সর্ষের সোনালি-হলুদ বিকেল

মিসবাহ উদ্দীন ও হাসান আওরঙ্গজেব



প্রার্থনা

আমি কি দেখতেছি তারে? এই তুরীয় অন্ধকারে?
আমি কি বলতেছি কিছু? কিংবা সে আমারে
বলতেছে নাকি গায়েবি ইথারে?

খোদা —
দুনিয়ার এই বিষণ্ণতম সন্ধ্যায়,
আমারে তফাতে রেখে
জেহের ও সুরার নহর
দুই দিকে বয়ে বয়ে যায়।।

দস্তুরমতো মুশকিলে আছি,
পুরানা ক্ষতর উপর ভনভন করে মাছি।
পানা দাও খোদা,
এমন আজাবে, হায়, ফানা হয়ে আছি।।

তবু কি দেখতেছি তারে?
বলতেছি নাকি কিছু?
হাঁটতেছি নিজেই আমি
আরেক আমার পিছু?


ফাইন মর্নিং মাতালতা

আমি কি তারে চাইতেছিলাম?
শর্ষের সোনালি-হলুদ বিকেলের ভেতর
তারে কি ডাকতেছিলাম?
নাকি সে আমারে বলতেছিলো কিছু?
একলা একডানা শালিখের চোখে যে-ভাষা
গুমরায় গুমরায় খালি তেমনই কোনো অবোধ্য দুর্গম
ইশারায় সে-ও কি ডাকতেছিলো কাছে?
উড়ালের শক্তির অভাবে?
অছিলায় অছিলায় খালি পড়ে যায় রোদ
আন্ধার ঘনায়ে আসে স্মৃতিদের স্মৃতি হয়ে যাওয়া হলুদ বেগানা বুক
পুত্রসম জড়ায়ে ধরেছিলা নাকি? নাকি নিজেই নিজেরে খুব ফিল দিতে গিয়া
পানিতে কাটছিলা সাঁতার? আমি এক আজিব পুস্কুনী?
কেবলই জিজ্ঞাসা জাগে, জিজ্ঞাসার গভীরে এক গাভীন পিপাসা
তোমারে কি চাইতেছিলাম, হে শ্যাওলাপড়া নগরীর শেষ ডাকবাক্স?
আমারে কি কোথাও পৌঁছানোর কথা ছিলো তোমার!
নাকি তোমারে আমার?
ভাষার ভিতরে তুমি আরেক আধো আধো বোল হয়ে ফুটে ফুটে রও
ফুল কি সঙ্গীতে পিপাসা কি মেটানোর কথা ছিলো না, হে নদী?
বয়ে যাও, বয়ে বয়ে যাও, হে ফোরাত রমণী
তোমার ঢেউয়ের ভাঁজে আমি শেষমেশ শুয়ে শুয়ে রবো
কোনো এক ফাইন মর্নিং মাতালতার ছলে...।

সওয়াল
ফিল তো করতেছিলা! করো কি নাই?
সাক্ষাৎ শব্দের অভাবে, বলো, বাজে না সানাই?
ভ্যাকেন্ট ভ্যাকেন্ট লাগে ক্যান এই সওয়াল কোরো না, নদী -
ভাসাইয়া নিবা কই, কতদূর দেশে, এই শংকায় থাকি।

সে
সে আসে আসে বুঝি এসে যায় যায়
রঙিলা শৈশব যেনো হাওয়ায় হাওয়ায়
পিছু ফিরে চাওয়া, কিছু রয়ে যাওয়া
বোঝা-না-বোঝা তারে কী ভীষণ দায়
সে আসে আসে বুঝি এসে যায় যায়
দেখিবো না বলে শিশু আবার তাকায়
তারে ধরি-বা-না-ধরি, ডানা-ডানা পরী
ইশারার ভাষা বোঝা যায়-বা-না-যায়
নদী নদী ভেবে ডাহুক ভিজিবার চায়
সে আসে আসে বুঝি এসে যায় যায়...
***************


যখন নেমে আসে সন্ধ্যা; সবুজ প্রান্তর জুড়ে বিকেলের শেষ রক্তিমাভা মাথা পেতে দেয় ঈষৎ আলস্যে। অস্তগামি সূর্যকে সাক্ষি রেখে, আসন্ন অন্ধকারের গহ্বরে তলিয়ে যাবারও প্রাক-লগ্নে, পৃথিবীর সকল বিষণ্ণতা ও নিদারুণ যন্ত্রনা-বোধ কন্ঠে ধারন করে, হৃদয় বিদীর্ণ করা গানে-গানে ক্লান্ত ডানার উড্ডীনে উড়ে যায় পাখিদের ঝাঁক। পৃথিবীর উপকন্ঠে ম্লান রোদের ছটা এক অপসৃয়মান স্বপ্নের ভেতর বুনন করে চলে তার মৃত্যুহীম যবনিকা। নিঃশেষ হতে থাকে একে-একে আলোর সমূহ উৎসার। বার্ধক্যের কোটরাগত ছানিপরা চোখের মত। নিঃশেষ হতে থাকে জীবনের স্পন্দন। পাখিদের বেদনাদায়ক প্রস্থান। রচিত হতে থাকে গোধুলীর আসন্ন মৃত্যু!
দৃষ্টির শেষ সীমানা জুড়ে তখন শুধু অন্ধকার- মুখোমুখি হবার, জেগে ওঠে চরাচরহীনতা হৃদয়ের মধ্যে। আমারই ভেতর এক বিদেহী আমি, কথা কয়, তার সকল অর্গল খুলে, সীমাহীন সামুদ্রিক আত্মগ্লানির অবশেষে, যেন এক ক্ষুদ্র ঝিনুকের স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার অভ্যন্তর, অথচ সমুদ্র সমান বেদনার গাঁথা বয়ে চলেছে অবিরাম।
কি সেই বেদনা? এই তুরীয় অন্ধকারের প্রচ্ছদ জুড়ে!
আমার প্রার্থনার সকল আয়োজন যখন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আমার ধ্যানকে বিনষ্ট করার এবং চিত্তকে ব্যাথিত ও ক্লান্ত করার সকল জাগতিক শব্দপ্রবাহ ও দৃশ্যমানতা যখন অপসারিত হয়েছে?
ছেয়ে ধরেছে মৃত্যুবোধকতা সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে, এবং ভয়- গ্রাস করেছে, একদা বসন্তের হাওয়ায় আর শরতের উজ্জ্বল মেঘমালার তলদেশে সঞ্চরণশীল আমার ফড়িং হৃদয়। আমার কচি সবুজ শিশু হৃদয়!
একদিন যে ছিল ক্লান্তহীন এক সুবোধ বালকের শৈশব। বনে-পাহাড়ে-সমুদ্রে ঘুরে বেড়িয়ে অতঃপর নদীর স্বাস্থ্যকর নিটোল জলে নিজেকে অর্থাৎ হৃদয়টাকে ধুয়ে মুছে হলুদ শার্টের বুকপকেটে লুকিয়ে রাখতো, খুব সযতনে!
আহ, একি সেই বেদনা-বোধ, এক ভীতিকর ও গ্লানিময় নৈরাশ্যের ভেতর একটু একটু করে বেড়ে উঠেছে আমারই ভেতর; যা আমাকে প্রতিটি দিনের শেষে ছুড়ে দিয়েছে এক কুৎসিত প্রতিবিম্বের মুখোমুখি, অবহেলায়, যেন এটাই ছিল আমার অনিবার্য। আর আমি চিৎকার করে উঠেছি, কেঁদেছি- ক্রোধে, বেদনায়, জিঘাংসায় কুকড়ে যেতে যেতে নীল হয়ে গিয়েছি। নিজের প্রতিচ্ছবি থেকে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি- এত কদাকার হতে পারে মানুষের মুখ!
এই তুমুল নিভৃত নির্জন অন্ধকারের প্রেক্ষাপটে শুধু বেজে ওঠে এক জন্মান্ধ দুঃখ-ভারাক্রান্ত বেহালা বাদকের অব্যাহত কান্নার ধ্বনি। বেজে ওঠে নিযুত-কোটি জীবনের অতৃপ্ত পিপাসার আর্তনাদ আমাকে ঘিরে। যেন আমি প্রাচীন পাথরে খোদিত শিলালিপি এক, অগুনতি জীবনের গাঁথায় লিপিবদ্ধ হয়ে আছি।
যেন জীবন ছিলনা আমার কোনো কালে। কোনো পৃথিবীর বুকে। সবুজ শস্যক্ষেত বা নিবিড় বনভূমি হয়ে ছিলাম না কোনোদিন! মানুষের উদ্যম আর সাইরেন পাখিদের গানে জেগে উঠিনি কখনো, ছায়াঘেরা, সুনিবিড় ঘাসে আচ্ছাদিত কোনো পাহাড়ের ঢালু সানুদেশে!
অজস্র জীবনের স্মৃতি নিয়ে, অনন্ত সময়ের মেঘ-বৃষ্টি-রোদে স্নাত, মলিন ধুলিচিত্রে চিত্রার্পিত আমি এক প্রাচীন পাথর।
কী এক ভীষণ দুর্বিষহ সর্পিল নৈঃশব্দ্য ক্রমে-ক্রমে জড়িয়ে ধরেছে আমাকে, এক উদ্বাহু অনিঃশেষ আলিঙ্গনে। আহ, এভাবেই বুঝি মরণের তীব্র-তীক্ষ্ম-তিক্ত-সু মিষ্ট অনুভবের কাছে পৌঁছে যাবো ঠিক ঠিক! এক্ষুনি বুঝি ভেঙ্গেচুরে গুড়িয়ে যাবে গ্রীবা, মেরুদন্ড ও জঠর। আর একটি অবশিষ্ট ভোরও কি এসে দাঁড়াবে না জীবনের ভগ্ন কাঁচের জানালায়? শিশির কিংবা ধুলিকণা সমেত! আর একটিবারও কি ফিরে আসবে না শর্ষের সোনালি-হলুদ বিকেল? ওইতো, আমি দেখতে পাচ্ছি জীবনের প্রতিটি পল অনুপল গভীর অনুধ্যানে, শুনতে পাচ্ছি জীবনের অন্তর্গত সব শব্দ, ধ্বনি, প্রতিধ্বনি। শৈশবে দেখা বোনের পরিধেয় মখমল কাপড়ের খসখস। মায়ের ঘামে ভেজা বগলের গন্ধ। কার্নিশ থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যাওয়া চড়ুই পাখির একজোড়া ডিমের কুসুম, পিঁপড়ের সারি এসে ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে ভ্রূণ ছানার দেহ। গভীর রাতে যুবক পুত্রের মৃত্যুতে এক বৃদ্ধা কিষাণির বিলাপ ভেসে আসছে অদূরের গ্রাম থেকে। দেয়ালে নিজের ছায়া দেখে চিৎকার করে উঠেছিলাম এক মধ্যরাতে। সব, সব আমি দেখতে পাচ্ছি, শুনতে পাচ্ছি, অনুভব করতে পারছি হৃদয় দিয়ে। যেন কেউ আমাকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ফাঁসির মঞ্চে, মাথায় পরিয়ে দেওয়া হয়েছে কালো মৃত্যু-টুপি, আর কি অনায়াসে চোখ বন্ধ করে আমি দেখতে পাচ্ছি পুরোটা জীবন।
উড়ালে ব্যর্থ ডানা ভাঙ্গা শালিখের মত আজ গুমরে গুমরে ওঠে জীবনের মর্মর।
আমি কি চেয়েছিলাম তাকে? এই ধুলোমলিন চিত্রার্পিত ধুসর জীবনকে? অথবা সে কি চেয়েছিল আমাকে? এক ডুবন্ত-প্রায় জাহাজের মত ঝড় বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে আমাকেই করতে চেয়েছিল তার নড়বড়ে পাটাতন? কূল-কিনারাহীন, এক অনন্ত আকাশের নীচে, সংক্ষুব্ধ ঢেউয়ের দাপটে, আমাকে ভাসিয়ে ডুবিয়ে রচনা করতে চেয়েছিল জীবন নামের এক বিয়োগান্ত?
হায়, এই জন্ম আমি চাইনি, ধর্ম আমি চাইনি, প্রেম আমি চাইনি, নাম আমি চাইনি, কাম আমি চাইনি, মৃত্যু আমি চাইনি!
অথচ, আমার জন্যই খড়গহস্ত তার নিষ্ঠুর কৃপাণ।
সে কি শুনতে পাচ্ছে আমাকে? দেখতে পাচ্ছে আমার গহীন গোপন শুশ্রূষাহীন সব ক্ষত? শুনতে পাচ্ছে এই অচিকিৎস্য ক্ষত ঘিরে ভনভন করা হাজারো মাছির ঘৃণা উদ্রেককারী উৎপীড়ন?
পৃথিবীর এই বিষণ্ণতম সন্ধ্যায়, মৃত্যুহীম ঘন অন্ধকারের বুক চিরে অদৃশ্য ইথারে ভেসে আসে কার কন্ঠস্বর? প্রতিধ্বনি তোলে, ভেঙ্গে দেয় সকল শব্দহীনতা। সে কি আমারই মত অন্য কেউ? ডাকছে আমাকে? জীবনের সকল আয়োজন ছেড়ে এক জনহীন নিস্তব্ধ তেপান্তরের বিরান শুন্যতায় পৌঁছে দিতে?