চম্পুকাব্য

মুজিব ইরম ও শিপা সুলতানা



সিলেট থেকে ঢাকাগামী লাল রঙা বি আর টি সি বাসটি ডিস্টিক রোড়, তালগাছ, বিদ্যালয়ের মাঠ কাঁপিয়ে মাজনবাড়ির মোড়ে অদৃশ্য হলে বুঝতে পারি ১০টা বেজেছে। আমাদের মাধ্যমিক মন ধড়ফড় করে। ক্লাস নেবেন নয়া স্যার। শুনেছি টাউনের লোক। বাংলা-ইংলিশ-অংক পড়াবেন। স্বাস্থ্যবান হাসিখুশি মানুষ। আমরা অনুমান করি আর যাই হোক এমন লোক জাঁদরেল হবার কথা নয়। অনুমান বিফলে যায়নি বলে আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচি। লজিংস্যার, সৈয়দস্যার, নয়াস্যার না-হয়ে স্বাস্থ্যের জন্য হয়ে গেলেন বটলাস্যার। হঠাৎ কী থেকে কী হলো বটলাস্যার বনবাদাড়ে ঘুরতে থাকলেন। বনৌষধি, গাছগাছড়া, শিকড়বাকড়ের রস খেয়ে স্বাস্থ্য কমাতে হবে। আমাদের কেউ কেউ এ-খবরও নিয়ে আসে স্যার নাকি আগুনরঙা কোনো এক বিয়াতি নারীর ভাবে মজেছেন। আবিয়াতি বটলাস্যার আমাদের কৌতুহল বাড়িয়ে দিয়ে দেখতে না দেখতে হয়ে গেলেন সুদর্শন। আমরা তখন এ-ও দেখতে পাই স্যারের হাতে সবসময় ১ ব্যান্ড রেডিও শোভা পায়। দিন নাই রাত নাই স্যার শুধু রেডিও শোনেন, আর কী যে লিখেন, আমরা তা বুঝে উঠতে পারি না। এর মাঝে আবিষ্কার করি স্যারের খাতায় কয়েক শ গান লেখা হয়ে গেছে। এবার শুধু স্থানীয় রেডিও থেকে প্রচার হবার অপেক্ষায়। একদিন গান লেখার সেই পেটলা খাতা নিয়ে বটলাস্যার শহরে রওয়ানা দিলে আমরা বুঝতে পারি প্রেমিক হতে হলে, পরনারী মজাতে হলে, হতে হবে সুদর্শন, লিখতে হবে গান!




সমবয়সীরা এমন এক বিস্ময়কর খবর নিয়ে আসে, দিন আর আমাদের কাটতে চায় না। পাশের বাড়ি শহর থেকে ভিসিআর এসেছে। রঙ্গিন টিভিতে রাতের বেলা বই দেখানো হবে। উঠানে তার ব্যবস্থা হচ্ছে।

দিন যায়, রাত আসে, আর আমরা কোনো এক অজানা রহস্যের খুঁজে পাশের বাড়ি হাজির হই।

আমরা পৌছাই, আর দেখতে পাই রঙ্গিন টেলিভিশনের পর্দায় কোনো এক জগৎসুন্দরী পাহাড়ের উঁচু থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে। তার মোমের মতো দেহ, উদ্ধত বুক, ধবল শরীর, টিউলিপের বাগান, ফুলের শয্যা মাড়িয়ে মাড়িয়ে গড়াতে থাকলে আমরা ভুলে যাই পড়শিনীর রূপ, সহপাঠিনীর মুখ। এই দৃশ্য মনের ভিতর চিরতরে খোদাই হতে থাকে।




আমাদের হাতের নাগালে আসে ১ টিকিটে ২ ছবির দিন। দূরের শহরে লাপাত্তা হই। বিডিআর সিনেমা হলের আলো ঝলমল সোনালি পর্দায় ভিনদেশী নায়িকারা পটাপট কাপড় খোলে, চুমু খায়, নায়কের সাথে বিছানায় কী যেন কী করে! আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে! বস্ত্রহীন নায়িকারা ঝর্নাজলে নাইতে নামে, শাওয়ারের নিচে উদলা শরীর ঘষামাজা করে, বাথটাবের নগ্ন দেহ লেপ্টে থাকে পানি ও ফেনায়। আমাদের বোধবুদ্ধি লোপ পায়। আলদ সাপের মতো উদ্ধত দেহ নিয়ে তারা নৃত্য করে, ফোসফাস করে! আমাদের দেহ ভাঙ্গে, মন ভাঙ্গে। দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভরে ওঠে বুক, আমাদের মাধ্যমিক চোখ, মনের অসুখ।





টিভি সমাচার

আমাদের বাবা-মা'র বিয়ের পর বড়চাচা লন্ডন থেকে দেশে গেছেন। নিয়ে গেছেন সাদা কালো একটি টিভি। সেই টিভি এতো ছোটো, এতো ছোটো যে আমাদের জ্ঞান হবার পর তা দেখে ফের অজ্ঞান হবার জোগাড়। কিন্তু বাবা-মা ভ্রূক্ষেপহীন। তখন নাকি সেই টিভি দেখতেই দূর দূরান্ত থেকে লোক আসতো আর বয়েসে বুড়োরা বিগড়ানো মাথা নিয়ে ফিরে যেতো বাড়ি। এতো ছোটো বাক্সে মানুষ ঢুকলো কি করে? এতো সুন্দর সুন্দর নারী! জাদু! জাদু!

তখন মাত্র দুইবার নিউজ হতো টিভিতে। আটটায় বাংলা আর দশটায় ইংরেজি নিউজ। তারপর কিছুক্ষন উচ্চাঙ্গসংগীত। পরে জাতীয় সঙ্গীত শুনিয়ে লাইট অফ করে দিতো টিভির লোকেরা।

কেউ কেউ আশেপাশের গ্রাম থেকে আসতো নিউজ শুনতে। বাংলা যেমন তেমন, খুব সিরিয়াস হয়ে ইংরেজি নিউজ শুনে তবেই বাড়ির পথ ধরতো তারা। ভাববেন না যে শিক্ষিত লোকে ভরপুর ছিলো গ্রাম। ইংরেজি বুঝার জন্য ইংরেজি জানার দরকার নেই, ছবিই যথেষ্ট।
আমাদের একজন চাচা সম্পর্কীয় ছিলেন। গ্রাম থেকে আসতেন। যেহেতু আমরা মফস্বলে ছিলাম। উনি নাকি বিকেলে কিনা মাছ নিয়ে মধ্যরাতে বাড়ি ফিরতেন। তার আগে ঘন্টায় ঘন্টায় লবন দিতেন মায়ের কাছ থেকে চেয়ে। দশটার নিউজটা বেশি গুরুত্বপূর্ন। ইংরেজি বুঝা যায়না কিন্তু গুরুত্বপূর্ন মানুষেরা যেহেতু শুনে, তাদের সাথে শরীক থাকা গেলো। ততক্ষনে তার আট ছেলেমেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে সাদা পানি পান করে...চাচী সেই পচাঁ মাছ ছুঁড়ে দিতেন বাল্লায়। মধ্যরাতে বাড়ি বাড়ি পাশ ফিরে ঘুমাতো লোকে, 'অমুকের বাপ' বাড়ি ফিরেছে নিশ্চিত হয়ে।

আমরা বড়ো হতে হতে সেইসব চালচিত্র বদলে গেছে। প্রায় সবার ঘরেই ১৪/১৭ ইঞ্চি টিভি, এবং বেশিরভাগই রঙিন। আমাদের যেই সেই। ব্রিটিশ মেইড কিনা, না ভাঙলে নিস্তার নেই। রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে, যতক্ষণ গাড়ির শব্দ, ততক্ষন ভাইব্রেশন। আমার ভাই জোরে জোরে কিল দিতো টিভির মাথায়, টিভির হুশ ফিরে আসতো বিনা ক্ষতিতে। আমার যেহেতু ভাঙাভাঙির স্বভাব, ভাই বলতো ভেঙে ফেলতে। বাবা বরাবরের মতো বলবেন ' ঠিকইতো আছে, ভাঙার জিনিস ভাঙবেই, বাবা আরেকটা কিনে দেবো'। চেষ্টা করে 'শর্ট সার্কিট' খেয়ে ২/৩ হাত উড়ে গিয়ে পড়েছি, টিভি যেই সেই।
তখন কি হীরামন বলে কোনো অনুষ্টান হতো টিভিতে? হয়তো মায়ের মুখে শুনেছি। বিদ্যুৎ একেবারেই যেতোনা। ছায়াছন্দ দেখার রাতে বাবাকে একটু পর পর ঘুম থেকে ডেকে তুলতাম। রাত দশটা এগারোটাকে মধ্যরাত মনে হতো। চারদিকে সব বিদঘুটে চেহারার ভুতেরা বাচ্চাদের খেতে বের হয়ে গেছে ততোক্ষণে...

বিশেষ বিশেষ দিবসে আমাদের মুখস্ত ছিলো কোন কোন ছবি দেবে টিভিতে। ছাব্বিশে মার্চ, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঘুরে ফিরে 'ওরা এগারোজন', 'জীবন থেকে নেয়া' । যদি ভাবেন ছোটদের কাছে খুব উপভোগ্য ছিলো, ভুল। গৃহকর্মী বুবু পর্যন্ত গালে পান ঠেসে বাউলি মারতে বেরিয়ে যেতো। মা ঘরের কাজ করতে করতে বলতে পারতেন আনোয়ার হোসেন কিংবা ববিতা, রওশন জামিল এখন কোন ডায়ালগ দেবেন। ববিতা ইয়ারিং বলে মায়ের বড় একজোড়া স্বর্ণের ইয়ারিং ছিলো। শাড়ি পরতেন সূচরিতা স্টাইলে। বিশেষ দিনের বিকল্প বলে কিছুই যেহেতু নাই, দুহাত দু গালে রেখে শেষ পর্যন্ত দেখে যেতাম আমরা। সেইসব সিনেমা যে রক্তের সাথে মিশে যাবে, আগে বুঝতে পারলে মায়ের মতো প্রতিটি ডায়ালগ মুখস্ত করে নিতাম পবিত্র পঙতির মতো।
আমাদের টিভির সাইজ অনুযায়ী পাত্র পাত্রীর সাইজ। কখনো বড়ো টিভিতে দেখতে গেলে খটকা লাগতো এবং খানিকটা দরিদ্র।

দিন দিন ভাইয়ের খুব মেজাজ খারাপ হতে লাগলো যেন অদূর ভবিষ্যতে তার সব হবু হবু প্রেম ফসকে যাবে এই টিভির দোষে। মুখচোরা বলে সে বাবা-মা'কে বলতে পারেনা, আমিও এই বয়েসে যথেষ্ট শর্ট সার্কিট ( আমরা বলতাম আরতিং ) খেয়ে ফেলছি। সুতরাং নীরবতাই নিরাপদ।

এই না এক টিভি। ৫/৬টা বিজ্ঞাপন। সপ্তাহে একটি নাটক, শুক্রবারে একটি সিনেমা, তাতেই কত ভাব আমাদের বাবার। পরীক্ষার আগে আগে, বিশেষ করে বাৎসরিক পরীক্ষার মাস খানেক আগে টিভির নাটবল্টু খুলে ফেলতেন তিনি। তখন হাত পা ভ্যাটকে মৃত বেড়ালের মতো চেয়ে থাকতো টিভি। 'ধুর ভালা অইছে' বলে দু/চারদিন গাছে মাছে ব্যস্ত থেকে স্ক্রু ড্রাইভার নিয়ে বসতো ভাই। তার দু চারজন ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু ছিলো। যারা মায়ের আলমিরা, বাবার ক্যাশবাক্স, বড়ো ভাইয়ের বাইসাইকেল নিখুঁত পারদর্শিতায় খুলতে পারতো, তারাও ব্যর্থ হতো সেই মিচকে শয়তানকে সাইজ করতে। ততদিনে পরীক্ষা পেছনে ফেলে দূর্গা পূজা এসে যেতো। পরপর লক্ষী স্বরস্বতী। কালী ও কি?
বাতিল বিবাহের মতো চোখের সামনেই অদৃশ্য হয়ে পড়তো টিভি।
স্কুলে যেতাম যেন হাতি দিয়ে টেনে নিচ্ছে কেউ, বেঞ্চে যেন ছারপোকা। তখন গতিপথ ও বদলে যেতো পূজার আবহাওয়া এলে। মাটি ছানা হচ্ছে, খড় পাইত হচ্ছে, বাঁশ চিরা হচ্ছে। কোনটার পর কোনটা হবে, পূজারী ঠাকুরের জোগালি হারামজাদাটা কেমন গড়িমসি করবে, সব মুখস্ত আমাদের। দেবীর কাজ খানিক দেখে ঠাকুর বাড়ির পেটের উপর দিয়ে মিশ্র পাড়া হয়ে শেষ মুহূর্তে ক্লাসে ঢুকতাম। কোনো কিছু মিস দেয়া যাবেনা। ফিরে আসার বেলাও সমান দৃশ্য। চারটা খেয়ে ফের ঠাকুর বাড়ি। পূজার সময় ঘরে কড়াকড়ি শীতল থাকতো তাই রাত করে ফিরতে পারতাম।

শেষ পরীক্ষার রাতে ভোজবাজির মতো হেসে উঠতো টিভি। মা কড়াই ভরে ইলিশ ভোনা করছেন, গরুর মাংস-ঝুলে মেড়া পিঠা খাচ্ছি আমরা, টিভিতে পাকিজা শাড়িতে অপরূপা দিতি...
তোমাকে আর ওতো মন্দ লাগছে না আমার সহোদরা টিভি, সহোদর টিভি