নীল ডায়েরির পাতা থেকে

তিস্তা ও অদিতি বসুরায়



ঘুম ভাঙলো যখন তুই নেই । ঘুম ভাঙলো যখন দরজা হাট করে খোলা । ঘুম ভাঙলো যখন অনেক দেরী হয়ে গেছে । ঘুম ভাঙলো যখন ট্রেনের জানালা দৃশ্যের মত সব দূরে সরে যাচ্ছে...বসন্ত পাখি মাঠ পুকুর আকাশ বাতাস জল সিনেমা নাটক কবিতা গান...সব, সব কেমন হু হু সরে যাচ্ছে ! উড়ে যাচ্ছে শুকনো পাতার মত আমাদের চাদর বিছানা খাট... আমি ধরতে পারছি না । দৌড়ে গিয়ে ট্রেনের চেন টেনে দিতে পারছি না ।আমার তখন দৌড়োনো বারন । আমার তখন উত্তেজিত হওয়া বারন । আমার তখন সিড়ি ওঠা-নামা বারন ।

আমার ভিতর তখন টালমাটাল ব্রহ্মান্ড...


এমন না রাশ টানতে জানি না । এমন না ঠাস্ করে দরজা বন্ধ করে দিতে জানি না ।এমন না হাত সরিয়ে নেওয়া অসম্ভব তোর হাতের ওপর থেকে। তোর প্রতিটা ইগনরেন্সের পর আমিও ইগনর করতে পারি না এমন না । আমিও পারি । তোর প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যেতে আমিও পারি। তুলে নিতে পারি আমার সমস্ত ভীরু সতর্ক বার্তাগুলো । তুলে নিতে পারি ঠোঁট চুমু আদর...বুক বুকের ওম... তুলে নিতে পারি তোর মুখের ওপর পরে থাকা আমার এলানো চুল । হাতের থাবা থেকে স্তন । শরীর থেকে শরীর ।পারি পারি পারি আমিও সব পারি । সব গুটিয়ে নিতে পারি । উইথড্র করে নিতে পারি এক নিমেষে ।



শুধু পারি না একটা মুহূর্তও তোকে না ভালোবেসে থাকতে



বারন বারন বারন । সব বারন । সবাই বলেছে বারন । ডাক্তার বলেছেন বারন । মা বলেছেন বারন । দিদিভাই বলেছে বারন । টুলু কাকিমা বলেছেন বারন । ফুল মামি বকুল দিদা বাবলি বৌদি ন-দি বরদি পিসি কুঁজৌ ঠাম্মা...সবাই, সবাই বলেছে বারন ।

কিন্তু কেউ কেন তোকে বারন করেন নি !


তুই ফিরবি না ।
তুই আর কোনদিন ফিরবিনা জেনেও –
এখনো মাঝে মাঝে শাদা লেসের পর্দাটা টানাই ।
খোলা চুলে দাঁড়াই জানলার পাশে...

আমার সেই শ্যাম্পুর গন্ধটা !
তুই আর পাস না, না !


ছাদের পঞ্চমুখী জবা গাছটায় এখন আর ফুল ফোটে না ।
তবু জানিস, আশরীর... কি অসহায় –
সূর্যের দিকে ঝুঁকে পড়েছে !

আচল খোলা নষ্ট মেয়ে মানুষের মত


আমার চলার সব কটা পথ আলোয় ভরিয়ে দিবি বলে
সিড়ি বারান্দায় টুইন্ সুইচ্টা লাগিয়েছিলি একদিন ।

আজ মাস কয়েক –
খারাপ হয়ে পড়ে আছে ।

এখন আর অন্ধকারে ভয় করে না আমার



গদাই দা-টা কতবার পই পই করে বলেছে –
বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়ি ঘরে রাখতে নেই । জীবন থেমে যায় ।
শুধু তোর ছোঁয়া মুছে যাবে বলে
আমি আজও সারাতে দেইনি ঘড়িটা ।


তোর গিটার...অ্যাসট্রে...আর ওই রুপোর গ্লাসটা !
মা না বোললেও বুঝতে পারি –
উদাস পাতা ওই বৃদ্ধার চোখে কেবল তোরই অপেক্ষা....

তুই নেই । নেই তো ! কোত্থাও নেই ।
তবু মনে হয় ঘরের প্রতিটা বাঁকে তুই লুকিয়ে আছিস ।
প্রতিটা কোণে ।
এখুনি এসে জাপটে ধরবি !
আমার হাতের হলুদ তোর গালে
আর, আমার গলায়...বুকে...মাখামাখি তোর সেভিং ক্রিম !
******************


তিস্তার লেখা আসলে তীব্র আবেগের সঙ্গে মিশে থাকা বিষণ্ণতার মিশেল। আমি লেখাগুলিকে ভালবাসার কবিতা বলেই মনে করছি। তবে এ ভালবাসার প্রকাশ আছে, প্রাপ্তি নেই। যে নেই- সে আছে,প্রবল ভাবে মিশে আছে জীবনের প্রতিটি মুহুর্তের সঙ্গে। তিস্তা সেই বিচ্ছেদকে মান্যতা দিয়েছেন। মান্যতা দেওয়াটাই তো কবির রীতি। অন্ধকারে অভ্যস্থ হয়ে যেতে হয় তাই তাকে। বারান্দার বাল্ব জ্বললেও সে কালো কাটার নয়। সম্পর্কের এমন এক বিন্দুতে কবি দাঁড়িয়ে আছেন যার প্রতি দুনিয়া জোড়া নিষেধাজ্ঞা। সেই বাধার যতই শক্তি থাক তা কিন্তু কবির প্রেমকে আটকাতে পারছে না-পারেও না। আমাদের মেয়েদের আসলে একটা আলাদা জাপন আছহে,যে জাপন একান্ত মেয়েদেরই। সিমোন দ্যা বেভোয়া বলেছেন মেয়ে বা পুরুশ হয়ে কেউ জন্মায় না,তাদের জীবন যাপ্নের ধারাটি থেকে সমাজ তাকে নারী বা পুরুষ-এ উর্তীণ করে দেয়। এখানে তিস্তা সেই ধারাতেই ব্যেছেন। তার লেখায় তাই মেয়েলি অনুষঙ্গে উঠে এসেছেন ভয় - আশ্নক্ষা- অভিমান। এই অভিমান মেয়ে জন্মকে চেনায় একেবারে নির্দেশ্য ভাবে। তিস্তা সেই যাপ্নকে তুলে এনেছেন। তাই তাঁর লেখার স্নক্বেত বুঝতে অসুবিধা হয় না। তিনি জেদ,অবুঝপনা এবং ভাল্বাসায় অন্নন্যা। নিজেকে প্রশ্র্য দিয়েছেন এক অন্ধকার, বারণের জায়গাকে নিজের চারণ ক্ষত্র করে তুলতে। এ বড় সাহসের কথা ! লেখাগুলোর পড়টী পঞকতিতে সেই জেহাদ - এর জেহাদের জিন্দবাহ লিখেছেন কবি নিজেই। সেই সঙ্গে করুণ সুরটিও কিন্তু পাঠককে বিচলিত করবেই। ভালবাসা যে ক্লান্ত ও যন্ত্রণার দিক্টিক তিস্তার লেখায় ফিরে ফিরে এসেছে সে আসলে এক ক্রুশ-যাপনের বর্ণ্না। কাঁটা ও চাবুক ছাড়া যেখানে প্রাপ্তির ভাণ্ডার শূণ্য। 'নীল ডায়েরির' পাতায় পাতায় এমন আখর সাজয়েছেন তিস্তা যেখানে আগুনের আসনে তাঁর বস্ত। সেভিং ক্রিমের গন্ধে আর ভাসছে না তাঁর শাম্পুর গন্ধ। হলুদের উল্লেখ এক অস্মাপ্ত এবং গন্তব্যহীন বিবাহের চিহ্ন যেন মেলে দেয় আমাদের সামনে। যে শয়ণয়তায় ঢেউ বেশি নেই। আঁখি আলো থেকে গড়িয়ে গিয়েছে অশ্রুসমূহ। ঘড়ি না সারালেও কবি যে শুশ্রুষা প্রার্থী তা নিয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই।