যেটুকু শরীর ফোটে সুখপদ্মে

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় ও অনিন্দ্য রায়

জীবন আর মননের মাঝে ভিস্যুয়াল ডিকম্পোজিশন যার নাম শরীর।আলোর নিবিড়পাঠে যাকে আমরা শনাক্ত করি।চিনে নিই।স্পর্শ করি রঙে এবং আর্দ্রতায়। আবার ভেঙে চলি এক অনবচ্ছিন নির্মানের ভেতর দিয়ে।আবহমান আর্দ্র চেতনার অন্তঃস্থলে জীর্ণতার পরম্পরাগুলো টুকরো টুকরো করে গড়ে তুলি দিগন্তের নতুন আভাস।ব্যক্তিগত ব্যর্থতা , সাফল্য অথবা অনতিসাফল্যের রসদ নিয়ে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে স্বকালচেতনার বিস্তার।অভিজ্ঞতার এই আরোহী এবং অবরোহী মনস্তত্বই সৃষ্টিকর্মের শীর্ষ লক্ষ্য।আতুর কান্নার নিরশ্রু রব অনাশ্রয় প্রান্তিক আবাসভূমির ঠিকানা খুঁজে ফেরা স্বপ্ন যেখানে জয় পরাজয়ের যন্ত্রণাবিদ্ধ মানুষ এবং তারই সমান্তরালে আছে ইন্দ্রিয়বেদ্য শরীরের অপার অস্তিত্ব। অধরা প্রশান্তি।এই ছায়ায় এসে দাঁড়ানোর প্রয়োজন।জীবনের স্রোত থেকে উৎখাত হতে হতেও জেদের জার্নাল নিয়ে ছেঁড়া পৃষ্ঠায় লেখা চাকুরিপ্রস্তাব দেখে আবার জীবনের কাছে অমল উজ্জ্বল রোদে এসে দাঁড়ায় থমকে যাওয়া সময়।আধো আলো , আবছায়া , আর অনুভবের মর্মভেদী সম্মোহন যার অনিয়ন্ত্রিত প্রভাবে উচ্চনাদী বর্তমান স্মৃতি ও সত্ত্বার শরীরে বিলীন হয়ে যায়।এক আলম্বনের নিঃশব্দ সঞ্চারে এবং প্রাপ্তিতে অন্তর্দীপ্ত হয়ে ওঠে একটি মুহূর্ত শুধু।চাদরে সংঘর্ষপাতা।সংবেদন অতিরিক্ত এক প্রাপ্তির স্থাপত্যে প্রতিবার কানা ভেঙেউপচে ওঠে জল।ভাষার নানান ভঙ্গিমা এবং মুদ্রার বিচ্ছুরণ শব্দসজ্জার অন্তর্বর্তী নির্জন পরিসরে পুনর্নিণীত হয় এক অব্যক্ত স্বরন্যাসে।ফিরে যাওয়া প্রতিবার।অবসাদ , ক্লান্তি , ঘুম থেকে আকাঙ্ক্ষার কাছে বিমুর্ত ভাববীজের সংকল্পে ফিরে ফিরে আসা।অস্তিত্বতাত্ত্বি ক উপলব্ধির দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানো । নিরবচ্ছিন নৈরাজ্যের অন্তর্লীন কুয়াশায় পিপাসার নিবিড় বয়ন ।


উৎখাতকেলি, আতুর কান্নাটি থাকে হারজিতে, ছেঁড়া পৃষ্ঠায় লেখা চাকুরিপ্রস্তাব দেখে
ভেবেছ শয়নকল্প, একটি চাদর মাত্র সংঘর্ষে পাতা

পারি না পারি না তার ভরণপোষণ

ফিরে যাওয়া প্রতিবার কানা ভেঙে ফেলা এবং ততটাই জল উপচে ওঠে বেদনার ওজন যেমন

অন্তর্দৃষ্টির বৃত্ত ভেঙে ঢেউয়ের ভেতর ঢেউ তুলে মৌল এবং স্বপ্নাদ্য দাহ নেভানোর যে প্রয়াস যে ভঙ্গিমা এই প্রযুক্তির নামই শিল্প । বিচিত্র ও কুহকে আচ্ছন্ন এই উদ্দীপনা । চূড়ান্ত নিরালম্ব এক অনবস্থার পীড়নে বারবার আক্রান্ত হয় চিন্তা ও মেধাবিন্যাস । শিকড়ে জলের ঘ্রান খুঁজে পাওয়ার অদম্য আয়োজন ও মন্থন । এভাবেই তর্পণের স্নিগ্ধতায় নিজেকেই দেখতে চাওয়া বারবার পীতবর্ন জলে , স্নানঘরের ছোট আয়নায় । জলে বিম্বিত অবয়বে কী ভেসে উঠছে ? সচেতন পরিধি জুড়ে সিক্ত শূন্যতাবোধ । এই স্তব্ধলোক স্পর্শ করার অভিপ্রায় জলের কাছে ফিরে আসা এবং এখানেই দেখতে চাওয়া যেটুকু শরীর ফোটে সুখপদ্মে । এরই মাইক্রোন্যারেটিভ বিন্যাসে এক অর্থময় নিঃসঙ্গ বৃত্ত । কালো গহ্বরের মধ্যে ক্ষতচিহ্নের দুরন্ত ইশারা। যেন সেই প্রতিধ্বনি ।নাড়াচাড়া করা এক থকথকে কাদা মাখা জীবন থেকে এক মহার্ঘের অনুসন্ধান । এই ঘুম আসলে জাগরণের পূর্বশর্ত । চ্যুতভূমি থেকে নতুন বসতির দিকে দুকদম অভিযান । । কিছুই গোপন থাকেনা চৈতন্যদ্যুতির বাইরে এক পরিদৃশ্যমান জগতের কাছে । এই সমান্তরাল বিন্যাসের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠেনা কোন অনুভূতিই । অংশীদার হয়ে ওঠেনা । হয়ে ওঠেনা বলেই দৃষ্টির বহুস্তররীয় বিস্তার ঘটে । সম্মোহন এবং আচ্ছন্নতার পরিসর অতিক্রম করে নিরীক্ষন সম্ভব হয় মৌলিক ধূসরতার মধ্যে বর্ণময়তার সনাক্তকরণ । উপস্থিতি আর অনুপস্থিতির মাঝে সরু রেখায়িত পথ । যা প্রতিদিনের পরিত্যক্ততাগুলিকে নতুন করে চিনিয়ে দিতে চায় । যার অ্যামোনিয়া ঘ্রাণ ভাসিয়ে নিয়ে যায় জৈব পৃথিবীর দিকে । যা সলাজতায় বেজে ওঠা রাধিকা কাঁসর ।



ছোট্ট আয়নার চেয়ে চোট স্নানঘর, ওপিঠে মার্কারি আর এদিকে ভেনাস

মাঝে আলোর সমস্যা নিয়ে তাকে ধরি, সমতলে কীই বা ফোকাস
শুধু যেটুকু শরীর ফোটে সুখপদ্মে, অ্যামোনিয়া ঘ্রাণ আমাকে ভাসিয়ে নিল

লজ্জা থেকে বেজে উঠল রাধিকা কাঁসর

জীবন তো কেবল রূপান্তরের ছবি । একদিকে মার্কারি অন্যদিকে ভেনাস । মাঝে আলোর রেখাটানে নিজেকে অতিজীবিত করে তোলার নিরন্তর প্রয়াস । নতুন পাঠক্রম । সমতলে মুহুর্তের মায়াজাল। টুকরো টুকরো উত্তীর্ণ সুখ আর মিহি ক্ষয় । এক অস্পষ্ট সমারোহ থেকে চিন্তার ক্রমিক মাইটোসিস । এই জারনচিহ্নগুলিই তো সমস্ত নিয়ম ভেঙে ক্রমিক অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে মায়াবন্দরে ঢুকে পড়ে একান্ত অশ্বের অবয়বে । শয্যার মুলতুবি তবু ঘুমের প্রত্যেক কিস্তির মধ্যে লিপ্ত হয়ে আছে এক ভার্চুয়াল আমোদ । আর ঠিক এখানেই রঙের ঘোর পাল্টে ঘনত্ব বদলে কাব্যিক আকর্ষক উপাদানে সহজ করে তোলে আয়ুরেখা । এই মনোলিথিক কথোপকথনের গভীরে স্পষ্টত সংবেদনশীল তৃষাতুর জীবনের বিস্তার । নিরীক্ষাপ্রিয় দৌড়ের ছবি টাঙিয়ে দেওয়া আছে আগাগোড়া । জবাবের সন্ধান আছে বলেই হাওয়ার অষ্টমদিকে গণতান্ত্রিক বহুমুখিতার দিকে সরে আসে বিখন্ড চেতনা । সময়বোধের নির্যাস নিঃশব্দ সঞ্চারে ব্যক্তিগত অনুভূতির ভাষাকে অন্তর্দীপ্ত করে তোলে । মনস্ক করে তোলে । তখন চেতনার ভূগোলে এবং অন্তর্নিহিত ভূকম্পনের ভেতর চৌচির হয়ে যায় সমস্ত হাহাকার । ধোঁয়া ওঠে । তরঙ্গের সাথে মিলিত হয় তরঙ্গ । উদ্দীপিত সিঙ্ক্রোনাইজেশন । কোন দ্রোহের ভেতরে নয় । যে জীবনকে আমরা প্রতিদিন দেখি , ছুঁই স্পর্শ করি এবং আলিঙ্গনের উষ্ণতায় গেঁথে নিই । যে জীবন সমর্পণের । কিন্তু কতদূর সমর্পিত হয় , আবর্তিত হতে পারে তার রঙের ঘোর ।

বসেছি তরঙ্গ কমিশনে, উঁচা থেকে স্যালাইন, নিম্নে ওঠে ধোঁয়া

শয্যার মুলতুবি তবু ঘুমের প্রতিটি কিস্তি, রাজিও হচ্ছে না, এত যে রঙের ঘোর বারংবার পাল্টাচ্ছে জল
কোথাও জবাব দিতে কেটে যাচ্ছে হাওয়ার অষ্টম দিক

আর সেই দ্বারে ঢুকে পড়ছে একান্ত অশ্ব, তার দৌড়ের পথে
আয়ুরেখা ক্রমাগত সহজ হয়েছে।

মনস্কতা এবং মগ্নতার মৌল চিন্তনপ্রনালীকে তাচ্ছিল্য করে অনুশীলিত চীৎকারগুলি ছুঁড়ে দিচ্ছে দূরে , ক্রমাগত দূরে এক । আর তা বলের মতো কোন গন্তব্যে না পৌঁছে আবার ফিরে আসছে উৎসের দিকে এবং স্বরচিত প্রতিধ্বনি নিজের স্বরকেই বিদ্রূপ করছে । ব্যক্তি এবং সামষ্টিক যৌথ অস্তিত্বের ভেতর থেকে আকরণের অন্তর্বর্তী আকরণের বহুস্বরিক অনন্যোসম্পৃক্ত পরিসরের প্রতিনিধি নয় , ঐতিহ্যবিযুক্ত এক রিক্ততা এবং হতাশার অনুনাদী আরব চীৎকার । যেখানে বিবর্ণতা ছাড়া আর কিছু নেই । তারকাখচিত আকাশের বহুরূপতা নেই । নেই চারপাশের বস্তুনিষ্ঠ জগতের বৈচিত্রের উষ্ণতা । যা ব্যক্তিগত বিষণ্ণতাকে বাজিয়ে তুলতে পারে শিল্পময়তায় , অপার্থিব সৌন্দর্যে । পেতে হবে আনন্দে উদ্ভাসিত সেই ঝুমঝুমি খেলনার আর্দ্রতা । অথচ মনের অনুভূমিক গভীরতর স্তরকে ঘা দেয় । নিবিড় হয়ে ওঠে এই ক্ষত । স্পর্শ করবার যে শিহরণ তা সংজ্ঞায়িত করার বোধ অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত । এক অস্থির চলনের মধ্যে ঈর্ষা এবং আত্মগরিমা ছাড়া আর কোন আবেগ থাকছে না । আড়িপথ , চোখের চাবুক এই অন্তঃস্থ আলো এবং জাগরিত পথ যা এক নিঃশব্দ প্রতীকের মতো । যে আলোর মধ্যে শরীরের অস্তিত্বকে চিনে নিই আমরা । চিনে নিই প্রত্যেকের ব্যক্তিগত শরীর আর যে ভাষাপথের সমীকরণ অনুসরণ করে এই কায়িক চলাফেরা তা জেগে ওঠে মরুভূমির মাঝে একটি বৃক্ষের মতো ।

আড়িপথ, চোখের চাবুক, যতটা সহ্য করি ঘা আরো নিবিড় হয়ে ওঠে
ওখানে মাখাই নুন, অথচ শর্করাস্বাদ শরীরে ছড়ায়

তুমি আরো দুর্বল কোরক, প্রতিক্রিয়া অনতি রাখো নি

মুহূর্ত দেখতে গিয়ে আরেকটু আঁধারপাগড়ি খুলে গিয়েছিল

জীবন এবং মননের মাঝখানে এই যে রোমাঞ্চকর শরীর তার শিহরণময় আবেদন । কবিতা এবং জীবন কখনও এক সরলরেখার উপর দাঁড়িয়ে থাকে । আবার কখনও তারা পরস্পরের হাত ধরে হাঁটলেও তাদের উৎসারণ পৃথক । প্রাকৃত থেকে অপ্রাকৃত , ফর্ম থেকে ডিফর্ম আকার থেকে নিরাকারের দিকে একটু একটু করে পা বাড়িয়ে দেওয়া । শব্দের ভেতরে যে শরীর থাকে অনুভূতির আলো এসে পড়লে আমরা সেই সংকেত দেখতে পাই । আঁধার পাগড়ি খুলে এভাবেই প্রতীয়মান হয়ে ওঠে শাব্দিক বয়ন শুধু নয় শারীরিক রসায়নের সামগ্রিক নির্যাস । এই প্রক্রিয়ার ভেতরেই স্পষ্ট হয় বিবর্তনশীল অস্তিত্বের চিহ্ন । পাঠকৃতির নিবিড়ে ভেসে ওঠে ছায়া পাঠকৃতি ।এই সমস্তের পাশেই এই নুন আর শর্করার মাঝেই শব্দের শরীরের কাছে সমর্পণ । এ এক দার্শনিক ডিসকোর্স । শরীরের সূক্ষ্মতর ইঙ্গিতময়তায় এক বোধের দীপ্র জাগরণ সূচিত হচ্ছে । প্রত্যেকটি শব্দ এক এক একটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যারা সত্যের শেষ বিন্দুটিকে স্পর্শের আকুলতা নিয়ে অনুমান করতে চায় । জীবনপথের সন্ধান করতে গিয়ে এভাবে পালাবদল ঘটছে অনুবর্তন ঘটছে তরঙ্গের । এখানে চরম সুস্থিরতার আত্মতৃপ্তি নেই । আছে অনির্বাণ এক খিদে । আছে উত্তেজনা এবং সমন্বয় স্বপ্ন ।
জীবন জগত নারী প্রকৃতি , প্রেম এবং সময়ের খরস্রোত থেকে কালোত্তীর্ণ নান্দনিকতার সাথেই যুক্ত হয়েছে সমকালের উত্তাপ । সংবেদনা এবং সহমর্মিতার আশ্লেষে চক্ষুর স্বচ্ছতা নিয়ে খুলে ফেলা হয়েছে যাবতীয় নির্মোক । দশদিক থেকে সংগ্রহ করেছে আলোর কণিকা । নিবিড় ছায়ালোকে যা ইপ্সিত আলোকবিন্দু । অন্তর্ভেদী তীক্ষ্ণতায় একটি উজ্জ্বল মুহূর্ত শুধু রয়ে গেছে চেতনাশ্রয়ী শব্দের গভীরে । অনুভূতি আর চিন্তার গভীর সঙ্গম - যেটুকু শরীর ফোটে সুখপদ্মে ।






( কবি অনিন্দ্য রায়ের “গোপনীয়তারা ” কবিতার ভাববীজ থেকে নির্মিত )

গোপনীয়তারা



উৎখাতকেলি, আতুর কান্নাটি থাকে হারজিতে, ছেঁড়া পৃষ্ঠায় লেখা চাকুরিপ্রস্তাব দেখে
ভেখেছ শয়নকল্প, একটি চাদর মাত্র সংঘর্ষে পাতা

পারি না পারি না তার ভরণপোষণ

ফিরে যাওয়া প্রতিবার কানা ভেঙে ফেলা এবং ততটাই জল উপচে ওঠে বেদনার ওজন যেমন



ছোট্ট আয়নার চেয়ে চোট স্নানঘর, ওপিঠে মার্কারি আর এদিকে ভেনাস

মাঝে আলোর সমস্যা নিয়ে তাকে ধরি, সমতলে কীই বা ফোকাস
শুধু যেটুকু শরীর ফোটে সুখপদ্মে, অ্যামোনিয়া ঘ্রাণ আমাকে ভাসিয়ে নিল

লজ্জা থেকে বেজে উঠল রাধিকা কাঁসর



বসেছি তরঙ্গ কমিশনে, উঁচা থেকে স্যালাইন, নিম্নে ওঠে ধোঁয়া

শয্যার মুলতুবি তবু ঘুমের প্রতিটি কিস্তি, রাজিও হচ্ছে না, এত যে রঙের ঘোর বারংবার পাল্টাচ্ছে জল
কোথাও জবাব দিতে কেটে যাচ্ছে হাওয়ার অষ্টম দিক

আর সেই দ্বারে ঢুকে পড়ছে একান্ত অশ্ব, তার দৌড়ের পথে
আয়ুরেখা ক্রমাগত সহজ হয়েছে



আড়িপথ, চোখের চাবুক, যতটা সহ্য করি ঘা আরো নিবিড় হয়ে ওঠে
ওখানে মাখাই নুন, অথচ শর্করাস্বাদ শরীরে ছড়ায়

তুমি আরো দুর্বল কোরক, প্রতিক্রিয়া অনতি রাখো নি

মুহূর্ত দেখতে গিয়ে আরেকটু আঁধারপাগড়ি খুলে গিয়েছিল