দুঃখের দিনের বন্ধু

বিভাস রায়চৌধুরী ও মণিকা চক্রবর্তী


বিশ্বাস
অনেক গাছের নীচে তুমি নেই কোনওদিন...

হাওয়া এসে ঘুরে যায়
জল থেকে চুপচাপ উঠে আসে হাঁস

পৃথিবী বিশ্বাস চায়... একটু বিশ্বাস...

কত গাছ অপেক্ষা করছে
এক জীবন... দুই জীবন!

এত শূন্যতায় বেঁচে থাকতে ভাল্লাগে না কারও

যেসব গাছের নীচে তুমি নেই কোনওদিন,
একাই দাঁড়িয়ে থাকি...

কী একটা বিশ্বাস ফিরে আসতেও পারো...


কেউ

মানুষ অবুঝ প্রাণী। তার একটাই ভাষা।

কোনও গাছ, কোনও প্রাণী কাঁদে না কখনও, কবি।

তারা হয় পায়, নইলে মরে যায় চুপিচুপি।

মানুষ অবুঝ । কান্না তার এক ধরণের দাবি।

তুমি কি তেমন অবুঝ?
তবে কাঁদো... কাঁদো, কাঁদো...
কান্না হোক নিয়ত ধারালো!

মানুষ অতৃপ্ত প্রাণী।
বৃষ্টির ভেতর কবে বেরিয়ে পড়েছি
প্রাণহীন... আবরণহীন...
চকিতে তবুও মনে হয়,
নেতুর ওপরে চুপিচুপি
একনিশ্বাসে কেউ কি দাঁড়াল?


শূন্যতা

ঠোঁটের অভাব বুঝি।

পাখির অভাব।

ক্রমশ ফুরায় আয়ু...
ক্রমশ জগৎ ঘন...

আমার জীবন আর
প্রসবকাতর গাছ
যদি এক ভোরবেলা
কাছাকাছি আসে,
কোনো কথা বলবার নেই...

কোনো কথা বলবার ছিলো না কখনও


প্রবল বৃষ্টির পর


দুঃখগুলো পার হয়ে আসি...
পার হতে হয়...

মরা ডালে পাতা গজানোর
দিনে বুঝি মনেই পড়ে না
দুঃখ এক শাশ্বত বিষয়...

কোনও একদিন
প্রবল বৃষ্টির পর
সামান্য ঝিঁঝিঁর ডাকে
হাউমাউ ফিরে আসতে পারে!

কাকে বলে বেঁচে-থাকা?
দুঃখের দিনের বন্ধু চোখে জল এনে
চেনা দিয়ে যায় বারেবারে...


বিষাদের মাছগুলি

এই জল মূলত আমাকে
চিন্তা দেয়, আমি তার
পাশে জুবুথুবু বসে থাকি...

একটি অর্জুন গাছ মায়াবী জন্মের
ছায়া ফ্যালে জলে...
বিষাদের মাছগুলি ঘোরে ফেরে আর
আমি ভাবি শিরায় শিরায়
অন্ধকার বাজায় নিজেকে!

এভাবেই দেহত্যাগ নিয়ম হয়েছে...
সকল নির্জনে
জল প্রবাহিত হয় জলের অধিক...

দুঃখের দিনের বন্ধুকে নিয়ে অবকাশের দুপুর

‘ দুঃখের দিনের বন্ধু ’ শিরোনামের কবিতাগুলো পড়লাম। বেশ কয়েকবার। বিভাস রায়চৌধুরীর কবিতা আরও আগেও পড়েছি । ভাল লেগেছে। অনেক পথ হাঁটার পর জলের ধারে বসে যেমন শরীর আর মনের আরাম হয় তেমন একটা অনুভব পেয়েছি কবিতাগুলো গভীর ভাবে পাঠের শেষে। ‘শূন্যতা’ কবিতাটিতে মিশে আছে বিষন্নতার অনুভব। আমাদের জীবনের ক্লান্তি , বিষাদ আর অবসাদের অনিবার্যতায় মরে যাওয়া সময়গুলো যখন নিথর চুপচাপ হয়ে ওঠে , যখন আমরা ষ্পষ্টতই জেনে যাই ,‘ঠোঁটের অভাব,পাখির অভাব’, তখনও কোনো এক ঘন গভীর অন্তরঙ্গতার সুর বেজে যায় একাকী। একাকী বেজে যাওয়া সুরে থাকে কান্নার রেশ। ‘কোনো কথা বলবার ছিল না কখনো’। সমস্ত আকাঙ্খা আর প্রয়াসের ভিতরেও কোথাও থেকে যায় আড়াল । বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণা। কেবলই বিচ্ছিন্নতা, অপারগতা, আর অসম্পূর্ণতা। পরষ্পরকে খুঁজে না পাবার আর্তি।

২.
খুব সরলভাবে শুরু হওয়া ‘কেউ’ কবিতাটি যেন দ্বিধাহীনভাবে কিছু অভিজ্ঞতালব্ধ সিদ্ধান্তকে জানাতে চাচ্ছে। যেমন,‘মানুষ অবুঝ। কান্না তার এক ধরনের দাবি।’ কবি যেন নিজেকে খনন করতে করতে জেনে গেছেন নিজের মধ্যে থেকে প্রকাশিত কোন গাঢ় উত্তর। মানুষ যখন দ্বন্দ্বের যন্ত্রণায় অস্থির ,নিজের আগুনে দগ্ধ হয়ে কান্নায় শীতল তখন ‘কান্না হোক নিয়ত ধারালো!’ আগের দুটো লাইন তীব্র হয়ে এখানে এসে যেন চেষ্টা করছে ঘুরে দাঁড়াতে। কিছুটা সংশয়! সহজভাবে ,সহজভাষায় গভীর চিন্তার সংযোগ কবির প্রতিটি কবিতায় আছে। চমৎকার চিত্রকল্প । যখন বৃষ্টির ভেতরে বেরিয়ে পড়া মানুষটি ‘প্রাণহীন, আরণহীন’। মানুষটির একাকী কন্ঠস্বর জেনে গেছে কোনো প্রেম পূর্ণ হয় না, তাড়া খাওয়া মানুষ নিজের কাছেই পলায়নরত, সম্পর্কগুলো তলিয়ে গেছে বহু আগে তবু তার কেন হঠাৎ মনে হয় সম্পর্ক-সেতুর ওপরে কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছেন একনিশ্বাসে। বিচ্ছেদের ফাটলগুলো সাঁকো দিয়ে ভরে থাক সবসময়। কবিতাটি পড়তে পড়তে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাই সর্ম্পকের সেতুটিকে।

৩.
‘বিষাদের মাছগুলি’ কবিতায় জল শব্দটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের মানসলোকে এক দৃশ্যময়তা তৈরি করে । আক্রান্তের চারপাশে জলের আরাম, আলোছায়া আর বিপরীতবর্তী অন্ধকার:
বিষাদের মাছগুলি ঘোরেফেরে আর
আমি ভাবি শিরায় শিরায়
অন্ধকার বাজায় নিজেকে!

এই জলের কবিতাটি অন্য এক অনুধাবনের মাত্রা তৈরি করে। জল ও মানব সম্পর্ক। লিরিকের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুগ্ধতা অন্য এক জলের দিকে আমাদের অনুভব ও মনোযোগকে টেনে নেয়। জলের গভীরে ডুবে যাওয়া এক অদৃশ্য কান্না । মাথা নিচু করে বসে থাকা গাছের তলায় যখন অন্ধকার। কয়েকটি লাইনে সংযত এই কবিতা অল্প অল্প বলে যাচ্ছে ভেঙে ভেঙে থেমে থেমে। কিন্তু তার প্রবহমানতা যেন বিলম্বিত লয়ে আমাদের নিয়ে যেতে থাকে কোন এক ইতিহাসের দিকে। জলের সাথে জীবনের যোগসূত্র ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।‘ সকল নির্জনে’ এই শব্দদুটি এখানে যেন অন্য একটি বার্তা নিয়ে আসে। প্রবাহিত জল যখন জলের অধিক তখন সেই পারে ভাসিয়ে নিতে সকল অন্ধকার ,বিষাদ আর স্থবিরতাকে। জলই পারে সব ভিন্নতাকে একাকার করে নিতে। যে মানুষটি জলের কাছে বসে থাকে জুবুথুবু , সে মানুষটি জলের গভীরে কোনো এক অন্ধকারকে অবলোকন করে আর এই অন্ধকার যেন হয়ে ওঠে অনিবার্য। অথচ জলের আয়নায়তো স্বচ্ছতাই থাকার কথা। আমাদের প্রত্যাশাকে অতিক্রম করে পরের স্তবকে জলরাশি বলে ওঠে সলিল সমাধির কথা। জলের গভীরে উল্লসিত হবার পরিবর্তে জলের বিষাদের মুখোমুখি হই। জল তার প্রকৃত রহস্যকে ঢেকে রেখে অন্য এক জলের দিকে আমাদের বিবেচনাবোধকে নিয়ে যেতে থাকে।

৪.

বিভাস রায়চৌধুরীর ‘ দুঃখের দিনের বন্ধু ’ সিরিজের লেখা প্রত্যেকটি কবিতায় একটি বিশেষ নির্মাণকুশলতা রয়েছে। প্রতিটি স্তবকের উপরের বিশেষ চিহ্ন এবং তার পরের পংক্তিগুলো নির্দিষ্ট বক্তব্যকে প্রকাশ করছে । কবিতাগুলোতে স্তবকের সংখ্যা তিনটি বা চারটি। কোনো কোনোটি এক লাইনেই প্রকাশ করছে সম্পূর্ণতা। কখনও পংক্তির শেষে সংশয়। কবির নিজস্ব মনোজগতের আলোছায়ার ছায়াকথন। আমাদের ব্যক্তিগত উপলব্ধির স্তরকে এক বিশেষ মাত্রায় নিয়ে যায়। অন্তত আমি তো এই সব টুকরো টুকরো কবিতার টুকরো টুকরো সময়কে নিয়ে এক অপূর্ব রূপের মধ্যে ঢুকে পড়ি। নিবিড় ভাবে অনুভব করি কবিতার বিষাদ। যদিও এই সিরিজের প্রতিটি কবিতাকেই আমি বলব প্রত্যেকে প্রত্যেকের সাথে সর্ম্পকযুক্ত। পড়তে গিয়ে মাঝে মাঝে মনে হয় বিষয় ও আঙ্গিক পরষ্পরকে জড়িয়ে লেপ্টে আছে। যেন একটি ঢেউয়ের পর অন্য একটি ঢেউ এসে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। এই ছোট্টো ছোট্ট কবিতাগুলো পড়তে যেয়ে এক ঘোর আর তীব্র জাদুটান অনুভব করি। সম্মোহিত হই। কবিতায় যে অনিবার্য প্রতীকগুলো এসেছে তা আমাদের ক্রমশ নিয়ে চলে মানবজীবনের গভীর পরিণামে। পড়তে পড়তে কল্পনা করি কবিতাগুলোর নির্মাণের দ্বান্দ্বিক পটভূমি। বন্দি জীবনের আনুগত্যের ভিতর এই কবিতাগুলো আমার কল্পনাকে উস্কে দেয়। সকল সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে স্বপ্নলোকের দিকে নিয়ে যেতে চায় যেখানে বাস্তব ও স্বপ্নের দ্বন্দ্ব ভেঙে বহুবিস্তৃত ভ্রমণের পথটি আমি পেয়ে যাই ।


৫.

‘কী একটা বিশ্বাস, ফিরে আসতেও পারো..’

জীবনের নানা বাঁকে এসে বারবার যেখানে আশ্রয় নিয়েছি , আহত মন নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছি তা ছিল কবিতার কোনো বিস্ময়কর পঙ্ক্তি। মুগ্ধতা আর বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করেছি কতটা বিষয় লুকানো আছে কবিতার রহস্যময় শরীরে। চমকে গেছি। কখনও সারাদিন কেটেছে ঘোরে। কখনও কখনও হঠাৎ তোলপাড়। এসব উথাল-পাতাল সময়ের পর নিজের অস্তিত্বের ভিতর একইসঙ্গে আবিষ্কার করেছি স্থির আর চলমান সময়কে। আমরা যখন একই সময়ে জানি জীবন ও শূন্যতাকে তখন দীর্ঘ হতে থাকে আমাদের বিষাদগুলো। আলো-অন্ধকারের দ্বন্দ্বমুখর অবস্থানে অবিরাম চলতে থাকে টানাপোড়েন। এই টানাপোড়েনের মধ্যে আমরা স্থিত হতে চাই বিশ্বাসে। এই কবিতাগুলোর শরীর যেন ধোঁয়াশায় গড়া। শব্দগুলো এমনই ছেঁড়া ছেঁড়া তুলোর মতো ভেসে যেতে থাকে। আবছা ভাবে গড়ে ওঠা কবিতার শরীর কখনও ক্রমশ স্পষ্টতা পেতে যাচ্ছে আবার কখনও ভেঙে যাচ্ছে। যিনি লিখেছেন তার নিঃশব্দ লিখন যেন অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য নয়। প্রতিটি কবিতায় এক আবছা অনুভব আলতো ভাবে সংকেত দিয়ে যায়। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যেতে যেতে এক আলতো টান অনুভব করি। আলো-আঁধার-দূর অতীত,বর্তমান সবকিছু মিলিয়ে আছে কবির কোনো অনবদ্য অনুভূতি । ব্যর্থতা, দুঃখ,অতৃপ্তি, নির্মোহতা কবিতাগুলোতে এনেছে অন্য এক শিল্পময় দ্যুতি। বিভাস রায়চৌধুরীর কবিতা আগেও অনেকবার পড়েছি ,ভাল লেগেছে । এবারের কবিতাগুলো পড়বার পর তাঁকে আর একটু কাছ থেকে জানতে পারলাম বোধ হয়।