রেফারী

রমিত দে

After the game is before the game
The ball is round. The game lasts
minutes. That’s a fact ...

Everything else is pure theory
Here we go !!! ...

পরিচালক টম ট্যাকওরের( Tom Tykwer)পরিচালনায় ‘ রান লোলা রান’ এর শুরুর দৃশ্যটা একটু দেখা যাক। কয়েকটা মাত্র সাধামাটা প্রশ্ন। “Who are we? Where do we come from? Where are we going? আর আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়লাম ওই প্রশ্নের মাঠে। গেরুয়া সূর্যাস্তের নিচে দাঁড়িয়ে অনন্তের মাঠে রেফারী ছুঁড়ে দিলেন বল। মুক্ত হবার জন্য সে ছুটতে থাকল।মুক্ত হবার জন্য নাকি এক ক্রমিক বন্ধনে শূণ্য অর্ঘ্য তুলে দিল বন্দীশালার মানুষ! ছুটতে লাগল মনি(ছবির নায়ক) ছুটতে লাগল লোলা(ছবির নায়িকা) ছুটতে লাগল কালগর্ভের মানুষ কুশলের মানুষ একশিরার মানুষ একা মানুষ। প্রচুর পালক জোগাড় করে পাখির মত উড়তে চেয়েও আমি কেবল দাঁড়িয়ে ছিলুম; কি জানি, হাত পা ভাঙার ভয়ে নাকি কোনো এক দীর্ঘায়ত বিস্ময়ে! আসলে ওই রেফারীতে পেয়েছে আমায়। বল ছাড়া দৌড়তে হবে জেনেও এর চেয়ে বিস্মণের জায়গা আর যে নেই, নিজেকে উলটে পালটে দেখার নিজের ধূ ধূ প্রান্তরে ঢুকে পড়ার উদগ্র বাসনা কেবল। এক অযৌক্তিক দৌড়ের মাঝে যুক্তি খুঁজে বেড়ায় নিয়ম খুঁজে বেড়ায় ওই একটিই বাঁশি। কেউ কি জানে রেফারীর ওই হুইসেলটি আসলে আমার নিজের! আমার আশা আকাঙ্খা ভীতি অনিশ্চয়তা মেশানো আমিটাকে দাঁড় করানোর প্রয়োজনে আমি যেন বাঁশি বাজিয়ে বাজিয়ে দাঁড় করাতে চাইছি নিজেকেই আর নিজের বয়সী নিপুন কিছু কোলাহলকে।কুঁদে কুঁদে নিজেকেই বের করতে চাইছি আমারই পাথর থেকে; আমার ছোটোবেলা আমার বড়বেলা আমার অন্ধকারের ভেতর আমার আলোর বাইরে থেকে প্রাগৌতিহাসিক শীতলতারা উলটে পালটে দেখতে শুরু করেছে আমায়- “ And then I ask myself/ what I’am doing here/ how long will this go on?/ How long!...what are you doing here? NOTHING…NOTHING “। এখন শুধু ওই রেফারীর অবস্থান থেকে দেখার চেষ্টা করছি মহাকালের মাঠে ভাসমান পিপাসাগুলি। আলো আলো আলো আর আলোর ভেতরই গড়াগড়ি খাচ্ছে অন্ধকারের মানুষগুলো,শিরোনামহীন অবস্থানগুলো। সারা মাঠ আলো জ্বলছে আর আলোর মিথ্যে প্রতিশ্রুতিতে কেউ ঘুমে যেতে পারছেনা।কি খাঁ খাঁ মিথ্যে আর মিথ্যেকেই আয়ত্ব করে নিয়েছে মানুষ।আমি রেফারীর অবস্থান থেকে দেখছি। কাটা মুন্ডুর মত ঘন জীবজগতের মাঝে গোল্লাছুট খেলছে একটি আবহমান সাদা কালো বল। আর তাকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠছে প্রশ্ন, সর্বতোভাবে পৌঁছবার প্রশ্ন। আমি রেফারীর অবস্থান থেকে দেখছি শুধু । একটি বিচ্ছিন্নতার প্রশ্ন একটি প্রবেশপথের প্রশ্ন অথবা একটি দৌড়ের প্রশ্ন। কোথায় যাব? এই যাওয়াটাই তো প্রশ্ন এই যাওয়াটাই তো বিস্ময়! নিরাকার অন্তরীক্ষ আর আলোকের মাঝে পাখা ছাড়া মানুষের পেন্ডুলামের মত কেবল দোলনের বিস্ময়।
রেফারীর জায়গা থেকে দেখলে জীবনও কি কেবল এক পাসিং আর ইনটারপাসিং-এর নমুনা নয়? ‘ক’ ‘খ’কে বল দিয়ে ‘ক-১’ এর জায়গায় আসতেই ‘খ’ সঙ্গে সঙ্গে সেই বল ‘ক-১’ কে ঠেলে দিচ্ছে এবং ‘খ-১’ এর জায়গায় দৌড়চ্ছে। ‘ক-১’ এবার সেই বল উঁচু করে ‘গ’ কে ঠেলে দিয়ে ‘ক-২’ এর জায়গায় দৌড়চ্ছে। ‘গ’ সে বল ‘ঘ’ কে ঠেলে দিয়ে ‘গ-১’ এর জায়গায় পৌঁছতেই ‘ঘ’ সাথে সাথে সে বল ‘গ-১’ কে দিচ্ছে। ‘গ-১’ এখন ‘ক-২’ কে উঁচু করে পাস দিচ্ছে। ‘ক-২’ আগের মতন ‘খ-১’ কে বল ঠেলে ‘ক-৩’ এর জায়গায় গিয়ে সে বল ‘খ-১’ এর কাছ থেকে পাস নিচ্ছে। কেবল একটি স্থাবরের আশায় কি তীব্র দৌড়! থাকা না-থাকার ব্যক্তিগত অন্তর্লোকে কি তীব্র দৌড়! মাঠভর্তি স্তব্ধ হাততালির মাঝে আমি কেবল রেফারীর অবস্থান থেকে দেখছি তাদের পৌঁছবার কথা। কোথায় পৌঁছোনোর কথা? পৌঁছোনো কি যায়? গোল কি কেবল একটা অর্ধভুক্ত গোলক নয়!-ঈষৎ হলদেটে, মানুষের মুখের মতই কোঁচকানো দাগ সমেত। আসলে প্রানের মধ্যেই তো ধরে আছে পূর্ণতার ব্যাকুল সংঘর্ষ। প্রতিদিনের চেনা। প্রতিদিনের চেনা না। প্রতিদিন যেন এ হলুদ রঙের মাঠে এসে দাঁড়াই প্রতিদিন সাদা কালো বল ছুঁড়ে দিয়ে বাঁশি বাজিয়ে দিই-যেন এক নতুন খেলা প্রসব করলাম, আবহমান অন্তহীন খেলা- আমি সে খেলার দূরত্ব বুঝি! দূরত্ব বুঝি না ! রেফারির অবস্থান থেকে দেখি গৃহীমানুষ দৌড়চ্ছে, দৌড়ের মাঝেই তার জেগে থাকা , গায়ে গায়ে লেগে রয়েছে মানুষ, ম্যান ট্যু ম্যান মার্কিং, কিছুতেই দেওয়া যাবে না বড় রাস্তা ,ছোট রাস্তা, গলির ভেতর গলি ,দেওয়া যাবে না সাদা প্রকৃতির সবটুকু শূণ্যতা। আসলে একটা কিছু ডট ডট লাইন আর এই লাইনের বাইরে কিছুতেই পড়ে যাওয়া চলবে না , এই নিঁখুত লাইন ধরে এই ধারাবাহিক অবিচ্ছিন্নতা ধরে জন্ম খুঁজবে তুমি মৃত্যু খুঁজবে , খুঁজবে কেবল একটি গোল, নিঝুম স্তব্ধ একটি গোল আর তার পরিপ্রেক্ষিতেই একটা গন্ডীবদ্ধ থাকা। একধরনের “হেইন্স স্টাইল” নিয়ে নিজেই তুমি স্ট্রাইকার আর নিজেরই অবস্থানকে স্পষ্ট করতে নিজেরই চারপাশে গড়ে তুলেছ থকথকে ক্ষতের মত একগোছা স্কিমার যাদের একটাই কাজ দৌড়োনো যাদের একটাই কাজ না-থামা আর আরও ভেতরে ঢুকে গোলে শট নেওয়া। একটা লজিকের কোড আর তাকে ঘিরে নিজের ভূগোলে ভাঙন রুখছে ইললজিক মানুষ। কাদার মধ্যে আটকে যাচ্ছে পা অথচ পজিশনে চলে আসছে পরমূর্হুতেই, ‘বিপক্ষের ফুল ব্যাককে ঢিলে পেলেই ছুঁকছুঁক করে ঢুকে পড়ছে শিকারী বেড়ালের মত’। আমি বাঁশি বাজাচ্ছি। যারা দৌড়চ্ছে বল নিয়ে কর্ণার ফ্ল্যাগের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে অথবা উঁচু করে নিঁখুত সেন্টার করছে বিপক্ষের ব্যাক এরিয়ায় তাদের প্রত্যেককে শিখিয়ে দিচ্ছি নিজের বিপক্ষে নিজের ফাঁকা জায়গা তৈরীর খেলা, শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে নিজেরই ছায়ার সাথে নিঁখুত ড্রিবলিং। কে যেন রেফারীর পোশাকটা আমায় চাপিয়ে দিয়েছে এইমাত্র অথচ আমি তো সারামাঠ জুড়ে খেলছি, যারা বল নিয়ে দৌড়চ্ছে আমি তাদের পায়ের প্রার্থণা শুনতে পাচ্ছি। নাকি জীবনের কাছাকাছি এসে সংগ্রহের কাছাকাছি এসে আমি শুধু দেখতে চাইছি প্রতীকের চেহারাগুলোকে, অবচেতনের শিকড়চ্যুতিগুলোকে ।৫-৩-২ এ যে লেফট আউট সেনটার ফরোয়ার্ড কিংবা রাইট আউট এগিয়ে আসছে কিংবা তাদের পেছন পেছন এগিয়ে আসছে যে দুটি ইনসাইড, কিংবা তীব্র গতিতে বল নিয়ে বিপক্ষের গোলে ঢুকে গেল যে উইঙ্গার তাদের কাছে আমি কি কেবল বাঁশি হাতে এক অনন্ত রেফারী! নাকি তাদেরই অমোঘ ও অনিবার্য প্রতিফলন! তাদেরই জার্সিবিহীন শনাক্তকরন! আসলে সবাই ছুটছি। সমূহ থেকে সমূহে,গুহা থেকে গ্রহে আমাদের নিজস্ব নাটকের প্রেতরাজ্যে একটি স্থায়ী গোলের উদ্দেশ্যে ।সবাই ছুটছি।
জীবন , সে তো দু পায়ে বল নিয়ে অনিশ্চিত দৌড়োনোর অনুশীলন। মিথ্যে অভিসারের আমন্ত্রণ।ফেরার উদগ্র তাড়নাটাকে মাপা সেনটারিংএ উড়িয়ে দেওয়া বাস্তুহারা বলের দিকে। আমি তো রেফারীর অবস্থান থেকে দেখছি বাবা এগিয়ে আসছে চৈত্র দুপুরে ওই ডট ধরে ধরে ,’মেঘ -গেরস্থতা’ থেকে মা-ও নেমে পড়ছে ওই ওভাল ল্যান্ডস্কেপে।স্কুলে যাবার জন্য তৈরী হচ্ছি আমি, পাখিরা ঘুরপাক খাচ্ছে আকাশে,ওদের যে স্কুলে যাবার তাড়া নেই। কেমন কান্না কান্না মুখ মায়ের,ফুলেদেরও মুখ কেমন কান্না কান্না, আজও জানি না ওদের মুখ মনের রং দিয়ে তৈরি হয় কিনা! বেশ মনে আছে বাবার প্রেমিকার নাম ছিল নীরু, বাবা ওর মধ্যে এক ঘন্টা নীরব থাকা খুঁজত । প্রায় প্রতিদিনই স্কুলে যাবার সময়ই দেখতাম মায়ের সাথে ঝগড়া হত, লো ভ্যল্যুমে ভেসে ভেসে আসত ঘুমন্ত আয়ু। বাবা নাকি নীরুকে পেয়ে গেছে মা নাকি বাবাকে হারিয়ে ফেলেছে নীরুও নাকি বিপক্ষের স্টপারে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। একটা না-পাওয়া দৌড়চ্ছে, একটা পাওয়া দৌড়চ্ছে। ম্যান টু ম্যান মার্কিং। একজনের পাহারা দেওয়া অন্যজনকে। নাকি একজনের পাহারা দেওয়া একজনকেই !আর গোল হতেই সারা মাঠ জুড়ে একজনেরই পায়ের শব্দ, আমি বুঝি তার খুব কষ্ট, তাকে বাঁশি বাজাতে হচ্ছে, এ বাঁশি আত্মসান্তনার, যার ফুটো দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে একটি আর্কষনীয় মিথ্যে, কাউকে জিতিয়ে দেওয়ার মিথ্যে কাউকে হারিয়ে দেওয়ার। সে দৌড়চ্ছে, তার পায়ে বল নেই, তার দৌড়বার ভাষা একটাই-“End of all our exploring will be to arrive where we started” । রোববারের রেফারি হয়ে আমি কি শব্দের সাথে আঁকিবুকি কাটছি! আজ বুঝি আসলে মানুষকে একটা খেলাঘরে মেতে থাকতে হয়; কালো পচনশীল পেশাদার একটা খেলা ঘর। বড় হয়েছি ধীর ধীরে। পরমা কে ভালোবেসেছি, (যদিও ভালোবাসা শব্দটা নিয়ে আমি একটু দ্বিধাদ্বন্ধিত, অনেকটা কাঁটাওয়ালা শিমূলগাছের মত, শ্রুতিসম্পন্ন অথচ স্থানু)। পরমা ছেড়ে চলে গেছে, নাকি সাদা মৃতদেহকে আমি নিজেই শোর্কাত করছে চেয়েছি আরও! এ প্রশ্ন আমার প্রতিরূপে বসে থাকে আমৃত্যু। লালপাপড়ি উড়তেই ভরে যায় রক্তচন্দনের বাড়ি। লাজুক মেয়েরা আসে আমি চ্যুত হই, কৃষ্ণা থেকে কুসুম-সোনালি থেকে শ্রেয়া-কুচি কুচি ওড়ে কিছুটা চাঁদের আলো কিছুটা চামড়া পোড়ার গন্ধ- না আমি হয়ত সত্যিই নেই-নির্লিপ্ততার নিচে বসে থাকি ছায়া ছায়া ছায়া হয়ে আর এই ছায়াময়তায় আমি হয়ত কেবল বেঁচে থাকার এক মিশ্র শিবিরে বন্দী মাত্র। কে আছে! সত্যিই কে আছে! কার পা থেমে আছে এই পাতাঝরার দেশে! ওই যে বার্ট্রাণ্ড রাসেল ‘কুয়ো’টার কথা বলেছিল না- যা মানুষ তৈরী করবে নিজের মধ্যে আর অবগাহন করবে নিটোল আনন্দের খোঁজে যদি নিস্তার পাওয়া যায় এই স্যাঁতসেঁতে আবহমান থেকে, আমি কি সেই কুয়োর ধারেই বসে থাকি! ঝুঁকে দেখি আমারই ছায়া! আমি কি কেবল বন্ধ দরজা দেখতে চাই নাকি ছায়ার নিচে বসে দেখি রাশিফল থেকে উড়ে উড়ে আসছে সেই স্বদেশী চড়ুই যে কেবল শূণ্যতাকেই পেতে চাইছে। আসলে আমরা শূন্যতাকেই পেতে চাই , আমাদের এই দৌড় অনেকটা গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার মত, নিচ্ছে না নিচ্ছে না নিচ্ছে না –নিলেই থামছে না থামছে না থামছে না। “গাড়ির ঘেরাটোপে বসে তুমি চাবি ঘোরাচ্ছো ক্লাচ টিপছো”-পেরিয়ে আসছ তোমার শৈশব তোমার কৈশোর তোমার যৌবন তোমার ক্ষণকাল-কেবল গতিবদলের কথার মাঝে আমরা ছুটছি ৪-২-৪ কিংবা ৪-৩-৩ এ , ছুটছি কোনাকুনি কভার খেলে কিংবা অফসাইড ট্র্যাপ করে অথবা থ্রু পাস দিয়ে । ওই যে মাঠ জুড়ে যারা ছুটছে যাদের বাঁশি বাজিয়ে বোঝাচ্ছি তোমরা আছো তোমাদের উপস্থিতি সংশয়াতীর্ণ হলেও অর্থহীন নয় ,এ মূহূর্তে তারাও কি জানে মাটির গর্ভে কোথায় থাকে মুখ থুবড়ে পড়ার নোটিশ! বাঁশি হাতে লক্ষ্য করে চলেছি এই অর্থহীনতার সাথেই শূণ্যতার সাথেই আত্মকে অন্বিত করে চলেছে ওরা। বাবা আমি মা নীরু আমরা সবাই তো আমাদের চটচটে ‘থাকা’ নিয়ে একটা ডিপডিফেন্স তৈরি করে চলেছি। অনেকটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে বিপক্ষের গোলে বলটি ঠেলে দিয়েই তাড়াহুড়ো করে দৌড়ে দৌড়ে ফিরে ফিরে আসছি ওই ডিপডিফেন্সে ওই ‘থাকাতে’ কিংবা যাপনের একটা জায়গানটিক মিসআনডারস্ট্যান্ডিং- এ। এই থাকা আসলে তো একটা না-থাকা। যেকোনো মূহূর্তে দখল হয়ে যেতে পারে জেনেও শরীরের ভেতর সংগ্রহ করে রাখা এক সম্মোহিত শ্মশান। আসলে পুরো মাঠটাতেই তুমি। এক বাস্তুহারা আবেশ এক অনুপস্থিতির আনন্দ; আর আমি শুধু রেফারীর পোশাক চড়িয়ে দেখি পুরো মাঠ জুড়ে আমি দৌড়ে বেড়াচ্ছি, আমার বিশ্রাম নেই, কেউ আমায় বলার নেই দেয়ার ইজ নো হোয়ার ট্যু গো।
মাঝে মাঝে রেফারীর অবস্থান থেকে জীবনকে দেখতে দেখতে গুম হয়ে যাই, ওই মাত্র ৫ গজের দূরে যে রাইট ইন ও তো আমি! আশ্চর্য! একেবারে লাইন ঘেঁষে ওই যে লেফট আউট বা ক্লান্ত অবসন্ন হাফব্যাক ও তো আমিই! পাখি ছাড়া গাছ ছাড়া খড়ি ওঠা আমি। আমার ভেতরই কি তবে আমারই এক ব্যাকরুম প্ল্যানার! যে আমারই ইনসাইডকে আটকে সারামাঠ জুড়ে খেলছে , খেলাচ্ছে? আক্রমণ কিংবা প্রতি আক্রমণ, ফরোয়ার্ড কিংবা ডিফেন্স-আসলে তোমার মাঝেই তুমি তৈরী করে রেখেছ তোমারই ‘স্কিমার’ যে তোমার হেরে যাওয়া ভেঙে পড়া গোল খাওয়া কিংবা আত্মসমারোহের পাথরতর আকুতিকে নাম দিতে কখনও নেমে আসছে বিপক্ষের একাধিক খেলোয়াড়কে ড্রিবল করে , কখনওবা নেমে আসছে ডিফেন্সে। রেফারীর অবস্থান থেকে আমার বারবার মনে হত কেউ যদি ঠিক মত বল কাড়তে না পারে আর তার ফেলে আসা যায়গায় যদি বিপক্ষের কোনো ফরোয়ার্ড ঢুকে পড়ে তাহলে কোনো মানুষের পক্ষেই বোধহয় অতদূর ছুটে এসে গোল বাঁচানো সম্ভব নয় কিংবা নিদেনপক্ষে বল কেড়ে নেওয়া।আসলে মানুষ একটা মার্কিং প্রসেস, মাঠে নেমে পায়ের প্যাঁচ দেখাচ্ছে, “একজন খেলোয়াড়কে ঠিক কতটা প্রস্তুত হতে হবে প্রসঙ্গে ইংল্যান্ডের উইং ব্যাক রে উইলসন বলেন-“কি ফ্যাশানের বাড়ি তৈরী করবে সে কথা ভাববার আগে, বাড়ির ভিতের দিকটা ভালো করে নজর দিও, না হলে দেখবে তোমার সব বাড়িটাই একদিন ঝড়ে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে।প্রশ্নঃ “ভিতটা কি?” উইলসনঃ-ভালো ভাবে টার্গেটকে রপ্ত করতে শেখা।“-আর তা হবে ত্বরিত পরিচ্ছন্ন আর ফলপ্রসূ”। আমার সাথে পরমার সম্পর্কও কি তবে একটা ‘টার্গেট’! নিজেকে পাওয়ার? বাবার সাথে ‘নীরুর’ সম্পর্কও ‘টার্গেট’? নিজেকে পাওয়ার? একটা গোল? বেশি করে একটা থাকা? আমরা কি নিজেদেরকেই শূণ্যে বা মাটিতে পড়বার আগেই ‘টার্গেট’এ মারার অনুশীলন করছি? অ্যাকিউরিসি,পারফেকশন চিৎকার উল্লোল এ সবই কি তবে নিজেরই ভেতর নিজের গল্প ফেঁদে নিজেকে জীবিত রাখার উন্মাননা? ঘুমস্তব্ধ ঘুলঘুলিতে আমরা তো নিজেরাই চেয়ে নিয়েছি ঘুমিয়ে না পড়ার অঙ্গীকার।সংসারের সাদা পৃষ্ঠায় এক একটা মানুষ খুঁজে নিয়েছে এক একটা পজিশন এক একটা পুতুলনাচ। কেউ ডিফেন্স কেউ সেন্টারহাফ কেউ ফরওর্য়াড । কিক এ্যন্ড রান।কিক এ্যন্ড রান। বল মারো ও প্রভেদটা স্পষ্ট করো। তোমার থেকে তোমার প্রভেদ। তুমি তো দাঁড়াতে চাও না আমি তো দাঁড়াতে চাই না; আমরা তো পেরিয়ে আসতে চাই লোহার গেট, ঝেড়ে নিতে চাই জুতোর বরফ। রাজপুত্রের হাতে পাখি দিয়ে শৈশবের কৈশোরের গজারি গাছের বনে কি আমিও ফেলে এলাম আমাকে? বড় নৌকার সন্ধানে ছইয়ের ভেতর রেখে এলাম সেই নিভৃত সখ্যকে যার কোন অস্পষ্টতা ছিলনা অস্থিরতা ছিলনা, যাকে লেখা যেতনা অসুখ আর অস্থিরতার ব্রাহ্মী হরফে।
বল অথবা খেলোয়াড়কে স্পষ্ট করে চেনবার জন্য আজ বড় আলোর অভাব, তাই তো আমার জন্য বানানো হয়েছে রেফারীর নতুন পোশাক,ঠোঁটে তুলে দেওয়া হয়েছে মহাকালের বাঁশি, যা এখন কেবল সম্ভাবনাকে রেফার করবে, রেফার করবে ভাঙা গোলপোস্ট বা মাঠে লেগে থাকা চুনের দাগ।একটার পর একটা গোল হবে, তৃষ্ণা বাড়বে,গোলকে বানিয়ে ফেলতে হবে জীবনে নুনের মত।আপনারা রক্তপিপাসু হবেন।পয়সা ছুঁড়বেন। হাততালি দেবেন , শূণ্যে শূণ্যে যোগ করে বসে থাকবেন আমার একটিমাত্র বাঁশির অপেক্ষায়। জানতে পারবেননা ডানার মানুষ পাখির ফাঁদে পা দেয় , অথচ ‘পুরোটা ওড়া’ তার হয়না। হয়না পুরোটা প্রত্যাখানও। তার ভেতরই পালক ঘামে,পায়চারী করে, জানতে চায় নিজের জায়গা ছেড়ে ছুটে অন্যের জায়গায় পৌঁছে যাওয়া যায় কিভাবে! কেবলই এক নেই-এর সন্ধান, একটা বাফেটিং গেম যা ক্রমশ শরীরের ঘামকে শুষে নিচ্ছে শরীরের স্থানিকতা পেরোতে। ধূসর আকাশের নিচে ক্ষতচিহ্নিত ঘাসে অথবা স্যাঁতস্যাঁতে অ্যাসফল্টের ওপর উত্তল তরঙ্গের মত এক গোছা খেলোয়াড় ,কেবল পাশ চাইছে, রক্ত লাল এবং জীবন্ত থাকার নাছোড়বান্দা অঙ্গীকার চাইছে , তারা মাটিতে পড়ছে কিন্তু সাথে সাথেই আবার ঠেলে উঠছে এবং ওরই ভেতর কেউ কেউ হয়ত নীচু হয়ে ছড়ে যাওয়া হাঁটুতে সযত্নে হাত বুলিয়ে নিচ্ছে। ইউনিফর্ম বদল করে নতুন ইউনিফর্ম পরে নিচ্ছে নিঃসঙ্গ চামড়ার ক্ষুধা ভুলতে।
কই আমিও তো পরিত্যক্ত ঘোষনা করছি না খেলা, আমিও তো বলছি না - “ The time will soon come/ When we can have rest. Our small crosses will stand/ On the bright edge of the road together/ And rain fail and snow fail/ And the winds come and go/…..Over the faint countryside/ And we rest, Hand in hand…”। তবে কি আমিও অপেক্ষা করছি কোনো এক অসীম রেফারীর জন্য! এই বাতাসঅশ্রুআলো এই উঁচু উঁচু টিলা আর নিচু নিচু জলে নেমে যে বাঁশি বাজিয়ে থামাবে গৃহীর চক্ষুহীন কর্ণহীন ছুটে যাওয়া গুপ্তবীজেদের! এই ছোটার ভেতর দিয়ে মুক্ত করবে স্বরূপের দিকে ? জড় আর চৈতন্যের মাঝের সেই বিভঙ্গ যে কিনা আছে আমার মাঝে তোমার মাঝে আছে একের মাঝে অতিকায় একটা একক চিনিয়ে! কি এই একক কি এই থামা –যা জেগে থাকতে থাকতে জাল বুনতে বুনতেও ক্লান্তির কথা বলছে দাঁড়াবার কথা বলছে। কেউ কেন করছেনা একটু দাঁড়াবার প্রশ্ন? কেউ কোন চাইছে না দিগন্তপ্লাবিত এ মহাশূণ্যে কোনো এক জায়গায় থামার নিশ্চিতি! আর এই প্রবহমানতায় এত সামান্য প্রশ্ন অথচ উত্তরের জায়গাটা খালি, প্রশ্নের পর প্রশ্নের ধাক্কায় যেন অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে উত্তরের, তাকে কাঁধে তুলে নিতে এসে পড়েছে আরও প্রশ্ন আরও পজিশন।ঠিক এমনই কোন পজিশনটা হতে পারত আমার? ঠিক কোন পজিশনটা নিতে চেয়েছিলাম? ডিফেন্স! সেন্টার হাফ! ফরওয়ার্ড! হয়ে গেলাম রেফারী-জীবনের এক গোছা মানে বই নিয়ে ট্যাকটিক্স নিয়ে জয় পরাজয় নিয়ে দৌড় দেখব বলে দাঁড়িয়ে গেলাম মাঠের মাঝরাবর। যতই ভেতরে ঢুকবো ততই কি একটা জায়গা খুঁজব? একটা শূণ্য কিছু! পজিশন(!) সে কি কেবল এক ঘোরলাগা আত্মহত্যার প্লট? চৈতন্যের ব্যপ্তি ঘটবে? নাকি ঠিক উলটো দিক থেকে কোথাও কোনও হয়ে ওঠাই নেই। কেবল বল ছুটছে গোলক ছুটছে ,আমিও ছুটছি, থামা নেই,আসলে শেষ অবধি থাকাটাই শূন্যবাদী। লক্ষ্য করছি টাচলাইন ধরে একের পর এক খেলোয়াড় একের পর এক অ্যাসট্রল বডি, সংখ্যা নিয়ে ঢুকে পড়ছে বেঁচে থাকার এক বহুমাত্রিক সংকট।
ওই তো মাঝমাঠ অতিক্রম করে তোমাকে পেরিয়ে যাচ্ছে তোমার অর্ধেক তুমি পেরিয়ে যাচ্ছে আমার অর্ধেক আমি। অথচ রেফারীর জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে একবারও বাঁশি বাজাচ্ছি না কেন?
একবারও কেন বলছি না – ‘অফসাইড’ ! ‘অফসাইড’ ! ‘অফসাইড’!


খেলা সম্পর্কীয় তথ্য ঋণ- অমল দত্ত