জ্বলন্ত পা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন কবি

প্রীতি আচার্য ও সমরজিৎ সিংহ

সত্যবতী
আমি সেই বিধবা মৎস্যকন্যা,
কোনো সাবানেই গা থেকে যার
আঁশটে গন্ধ দূর হয় না ।

পুরুষ দর্শনে পাঁকের ভেতর
ফুটে ওঠে যার নীলপদ্ম

জনসমাজ বিক্ষুব্ধ হবে, জেনেও ।


গার্গীর ডায়েরি

কোনো আত্মীয় বাড়িতে, অনুষ্ঠানে আমি
এখন যাই না আর । গেলে,
সেই উষ্ণ আলিঙ্গন, সমাদর কোথাও পাই মা ।

কেন না, আমার হাত খালি । শাঁখা নেই ।
বন্দীত্বের চিহ্ন নেই । সিঁথি পারিনি রাঙাতে ।
পাশের চেয়ার খালি থাকে অনুষ্ঠানে ।

একা যাই, একা খেতে বসি ।
এই স্পর্ধা আর স্বাধীনতা সাত পৃথিবীর সকল নারীর ।


চিররূপিনী

ব্রাহ্মণ তুমি নও, জানিয়া, শাস্ত্র মানিয়া
তোমার বামহস্তের বাজুতে একখানা সম্পূর্ণ সাদা সূতা
বাঁধিয়া দিলেন বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ ।
যাহা তোমার স্বামীর দেহ হইতে পৈতারূপ ধারণ করিয়া
নামিয়া আসিয়াছে ।

আজ হইতে তুমি ব্রাহ্মণী হইয়াছ ।
স্বামীর অনুসরণই তোমার ধর্ম ।
শুধু জানিবে, ব্রাহ্মণী সাজিবার সৌভাগ্যলাভ করিয়াছ,
এই শালগ্রাম পূজা করিবার অধিকার
তোমার নাই ।কেন না, শাস্ত্রবিধান অনুসারে
তুমি কর নাই ব্রহ্মলাভ ।

নাচ

পায়ের পাতায় আগুন গুঁজে বলেছিলে
নাচ, ময়ূরী, নাচ ।পেখম তুলে নাচ ।

যার পাখা নেই সে কতটা পেখম তুলে নাচবে
তুমি তা ঠিক জানতে ।জানতে বলেই

তোমার ঐ চাবকানো হাতের সামনে কোনোদিন
তুলে দিইনি পায়ের মুদ্রা ।


অহল্যা

কোনো সংকেত ছাড়াই তোমাদের নির্দেশিত পথ ছেড়ে
একা একা যদি হাঁটি; ও মরু, কাঁকড়
বলো, তাতে কার ক্ষতি ?

আমি তো জন্মেছি দগদগে জ্বলন্ত পা নিয়ে ।





জ্বলন্ত পা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন কবি

বাংলা কবিতা, সেই শুরু থেকে, পুরুষপ্রধান । প্রিয়ম্বদা দেবী, কুসুমকুমারী দাশ, এরকম দু-একটা নাম বিদ্যুচ্চমকের মত উল্লেখিত হলেও, পঞ্চাশের দশক অবধি উজ্জ্বল কোনো নাম বাংলা কবিতার ভুবনে পরিলক্ষিত হয়নি ।
মূলত পঞ্চাশ-এর দশক থেকে, ধীরে ধীরে, আমরা লক্ষ্য করি, বাংলা কবিতা চর্চার ক্ষেত্রে, পুরুষের পাশাপাশি নারীর উজ্জ্বল উপস্থিতি । সংখ্যার দিক থেকে নগণ্য হলেও তাদের কবিতা নাড়া দিয়ে গেলো পাঠকের ভুবন । কবিতা সিংহ, নবনীতা দেবসেন, বিজয়া মুখোপাধ্যায় বা দেবারতি মিত্রর কবিতায় স্পষ্ট হতে লাগলো নারীস্বর ।
আশির দশক থেকে, দেখা গেলো, বাংলা কবিতা শাসন করতে শুরু করেছে নারীরাই । সুতপা সেনগুপ্ত, চৈতালী চট্টোপাধ্যায়, সংযুক্তা বন্দোপাধ্যায় থেকে শুরু করে আরও অনেকের কবিতায় প্রধান হয়ে ওঠলো নারীস্বর ।
শূন্য দশকের কবি প্রীতি আচার্যর কবিতায় এই নারীস্বর দেখা গেলো ভিন্নরূপে ।‘যে মন্ত্রে তোমাকে পুড়েছে এতকাল/ দেবি, সে মন্ত্রে আমি আজ শাস্ত্র পোড়াই ।‘ প্রীতির এই উচ্চারণ দ্রোহের, এই উচ্চারণ পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধেও । অথবা, ‘একটি হাত আমার এক স্তনে,/আরেক স্তনে একটি ঠোঁট/হাত আমাকে জাগিয়ে রাখছে/অসহ্য অস্বস্তিতে/ঠোঁট টেনে নিচ্ছে এক পুরুষের পুষ্টি ।/এই হাতটিকে আমি চুমু খেয়ে বলি, সন্তান ।/হাত আমাকে বলে, তুই নারী ।‘(সংজ্ঞা/ইউরেনাসের মেয়ে) ।এই কবিতায় দ্রোহ নয়, রয়ে গেছে চাপা অভিমানও, যে অভিমান প্রতিটি নারীর ।
প্রীতির কবিতায় সমাজের বিরুদ্ধে, সকল ভুল নিয়মের বিরুদ্ধে একদিকে দ্রোহ, আর একদিকে নারীর আত্মপরিচয় যেমন রয়েছে, ভালোবাসার এক আশ্চর্য আকুতিও সমপরিমাণে পরিলক্ষিত সেখানে যা বিস্ফোরকও বটে ।‘জাতিস্মর নও তুমি, নও পরজন্মবাদী/এ জীবন বিধান মেনে তারা দিলেন/যোনিসাধনের শুচিদেশে/ বলো মেয়ে, তুমি কি এই জন্ম চেয়েছিলে ?’ (প্রাচীন ভারত)। এই কবিতায় প্রীতি যেন আরও তীব্র, আরও যেন বিস্ফোরক ।নারী, এই শব্টির অবমাননা পুরুষের হাতেই, আবার সে পউরুষই নারীর দয়িত ও সন্তান ।এই বোধ, এই দোলাচল সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন প্রীতি তার কবিতয় ।

সমরজিৎ সিংহ