এই অপ্রশস্ত রাস্তাটি। সেই যে রক্তস্নান, সেই থেকে আর কোনোদিন এই রাস্তায় ঘাস জন্মায়নি। আমাদের সারা শরীর শিউরে ওঠে। এমন একটা ঘাসহীন, দূর্বাহীন রাস্তার কথা ভেবে আমরা আর্দ্র হয়ে ওঠি।
যুদ্ধাপরাধীর বিচারের এমন উত্তপ্ত দিনে আমরা ইতিহাসের চরিত্র হয়ে উঠতে পেরে আনন্দিত হই। ছায়াকে বলি, আহ কী শান্তি ! আমার ছায়া অস্বস্তি নিয়ে জানতে চায়, ক্যান ? শান্তি কি গাছে ধরে ?’ আমি তাকে শুধরে দিই, গাছেই তো ধরে। এখন মৌসুম। সবকটা এবার কাটা পড়বে। জানোয়ারের বাচ্চারা।’ প্রতিদিন কত তর্ক জমা হচ্ছে। ঘরে। বাইরে। কোনো কোনো দিন শ্রান্তি নিয়ে একে অন্যকে ছুঁড়ে ফেলতে পারলে উল্লাসে ফেটে পড়ি। তারপর মুখ ভার করে পুনরায় মিলিত হই। ছায়াকে বোঝাই। ছায়া আমাকে বোঝায়। কেন করি জেতার ভান? কোনো কোনো নির্মল অবসরে ছায়াকে প্রশ্ন করি, ‘আচ্ছা আমরা নিজেদের মধ্যে এত ঝগড়া করি কেন ?’ ছায়া শান্ত স্বরে উত্তর দেয়, ‘পুরুষের ধর্মই তাই। পুরুষমাত্রই নিপীড়নকারী।’ আমার মন আবার খারাপ হয়। মাথা গরম হয়। আমি প্রত্যুত্তর দিইে তৎপর হই, ‘এই হলো ঝগড়ার উৎস। খোঁচাখুঁচি আর রক্তপাত ছাড়া তোমরা থাকতে পারো না।’
ছায়া তবু নিরুত্তর থাকে। আমার মেজাজ আরো চড়া হয়, ‘তোমরা এমনই। নিগ্রহ পছন্দ করো। কাউকে বুক পেতে গ্রহণ করতে পার না ।’
আমি শান্ত হওয়ার চেষ্টা করি। পাশে একটা আধাপোড়া টেম্পু পড়ে আছে। আমি ছায়ার হাতটা ধরার চেষ্টা করি। ছায়া বাঁধা দেয় না। খুব নরম আর তুলতুলে হাত দুটো। মাহীর হাতের মতো। মাহী আমাদের ফ্লাটের বাড়িওয়ালার শিশু-সন্তান। তিন বছরের শিশু। আমরা সাবলেট থাকি। ঢাকা শহরে গরিব বাড়িওয়ালার সাথে সাবলেট থাকা কম ঝক্কির বিষয় নয়। ধর্মে বিরোধ, আচারে বিরোধ। চলনে-বলনে বিরোধ। তবু থাকতে হয়। অনেক কিছু গোপন করে। মুখে দাঁড়ি মেখে। বুকে ওড়না পেঁচিয়ে। সঙ্গমের সময় মুখে হাত চাপা দিয়ে। দিন কেটে যাচ্ছে। কেউ ফালা ফালা করে কেটে ফেলছে সময়গুলো। নিয়তিতে আমার বিশ্বাস নেই। মাহী মাঝেমধ্যে আমাকে বাপ বলে ব্রিবত করে। বিষয়টা কেউ তাকে শিখিয়ে দেয় নি। তারপরও কীভাবে এটা হয়ে গেলো মাথায় আসে না। পিচ্চিটাকে বলি, ‘বাবা নয়। আংকেল ডাকো বাবুসোনা !’ মাহী বোঝে না। বাবা ডাকে তারপরও। আমি লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠি। ছায়া আমাকে দেখে হাসি গোপন করে। বাড়িওয়ালার বউটি বিষয়টা চেপে যায়। এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আমি দ্রুত ছাদে উঠে নিস্তার খুঁজি। মগজে সবসময় পোকা কিলবিল করে। কাঁধ বেয়ে নামা চুলে বাতাস ভর করে। খারাপ সময়কে এড়িয়ে যেতে চাই। কখনো কখনো সুন্দর মুহূর্তগুলো আমাদের প্রশ্রয় দেয়। সেই প্রশ্রয়ে আমরা আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করি। ঢাকা শহর নিষ্ঠুরভাবে সবকিছু কেড়ে নেয়। টান মারে বুকের পাঁজর ধরে। আমি ছুটি। এদিক-ওদিক। শরীরে শ্রান্তি নিয়ে দৌড়ায়। গলির মুখের দোকান থেকে বিড়ি নিই। ফুঁকতে ফুঁকতে হাঁটি। ছায়াকে বোঝানোর চেষ্টা করি, ‘সবকিছু দিনে দিনে গুছানো যায় না। সময় লাগে। অভিজিৎদা নেই। আরো অনেকেই থাকবে না। তবু টিকে থাকতে হবে।’ ছায়া ঝামটা মারে, ‘বর্বরদের আবাসভূমি এটা। কেউ ধর্মে। কেউ অর্থে। কেউ মুখে। কেউ মগজে। সবকিছু পুরুষতন্ত্রের নকশামাফিক হবে। মৌলবাদও পুরুষতন্ত্রের আঁতুড়ঘরে জন্মায়। কেউ দাঁড়াতে পারবে না। যারা লড়বে তারা মরবে। চাপাতির কোপে নির্ধারিত হবে নিয়তি।’
আমি প্রতিবাদ করি না। ছায়ার সাথে কথা বাড়াতে ইচ্ছে করে না। পকেটে টানাটানি। চাকরি-বাকরি নেই। কোথাও মন বসানো যাচ্ছে না। বাড়ির কথা খুব মনে পড়ে। বাড়ি যাওয়া হয় না অনেকদিন। বাবার চাকরি আর খুব বেশিদিন নেই। কলোনির জীবনটা কাছে ডাকে। কলোনির মানুষগুলোকে এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না আগের মতো। শৈশবের স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে কলোনি থেকে। মাটিতে মিশে যাচ্ছে স্মৃতির লাগাম। দূরে কোথাও ঘুরে আসতে পারলে শান্তি পাওয়া যেত। মনে পড়ছে করলডেঙার স্মৃতি। বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল কি অনেক দূরের পথ ? ঢাকার কোনে বাস কাউন্টার থেকে রাতের বাসে উঠে গেলে কেমন হয় ? চট্টগ্রাম গিয়ে কর্ণফুলী পার হয়ে কোথাও হারিয়ে গেলেও মন্দ হয় না। রাতের বেলা তারা গুনতে গুনতে কোথাও আড়াল হয়ে গেলে কেউ কি খুঁজবে ?
ছায়ার সাথে সম্পর্কটা এখনো রহস্যঘেরা। ছাই-চাপা প্রেম আর ভালবাসা প্রতিদিন একটু একটু করে ছাইফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। শরীরের কিংবা হৃদয়ের উত্তেজনা যখন তুঙ্গে ওঠে তখন একের সাথে অপরের বোঝাপড়ার দারুণ সূত্রগুলো হঠাৎ হঠাৎ আবিষ্কার হয়। কখনো কখনো সামলানো যায় না।
ছায়াকে কথাটা বলি, ‘চলো বাসে উঠে পড়ি। আজকের দিনটা উদযাপন করি রাস্তায় !’ ছায়া ধমক দেয়, ‘কেন? সাহস দেখাতে চাও ? উইকেট এখনো পড়ে নাই। অনেককিছু বাকি আছে।’ আমি প্রতিবাদ করি,‘সংশয়ের আর কোনো কারণ নেই। রাতেই রায় কার্যকর হবে।’
সারা শহরে পেট্রোলবোমা আর পোড়া টায়ারের ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন এখন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দূরপাল্লার গাড়ি সেই অর্থে চলেই না। অনিশ্চয়তায় ভরা সাধারণ মানুষের জীবন। এতকিছুর পরও দিনের পর দিন মানুষ ধর্মান্ধ যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে কথা বলে যাচ্ছে। আমি মাঝেমধ্যে ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। এদেশের মানুষ এখনো মুক্তির পথ খুঁজতে মরিয়া হয়ে আছে। দাদা নাকি ছোটবেলায় বাবাকে বলত, ‘এসব পশুর চামড়া দিয়ে এদেশের মানুষ একদিন জুতা সেলাই করবে।’
ছায়া আামার কথার পিঠে ক্ষোভ ঝাড়ে, ‘দেখবো এরপর আর কী কী হয়। এতে কী এমন হবে ? দেশোদ্ধার হয়ে যাবে ? সবকিছু পাল্টে যাবে ? কই নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পার?’
মানুষের নিরাপত্তা বিষয়ক ধারণাকে আমি আগ্রাহ্য করতেই ভালবাসি। শঙ্কা একজন নির্ভীক মানুষকেও আর দশটা এভারেজ মানুষের মতো তাৎপর্যহীন মানুষে পরিণত করতে পারে। কিন্তু এরপরও এদেশকে মুক্ত করার শপথ নিয়েছিল নিরক্ষর চাষাভুষারা। একটা সময় যেটা অসম্ভব মনে হয় কিছু অকুতোভয় যোদ্ধার হাত ধরে সেটা সম্ভবপর হয়ে ওঠে। অগম্য পথ নতুন আলোর দিশা নিয়ে মানুষকে পথ দেখাতে শুরু করে।
আমি ছায়াকে অভয় দিই, ‘সময়টাকে উপভোগ করতে তো দোষ নেই। রাতের বাসে টিকিট পাওয়া যায় কি না একবার ট্রাই করে দেখতে পারি।’ ছায়া আর কথা বাড়াতে চায় না বুঝতে পারি। তবু বলি, ‘কাগজপত্রগুলো রেডি করে ফেলি এই ফাঁকে। ভয়কে তো জয় করতে হবে।’ ছায়া উত্তর দেয় না। কীসের কাগজ রেডি করতে চাই তাও জিজ্ঞেস করে না। মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি একটা তাচ্ছিল্যের হাসি তার ঠোঁটের কোণে জমা হয়ে পুনরায় মিলিয়ে গেল।
একদিন তুমুল আবেগেঘণ মুহূর্তে আমি কথা দিয়েছিলাম যে আমাদের সম্পর্কের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারিত হবে এমন একটা বিশেষ দিনে, যেদিন আমরা ধর্মের সামাজিক দেয়ালকে টপকাতে পারব। কিন্তু আর দশটা মানুষের মতো জীবন বেছে নেব। পড়ন্ত দুপুরের আলোয় পরস্পরের মুখ একবার প্রাণভরে দেখে বাকি দিনগুলো একসাথে কাটানোর শপথ নিতে পারব।
তারপর সমস্ত দিনের আনন্দ ভাগাভাগি করে সূর্যাস্তের ঠিক সন্ধিক্ষণে আমরা সূর্যের দিকে মুখ করে পরস্পরকে জীবনসঙ্গী বানাব। একে অন্যের হাতে আংটি পরিয়ে লাজুক মুখে মালা বদল করব। তারপর উচ্চহাস্যে বলব, ‘জয় বাংলা।’
কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে দুপুরের পড়ন্ত আলোয় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছায়া আচমকা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। আমি তখন পোড়া টায়ার থেকে বের হওয়া ধোঁয়ার কুণ্ডলী থেকে চোখ সরিয়ে ছায়ার মুখের দিকে তাকাই। দেখি তার মুখ ভয়ে ও শঙ্কায় মরা মাছের মতো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। এতক্ষণ ধরে চেপে রাখা কান্নাকে কোনোভাবে সে আর থামাতে পারছে না। নিজেদের ব্যক্তিগত টানাপোড়েন ও বোঝাপড়ার সীমাবদ্ধতা এতটা অসহায় করেনি আমাদেরকে যে এভাবে সে ভেঙে পড়বে।
ছায়া গোঙানি না থামিয়েই বলে যে সে আর এদেশে থাকবে না। এই শ্বাপদের অভয়ারণ্যে তাদের মুখের খাবার হতে পারবে না। গতরাত থেকে ভর করা অচেনা অস্বস্তিটা বুকে পুনরায় ঘাই মারে। আমার মনে পড়লো গতরাতে অপরিচিত নাম্বার থেকে আসা শরীর ঠান্ডা করে ফেলা মেসেজটির কথা। সারারাত দুজনের কারো চোখেই দু-ফোঁটা ঘুম আসেনি। অচেনা শ্বাপদের বার্তাটা ছিল এরকম, ‘লিস্ট ছোট হয়ে আসছে। জাহান্নাম খুব বেশি দূরে নয়। প্রস্তুত হও জয় বাংলার বাচ্চা।’
ছায়ার মাথায় হাত রাখি। চুলে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিই। আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি যে এই যুদ্ধে তারপরও আমরা জিতব এবং সেদিনও ঠিক এমনই এক তাৎপর্যময় দুপুরের মতো ফাঁকা রাস্তায় পরস্পরের হাত ধরে হেঁটে বেড়াব। একে অন্যের গায়ে লুটিয়ে পড়ব।
সূর্যাস্ত আমাদের জন্য ঠায় দঁড়িয়ে থাকবে—পশ্চিমের মেঘে খানিকটা হেলান দিয়ে।