এক্স

শর্মিষ্ঠা ঘোষ ও জয়া চৌধুরী

এক্স ১
কি খেলে আজ জন্মদিনে ? স্যাকারিনের পায়েস নাকি মদ , মাংস ?
কাঁথা স্টিচের পাঞ্জাবি আর বেল্ট লাগানো ধাক্কা ধুতি এখনো পর ?
নাকি এখন স্যুটেড বুটেড ? আমার জানো , তোমার দেওয়া প্রথম শাড়ি
লকারে রাখা । হলুদ পাতার প্রিয়তমাসু ডিকশনারির পাতায় রাখা
শুকনো পলাশ , সেই যেবারে কবিগুরুর গানে গানে আমরা দুজন
চারটে চোখে সর্বনাশের স্বরলিপি , খোয়াই হাটে একতারা আর ডোকরার দুল
বাউল আমার কপাল দেখে গান বাঁধল , হৃদমাঝারে চিরকালের কয়েদ দেবার
গেছে গেছে সেদিন গেছে গোল্লায় যাক , তাও কি জানো , একলা হলে
মনঘরটার তালাচাবির জং ঝরে যায় , খুব তোমাকে ইচ্ছে করে দেখতে তখন
আচ্ছা , তোমরা মন্দিরে যাও বিশেষ দিনে ? ফুল কেন আর আতর লাগাও ?
রাত বারোটায় সেও চুমু খায় আমার মত ? উইশ করে ? তার সাথেও
নেই কারণের ঝগড়া কর ? চেয়ার টেবিল আছড়ে ভাঙ রাত দুপুরে পাড়া কাঁপিয়ে ?
নাকের ডাকে ধুন্ধুমার কি হয় এখনো ? পাশ ফিরিয়ে শোয়ায় তোমায় ?
প্রেশার সুগার থাইরয়েডের হোমিও অ্যালো , থানকুনি রস উচ্ছে ভাজা
সকাল বিকেল ঘামঝরানো , সব ঠিকঠাক ? আগের মতই ?
চশমা হারাও যখন তখন ? রাগ করোনা ? আর মোবাইল রুমাল ছাতা ?
ফুটো গেঞ্জির ঘামগন্ধ ঢাকছ এখন অন্য ডিওয় ? নতুন ব্রান্ডে ?
খবর দেখ ? ডিবেট কর ? পলিটিক্সের মুন্ডুপাতও ? তারই সাথে ?
সেম দলকে সাপোর্ট কর তোমরা দুজন ? নাকি তোমরা অন্য লবির ?
কোন কবিতায় বশ করেছ ? বর্ষাকালের একটি ছাতায় ভিজতে ভিজতে
সেই ‘ইজাজত’ শোনাও তাকে ? কদম ঝরে মাথার ওপর ? আমার মতো
সেও চুমু খায় দুচোখ বুঁজে ? কানের লতি কামড়ে ধরে ? তুমুল জ্বরে
নখ বসে যায় পিঠের ওপর ? চুল টেনে দেয় ? ডুকরে ওঠে বুকের ভেতর ?
নাকি সবই অন্যরকম ? ঠিক যেগুলি পাওনি তুমি আমার কাছে ?
আমার রাগে নীরবতায় একলা কাঁদার বালিশ তোষক আর যা সবের অভাব ছিল
সব পেয়েছ ? খুব সুখী তো তোমরা দুজন ? স্বর্গরাজ্য ঠিক চিনেছ ?
একটা জীবন এক গতিকে যায় না শুনি , সবাই বলে কান্না হাসি ব্যালেন্স করা
ভাগ্যি তোমার কষ্টবেলা আমার সাথে কাটিয়ে ছিলে ! এবার তো সুখ
চাকার মত গড়িয়ে যাবে , তাই না সোনা ? হ্যাপি ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেবে
পার্টি স্বজন কুটুম্বিতা , হাসি খুশী উপচে যাবে আত্মজ আর পারিবারিক
আলোর উঠোন । আমার বুকের ছোট্ট কোনায় বুজবুজি দেয় ফাতনা নাড়ায়
মেঘ রোদ্দুর শীতের বিকেল শরত আকাশ মহালয়া ফাগুন আবির শিমুল পলাশ
সব ভুলেছি মন্দগুলোর , আফসোস হয় কষ্ট দিলাম মুখকালো আর অভিমানের
গেছে গেছে সে দিন গেছে , আর ছায়া নেই অভিমানের , পাইনি যা তার অভিযোগও
তাকে দেখলাম , ঠিক বুঝিনি তৃপ্ত কিনা , তোমায় দেখি আসতে যেতে
নীরব থাক , লজ্জা লাগে ? ঝড় বাদলা অনেক গেছে দুজনারই , আবার কেন ?
এবার ভোলো , সময় পেলে দু একটা কাপ চা হয়ে যাক আমার বাড়ি
এই তো কাছেই , আমার উনি আর মেয়েরা , ভালোই আছি মধ্যবিত্ত
ছোট্টজনা আদর করে সেই ডাকনাম কি করে যে বের করেছে , তাও জানিনা
সকাল বিকেল জড়িয়ে রাখে আমার সময় , ওদের ঘিরেই কাটছে এখন
আজ মনে নেই ঠিক কতটা নুন গলেছে একটা সময় , আর হ্যাঁ শোনো
তোমার তাকেও আসতে বোলো , তারও নিশ্চয় ইচ্ছে করে দেখতে আমায় ?
তোমার এক্সকে ? বেশ দেখে যাক বাঞ্ছারামের সাধের বাগান কেমনতর
আপন ভাগ্য তুষ্ট করুক , সেও নিজের বাগান সাজাক আপন করে


এক্স ২
যে নেই তার জন্যই তো আদিখ্যেতায় মরি মরি
নেই তাই পুষ্প দিয়ে মারি তাকে এবেলা ওবেলা
লাইফে এক্স ফ্যাক্টরটি না থাকলে জাতে ওঠা যায় না
যেভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ গেট টুগেদারে ব্রান্ডেড অ্যাপারেলে চোখ আটকায়
Ex ছাপ পিঠে লাগিয়ে ঘোরার একটা আভিজাত্য আছে
টুকটাক পিএনপিসি অরা হয়ে এক্সট্রা গ্ল্যামার দেয়
ইহা বার্ধক্যে অবকাশ যাপনের সম্পৃক্ত বিষাদ
যৌবনে দেখনদারি কলার উঁচানো বৈভব
একান্তে নিজের সাথে মনমানি , চূড়ান্ত অর্গাজম
বিবেকের দুষ্টুমিষ্টি বেত্রাঘাত স্যাডিস্টিক প্লেজার
দেবদাসের ছিপটি স্টেডি রিলেশানের পারো মার্কা ঈর্ষা
গুচ্ছের না পাওয়ায় ক্রুদ্ধ রক্তপিপাসু প্রত্যাঘাত
ইহা একটি ঢপের চপ , খেলে গ্যারান্টেড অ্যাসিড গ্যাস
চান্স পেলেই নুনপাথর চেটে আসার জন্য মন ম্যাজম্যাজ
এই অসুখের উদযাপনে জীবনবাবুকে অ্যালজোলাম নয়
শ্যাম্পেন খুলে ছিটিয়ে দিও ট্রাজিকমেডির বাবল

এক্স ৩
আরে বাওয়া , চাপ নেবেন না । আপনার মোট্টেই কোন দোষ ছিল না । আপনি তো আর ইয়ে মানে ইচ্ছে করে পথ দেখেন নি । ওই ন্যালাখ্যাপা ক্যারেক্টারটির মধ্যে আসলেই তেমন বিশদ কিছু ছিল না । না তেমন কেউকেটা না তেমন নাচুনে যে দোহার প্রেমঝুলনা দুলিয়ে যাবে নিরন্তর । কোন চুম্বক তো নয় ই , তাইতো নেই তেমন কোন চুম্বন স্মৃতি । তবে কি জানেন তো , বড্ড ভাইরাল । এই ‘প্রাক্তন’ শব্দটি একটি থ্রি ডাইমেনশনাল কবিতার নিরাকার গদ্যভূত বলতে পারেন । প্রেম প্রতিজ্ঞার রক্ত শুকিয়ে ভেঙ্গেচুরে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে হলুদ পাতায় মেরুন পোকা হয়ে যায় । নীল খামে লাল বসন্ত সিটি মারে নগর নাবিককে । গুমনামী নায়ক নায়িকা তন্দুরভাজা স্মৃতির অলটারের পাশে টুপি নামিয়ে রাখে । কবরখানা থেকে ফুল চুরি যায় । কে যেন শীত মহল্লায় জানালায় নাক ঠেকিয়ে নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে কার নাম লেখে । রোদ ঝলমল শীর্ষে দাঁড়ানো সফল জুটি হানিমুনের ছবি পোস্টায় স্যোসাল মিডিয়ায় । সবুজ কালো খাদের অন্ধকার থেকে ভুল প্রেম ঠিক গন্তব্য চিনিয়ে দেয় সম্ভাব্য বোকা প্রণয়ীকে ।


এক্স ৪
তোমাকে দেখলে মনে পড়ে কত্তদিন হয়ে গেল ক্যাডবেরি খাই না
আর হ্যাঁ , কি যেন বলে মেঘেদের প্রলাপ আলাপ বিস্তার মাখা হয় না
শ্যাম্পু করা চুলে
যারা তোমার বদন ছুঁলেই আমি ক্লিওপেট্রা যার আস্ত একটি পাগলামি ছাড়া
ধন সম্পদ সিডাকশান ইত্যাদি কিস্যু নাই আর নাই
কত্তদিন পর দেখ একলা একলা হাসছি
আমার গাল বেয়ে পড়ছে চিবুক বেয়ে পড়ছে কয়েকটা হন্তদন্ত দুপুর
কয়েকটা এলোপাথাড়ি ছক্কা পাঞ্জা কথা
আমি কি ফিরে যাবো তোমাকে বলতে এসব ?
বলে ফেলি ? বলে ফেলি ? একটাই তো জীবন
এইটুকু ভালোলাগা না বলেই যদি মরে যাই
কোনো ফুল ঝরবেনা
শুধু খাঁ খাঁ একটা একটা দুপুর গুনতে গুনতে কোনো উদাসী
তোমাকে ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়াবে অন্ধ বাতাসে

*************
কথা দেওয়াই ছিল। আসলে দিয়েছিল কি না সেটাও চোখ বুজে বলা যায় না। কথা আদায় করতে তো বাড়িই চলে এসেছিল কুবলয়। রোদ ঝড় জল বৃষ্টি এক একটা দিন কেটে গেছে । দিন যেন মরুভূমি। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় থেকে কবিতা লেখার অভ্যাস ছিল মরালীর। এই মরুভূমি শব্দটাকে কেটে জুড়ে বাড়িয়ে অনেক থরথর শব্দ চয়ন করা যেতে পারত হয়ত, যেভাবে ডায়রির পাতা ভরিয়ে ফেলত এক জন্ম জীবন। অনেক ভাবতে চেষ্টা করেছে একটা শব্দ একটাই শব্দ কীভাবে শরীর হয়ে সামনে দাঁড়াতে পারে। চারদিকে জল রয়েছে মানুষ তার চলাফেরা শব্দ কাশি বাত কর্ম ছাড়াও ঢাক মাইক মিউজিক সম্মেলন ইত্যাদি ছত্রিশ রকম শব্দ তার ছবি নিয়ে রোজ কানে এসে দাঁড়ায়। মরালী পারবে কি তার ভেতরে মরুভূমি শব্দটা কে বুঝতে? পেরেছে বই কি! ‘না পারা’ শব্দ দুটোই তার অপছন্দ চিরকাল। ভাগ্য তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য ই করেছে চিরকাল না কি বলা যায় সে সাহায্য করেছে ভাগ্য কে। যেখানে জল নেই তপ্ত বালি জমে যাবার মত ঠান্ডা রাত আর শুধু কাঁটাঝোপ এমন টাই তো বলে মরুভূমি র সংজ্ঞা। ঠিক তেমন তেমন ই তো পেয়েছে সে। কত সাধ কত প্ল্যানিং তার। কুবলয় শুনে গেছে দিনের পর দিন, হাত কাজ করেছে ফিনফিনে জামার ওপরে একটু সাহস করে এগোলে একেবারে ভেতরেও ঢুকিয়ে দিয়েছে। সমর্পণের স্তনে গোপন অঙ্গে খেলা করে গেছে হাত তার, কান শুধু খোলা ছিল। কান দেখা যেত তবে খোলাই ছিল কি না টের পায় নি তখন মরালী। দুজনে একসঙ্গে থাকবে এক বিছানায় কোন লুকোচুরি ছাড়াই। পরস্পরকে শরীরে পাবার জন্য মরীয়া দুজন নর নারীকে শোবার লাইসেন্স কে তো বিবাহ বলে। আর যা কিছু ভারী মিষ্টি আইন ই কথা থাক তবু শুরুর শর্ত তো নিশ্চিন্ত শরীর ভোগ এ কথা চাপা দেওয়া যাবে না অন্তত নিজের কাছে। আয়নার কাছে। তারপরেও দু কথা থাকে জীবন। যৌনতার দ্বার টি খুলতে এগিয়ে আসে আকাঙ্খাতেই আর সে কামনা তৈরী হয় মানুষটার কথায় । হ্যাঁ শুধু কথা তাকে আচ্ছন্ন করে দিত। কী চমৎকার কথা বলে কুবলয়। হ্যাঁ বলে, শুধু বলতই না। আজও বলে। বাংলা ইংরিজী কবিতার লাইন উদ্ধৃতি চমকপ্রদ উইট কথা শব্দের উর্ণনাভ জাল ওকে টানত জালে আটকানো পোকার মত। প্রথম রাতেই চূড়ান্ত আঘাত মরালীর জন্য... না প্রত্যঙ্গের আঘাত নয় তা ছিল কথার আঘাত। এক রূঢ় ব্যর্থতার দায়ভাগ অশ্লীল তম শব্দ গুলো মরালীর মনের কান পুড়িয়ে দিয়েছিল সেই রাতে। তার অনেক চাওয়ার রাত। শেষের সময় টুকু তার মনে হচ্ছিল জল খেলে ভাল হত। খুব তেষ্টা।
*****************
একটা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করবে মরালী। কুবলয় ছাড়া আর কার সঙ্গে করবে! দুটো পিরিয়ড মিস করেছে। প্রেগ্ন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ। সামনে তিন চারটে চাকরির পরীক্ষা, কম্পিউটার কোর্স টার চূড়ান্ত পরীক্ষা কি করে সামলাবে এসব?
- শোনো আমার খুব ভয় করছে।
- ভয়ের কী আছে।
- এত গুলো চাপ সামলাব কি করে?
- নিও না।
- মানে? আমার এত দিনের প্রস্তুতি... তুমি যদি এই কোর্স টায় আমাকে ভর্তি করে দাও আমি ট্রেনিং নিয়ে পরীক্ষায় বসি
- ও আমি পারব না। পয়সা নেই। আমার তো কোন ট্রেনিং নিতে হয় নি? তোমার কেন লাগবে?
- পয়সা নেই মানে? আমি নিজে পারছি না বলেই তো
- তাহলে বাচ্চার জন্ম দিও না।
- মানে???
- খুব সহজ।
- আগে মনে হয় নি তোমার? আমি কি বলি নি বারবার এ রিস্ক হয়ে যাচ্ছে। তুমি শুনলে না কেন? কনসিভ করেছি প্রথম বার ... আমি তো দু দিক ই সামলাতে চাই...আমি ভাবতে পারছি না... তুমি আমায় একটু হেল্প করো প্লিজ
- খুব টায়ার্ড সারাদিন
- সারাদিন কিচ্ছু করো নি তুমি। অফিসে না গিয়ে অনির্বাণ এর সঙ্গে আড্ডা দিয়েছ তারপর বেরিয়ে গেলে মুভি দেখতে ...তুমি কি ব্যাচেলার?
- আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু আরগু উইথ ইউ। ডিসগাস্টিং... শোবার বিছানাতেও বউয়ের ঘ্যান ঘ্যান...
- শাট আপ... তুমি এভাবে অসভ্যের মত কথা বলতে পারো না আমার সঙ্গে
- এই... চুপ কর... আর মাল খালাস করে আয়
চারদিকে ছড়ানো কাঁটাঝোপেরা... এমনকী হলিউডের ছবি তেও মরুভূমি দেখলে বুক ছমছম করতে থাকে মরালীর।
************
ভোর খুব প্রিয় মরালীর। ভোরের শরীর যেন অনুভব করে সে প্রতিটি ইন্দ্রিয় দিয়ে। ভোরের গম্ভীর নির্মল বাতাস বুকের ভেতর দিয়ে প্রতিটি রন্ধ্রে ঢুকে যাচ্ছে তার। মন বুদ্ধি অহং বলে যেন কিছু নেই আর। যেন একটি ভাসতে থাকা ছিন্ন শুকনো পাতাটি সে... শুকনো তবুও প্রাণহীন নয়। তার দৃঢ় শিরা গুলি যেন নিশ্চিত প্রশান্ত কোন সাগর, মাটি স্পর্শ করতে মন আর চায় না। কোথাও ভাসতে ভাসতে মিলিয়ে যেতে চায় অনন্ত কোন দিগন্তে। এই সব ভোরগুলোতেই মন দিয়ে সেরে ফেলে তার নিজের কাজ । এক কাপ চা আর পরীক্ষার্থীদের খাতার বান্ডিল নিয়ে বসে। এই বেশ সময়। তার সকল ধ্যানের নিভৃতি এই ভোর। এই তো সময় কিছু লেখার কিছু ভাবার কিছু আঁকার... । আজ তাড়া নেই তেমন। মেয়ে তার কলেজ যাবে না। প্রজেক্টের কোন কাজেই তাকে অন্য কোথাও যেতে হবে। কাজ করতে করতে মগ্ন হয়ে গিয়েছিল মরালী চমক ভাঙ্গলো কলিং বেল এর আওয়াজে। কাজের মেয়েটিকে দরজা খুলেই আবার বসে পড়ল নিজের কাজে। প্রায় শেষ করে এনেছে খাতার আন্ডিল। তার ভালই লাগে পড়াতে পড়তে...। সে তো আজন্ম পড়ুয়াই মানুষ। শুধু মাঝের কটা বছর কেটেছে দুঃস্বপ্ন। উফফ বারবার বেলের আওয়াজে মগ্নতা ছিন্ন হয়ে যায়। উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই সত্যি বলতে কি... অবাক শব্দটা কি ব্যবহার করবে সে? মন টা তন্নতন্ন করে দেখল। এই দিন টার জন্য কত বছর অপেক্ষা করেছিল সে? এক দুই তিন চার ...জানে না অগুন্তি হবে... আসলেই কী কোন অপেক্ষা ছিল?
- ভেতরে আসতে দেবে?
ঠিক কপিবুক সিনেমার দৃশ্য। ঠিক কী করলে এই লোকটার সঙ্গে সবচেয়ে ঠিক আচরণ টা করা যায় আজও তা ভেবে উঠতে পারে নি মরালী। স্বভাব সৌজন্য মুখ থেকে বের করে দিল
- নিশ্চয়ই ভেতরে এসো
একরকম হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল কুবলয়। সামনে রাখা চেয়ারে বসে পড়ল বিনা আহবানে। যেন কত অভ্যাস এভাবেই বসে পড়া।
- খুব অবাক হয়ে গেছ তাই না?
- হ্যাঁ তা একটু
- আসলে আমার ... আমি ... তুমি কী জানো আমার খুব শরীর খারাপ... টেস্ট হয়েছিল ডাক্তার টিবি বলছে... আমার লাংস টা খুব... জানো বাবা মা কে তুমি দেখতে পারবে না কী অবস্থা তাদের...
মরালী তাকিয়ে ছিল ... না কুবলয়ের দিকে নয় সামনে খোলা খাতাটার দিকে। কান দিয়ে কথাগুলো এরকমই ছেঁড়া ছেঁড়া আসছিল... মন চলে যাচ্ছিল সেই সব ভয়ংকর দিনগুলোতে।
- তুই চোর
- তার মানে?
- হ্যাঁ তোকে বাজার করতে দিই কারণ তোর শ্বশুর কটা দিন বাজার যেতে পারছে না। তোকে যে টাকা দিই তুই তার অর্ধেক নিজের কাছে রাখিস। বানিয়ে বানিয়ে দাম বলিস এসে। খাবার বেলা তো কম খাস না তবু এত নোলা কেন তোর? বাপের বাড়িতে খাস নি বুঝি কিছু? শেষ কালে চুরি করতে শুরু করলি?
এত অবাক হয়েছিল শাশুড়ির এ কথায় যে তোতলাতে তোতলাতে চলে গেল বেড রুমে। তার প্রায় বাল্য প্রেমিক তার বেড়ে ওঠার প্রথম ডাকঘর তার প্রথম আর একমাত্র পুরুষ যাকে তার অপাপবিদ্ধ শরীর তুলে দিয়েছিল একদিন , সকালের উঠতি খটখটে আলোয় জিজ্ঞেস করেছিল সরাসরি-
- তোমার মা আমায় চোর বলছেন। তুমি তো জানো আমি ডায়রি তে সব হিসেব লিখে রাখি । তুমি শুনলে? কিছু বলবে না
- একশ বার ঠিক বলেছে মা। বাবা আমায় সব বলেছে। তুমি টাকাপয়সার গন্ডগোল কর। রোজ এত টাকা লাগে কি সে তোমার?
- মানে? তুমি জানো না কীসে লাগে? তোমাদের এত বড় সংসার হাজার টা পদ রান্না তার মধ্যে এখানকার বাজারের দাম তোমার বাবার তো সব জানা র কথা...। তুমি কি সত্যি আমাকে বলছ ...আমি চোর!
- বেশ করেছি। কোথাকার কে তুই? তুই চোর কোন সম্মান তোকে করার কারণ তো নেই। দে দে তোর হিসেবের খাতা। আজ থেকে সব টাকা বাবার কাছে থাকবে। তোকে আর বাজার যেতে হবে না। চোরের হাতে আমি আমার বাড়ির রিস্ক তুলে দিতে পারি না
কানে এল বলেই চলেছে কুবলয়-
- আমি একটা সংসার চাই এবার। আমি মামলাটা তুলে নিচ্ছি । তুমি একবার আমাদের বাড়ি এসে দেখে যাও ...প্লিজ...মনে আছে তোমার আমরা “দিল” সিনেমা টা যেদিন দেখেছিলাম। তারপর আমি তোমার বাড়ি আর তুমি আমার বাড়ি চলে গেছিলাম... তারপর ...
- তুমি কি চাও?
- একবার আমার ফ্ল্যাটে এসে দেখে যাও। একবার দাঁড়াও এসে , দ্যাখো আমি কীভাবে আছি
- তুমি এত রোজগার করো এত লোকজন এত পার্টি এত আলো...
- ও সব কিছু নয় , আমার ভুল হয়ে গিয়েছিল। আমাকে মাফ করে দাও তুমি
- ভুল? ...ভাবতে থাকে মরালী...ভুল কাকে বলে আর অন্যায় কী? এত সহজ সব কটা পাপ কে পাদ্রীর মত কনফেশনের ডিজাইনে পরিবেশন করলে মাফ করে দেওয়া। তারপর ঝরঝরে তারপর আগ মার্কা পুণ্যবান মানুষ ... স্টারটিং এ নিউ লাইফ উইথ নিউ এন্টারটেন্মেন্ট... টর্চার করাটা এক ধরণে মর্ষকাম ই তো, আমি আগুন তাতে ছ্যাকা দিচ্ছি আবার সোহাগ করার সময় পাতলা নাইটি পরিয়ে দিচ্ছি কীভাবে ক্ষতবিক্ষত করে ধর্ষণ করা যায় মোমের আলোয়... ভুল...এই একটু মিসটেক মাত্র...
যে দিকে দু চোখ যায় ধূ ধূ করে বালি আর বালি... সকাল থেকে তপ্ত হতে থাকে তার গা...চড়তে চড়তে পুড়িয়ে ফেলার মত আগুন তাত হয়ে যায় যেখানে মরুভূমি তাকেই বলে।
************************
স্টাফ রুমের গোলযোগে কান পাতাই দায়। বিরক্ত হয়ে নিজের মোবাইল টাই নাড়াচাড়া করতে থাকে মরালী। আজ সন্ধ্যায় তার কুবলয়ের ফ্ল্যাটে যাবার কথা। সেদিন সে সেকথাই আদায় করে নিয়ে গেছে। আজ হঠাত মনে হচ্ছে তার খাতায় কলমে আজও সে মিসেস কুবলয় হয়েই তো আছে। মনে মনেও কী তাই নয়? প্রতিটি দিন প্রতিটি ক্ষণ যে সময় কাটিয়েছে কুবলয়ের সঙ্গে হোক না নিষ্ঠুর তবু স্মৃতি তো তারই। সঙ্গেই তো বাস করল সে এক দুই পাঁচ বাইশ টা বছর। এর নামই কি বলবে সে প্রেম? তারও মর্ষ কাম আছে না কি! অত্যাচারিত হবার! তবে তো সে এখনও প্রাক্তন হয়ে যায় নি। আসলে তো বড় বেশি বর্তমান অযাচিত প্রত্যাখ্যাত এক বর্তমান হয়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে গেছে। বৃষ্টির ছাঁট গায়ে এলে, চেনা কবিতা চোখে পড়লে হাটে বাজারে স্কুলে বাসে সারাক্ষণ তাকেই সে মনে করে রেখেছে এতকাল... খুব মন খারাপ লাগল তার। আসলে খারাপ নয় একটা লজ্জা এল। সে কি মানুষ! যার আত্মশ্রদ্ধা নেই তাকে মানুষ বলা যায়! মন স্থির করল সে। নাম্বার টিপল মোবাইলে। ওপ্রান্তে ফোন তুলতেই শুধু বলল-
- আমি মরালী কথা বলছি। ভেবে দেখলাম আমার যাবার কোন কারণ নেই। অসুখ হয়েছে ডাক্তার দেখাচ্ছ ঠিক হয়ে যাবে তুমি। আর একটা কথা বলি আমার বাড়ি আর এসো না। তোমার মামলা তুমি তুলবে কি না তোমার ব্যাপার। আমি একটি নতুন মামলা আনছি বিবাহ বিচ্ছেদের। আর আমি ফিরবো না। আমি যেমন আছি তেমন থাকতে চাই তোমার বর্তমানে আমার রুচি আর নেই।
লাইন কেটে দিল অক্লেশে। ঠিক ছিল আজ একটা সিনেমা দেখতে যাবে ওরা দুজন , মানে দেবায়ুধ আর সে, তারপর রাতের ডিনার সেরে বাড়ি। মাঝে মাঝে শহরে দেবায়ুধ এলে ওরা একসাথে থাকে। একসঙ্গে সিনেমা দেখা এক সঙ্গে বই পড়া একসঙ্গে গান শোনা... একসঙ্গে আজ ঝড় দেখবে। বাইরে ঝড় উঠেছে। শাড়ি ব্যাগ সামলাতে সামলাতে স্কুল থেকে বেরোল সে। আকাশ দেখা যায় না হঠাত এত মেঘ... গুরুগুরু ডাক শুরু হয়েছে। ক্রমশ জলের ঝিরিঝিরি ঝাপট চশমার কাচে... নীল অঞ্জন ঘন পুঞ্জ ছায়ায়... দূরে এসে দাঁড়িয়েছে ওর ট্যাক্সি। দরজা খুলে উঠে পড়ে ট্যাক্সিতে মরালী রায়, এক্স ওয়াইফ অফ কুবলয় মিত্র।

মরুভূমির মাঝে উর্বর এক ফালি জায়গা যেখানে জল পাওয়া যায় বৃক্ষ ইত্যাদিও তাকে বলে মরুদ্যান...