লাইন্সম্যান

তুষ্টি ভট্টাচার্য

লাইনের পাশে পাশে ছুটছি । কোনভাবেই যেন চোখ না এড়ায় , লাইন পেরোলেই ফ্ল্যাগ তুলব , সে তুমি যত স্টারই হও না কেন ! “তোর মাকে চুদি” কিম্বা “ফাক ইউ” শুনে আমি অভ্যস্ত , ওসব খিস্তিখামারি আমি পকেটে গুঁজে রেখেছি আমার তৃতীয় খেলার পর থেকে । প্রথমদিকে খুব অপমানিত লাগত , এখন চামড়া মোটা হয়ে গেছে । আমি শক্ত হাতে ফ্ল্যাগ ধরে রাখি শুধু আর চোখ থাকে লাইনে । লাইনের বাইরে বল গেলেই ফ্ল্যাগ তুলি । লাইনের পাশে পাশে ছোটা আমার নেশা হয়ে গেছে । এমনকি ঘুমের মধ্যেও আমি লাইন দেখি । আমার ঘুমও লাইন পেরোতে পারে না । আমি নিয়ম করে রাত এগারোটায় ঘুমোই আর ভোর চারটেয় উঠি ।
অথচ হরদমই লাইন পেরিয়ে যাচ্ছে অনেকেই । আমি দেখি সব , সতর্ক করি অনেকবার , তবু বল কন্ট্রোল করতে পারে না কেউ কেউ । বল লাইন পেরিয়ে গেলে তখন তো আমার করার কিছু থাকে না । এভাবেই সতর্ক করেছিলাম পাশের বাড়ির রুনা বৌদিকে । রোজ দেখতাম কিভাবে যেন একটু একটু করে লাইন পেরোবে বলে মাঠের ধারে এগিয়ে আসছে বেপাড়ার এক ছোকরার ডাকে ! আমি তো আর রেফারী না , আকারে ইংগিতে বারণ করেছি , একদিন তো সরাসরি ডেকে বোঝালাম , কিন্তু রুনা বৌদি তখন নেশায় পড়েছে , আমার বারণ শুনবে কেন ! গর্জে উঠে বলেছিল , “ তোমার অসীমদা কি আমার শরীরের জ্বালা মেটাতে পারবে ? দু মিনিটেই তোমার দাদা উপুড় হয়ে পড়ে । আমি যে জ্বলে পুড়ে মরি , দেখেছ কখনও সেটা ? মেয়ে হয়ে জন্মেছি বলে কি শরীরের খিদে থাকতে নেই ! “ আমার আর কিছু বলার মুখ ছিল না সেদিন । শেষ পর্যন্ত যা হওয়ার তাই হল , রুনা বৌদি পালালো রাতের অন্ধকারে । অসীমদা খুব মুষড়ে পড়েছিল , পাড়ায় বেরোত না , ক্লাবে আড্ডা দিত না বহুকাল । তবে সেসব যতটা না বৌয়ের শোকে , তার চেয়েও বেশি বৌ পালানোর লজ্জায় । অনেক পরে খবর পাওয়া গেছিল – রুনা বৌদি এক বস্তির ঘরে খুব অভাবের সাথে দিন কাটাচ্ছে । তবে এবারে সে মা হতে পেরেছিল । জানিনা , রুনা বৌদি সুখী হয়েছিল কিনা ! বল লাইন থেকে বেরিয়ে গেল , আমি ফ্ল্যাগ তুললাম যথারীতি , কিন্তু অপোনেন্ট টিমের কেউ বল নিতে এলো না এবারে , এই প্রথম বার এমন কান্ড ঘটল !
সেবারে এক স্টার টিমের সাথে এক এক মাঝারী দলের খেলা পড়ল । অভিজ্ঞ রেফারীকে আনা হল ম্যাচ পরিচালনার জন্য । সেই স্টার দলে একজন হেভিওয়েট ফুটবলার ছিল , যাকে মার্কিং করতে নেমেছিল দুজন । ওরা দুজন এমনভাবে লেপ্টে ছিল হেভিওয়েটের গায়ে , যে সে বেচারি নড়াচড়া করতে পারছিল না স্বাভাবিক ভাবে । ফার্স্ট হাফের পর তিনি ধৈর্য্য হারালেন । পেনাল্টি বক্সের ভেতরে একজন মার্কারকে মোক্ষম জায়গায় লাথি চালালেন বেপরোয়া ভাবে । রেফারী সব দেখেও পেনাল্টি দিলেন না , রেড কার্ডও দেখালেন না । ফাউলের বাঁশি বাজল শুধু । আমিও দেখলাম সব । দেখলাম এবারেও বল লাইনের বাইরে চলে গেল আর আমি হাত পা গুটিয়ে পাথর হয়ে গেছি । কিছুতেই আমার ফ্ল্যাগ তুলতে পারছি না ।
বয়স বাড়ছে বুঝতে পারছি । শরীরের বয়সের সাথে সাথে মনেরও । লাইন বরাবর ছুটতে ছুটতে আজকাল হাঁফিয়ে উঠি । বাড়ি ফিরে ক্লান্ত লাগে । চোখের দৃষ্টিও কেমন ঘোলাটে হয়ে আসছে । রাতে বৌয়ের পাশে শুতে গিয়ে চোখ যায় মেনোপজের দোরগোড়ায় দাড়াঁনো ঝুলে যাওয়া বুকের দিকে । লিঙ্গোত্থান হয় না , মনে হয় একবার “মা” বলে ডেকে মাইদুধ খাই । কিছুই করা হয় না শেষমেশ , পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ি । ভোরে উঠে যখন মাঠে ছুটতে যাই , তখনো যেন আমার হাতে ধরা থাকে এক অদৃশ্য ফ্ল্যাগ । এক কায়াহীন বলকে ছুটে যেতে দেখি এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে । কিছুতেই সেই বল মাঠের বাইরে আসে না । আমার অদৃশ্য ফ্ল্যাগ আমার হাতেই রয়ে যায় মাথা নীচু করে । মাঠে খেলার সময়ে দূরের বল ঝাপসা লাগে । ওপারের গোলপোস্ট যেন ধোঁয়ায় ঢেকে আছে মনে হয় । অস্পষ্ট বলটাকে নিয়ে কারা যেন মারামারি করছে বলে ভুল হয় । চোখ রগড়ে আবার খেলায় মন দিই , লাইনের পাশে দাঁড়াই কড়া পাহারায় । বল আসছে লাইনের দিকে , আমি শক্ত করে ধরি ফ্ল্যাগের হ্যান্ডেল । আর একটু দূরে আছে বল , আরও একটুখানি অপেক্ষায় থাকতে হয় আমায় । এই তো আসছে আমার কাছে , আর কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা ... ধৈর্য্য হারাচ্ছি ক্রমশ ... এই কয়েক মুহুর্ত যেন কয়েক বছরের মত সময় নিয়ে আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে লাইনের পাশে ; পাহারাদারের আদল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমি - এক লাইন্সম্যান ।