অধিবিদ্যা সিরিজ

কুমার চক্রবর্তী ও চঞ্চল আশরাফ

১.
অধিবিদ্যা
অস্তিত্বহীন এমন কিছু রয়েছে যা অধিকার করে রাখে আমাদের। গত রাতে নদীদের গতিপথ খুঁজতে গিয়ে দেখা পেলাম সেই গাছপালাদের
যারা সময়ের বাইরে বাস করে অনন্তের অধিবিদ্যার কথা বলে গেল আমাদের।অজানার উদ্দেশে এখানে রয়েছে এক মন্দির যেখানে প্রার্থনা করে পাখিরা। ছায়ার পৃথিবী একথাই প্রমাণ করে যে মানুষ আর প্রকৃতির মাঝে বিরাজ করছে এক টলোমলো ঐক্য, সুতরাং প্রথম কাজ হলো যা কিছু অস্তি¡ত্বময়, তার ক্ষণভঙ্গুরত্বকে প্রতিষ্ঠা করা।বৃক্ষদের অধিবিদ্যা হলো নিজ জন্মমৃত্যুর ক্ষণকে অনিশ্চিত করা, পাখিদের অধিবিদ্যা হলো নিজেদেরকে প্রকৃতির প্রতীক করে রাখা। আর মানুষের অধিবিদ্যা হলো মৃত্যুর পর জীবনের কথা বলা।
মনে রেখো, অস্তিত্বহীন আমি এখনও চর্চা করি অস্তিত্ববিদ্যার, যা তোমাদের অসোয়াস্তিতে ফেলে। আমার ভুলগুলো হলো আমার বিম্ব ও প্রতিস্ব, আর শুদ্ধগুলো হলো তোমার নিজস্ব øায়ুসন্ধির সৌন্দর্য।
আরও মনে রেখো, যা অসীম তার কোনো অস্তিত্ব থাকে না।




২.
অধিপ্রাণবাদী
মুক্ত হতে গিয়ে আটকে যাচ্ছি প্রতিটি বস্তুর ঘনত্ব-ছায়ায়। যা কিছু শিখেছি তা ছুড়ে দিচ্ছে আমাকে সংশয়বাদে, আর যা শিখিনি তা-ও ছুড়ে দিচ্ছে আমাকে অস্তিত্ব ও প্রতিভাসের খমধ্যবিন্দুতে। এক শান্ত বিমূর্তকরণ আমাকে ভ্রমণ করে, দেখে নেয় নিবৃত্তি এবং নিশ্চেতনের খাদগুলোকে, অন্তর্নারীত্ব আর অন্তর্পুরুষত্বের উভবলতাকেও পরখ করে নেয় আমার অপবেদন। যে রক্তকে লাল মনে হয়, আসলে তারা নীল, কারণ তা না হলে ব্যথা হতে পারত না পরানুভব।
মৃত্যুপরবর্তী কোনোকিছুতে বিশ্বাস না করেই আমি চাই অমরত্ব, খ্যাতি, ব্যক্তি-অভিন্নতা আর ঈশ্বর, পৃথিবী ও মানুষ সম্পর্কে না জেনেই আমি চাই হতে অধিপ্রাণবাদী। আমার রয়েছে জানা ও না-জানার সমুদ্র যা আমাকে কখনও একা করে, কখনও বা করে অসংখ্য।





৩.
মহাবিশ্বমানচিত্র

মৃত্যুর আগেভাগে এমন একটি পুস্তক রচনা করে যাব যা জীবনের কথা বলে যাবে অনন্তকাল। তোমরা দেখবে তা, পড়বে তার অবোধসংবেদ, আর ভাববে, মৃত্যু দিয়েই যেন রচনা করেছি আমি এইসব জীবনবিদ্যা, এইসব ক্ষীণবুদ্ধিকর অসম্বন্ধতার মহাভাব।
বেঁচে থাকবে তোমরা স্বপ্নবিশ্লেষণ আর রীতিবিশ্বাসে। যখন সজ্ঞানতা বহিস্তরে রচনা করবে কুহকের রসায়ন, যখন অদৃশ্য এসে উপহার দেবে জরাবিদ্যার সমাপ্তিপাঠ, তখন খুলে বসো আমার পুস্তকটি, পাবে, সত্যিই, পাবে প্রকৃত আফিমের স্বাদ। তোমরা ঢুলবে, আর তাতেই খসে পড়বে পৃথিবীর যাবতীয় স্মৃতি ও সীমাহীনতা।
মহাবিশ্বমানচিত্র এক ত্রিমাত্রিক ধারণা, তাতে তোমরা পথ হারাবে আর তখন ধরতাই হিসেবে তোমাদের কাজে লাগবে আমার এই শব্দহীন পুস্তকখানা।

৪.
আমি আর অন্য
আমি আর অন্য আলাদা নয় কিছু। আমাদের উপস্থিতি এক, শুধু দৃশ্যমান বস্তুগুলোই আলাদা করে দেয় তাদের। সীমান্তভূমিতে কিছু গাছ: গর্জন, ফার বা ওক, অথবা সাইপ্রেস। নগ্ন, যেন নগ্নতাই তাদের পোশাক।
ডানা প্রসারিত করেও যারা উড়তে পারেনি, তাদের জন্য রাত আনে বেদনার স্বস্তি ও স্বান্তনা, তারা নগ্ন ঈশ্বরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হয়ে গেল অন্ধ।
যে ফুল ফোটে তা নয় বসন্তের দান, তা হলো ফুলেরই আত্মার বিকাশ, পাতা যাদের আবৃত করে রাখে।
আমার রহস্যবাদ কোমল প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করে না। যে বাতাস বয়ে চলে তা স্বচ্ছ কিন্তু পরিষ্কারও করে না কোনোকিছু। সুতরাং জীবনের মানে হলো এমন অর্থময়তা যা জীবনকে অর্থহীন করে। কেননা যে আকাশ আমরা দেখি তা স্বর্গে ও নরকে এক।
গাছেদের নিকটে যাই, ভালো লাগে, কেননা তারা ব্যক্ত করে না কোনো দর্শন, শুধু ধারণ করে একা হয়ে থাকে। জীবনকে এমনই হতে হয়, নীরবতা আর সমুদ্রের ঢেউ, যা শান্তভাবে একা করে চলে আমাদের।
আমিও তাদের মতো হব আর নিজেই আস্ত এক নিশ্চল-দর্শন হয়ে রইব অনন্তকাল।




৫.
কোমল আর কড়ি

কোমল আর কড়িতে যেটুকু পার্থক্য, সেটুকু নৈকট্য নিয়ে তোমার কাছে আসি। বিহ্বলতা রয়েছে, এখানে। রয়েছে সংগীতের মতো গান ও গৌরব।
ঘুম আমাকে দেয় স্বপ্ন, আর স্বপ্নে ঘটে স্মৃতির মৈথুন। নিঃশ্বেষচেতনা যে অবসন্নতার জন্ম দেয় তাকে আমি প্রশ্ন রাখি---কে সবচেয়ে নিঃসঙ্গ? ঈশ্বর না আমি! যে এক থেকে জন্ম দিয়েছিল অসংখ্যের, ভঙ্গিবিকারে যাদের কেঁপে উঠেচিল ভববন্ধন।
জীবনের কাছে যাও, দেখো, ভেজা শরীর আসলে চিৎপ্রধান নগ্নতা। আমি যার সুবর্ণমুদ্রা চুরি করেছি।
জানা ভালো, দৃশ্যের বাইরেই প্রকৃত বাস্তব, শব্দের বাইরেই জীবনের আসল দর্শন। জেনো, ভুল সংখ্যক পাপড়ি নিয়েই ভ্যান গঘের সূর্যমুখী উচ্চতর সত্য হয়ে যায়।

৬.
আমিই অর্জুন, আমিই কর্ণ
জীবনের সমুদ্রে আমরা প্রত্যেকেই নির্বাসিত। ঘুরছি একা, এবং অনির্দেশ্য। আমাদের অবক্ষয় সমুদ্রে মেশে, আর তা থেকেই পেয়ে যায় সমূহ উপচিতি। যুদ্ধ হলো হননের পরাবর্ত, যা চলে ছদ্মব্রীড়ায়। ক্লান্তি আসে তো আবার গুরুমস্তিষ্কে অন্তর্বাহী হয়।
কিন্তু আমার যুদ্ধ নিজেরই বিরুদ্ধে, হত্যা করি নিজেকে আবার। প্রতিটি শৈশব দাঁড়িয়ে যায় যৌবনের মল্লভূমিতে, আর, যৌবন বার্ধক্যের, জীবন মৃত্যুর, এভাবেই...অন্তহীনতা আর হাহাকার।
বাক্-সংযমে পারদর্শী আমি, ফলে যে বিকারতত্ত্বের জন্ম হয় তাকে শিশ্নাকাক্সক্ষায় পরিণত করেছি। জানা ছিল করোটিবিদ্যা তাই স্বপ্নকে করেছি সার্বভৌম যে কি না খনন করে ঋত স্মরণের গহ্বর।
কুরুক্ষেত্র রয়েছে আমারই ভেতরে যেখানে আমিই অর্জুন, আমিই কর্ণ।



**********************
চঞ্চল আশরাফ

কুমার চক্রবর্তীর এই কবিতাগুলো পাঠের পর যতটা সুখবোধ হয়, তার চেয়ে বেশি চিন্তনের মধ্যে প্রবেশ করায়। ফলে পাঠমাত্র আচ্ছন্নতার বদলে মস্তিষ্ক সক্রিয় হয়ে ওঠে। তা দার্শনিকের সক্রিয়তাই; যদিও, এর ফলে, কবিতার মৌল ধর্মে কোনো ব্যাঘাত ঘটতে দেখছি না। সিদ্ধান্ত ও অনুসিদ্ধান্তের আকর হয়েছে কবিতাগুলো, এবং এই ধরনের রচনায় অন্তত দুটি ঝুঁকি আছে : প্রথমত, কাব্যত্ব ক্ষুণ্ণ হওয়া, দ্বিতীয়ত একরৈখিক হয়ে পড়া। কিন্তু বিস্ময়কর, কবিতাগুলো চেষ্টাহীনভাবে উভয় ঝুঁকি এড়িয়ে গেছে। অথচ দেখুন, যে শব্দযোজনা ও বাক্যিক কাঠামো কবিতায় অবধারিত (এবং আমরা অভ্যস্ত), তা এড়িয়ে গেছেন কবি। মানে, প্রচলিত কাব্যিকতায় তাঁর আস্থা নেই; ফলে, বিন্যাস-সমাবেশের খেলায়ও তিনি মাতেন নি।
এ তো গেল কবিতার চেহারার কথা। মর্ম কী? এই ধরনের কবিতায় মর্ম খোঁজার দরকার নেই, কেননা, পাঠের সময় থেকেই আমাদের মনের মধ্যে সমান্তরাল চিন্তনপ্রবাহ তৈরি হতে থাকে। সেই কবিতাই উত্তরিত ও সার্থক, যার প্রকাশবস্তু প্রভাবকের কাজ করে, তার নিজের জায়গা থেকে পাঠককে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এই অর্থে যে, পাঠকের মস্তিষ্কে পঠিত কবিতার প্রতিক্রিয়ায় অন্য এক জগত তৈরি হয়ে যায়।
কুমার চক্রবর্তীর কবিতায় মরমি চিন্তার স্পন্দন কমবেশি লক্ষ করেছি। কিন্তু তা সহজিয়া বা ওই ধরনের নিরীহ কিছু নয়। তাতে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, চিন্তন, উপলব্ধি, পর্যবেক্ষিত সত্য, প্রপঞ্চ ও মিথ্যা- এসব নিয়ে বহির্জগত ও অন্তর্জগতের মধ্যে বোঝাপড়া আছে, আসা-যাওয়া আছে। এ হলো আধুনিকের মরমিপনা, আত্মসমর্পণের আগে নিজেকে যিনি যাচাই করতে চান।