অবিশ্বাসের স্বপ্ন অথবা সাধারণ গল্প

বৈদূর্য্য সরকার ও অনির্বাণ ভট্টাচার্য



অবিশ্বাসের স্বপ্ন
পুরনো শহুরে মোহ শিরা উপশিরায় বয়ে চলে
কখন জমাট বাঁধে কোথায় ফুটে ওঠে রক্তদাগ,
খসে গিয়ে মেদ মজ্জা সহজ হয় না রাস্তা চেনা
একলা পথের বাঁকে টেনে যেতে হয় মায়াদেহ,
কিসের কমিটমেন্ট কিসের হুঙ্কার - ঢপবাজী
হোমিওপ্যাথে বিশ্বাস কার ঠিকানায় কাকে পাই !

বিশ্বাস রাখার চুক্তিতে যত ব্যর্থ লোক আশপাশে
কঠিন জীবন-প্রশ্নে ততটা প্যাঁচালো উত্তর দিই,
সামাজিক প্রতিষ্ঠায় ‘না বলা সত্যির’ শিল্পচর্চায়
অসফল ঝগড়ায় কোণঠাসা হয় মধ্যবিত্ত,
কোনও বিশ্বাস নেই আশা নেই বলে চিরায়ত
কনক্লুশনে পৌঁছনো অসম্ভব বলে হাল ছাড়ি... ।

প্রতিমুহূর্তে বিদ্রুপ খিদে পাওয়ার বাস্তবতায়
অতিরিক্ত কাজের নামে ‘রক্ত চড়ে যায়’ নেশার মতো ,
ছায়া দীর্ঘতর হলে কাজ করে যাই নেগেটিভ
দল বেঁধে বসে থাকি সেই লোভনীয় অজুহাতে ,
পুজোর আশায় থেকে কিশোরী স্মৃতির অপেক্ষারা
নেই কাজের এ দেশে – সুবিচার পায় ক'জীবনে !
তুমি চেহারা পাল্টালে
দুঃখের রঙ এ দেওয়ালে –কি বা আসে যায় নামে
প্রত্যেক লোকের মুখে কষ্ট - চেহারা অপ্রয়োজনীয়
শবযাত্রীর শোক ঘনিয়েছে ওয়েটারদের মুখে ...
ভাদ্রের বিকেলে বৃষ্টি এলে কোথা থাকে কোথায় যাই ।

খোলস ফাটার মৃদু শব্দে কথা হোক অনাবিল
যে কথার মানে নেই কোনও, রেফারেন্স নেই বলে
থেকে যাচ্ছি গড্ডালিকা ভিড়ে অনন্ত জীবন গিঁটে
রাম-কোক-জলে মিলেমিশে কি’করে জমে আবেশ !

মানুষ অকারনে বলেছে গভীর আবেগের কথা
লৌকিক কাহিনীরা বলেনি - আমাদের পরিচয়,
তিন শতক পেরিয়ে এসে এই শহর বোঝালো -
ভালবাসা একই থেকে যায়, শুধু মুখ পাল্টে যায় ।

এতদিন শুধু জেনে গেছি জায়গা হারিয়ে যাচ্ছে
চুমু উড়ে যায়, সাঁকো দোলে... উল্টোডাঙার বুধহাটে
বাঁশ বেহাগ দোকানে ভিড়, স্বপ্নে শিউলি ঝরে না
ট্যুর প্ল্যান করি নিয়মিত পুজো এসে গেল বলে ।



অভ্যেসের বাইরে
ছাতার অভ্যেস নেই, হঠাৎ আসা বৃষ্টিতে খুঁজেছি ছাউনি
গা ঘিনঘিনে অস্তিত্বে অন্তজ সহাবস্থানে বৃষ্টিভেজা মুখে
যে নৌকা বয়ে এসেছে অতীতের স্মৃতি হয়ে ‘অন্ধ করে রাখে’,
কে আটকে কার সাথে, বৃষ্টি এলে মনে মনে – ‘কেন মেঘ আসে’!

ধানসিঁড়ি ক্ষয়ে এলে অধুনা বাংলাদেশে কে খোঁজে কবিকে
কত খুনে দেখা দেয় ইদের বিষণ্ণ চাঁদে তোমার সম্প্রীতি
কবি রক্তেদাগ মাখে, পড়ে থাকে কলকাতায় পিছল রাস্তায়
ভোট টানাটানি খেলায়, ছদ্মবেশে এতকাল বেঁচে আছে যারা ।

হঠাৎ বৃষ্টি আসলে রবি ঠাকুরের গানে কাকে খুঁজেছি আমরা
এ আকাঙ্খিত আষাঢ়ে কে ঝরেছিল কপালে অভিমান হয়ে !
যেখানে এখন আমি তোমাকে খুঁজি না আর, দূর অভিপ্রায়ে
অসাধারণ কি কেউ কোনওদিন কি শেখাবে কাকে বলে বাঁচা...
শহরের সাধারণ মেয়ে সেজে এসে ।









ভার্চুয়াল
তোমার সাথে আমার এই এক অদ্ভুত ব্যাপার
কোনো কথা হয় না ...‘কি করছ’ আজকাল শুধু
সকাল দুপুর রাতে বারবার শুভেচ্ছা জ্ঞাপন !
রকের আড্ডা ফুরিয়ে যেটুকু যা ঠেকেছে ক্লাউডে,
মন কখন মেঘলা রিঅ্যাক্টেই বুঝে নিতে হয় ।

পুরনো বন্ধুরা সব ফেসবুকে হোয়াটসঅ্যাপে
কিন্তু কারুর সাথেই দেখা করা হয়ে ওঠে না,
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নরা দেখা করে একদিন তবু
ডিপি-পোস্ট-চ্যাটবক্সে তাও নয়, অতিযোগাযোগে
শুধু একা বসে বসে খুঁজে যাই কাকে পাবো অন ।

মধ্যাহ্নের জল ভেঙে কার কাছে অভিসারে যাও
সমুদ্র পুরুষ হলে কার জন্যে শুয়ে থাকে বালি,
পরজীবী মন শুধু ‘হায় হায়’ জল সরে গেলে
কে কার সাথে দীঘায়, ছোঁয়াছুঁয়ি পোস্ট হয়ে যায় -
সাজেশানে লেখা থাকে কি ঘটবে গ্লোবাল ম্যাজিকে ।

**************



অবিশ্বাসে আছি। সেই একটা খেলা ছিল না? চার পাঁচটা রাস্তা গোলকধাঁধা ঘুরে শেষমেশ একটা না একটা ঠিক অন্য দিকে বেরিয়েছে। তোমাকে বার করতে সেই একমাত্র রাস্তাটা। ব্যাক ক্যালকুলেশন করতাম। অনেক বড় হয়েছি। খেলাটা একইরকম। ওপারে অবশ্য ঠিক মুক্তি নেই। একটা কালো মুখ। শহরের। তুমি তাকে মানুষ বলে ডাকতে পারো কিংবা ম্যানহোল। জীবনযুদ্ধ। ভিখিরিটা এক এক করে ওদিকে এগোয়। খোঁড়া মাদী কুকুরটা প্লাস্টিক শুঁকতে শুঁকতে বিপদসীমার একটু বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যায়। বরাতজোরে ভেতরে ছটফট করাটা থাকে। ওই ম্যানহোলের ঢাকনাটা শিল্পচর্চার মুখ। কারুবাসনা। ভেতরটা সামাজিকতা। আসলে যাকে অন্ধকার বলে ভাবছ তা ভ্রম মাত্র। তোমার বয়স হচ্ছে বনমালী। কাল রাত্রে দরজা তুমি সত্যই বন্ধ করতে ভুলে গেছিলে। হতে পারে কাচ বদলাতে গিয়ে আস্ত একটা কর্ণিয়াই ছেঁদো করে দিয়েছে ডাক্তার। যাকে বিষ গ্যাস বলে ভাবছ আসলে তা তোমারই নিঃশ্বাস। সহ্য করতে না পেরে এখন নিজেই নিজের কাছে অশান্ত ঠেকছে। নুরেনবার্গের ট্রায়ালে তোমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে জবাবদিহি চাইছে শান্তিরক্ষা বাহিনী। আর তুমি কাঁটাতার দেখিয়ে হা হা করে হাসছ। তোমার মধ্যবিত্ত চৌকাঠে রোজ এক একটা অসউইৎজ এর চিঠি, রাস্তায় বার্কনিউ থেকে পাঠানো জরুরি এস ও এস। তোমায় নিজস্ব একটা নাজিবাহিনী লালন করতে হবে শরীরে। তোমার পার্সোনাল ওয়ার। তোমার 'আঃ, জীবন'। তোমার 'লোভনীয় অজুহাত'।

অজুহাতে চাপ পড়ে কেঁপে ওঠে ইঁদুর। রক্তমাখা ঠোঁট। আকাঙ্খা-ফেরত যারা সমস্ত পাহাড় থেকে জন্ম নিয়েছিল। শুভেচ্ছা। বয়স্ক হয়। যাকে চিনতে, প্রবাসী হাওয়ায় তাকে অন্যরকম লাগে। সে ভালো থাকলেই তুমি ভালো। নিজেকে বোঝাও। যাকে চিনতে না, হাতে লেগেও তাপ লাগেনা তার নরম নিকোটিনের ছোঁয়ায়। তবু, ছোঁয়াটুকু থাকে। দেখা হয় না। 'বন্ধু, কী খবর বল। কতদিন ...'। ধরে নাও, তোমাদের কোনোদিন আলাপ হয়নি। কোনোদিন দেখাও। এসে যেত কী খুব বেশী? খুব বেশী হলে নুলিয়া বস্তির মৎসকন্যা। খুব বেশী হলে নেশালু জোলো হাওয়া, 'মেরে আরমানো কি পঞ্ছি লাগাকে কাঁহা উড় চলি'। খুব বেশী হলে একটা নৌকোকে শুটিং এর জন্য সমুদের ঠিক মাঝখানে আনতে হবে, দেখো যেন দিগন্ত ছোঁয়। আঃ, একা ...। 'নেবে তো আমায় বলো নেবে তো আমায়'। খুব বেশী হলে তুমি ডুবে মরে যেতে পারো। অমিতেশ। অলৌকিক। 'গ্লোবাল ম্যাজিক'।

ম্যাজিকের ওপারে একটা খরগোশ। ক্রমাগত কথা শুনতে শুনতে সে একদিন রেসটা জিতে যায়। কচ্ছপটা গোলাপী মাংস হয়ে টেবিলে ঘোরে। কথা। তারপরেও কথা। বিষন্নতায় শব্দ হয় না বেশী। মুখ থেকে মুখোশ খুলে যা দেখা যায়, তা আসলে অন্য কারোর মুখ। মুখের রং, ভাষা, ভাঁজ মিলিয়ে অপূর্ব এক কায়ারেস্কিউরো। তোমার দেরি হয়। ব্যস্ততায় সন্তানকে চুমু খেতে ভুলে যাও। কোচোয়ান সেলাম ঠোকে তোমায়। আর তুমি, অভ্যেসকে। উড়ালপুলের শহর তোমায় টানে। এবার ট্যুরে তোমায় কোনো এক পাহাড়ি ব্রীজের তলায় দাঁড়াতে হবে। নীচে ছলছল স্রোতস্বীনি। যাবে?

অবশ্য না যেতেও পারো। শহরের রাস্তা পিচ্ছল বড়। দেশপ্রিয় পার্কের ওপরে জমে আছে একটা কালো মেঘ। নীচে ভ্যাপসা কবির লাশ। নাক ঢেকে কেউ চলে যাচ্ছে কবিসম্মেলনের রাস্তায়, কেউ তীব্র অভিমানে আর তুলছেই না লেখার খাতা। তবু বৃষ্টি আসে। বৃষ্টি থেকে আষাঢ়ের কথাবার্তা। প্লাবন। পড়শী দুই বাড়ির ভেতর যাতায়াত বলতে একটা নৌকো। সেখানে ওনিডা টিভি। দুপাশের কোনো একটা বাড়ির ছোট মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। বড়টার নাম তিলোত্তমা। রেলিং-এ ঠেস দিয়ে ছিল কাল অব্দি। প্রজাপতিটা ভুল করে মেরে দিয়েছে বলে সে কি কান্না। আর বেরোনোর জো'টি নেই। ওর মধ্যে বাঁচাটুকু ছিল যে। বড় মেয়ে। তিলোত্তমা। মেয়ে। বড় সাধারণ মেয়ে।