গভীর বৃষ্টিবিন্দুগুলি

তপতী বাগচী ও অমিতাভ মৈত্র

বসন্ত তুমি এসেছ আবার …


ঠান্ডা শীতল আলোর মহিমায় তোমাকে দেখা…ও তুমি ! অজানা উৎস থেকে আসছ… আমার আত্মার আয়তনে…শূন্যতার মত এক নগ্নবিষয়ে আমি তোমাকে রেখে দিলাম…যতো দেখা…রহস্যময়…দরজা খুলে যাবে আরো…


আমি তোমার কাছে দাঁড়াই আমার আড়ষ্টতা নিয়ে…রং কেড়ে নেয়া আলোর ধূসরতায় …স্বপ্নের মত অবিন্যস্ত প্রস্তুতিহীন…আমার নিজস্ব কথা উধাও হয়ে যায়…মুখ ও মুর্ততা ক্ষমাপ্রাপ্ত দন্ডিতের মত দরজার একপাশে…আমি শুধুমাত্র একটি বস্তুপিন্ড…আর বস্তুর জন্য আত্মা তৈরী করছ তুমি…



শূন্যতার বীজত্বক ছিঁড়ে…কথা ফুটছে পাথরের …রং…গড়িয়ে…নেমে… ছুঁয়ে দিচ্ছে কাগজ ক্যানভাস…শূন্যকে এফোঁড় ওফোঁড়, নিজস্ব সংলাপে বুঁদ হাওয়া খেলে বেড়াচ্ছে শব্দ-সুড়ঙ্গে…মুক্তি ঘটছে দন্ডিত আত্মার…শুধু বসন্ত… হে বসন্ত… তুমি আবার ফিরে এসেছ বলে…স্নাত হচ্ছি …পুণ্য হচ্ছি আমি…


যতটা চেয়েছিলাম কাল…আজ তার থেকে অনেক আগ্রাসী আমি…আগামীদিনের চাওয়ার থেকে যদিও তা বড্ড কম…আর এই সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ভালবাসার দিনে আমি তোমাকে চেয়েছি রক্তমাংস থেকে অনেক এগিয়ে…


জল…জল থেকে উঠে আসছি আমি…হাত ছোঁয়ালে আমি সময়ের ঢেউ…রামধনু আলপনা ভেঙে ভেঙে যাই …আর অবাক তুমি অটুট…সম্পূর্ণ থেকে যাও…অতিরিক্ত তো এটুকুই শুধু…!তবু তুমি ছুঁতে পারছনা…পারছনা আজো…আজো পারলেনা নিজের কাছে যেতে…যত তুমি গড়িয়ে নামছ টানা নিজের ভেতর … অতৃপ্ত… পরিত্রাণহীন…

…যাহা বলিতে চাই বৈধ শুধু নিজের কাছেই…শুধু নিজেই বিষয়…বাইরের দিকে মেলে ধরে রাখা নগ্নতা কেটেকুটে ধুয়ে …মঞ্জুর হয়েছে রান্না…শেষ পর্যন্ত সে নিজেও আর তার নেই…থাকেনা……হয়ে ওঠে অন্য…তৈরী করা অন্য কোনোকিছু…। চারদিকে ঝলমলে প্রতিবিম্বের মাঝে প্রতিমুহূর্তে নিজেকে খোঁজা…প্রতি মুহূর্তে ভয় নিজেকে হারিয়ে যাবার…প্রতিমূহূর্তে আলো ছায়া বেধ এর ভেতর সম্পর্ক গুঁজে দেয়া… দূর এবং নৈকট্যের ভেতর ছিন্ন করা অস্পর্শ ব্যবধান…


সমস্ত অলংকার খুলে হনন এসেছে…ঝিনুকের ডানা ভেঙে বের করে এনেছে অসহ্য মুক্তার দানা…চোয়ালের হাড় নীল হয়ে উঠেছিল…ডান কন্ঠার হাড় …বাঁ দিকের পাঁজর… মড়মড় করে উঠেছিল আনন্দশিহরে…প্রেরণার মত একটা টাটকা রক্তে ভরা হৃদয় হাতের সমস্ত আলো ঢেলে দিয়েছে স্পর্শযোগ্য পায়ে…মাখিয়ে দিয়েছে বৃষ্টি…বলছে …উদযাপন হোক…আজ শোক হোক…হা হা শূন্যতা…

তোমাকে আলোনাচ দেবো …হাতের পাতায় দেবো টুকরো অঙ্গার…দেবো নিয়ন্ত্রণহারা ভয়……সংকেত শিখিয়ে দেবো দ্রিদিম ছন্দের…শকুনের পাখা দেবো…মুরগীর উলটো পালক…রক্তমাখা বাঘনখ…তোমার ঝিমঝিমে ঘোলা চোখে লেপে দেবো স্বপ্নদুপুর…মায়াস্বর …নীচু মন্দ্রপাঠ…হাড়দন্ডে ছুঁয়ে দেবো তোমার কপাল…তুমি পিশাচ হাসিতে… চোখ রক্তলাল করে…কালো ডানায় … উড়ে আসবে হাঁ করে… …বসে আছি আমি…নিমীলিত…নির্জিত…

শিখিয়েছিলে…তোমার আলোর বাইরে কিছু নেই আর… অন্ধকার…মেঘঝড়…ততটা তৃষ্ণা …ততটা বিন্দু বিন্দু জল…ভীষণ উন্মাদ স্রোত নেই তোমার বাইরে্, সামনে পেছনের ঘোর অনিশ্চয়…আদিম হিংস্রতা কোথাও নেই আর তোমার মতন…ততটা আনন্দ –যন্ত্রণা-রহস্যভেদ বা…তোমার বাইরে নেই নিরুপায় জন্ম-মৃত্যু খেলা…তুমি বলেছ বলে আজ আর নতুন মুখশ্রী খুঁজিনা…
১০
যাবে…তার আগে মুছে নিচ্ছ সম্মোহন…তুলে নিচ্ছ অস্থায়ী সেতু…বসন্ত, তোমার নোঙ্গর … উন্মাদ উলঙ্গ স্মৃতি…আধোঘুম…মুঠো থেকে খুলে নিচ্ছ উষ্ণ আঙুল…মুচড়ে নিচ্ছ অগ্নিকণাগুলি… রাঙা আনন্দফুল…গভীর বৃষ্টিবিন্দুগুলি…নির ্বাসন এঁকে দিচ্ছ কপালে… ঢেকে দিচ্ছ যাপনের রক্তশরীর…

১১

তোমার আগে শূন্যতা ছিল।তুমি এলে।আসলে কতটা শূন্যতা জুড়ে তুমি এলে বসন্ত ? আমার শূন্যতার পটভূমি কতটা রচেছিলে তুমি? কতটা শুষে নিলে , কতটা হরণ করলে তার গভীর মহিমা ? দূরত্বের শেষে তুমি না থাকলে সেতুও তো শূন্যতাই এক…! সেতু নেই। তোমার ভিতর পর্যন্ত আমার শূন্যতা নেই কোনো।তুমি এলে সসম্মানে আর জায়গা ছেড়ে দেবেনা আমার ভারী থমথমে শূন্যতার নিরেট কালো জল…

১২

যে জলবিন্দু চোখ থেকে নেমে ইতস্ততঃ ভেসে বেড়াচ্ছে…যে রক্তফোঁটা ক্ষত থেকে চুঁইয়ে চার পাশে সঞ্চরণশীল…তাদের লাগাতার গুঞ্জরণ শুনতে পাচ্ছি আমি…নেই…নেই…নেই…আমার পৃথিবীতে আর গ্র্যাভিটি নেই… টেনে রাখছেনা আর কোনো সুতো মাটির দিকে…আমি এখন হাওয়ায় হাঁটতে পারি…মুক্ত …চলে যেতে পারি মহাকাশের যে কোনো দিকেই…

=০=

“…like a tree planted by the rivers of water, that brings forth its in its season, whose leaf also shall not wither…” Psalm-I. The Book of Psalms.
বেথুয়াডহরীর সংরক্ষিত এক ফালি অরণ্যভূমির তিন/চার কিলোমিটার দক্ষিণে লেভেলক্রসিংটা এক ডিসেম্বরের সকাল সাতটায় আর ঘুমোতে পারছেনা।যেন উদ্বিগ্ন অপেক্ষা করছে সে সূর্য ওঠার জন্য।রেললাইনের পাঁচ-সাত হাত দূরে সারা শরীরে কয়েক পরত নোংরা ছেঁড়া কাঁথা জড়িয়ে বৃদ্ধা এক ভিখারিণী তার অসাড় শরীর একটুকরো কালো ত্রিপলের ওপর ফেলে চোখ বুঁজে শুয়ে।বরফের মত ঠান্ডা রাস্তায় দুটো কাঁথা আর একটিমাত্র ত্রিপলের সামান্য শস্ত্র নিয়ে সেই বৃদ্ধার অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত এই মরীয়া অসম যুদ্ধ চালিয়ে যাবার চেষ্টা করছে তার প্রাণ।কর্তব্যে বাঁধা ঠান্ডা অসহায় লেভেলক্রসিং সূর্যকে চাইছে এই মেয়েটিকে বাঁচানোর জন্য।গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে তখনই প্রাণশক্তিহীন প্রায় দেখা যায়না এমন এক কম্পমান আলোর আঙুলে সূর্য ছুঁয়ে দিলেন মেয়টির কপাল,শিশিরে ভেজা কাঁথার নীচে মেয়েটির পায়ে অন্ধের স্পর্শের মত অনিশ্চয়তাময় হাত রাখলেন।বন্ধ চোখে আচ্ছন্ন চেতনায় সেই মেয়েটি তখন অনুচ্চারে হয়তো বলে উঠেছে-
“ ঠান্ডা শীতল আলোর মহিমায় তোমাকে দেখা…ও তুমি ! অজানা উৎস থেকে আসছ… আমার আত্মার আয়তনে…শূন্যতার মত এক নগ্নবিষয়ে আমি তোমাকে রেখে দিলাম…যতো দেখা…রহস্যময়…দরজা খুলে যাবে আরো…”
বছর কুড়ি আগে এক ডিসেম্বর শেষের সকাল সাতটায় আমার বাস দাঁড়িয়ে পড়েছিল এই দৃশ্যটি আমাকে উপহার দেবে বলে।তখন চাকরী করি কৃষ্ণনগরে।মাসে বার দুয়েক এই বাস আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়।সেই দিনটিও ছিল এমনই একটি দিন।কর্কটক্রান্তি বলয়ের এই অঞ্চলে ঠান্ডা বেশী পড়ে।ওই প্রবল শীতে, রাস্তার কনকনে অ্যাসফল্টে,মৃতের শ্বাসের মত ঠান্ডা হাওয়ায় আর উঁচু গাছগুলো থেকে ঝরে পড়া শিশিরে স্নান করে কি করে তিনি বেঁচে আছেন এখনো!এই বিস্ময় এই ত্রাস কঙ্কাল সমেত ঝাঁকিয়ে দিয়েছিল আমাকে।শেষরাতে সবার অলক্ষ্যে যে বা যারা এই প্রাণান্তকর মেয়েটিকে বড়সড় ভিক্ষাপাত্র - যাতে চলমান গাড়ি থেকে ছুঁড়ে দেওয়া মুদ্রা যথাসম্ভব লক্ষ্যে পৌঁছয়-আর সামান্য কাপড়ে মুড়ে রেখে গেছে,দিনান্তে তারা এসে সবকিছু তুলে নিয়ে যাবে আবার।
কয়েক হাজার বছরের পুরোনো মুখ নিয়ে চোখ বুঁজে শুয়ে ছিল মেয়েটি।সে মুখে জীবনের কোনো লক্ষণ নেই।যেন এক শ্বাস নেওয়া শালগ্রাম মাত্র সে, যার অনুভূতি নেই, স্পৃহা নেই, ক্ষুধা নেই।যার উদযাপন ছিলনা কোনোদিন, আনন্দ ছিলনা।জড় একটি বস্তুপিন্ড ছাড়া তার আর কোনো ভস্মাবশেষ নেই। পরদিন আবার এই লেভেলক্রসিং এ নামিয়ে দেবে বলে যারা তাকে নিয়ে যাচ্ছে এখন, তারা জানেনা যাবার আগে সেই মেয়েটি সূর্যকে বলেছে-
“যাবে…তার আগে মুছে নিচ্ছ সম্মোহন…তুলে নিচ্ছ অস্থায়ী সেতু…বসন্ত, তোমার নোঙ্গর … উন্মাদ উলঙ্গ স্মৃতি…আধোঘুম…মুঠো থেকে খুলে নিচ্ছ উষ্ণ আঙুল…মুচড়ে নিচ্ছ অগ্নিকণাগুলি… রাঙা আনন্দফুল…গভীর বৃষ্টিবিন্দুগুলি…নির ্বাসন এঁকে দিচ্ছ কপালে… ঢেকে দিচ্ছ যাপনের রক্তশরীর… ”

দৃশ্য আমার মাথার মধ্যে গেঁথে যায়।বছরের পর বছর নানারকম দেখার স্মৃতি আমি প্রেততাড়িতের মত বয়ে বেড়াই আজও । সেদিন বাসে ফেরার সময় আমার মনে হয়েছিল মেয়েটি হয়তো সারাজীবন ধরে আস্তে আস্তে নিঃশেষিত হয়ে যাওয়া কুন্তী-অস্ত্রের গৌরবহীন,নিঃসঙ্গ,পরিত্ ক্ত ,অসহায়।সূর্য এখন তাঁর চেতনায় কষ্ট করে জাগিয়ে তোলা কোনো ক্ষীণ স্বপ্নের মত।তীব্র শীতে অশক্ত অস্তিত্ব আর কাঁপা কাঁপা হাত নিয়ে সূর্য যেন কী এক তীব্রটানে, কী এক অদ্ভুত ভালবাসায় অনেক অনেক বছর পর কুন্তীর কাছে ফিরে এসেছেন আবার,ফুরিয়ে আসা কুন্তীকে প্রজ্জ্বলিত করতে ।
“আমি তোমার কাছে দাঁড়াই আমার আড়ষ্টতা নিয়ে…রং কেড়ে নেয়া আলোর ধূসরতায় …স্বপ্নের মত অবিন্যস্ত প্রস্তুতিহীন…আমার নিজস্ব কথা উধাও হয়ে যায়…মুখ ও মূর্ততা ক্ষমাপ্রাপ্ত দন্ডিতের মত দরজার একপাশে… আমি শুধুমাত্র একটি বস্তুপিন্ড…আর বস্তুর জন্য আত্মা তৈরী করছ তুমি…”
সূর্য-সেই সুমহান,সেই নিঃসঙ্গ পরিব্রাজক দেবতা-জীবনের শেষপ্রান্তে এসেছেন তাঁর বহুপুরোনো ক্ষণমুহূর্তের সঙ্গীর কাছে।তাঁর ভুলে যাওয়া নারীটির কাছে।গাঢ় নিশ্চেতনা থেকে আস্তে আস্তে যেন জেগে উঠছেন সেই নারী।
“জল…জল থেকে উঠে আসছি আমি…হাত ছোঁয়ালে আমি সময়ের ঢেউ…রামধনু আলপনা ভেঙে ভেঙে যাই …আর অবাক, তুমি অটুট…সম্পূর্ণ থেকে যাও…অতিরিক্ত তো এটুকুই শুধু…!তবু তুমি ছুঁতে পারছনা…পারছনা আজো…আজো পারলেনা নিজের কাছে যেতে…যত তুমি গড়িয়ে নামছ টানা নিজের ভেতর … অতৃপ্ত… পরিত্রাণহীন…”
সময় নিবিষ্ট করেছে তাকে,আত্মস্থ অন্তর্মুখী করেছে।তার ভেতরে জেগে উঠেছে অনেকদূর দেখতে পাওয়ার চোখ।এই চোখে আর কোনো মোহ মায়াঞ্জন নেই।তার হয়তো মনে হচ্ছে-
“শূন্যতার বীজত্বক ছিঁড়ে…কথা ফুটছে পাথরের …রং…গড়িয়ে…নেমে… ছুঁয়ে দিচ্ছে কাগজ ক্যানভাস…শূন্যকে এফোঁড় ওফোঁড়, নিজস্ব সংলাপে বুঁদ হাওয়া খেলে বেড়াচ্ছে শব্দ-সুড়ঙ্গে…মুক্তি ঘটছে দন্ডিত আত্মার…শুধু বসন্ত… হে বসন্ত… তুমি আবার ফিরে এসেছ বলে…স্নাত হচ্ছি …পুণ্য হচ্ছি আমি…”
শূন্যতার বীজত্বক ছিঁড়ে যাচ্ছে, কিন্তু সারাজীবন জুড়ে যে শূন্যতা অর্জন করে যাই আমরা তার গাঢ় রেশ আমাদের অস্তিত্বে মিশে থাকে।পূর্ণতা দিতে যে আসছে,কতটা শূন্যতা জুড়ে তার এই আসা!
“ তোমার আগে শূন্যতা ছিল।তুমি এলে।আসলে কতটা শূন্যতা জুড়ে তুমি এলে বসন্ত ? আমার শূন্যতার পটভূমি কতটা রচেছিলে তুমি? কতটা শুষে নিলে , কতটা হরণ করলে তার গভীর মহিমা ? দূরত্বের শেষে তুমি না থাকলে সেতুও তো শূন্যতাই এক…! সেতু নেই। তোমার ভিতর পর্যন্ত আমার শূন্যতা নেই কোনো।তুমি এলে সসম্মানে আর জায়গা ছেড়ে দেবেনা আমার ভারী থমথমে শূন্যতার নিরেট কালো জল…”

পাতার ফাঁক দিয়ে অস্ফুট আলোর একটি রেখা এক মৃত্যুস্পর্শিত নারীর কপাল কাঁপা আঙুলে ছুঁয়ে আছে।লেভেলক্রসিংএ আমার বাস দু’মিনিট দাঁড়িয়ে ছিল।যার সৌজন্যে এই ঝলক-দেখা।এর বাইরে আমি কিছু দেখিনি।প্রবীণ সূর্য আর প্রবীণা নারীটির মধ্যে কোনো সংলাপ কল্পনা করিনি আমি,যদিও নানা মুহূর্তে বারবার আমার কাছে ফিরে এসেছে দৃশ্যটি।যেন বলতে চেয়েছে,তাদের জন্য কিছু একটা করার ছিল আমার,যা আমি করিনি।মনে হলো সেই নির্বাক চলচ্চিত্রের মত ছবিটি যেন নিখুঁত একটি ভাষা তাদের জন্য পেয়ে গেছে কবিতাটির মধ্যে।এতদিন ধরে যা শুধু দৃশ্য হয়েই ছিল-কবিতার ভাষায় আজ যেন পূর্ণতা পেল।স্তিমিত সুরের রেশ যেন ধরে আছে কবিতাটি।ঝংকার থেমে যাওয়া সেতারের তারগুলি যেভাবে রণন ও স্মৃতি ধরে রাখে সুরের।কবিতাটি আমি একটি পরিপূর্ণ শুদ্ধতম রাগসংগীত হিসেবেই পেলাম।সেই একই আলাপ,বিস্তার,মুখড়া ছুঁয়ে আবার ছড়িয়ে পড়া। এবং অনবসিত অবসান এই কবিতাটি জুড়ে।এভাবেই জেগে উঠছে সে নিজেও যেন, যেভাবে সেই নারীটি-
“ যতটা চেয়েছিলাম কাল…আজ তার থেকে অনেক আগ্রাসী আমি…আগামীদিনের চাওয়ার থেকে যদিও তা বড্ড কম…আর এই সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ভালবাসার দিনে আমি তোমাকে চেয়েছি রক্তমাংস থেকে অনেক এগিয়ে…”
পরবর্তী তিনটি টুকরো যেন সেই নারীটির প্যাশন, জীবনতৃষ্ণা এবং চূড়ান্ত বিন্দুটি ছুঁয়ে নেওয়ার মত- যা ফেটে পড়ছে আনন্দশিহরে, প্রতিটি অণুর বিস্ফোরণে যে ভেসে যাচ্ছে সুধারসে…এবং মৃত্যুর দিকে।
“ সমস্ত অলংকার খুলে হনন এসেছে…ঝিনুকের ডানা ভেঙে বের করে এনেছে অসহ্য মুক্তার দানা…চোয়ালের হাড় নীল হয়ে উঠেছিল…ডান কন্ঠার হাড় …বাঁ দিকের পাঁজর… মড়মড় করে উঠেছিল আনন্দশিহরে…প্রেরণার মত একটা টাটকা রক্তে ভরা হৃদয় হাতের সমস্ত আলো ঢেলে দিয়েছে স্পর্শযোগ্য পায়ে…মাখিয়ে দিয়েছে বৃষ্টি…বলছে …উদযাপন হোক…আজ শোক হোক…হা হা শূন্যতা…
“ তোমাকে আলোনাচ দেবো …হাতের পাতায় দেবো টুকরো অঙ্গার…দেবো নিয়ন্ত্রণহারা ভয়……সংকেত শিখিয়ে দেবো দ্রিদিম ছন্দের…শকুনের পাখা দেবো…মুরগীর উলটো পালক…রক্তমাখা বাঘনখ…তোমার ঝিমঝিমে ঘোলা চোখে লেপে দেবো স্বপ্নদুপুর…মায়াস্বর …নীচু মন্দ্রপাঠ…হাড়দন্ডে ছুঁয়ে দেবো তোমার কপাল…তুমি পিশাচ হাসিতে… চোখ রক্তলাল করে…কালো ডানায় … উড়ে আসবে হাঁ করে… …বসে আছি আমি…নিমীলিত…নির্জিত… ”
“ শিখিয়েছিলে…তোমার আলোর বাইরে কিছু নেই আর… অন্ধকার…মেঘঝড়…ততটা তৃষ্ণা …ততটা বিন্দু বিন্দু জল…ভীষণ উন্মাদ স্রোত নেই তোমার বাইরে্, সামনে পেছনের ঘোর অনিশ্চয়…আদিম হিংস্রতা কোথাও নেই আর তোমার মতন…ততটা আনন্দ –যন্ত্রণা-রহস্যভেদ বা…তোমার বাইরে নেই নিরুপায় জন্ম-মৃত্যু খেলা…তুমি বলেছ বলে আজ আর নতুন মুখশ্রী খুঁজিনা…”
অক্টোবরের এই দুপুরে আমার সামনে হাত ধরাধরি করে হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে আমার দেখা সেই কুড়ি বছর আগের দৃশ্যটির কুশীলব। তারা ছিল অসম্পূর্ণ,খন্ডাংশ, চলৎশক্তিহীন।কবিতার ভাষায় তারা পূর্ণ নিজেদের ফিরে পেল কুড়ি বৎসর প্রার্থনা ও প্রতীক্ষার পর।আমার ভাবতে ভাল লাগছে অনুচ্চ মন্ত্রের মত সম্মোহন ছড়িয়ে দেওয়া এই কবিতাটি হয়তো এবার আমাকেও মুক্তি দেবে কোনোভাবে-যেভাবে একটি ভাল কবিতা আমাকে পরিশুদ্ধ করে,ছড়িয়ে যেতে দেয়।আমার অনেক অন্তর্গত ভাবনায় কবিতাটি সমর্থনের মত সাড়া দিয়েছে।চোখধাঁধাঁনো কোনো চমক নেই,চেপে বসা মোটা দাগের অলংকরণের চেষ্টাও নেই,কোনো আরোপিত সপ্রতিভতা নেই। কবিতাটি যেন অবিশ্রাম ঢেউএর মত ভেসে উঠছে, ভেঙে পড়ছে, হারিয়ে যাচ্ছে। একটু একটু ভাসাচ্ছে, একটু একটু পা রাখতে দিচ্ছে মাটিতে-
“ যে জলবিন্দু চোখ থেকে নেমে ইতস্ততঃ ভেসে বেড়াচ্ছে…যে রক্তফোঁটা ক্ষত থেকে চুঁইয়ে চার পাশে সঞ্চরণশীল…তাদের লাগাতার গুঞ্জরণ শুনতে পাচ্ছি আমি…নেই…নেই…নেই…আমার পৃথিবীতে আর গ্র্যাভিটি নেই… টেনে রাখছেনা আর কোনো সুতো মাটির দিকে…আমি এখন হাওয়ায় হাঁটতে পারি…মুক্ত …চলে যেতে পারি মহাকাশের যে কোনো দিকেই…”
লেখাটির একেবারে শুরুতে The Book of Psalms থেকে যে অংশটি উদ্ধৃত হয়েছে সেখানেই ফিরে যাই এবার।জলের নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটির মত এই গাঢ় অন্তরতম কবিতাগুলিও সারাজীবন শ্যামলছায়া ও ফল দিয়ে যাবে।পাতা ঝরে যাবেনা কখোনো এই গাছের।কখনো ফুরিয়ে যাবেনা এই কবিতাগুলির আবেদন।
=০=