কাচ চশমার জলছাপ

সুমী সিকানদার ও অপরাহ্ণ সুসমিতো



যতবারই ছলকে গেছি কাছে
ততবারই চমকে গেছে মন,
ফিরিয়ে দিলাম যত উড়ালপনা
ফিরিয়ে দিলাম খাঁচার আয়োজন।

**


১.
পুরোনো সেই সুর ধরে ধরে ফেরার পথ খুঁজে পাচ্ছিনা আর। লাল ইট দালানটার পাশেই জানালাহীন মহড়াঘর ,তাতে কারো খেই ছিলো না। ঘরপালানো বিকেলের ডোবা রঙ্গে পায়রা ঘাড় বাঁকিয়ে নাচ করতো। মাঝে মাঝে কাছে এসে ঠোঁটে ঠোঁট ঘষে দিতো দুদ্দাড় আমাদের দেখাদেখি । তখন কী যেন ফুলটা ফুটতো ঘ্রাণ মনে আছে। যম ঢোলা পাঞ্জাবীর পকেটে তাড়াহুড়োয় রেখেছিলাম স্বরবিতানের ৫০ নম্বর ছেঁড়া পাতা। তাতে তান লেখা ছিলো ১৬ মাত্রার। আর ছিলো বুকের ওপর ঝুঁকে থাকা লকেটের বর্ণনা (শুধু লকেটের নয়)। ছিলো লাল সুতোয় জড়ানো শান্ত মন্দিরার টং শব্দ,পাতার শিস । ছিলো চশমাটাও। তবে কালো ছিলো না কখনই। তোমার মন কিম্বা চশমা কোনটাই অতটা কালো ছিলো না ভাঙ্গা অব্দি।

২.
অগুনতি গাছের ছায়া পড়া সবুজ জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তোমার জলচোখের কালো তিল মনে এলো। মনে এলো চশমা খুলে টেবিলে রাখা। মাত্রই টের পেলাম। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার আগে যেমন গাছেরা টের পায়,তেমনি।
গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা ঝরার আগে গাছেরা যেমন টের পায়,মেঘ করে আসার আগে রোদের মনে যেমন জানান দেয়, তেমন করে।
হলদে হাত আলতো ধরে ছুটে চলা পথটার গায়ের ধূলো ফেলে একাকার উধাও পানে,। যেন চেনা কেউ চিনতে না পারে অচেনারাও। সেই জানালাহীন মহড়া ঘরের পাশ ঘেঁষে বেগুনীফুলের উপচানো গর্বে ভাসা কচুরিপানার মত আমারও গর্ব হয় । আমি দিশাহারা টেরপাই সকল দামামায় সে আসছে । তোমার চোখ টেবিলে রাখা অলস চশমার দিকে আর আমার , তোমার দিকে...

৩.
ছুঁড়ে দেয়া ঢিল কাচরঙ জলে প্রবেশ করতে করতে
গুম হতে থাকে তার পারদকন্ঠে অনিবার্য প্রবেশে

চশমা চোখে ঝাপ্সা হতে হতে নৌকার শরীর দুলে ওঠে
পরনের টাঙ্গাইল শাড়ি উঠিয়ে
পা জলে ছেড়ে দিলে বৃষ্টির ছাঁট গায়ে লাগে
বৃষ্টির ছাঁটের ওসবের সম্পর্ক আছে

দলছুটে আসা ভাসানে ডোবো ও ডোবাও
উড়ে চলা পারিযায়ী জাহাজকে ঘিড়ে ওড়ে
যেন জাহাজটা উড়তে চায় কিম্বা পারিযায়ী ভাসতে
যেন তারা দোসর দূরে সরে থেকে
পলাতক দিনে মাদকতা মিশে থাকে
গয়না খোলা নিশি তুমুল শুষে নেয় ছাপচিত্র
আংটি খুলে আঙ্গুলে আঙ্গুল
লকেট সরিয়ে আলোময় স্নান ডুবে ডুব

সব ছেড়ে যাবার কথা দিন
পরনে ছিলো টাঙ্গাইল শাড়ি ঘটি হাতা ব্লাউজ টিপ আর লকেটও
ব্যাগে এক দু'খানা পোষাক আর ৫০ নম্বর স্বরবিতান

সারাসকালসারাদুপুর পেরিয়ে ফিরে যাবার সময় দূর থেকে সেই টকটক ফর্সা
ছায়া দেখা যায়


সবকিছুই রয়ে গেছে রয়ে যায়
রয়ে গেছে বিকেলে নুয়ে পড়া রোদের দোসর
সুরটুকু আছে শুধু কোথাও পাতাটা নেই
লকেটটা সেই পুরোনো ভাঁজে রয়ে গেছে সনাতন
ঢেউ ভেঙ্গে গেছে ছটফটে

মোমশরীর জুড়ে যে স্পন্দন এসেছে পরের শরতের আশ্বাসে
সে সরেছে অচেনা দোলাচলে
চেনা হয়নি চেনা অবয়ব তার
মা’র কাছে জমা ছিল সেই কবেকার পুরুষ নান্দীপাঠ

********************************



কী জানি সে ডাক দিল পরাণ ভরে। ডাক শুনে হাঁ করে তাকানোর মাঝে শান বাঁধানো ঘাট আছে। ঝকঝকে স্টিমার শব্দ আছে। মনে হবে কীর্তনখোলা নদী ধরে সে স্পিডবোটে ছুটে যাচ্ছে। ছোটবেলার যে সব থ্রিলার আকর্ষণ করত,জেমস বন্ড,দস্যু বনহুর,মাসুদ রানা,কুয়াশা,কিরীটি রায়;আচ্ছা এদের কেউ কি চশমা পরতো?
তবু এসব থ্রিলার পড়তে পড়তে পকেট ভর্তি কবিতা জমে যেত,কবিতার ভাঁজে ভাঁজে দৃশ্যপট। বারবার ভাঁজ খুলে কাগজের প্রায় ছিন্নদশা। মনে হতো নিজেই জেমস বন্ড আর সে রাশান সুন্দরী নিয়ে ছুটছে ভূমধ্যসাগরে চশমাবিহীন,কামজগন্ধা নারী আর শিহরণে!

কী এক বৈপরিত্য ! চোখে চশমার কাল্পনিক ছায়া,চোখ খারাপ হয়ে চশমা পরে ইনটেলেকচুয়াল হবার স্বপ্ন,কুয়াশা কুয়াশা। সে কবি হবে,শিক্ষক হবে,মাসুদ রানা হবে,ক্রিকেটার হবে আবার শহীদ কাদরী পড়তে পড়তে মনে হতো তার;ভেসে যাচ্ছে সম্পাদকের টেবিল থেকে শাবানার ন্যাকামো কান্নায়।

কটকস্থলে যে লাল দালানের একটা বিশাল বাড়ি ছিল,কবে কোন হিন্দু জমিদার এই বিশাল বাড়ি ঘর ফেলে কোলকাতা পালিয়েছে,দেশ ভাগের পরপরই। আশে পাশের তালুকদার,মাঝিরা সব দখল করেছে সব,নামমাত্র মূল্যে। উঁচু দালান,মোটা মোটা খামের আড়ালে মায়া রানীর ভরাট শরীর ঘ্রাণ। কোলকাতা কোলকাতা কলতলা কলতলা।
সাহেবরামপুর গ্রাম থেকে কটকস্থল তার শ্বশুরবাড়ি যেতে হলে নদীপথে ছ’সাত ঘন্টা। ভাটা এলে নৌকার মাঝি ঝিম মেরে নৌকার মাঝে মাটির চুলায় রান্না বসাতো। আড়িয়াল খাঁ নদীর বাতাসে তার (জামাই সাহেবের) খিদে দেশভাগের মতো দগদগ করত। বউ অস্থির হয়ে উঠত,বাপের বাড়ি পৌঁছাতে আর কতো দেরী আছে? বউটার ইচ্ছা করে এক দৌড়ে চলে যায় উঁচু খিলানের লাল ইটের দালান। হোসনাবাদ গ্রামের নদীতট ছবির মতো সুন্দর। লোকজন নদী পাশে বসে দাঁত মাজছে নিম গাছের ডাল দিয়ে,ছোট ছেলেরা লুঙ্গিটা খুলেই ধুপধাপ ঝাঁপ দিচ্ছে আড়িয়াল খাঁ’র ঘোলা ঢেউয়ের ঘূর্ণিপাকে ।
নৌকার ছইয়ের আড়াল থেকে ফর্সা জামাই উঁকি দেয় চোখ ঝিম করা রৌদ্দুর সরিয়ে কোন গ্রাম কোন গ্রাম জানতে,যেন সে এই হোসনাবাদ,পিঙ্গলাকাঠি, রকী,সাহেবরামপুরের কেউ না । বৃটিশ বাবু,ফর্সা জামাই । তার গায়ের রঙ ফর্সা বলে তার মৃদু অহংকার আছে গোপনে। দূর থেকে নদী পারের লোকজন হাত উঁচিয়ে দেখাচ্ছে ঐ যে চশমা পরা ফর্সা জামাই । কেউ কেউ জোরে হাঁক দেবে;
: ও মাঝি বাড়ির মাইয়া আছো কেমন?
কেউ বলে;
: ও দিলতাজ,তোমার পোলামাইয়া কয় জন?

দিলতাজ তার বউ।
ছোট ছেলেটা গোল গোল চোখ করে এসব দেখতে থাকে। এক লোক লুঙ্গি তুলে হিসু করতে যাচ্ছিল কাশ বনের পাশেই,সে এই ভিন রঙা ছেলেটাকে দেখেই লুঙি নামিয়ে ফেলে,তীব্র কৌতুহলে প্রশ্ন উড়িয়ে দেয় ছেলেটার দিকে;
: ও মনু ধোন কাটাইছো?
ছেলেটা এ লাইনটার মানে জানে না । দিলতাজ বেগম ঝামটা মারে ছেলেটার হাত ধরে ছইয়ের ভেতর থেকে। যেন ছেলেটার গায়ে ফোসকা পড়ে যাবে রোদে বা কৌতুহলী লোকটার বেমক্কা প্রশ্ন শুনে।

একটা ঢোড়া সাপ আড়িয়াল খাঁ নদীর পাশ থেকে মাথা তুলে চলে যেতে থাকে ভেসে ভেসে। চশমাটা পরে জামাই সেদিকে এক নয়নে তাকায়। বিয়ের পরপরই সে একটা বই কিনেছিল ‘আদর্শ যৌন জীবন’। ওখানে পড়েছিল পুরুষের যৌনক্রিয়া ঢোড়া সাপের মতো,একবার বিষ ঢেলেই খালাশ। ঝিম পাড়া রোদের ডানায়,নৌকার দুলুনিতে,গরমের খনখনিতে তার ঈষৎ কাম জেগে উঠলো শিরশির ছনবনের খসখসে শব্দের মতো । পাশের গয়না নৌকা দেখে থমকে গেল কাম কাম খসখস । নৌকা ভর্তি পাটের স্তুপ,একটা মাতাল পাট পঁচা গন্ধ। সে নিজেই জোরে ডাক দিলো;

: এই নৌকা যায় কোম্মে ?
মাঝি মহা বিরক্তি নিয়ে জবাব দেয়;
: দৌলতপুর।
বিকাল নামতে থাকে মুখের ভেতর চুষতে থাকা ছোট হয়ে আসা সি-ভিটা ট্যাবলেটের মতো করে। বিকালের নোনা সুন্দর ছায়া নামতে থাকে কটকস্থল গ্রামের পাশে। পাশের নমো বাড়ি থেকে উলুধ্বনি ভেসে আসে প্রাক সন্ধ্যার আহ্নিকে । সন্ধ্যা নামার সুবর্ণ ঢলে এক মাদক আছে নদীর ছলাত ছলাত শব্দে। বৈঠার এক মোহন সুর তান আছে। আচ্ছা এই সুর কয় মাত্রার?

জামাই সাহেব আজ শখ করে পাঞ্জাবী পরেছে। কেমন যেন যম ঢোলা। ছইয়ের বাইরে এসে গলুইয়ের ধারে বসলে বাতাসে ওড়ে,গায়ের সাথে মিশে যেতে চায়,এই সন্ধ্যায় আধো ঠাণ্ডাও লাগছে। তবু ছইয়ের ভেতর গুমোট পারিবারিক আবহের চেয়ে বাইরের নদী জীবন সুন্দর। তিনি গান কখনো শেখেননি তবু মাথায় খেলে যায় সতীনাথের গান : মা আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল...
মুহূর্তে এই জলজ চলমান জীবন,পাশ কেটে যাওয়া কচুরীপানা চলে যাওয়া,দূরের নৌকা,টরকী থেকে ছেড়ে যাওয়া জামাল মিয়ার ঢাকাগামী লঞ্চের বড় বড় ঢেউয়ে তাদের নৌকার দুলুনি তাকে এই বিষাদ গান থামিয়ে দেয়। আধো উদাস নদী গন্ধা সন্ধ্যার বিষুবে আনমনে পাঞ্জাবী’র পকেটে হাত চলে যায়,খসখস শব্দে একটা ছেঁড়া কাগজ বেরিয়ে আসে। স্বরবিতানের ৫০ নম্বর পাতা..
কী অবাক কাণ্ড ! স্বরবিতানের ছেঁড়া পাতা এলো কোত্থেকে? আরো অবাক সে হয় যে প্রথম গানটাই : অমল ধবল পালে লেগেছে ...
তাইতো আজ পালে লেগেছে হাওয়া..
আড়িয়াল খাঁ নদীর শাখা ছোট খাল হয়ে আসে। সন্ধ্যার আগমনী তান মিলিয়ে যাবার মন্দিরা বাজছে। এটা খাল। কেউ কেউ বলে এটার নাম হাউদার খাল। দুই পাশে গাছের শান্ত ভঙ্গিমা । ঝিঁ ঝিঁ ডাকার রাত শব্দ। নৌকার ভেতর হারিকেন জ্বালানো আলোর ছায়া খালের পানিতে ঘূর্ণি খাচ্ছে। মেঝো ছেলে গলুইয়ের কাছে আসতে চাইছে,সে অস্থির। তলপেট ভর্তি চাপ। ছইয়ের ভেতর থেকে দিলতাজ বেগম মিনমিন করে জানান দেয়;
: শুনছো,অপু পেশাব করবে
মাঝি নৌকার ওপাশ থেকে শুনে হাঁক দেয়;
: ও মনু মোতবা ? সাবধানে কইলাম। নৌকায় য্যান না পড়ে। পানি লইয়ো কইলাম।
এরকম হাঁক ডাকে মেঝো ছেলে লজ্জায় শেষ। বাবা ডাক দেয়,চলে আসতে গলুইয়ের কাছে। ঘামে লজ্জায় মাথা নিচু করে হামাগুড়ি দিয়ে আসে। রাতের অন্ধকার নেমেছে বলেছে বাঁচোয়া। ছই ধরে মেঝো ছেলে জিপার খোলে। নৌকার গতির বিপরীতে তার তীব্র জলকামান..
খালের কচুরীপানার মধ্য ঘেঁষে নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে,মাঝির ভাঙ্গা চোয়ালে ক্লান্তির সন্ধ্যাতারা,হাফ হাতা আধো ময়লা গেঞ্জির ঘাম..আগমনী খিদের পেট মোচড় ঘিরে অনুমান করছে কটকস্থল পৌঁছাতে আর দেরি নাই। মাঝি আবার মনে মনে কেরায়ার টাকা হিসাব করে। এই টাকার হিসাব মাঝিকে খানিক তৃপ্ত করে।
কটকস্থল পৌঁছেই মাঝি নৌকা ঘাটে ভেড়ায় । শান্ত খালের পাশে অগোছালো কাদা মাখা ঘাট । নামছে ভ্রমণ ক্লান্ত জামাই,দিলতাজ,মেঝো ছেলে,ছোট ছেলে। বড় ছেলে এবারে এ যাত্রায় তাদের সাথে আসেনি। হারিকেনের আলোতে ঘাটের কিনারায় এক অন্য রকম আলো প্রান্তর মনে হয় জেগে উঠল। চশমাটা পরে নিল জামাই,তার মনে হলো সেই ছোটবেলার পড়া জেমস বন্ড বা মাসুদ রানা বা দস্যু বনহুর বা কুয়াশা। ওরা তো চশমা পরতো না। তবুও নিজেকে অন্যরকম বিজয়ী লাগছে। শ্বশুর বাড়ি এলে জামাইদের এরকম লাগে মনে হয়। অল্প বাতাসে পাঞ্জাবীটা দুলছে..বাইরে থেকে পাঞ্জাবী’র পকেটে হাতটা চলে গেল অজান্তে। খসখস করে উঠল পকেটের ভেতর স্বরবিতানের ৫০ নম্বর পাতা। কতোগুলো গান যেন আচানক সুরময়ী হয়ে উঠল নদীর ঘাটে,প্রাক রাতের শোভনে। গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা ঝরার আগে গাছেরা যেমন টের পায়,মেঘ করে আসার আগে রোদের মনে যেমন জানান দেয়,তেমন করে জামাই টের পাচ্ছে সে এসেছে সে এসেছে।

মাঝি জোরে হাঁক দেয় : ও মাঝির পোওওওওওও ..জামাই আইছেএএএএ

শ্বশুর বাড়ির লোকজন জানত যে আজ মেয়ে দিলতাজ,বাচ্চারা ও জামাই আসবে। প্রস্তুতি আছে সেজন্য । মাঝির খান খান গলার আওয়াজ বাড়ির সদর দরজা,মোটা খাম ঘিরে খিলানে খিলানে প্রতিধ্বনিত হলো। মাঝি বাড়ির ছোট ছেলে সজল এক দৌড় লাগাল খালের দিকে,যেখানে নৌকা ঘাটে বাঁধা,মাঝি ঝিমিয়ে। সজলের সাথে সজলের সঙ্গীরা,আনার,ছালু,কামা ল,বাবলু,খোকন। ওদের বুয়া,ওদের ফর্সা দুলাভাই এসেছে। বুয়া নাইওর এসেছে।
নদী জলের হাওয়ায় সবার খিদে প্রচণ্ড । হাজী সাহেবের হৈ চৈ..সবাইকে খেতে দাও দ্রুত। রেকাবী সাজাও,ফুল তোলা বাটি,গেলাস নামাও। সে কী পুরুষালী হাঁকডাক। খোকন মামা এক ফাঁকে ছোট ছেলেটার প্যান্টের সামনে হাত দিয়ে বলে;
: কি ভাইগনা কাটাইছো ?
বলে আবার খ্যাক খ্যাক হাসে খেকশিয়ালের মতো। ছোট ছেলেটা বুঝতে পারে না ইঙ্গিত,তবে বোঝে কিছু একটা শরমের বিষয়। লজ্জায় দৌড় দেয় বাড়ির অন্দর মহলে। সাজ সাজ রব খাবার আয়োজনে। হাজী সাহেবের বাড়ি,জামাই এসেছে বলে কথা। জামাই বাবাজীর জন্য বিশাল রেকাবী। প্লেট ঠেঁসে খাবারের স্তুপ। একজন মানুষের পক্ষে এতো খাওয়া সম্ভব না জেনেও উপচে পড়া প্লেট আয়োজন করা হয়েছে। জামাইয়ের মুখে তেলতেল অঢেল তৃপ্তি। দূর থেকে আনার,সজল,বাবলু ওদের চোখ চিকিচিক করছে খাবারের ঘ্রাণে..কেউ কেউ কবে বিয়ে করবে এ রকম এক সুখী ভাবনায় ডুবে যেতে থাকে। কবে কবে ?...
খাবার আসনে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত জামাই,পাশে শ্বশুর হাজী সাহেব।অন্য পাশে দিলতাজ,ছেলে দুটো।জামাই মাছের বিশাল মাথাটা নিয়ে কি করবে ভেবে খানিক উদ্বিগ্ন। দিলতাজের দিকে চোখ খানিক ইশারা করতে দিলতাজ কনুই দিয়ে নিজের স্বামীকে খোঁচা দিয়ে বলল;
: ও পুরুষ খাও। খাও। জগত সংসারে পুরুষ থাকে খাবার জন্যই ...
জামাই খোঁচাটা টের পেল না। নিজের বেড়ে ওঠা দারিদ্র,হা হা করে বেড়ে ওঠা হাভাতে শৈশব জীবনের কথা মনে পড়ে।
হরেক রকম ১২ পদী খাবার,মাছ,মাংস শেষে দধি মিষ্টান্ন । জামাই খেয়ে দেয়ে আর নড়তে পারছিল না। এতো সুখের অসুখ!
খাবার শেষ করে বাইরে এসে দাঁড়ান অহংকারী আপাত সহজ মানুষটি। হালকা বাতাস আছে চারপাশে শাশুড়ির নাকের নথের মতো নিরীহ আদলে।সজল জামাই’র কাছে এসে কাঁচুমাচু করে বলল;
: পান খাইবেন দুলাভাই?
ফর্সা মুখটা আধো অন্ধকারে বিকশিত হলো ছোটবেলায় পড়া দস্যু বনহুরের আদলে। কেনো যে শ্বশুর বাড়ি এসে কোনো কিছুতেই না বলতে ইচ্ছা করছে না। সজল পান নিয়ে আসে,সাথে একটা চেয়ার। জামাই আরাম করে চেয়ারে বসল,পান খাবার অভ্যাস না থাকলেও বাংলা সিনেমার আদলে পানের খিলি মুখের ভেতর চালান করল,জর্দার ঝাঁজে মাথার তালু পর্যন্ত খবর হয়ে গেল। মৃদু ঘাম এলো গলায় ভাঁজে,বুকের লোমে..অন্য রকম মাদকতা যেন। একটু সামনের পথে কী আছে দেখা যায় না,জামাই পাঞ্জাবীর পকেটে হাত ঢুকিয়ে চশমা বের করে পরে নিলেন। সজল পানের বাটা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েই ছিল। দুলাভাইকে চশমা পরার পরই কেমন যেন অন্য রকম লাগছে। চশমার ফ্রেমটা কি কালো নাকি বাদামী? অন্ধকারে ঠাহর হলো না। সজল তার চারপাশের বন্ধুদের দিকে সগর্ব তাকায়,সজলের নিজের গায়ের রঙ বা তার বুয়ার গায়ের রঙ ম্লান লাগে তখন। দুলাভাই কি বিদেশী?

চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে সারাদিনের নৌকা ভ্রমণ,অতিরিক্ত ভোজ,বাইরের খোলা বাতাস মিলে মিশে জামাইয়ের ঝিমুনি সরীসৃপ নেমে এলো তরাসে। দূরে কোথাও শান্ত মন্দিরার মায়াবী শব্দ,কোনো অচেনা নারীর ঝাঁজালো গানের শব্দ :

ও আমার রসের নাগর
কি খাওয়াবি কাল কিনে?
কাল কিনে কি খাওয়াবি?
সব খেলি একদিনে...

তার ভেতরে পাতার শিস,ভেতরে সেই আরাকানী সাম্পানের দোল..মাঝির হাঁক বা মাসুদ রানার শিহরণ মিশন সব একাকার হয়ে এলো কটকস্থল গ্রামের নিশি ছায়ায়..। মাদক গলায় বিড়বিড় করল; ঘু মা ব...
কাঠের সিঁড়ি ভেঙ্গে সে দোতলায় উঠে গেল। তাদের জন্য বরাদ্দ শোবার ঘরে ঢোকার মুহূর্তে শুনতে পেল দিলতাজ গুনগুন করছে;

ধীরে চলো হে রাজনন্দিনী
হংস গমনে চলিল রাই...

দিলতাজের সুর ছাপিয়ে তার করোটিতে ভাসতে লাগল কিছুক্ষণ আগে শোনা সেই ঝাঁজালো রসিক নাগরের গান। হারিকেনের লিকলিকে আলোয় সে দিলতাজকে দেখতে লাগল। দিলতাজের শাড়ি অগোছালো। ব্লাউজের উপরে জ্বলজ্বল করে ওঠে ঝোলানো লকেট । দিলতাজের ভরাট স্তনের খাঁজে খাজুরাহো মায়া,লকেটটা যেন সেখানে চুমু করছে বীরদর্পে..
পানের রস,বাবা জর্দার আঁচ ছাপিয়ে জামাই হাত বাড়াল দিলতাজের আড়িয়াল খাঁ জোয়ার শরীরে। পাজামার ফিতে খুলতে খুলতে বিড়বিড় করল;
: আমাকে সব দাও..সব দাও..
দিলতাজের অসম্মতি ছাপিয়ে তীরন্দাজের মতো,ছোটবেলায় পড়া সেইসব থ্রিলার চরিত্র জীবন্ত হয়ে উঠল শারীরীক বাকবাকুম কুসুমে। তার মনে হলো সে কেরায়া নৌকায় দুলছে,আড়িয়াল খাঁর ছোট ছোট ঢেউ..
জামাই যাচ্ছে যাচ্ছে দূর যাত্রায়..

সব কিছুরই সমাপ্তি আছে। আসলে সমাপ্তি বলে কিছু নেই,একটির সমাপ্তিতে অন্যটির সূচনা। জামাই শান্ত হলো নির্ধারিত কর্মসূচির পরপরই। একবার বিষ ঢেলেই যেন শেষ। চারপাশে আবারও সেই লিকলিকে আধো অর্ধেক আলো।

দিলতাজ সব সামলে নিয়ে নিজেকে খানিক গুছিয়ে ধীরে ধীরে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলো। মায়ের ঘরের সামনে এসে খুব আস্তে আস্তে ডাকল : মা ,ও মা ..

মায়ের বয়স্ক ঘুম খুব শিশির পাতলা। ধড়মড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে এলো বিছানা থেকে। বয়সী মানুষ,কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে বিছানা থেকে নেমে এলো মেয়ের কাছে আধো নেভানো হারিকেনটা নিয়ে।

: কি হইছে দিল? কি হইছে..কানতেছিস ক্যান?

দিলতাজ ফুঁপিয়ে কান্না সামলে নিল,চোখ মুছলো অষ্পষ্ট আঁচলে। গলা থেকে লকেটটা খুলে মায়ের হাতের মুঠোয় গুঁজে দিয়ে ফিসফিসিয়ে উঠল;


: মা সবখানে পুরুষ,সবখানে পুরুষের খিদে...

উপরের দোতলায় তখনো ঘুমায় কেউ কেউ নেতিয়ে থাকা বিছানায়,যেন ঢোড়া সাপ। পাশের টেবিলে পড়ে আছে ক্লান্তির ছায়া মুছে নেয়া অলস চশমা,যেন তাকিয়ে আছে নিশি সাম্রাজ্যে।

****
আসলে সমাপ্তি বলে কিছু নেই,একটির সমাপ্তিতে অন্যটির সূচনা