তোমার হয়ে জীবনবীমা

শান্তনু বেজ ও জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়





তারপর নখের বাকিটুকু ভিজে গেল

সন্ধ্যা খবরে নিম্নচাপের সত্যি পেলাম
ঘরের ভিতরে এখন যে জল চপচপ। স্যাঁতসেঁতে
ওটা বঙ্গোপসাগরীয়। যথা দামোদরবর্তী

তোমার ন্যাতা ছুঁতে যাচ্ছে বিশ্বজোড়া জল
মুছে দিচ্ছো ঢালু রাস্তায় আসা। মেঘের কান্না

তারপর শাড়ির হয়ে তুমি পুনরায় রঙ নিলে
চোখ মুছলে মেঝের হয়ে
আঁচল খুললে। গোছ করলে। আয়নার হয়ে

এখন তুমি ভিজে। বারান্দার ভূমিকা। অটুট



হিন্দি ঘটনার দিনে তুমি আঙুল দেখছিলে
চুপচাপ ভাস্কর্যের হয়ে। ভালো পুতুল যেন

শরীর থেকে নাবিক ধর্ম। উধাও
চেয়ে দেখছি অবেলার ক্রোড়পত্র। নামহীন

অনেকটা। পৌঢ়ের মতো পরে গিয়েছিল। সেদিন ভোরবেলা। কত জোড়া চোখের ছায়াপথ লাল

একটা ভালো বোতাম। যেন আমাদের অলিন্দ

ওটা দেখছি বলে। তুমি সুতোর হয়ে ছিঁড়ে গেলে
চিৎকার করলে। পুতুলের গলা নকল করে

এখন তুমি ভেজা। নূপুরের সম্পাদক। অম্লান




তুমি শুধু একের পর এক ইশারা। নিশ্চিত ভাষা।

ছাড়িয়ে চলে গ্যাছো সাদা বাড়ি। ওখানে ঘন্টা নেই
দেখা যাচ্ছেনা তোমায়। নেমে আসছে ঝরনা
বৃষ্টি আসছে একদিকে। অন্যদিকে বদ্বীপ।

রাস্তা জুড়ে ফুটে উঠছিল কাদম্বরী। ও রামের বৌ

একটি মেয়ে তোমার হয়ে সেগুলো কুড়িয়ে দিল
তার হাতে আবার ভ্রমন। পাশে পাঠকের ঘোড়া

এখন তোমার ভেজা।একজন আকাশ। নিমসেলাই




তুমি কথা বলছো। গোলাপের হয়ে।
উপস্থিত বনসকল। কানের কাছে মৌমাছি কেন

আমি কথা শুনছি। টেবিলের হয়ে।
পর্যাপ্ত খাবারদাবার। জিভের কাছে মাংস কেন

তোমার আমার ইন্দ্রিয়। জুড়ে দিলে। যখনতখন
জুলাই। বাংলার শ্রাবণ। এবং

নৌকার খোলে অন্যতম ফুল। পুরো ভর্তি রঙ্গ

তার পাশে একটি স্টেশন।
যেখানে রোজ দুপুরে দুধের ডেচকি উল্টে যায়
ঠিকানা সতীর বাহান্ন পীঠ। আমাদের জীবনবীমা

এখন তুমি ভেজো। চোখ তুলি। মহা শশ্মান



************





ব্লেড এর অভ্যেসটা অনেকদিন হ’ল কেটে গেছে। দাঁত দিয়েই কাজ চলে যায়… যেভাবে মুহূর্তও চলে যায়, টিক টিক শব্দ শোনা যাক বা না যাক। তবু, মাসে অন্ততঃ একবার নেল কাটারের খোঁজ করতে হয়। একটু বেশি যত্ন করেই কাটতে হয় তর্জনী, মধ্যমা আর অনামিকার নখ… সাবধানতা। তবে যতই সাবধানতা থাকুক, একটা নখের কোণ উঠা… খানিকটা চামড়া ছিঁড়ে যাওয়া… ভীষণ ভাবে এড়িয়ে যেতে চাওয়া পরিচিত রক্তপাত… অবধারিত। একটা পুরনো অভ্যেস কেটে গেলেও, নতুন অভ্যেসের সবটুকু আজও ঠিকমত রপ্ত হয়নি। একটা খচখচ লেগেই থাকবে নখের কোণে… যেমন মনের কোণে লেগে থাকে, বেশ কিছুদিন। তুলো আর খানিকটা তরল অ্যাণ্টিসেপ্টিক পাশেই থাকে, নিজেকে কিছুটা হলেও চিনে গেছে বিশাখা। কটাস করে নেলকাটারের কামড় খাওয়ার পর নখের যে টুকরোটা ছিটকে চলে গেল তাকে দেখতে পেল না বিশাখা, বারান্দার রোদটাও যেন হঠাৎ করেই পড়ে এলো। অনামিকার কোণে খোঁচাজন্ম নখের অবশেষকে সঙ্গে নিয়েই বিছানা ছেড়ে বারান্দার দিকে উঠে গেল… মেঘ তো ছিলই, জল এসে ভিজিয়ে দিতে আর কত দেরি? আগের মত বৃষ্টি দেখার তাড়া নেই। সোঁদা গন্ধের প্রতি পুরনো ভাল লাগা? তাতেই বা কি আসে যায়? ছাতিম গাছের পাশে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে সাইকেল নিয়ে। ছেলেটা যেদিকে তাকিয়ে, সেই দিকে চোখ চলে গেল বিশাখার। একটা স্কুল ড্রেস পড়া মেয়ে প্রায় দৌড়ে চলে যাচ্ছে রাস্তার ধার দিয়ে। বৃষ্টি আসছে বলে? আনমনেই অনামিকায় জেগে থাকা খচ-খচ টা দাঁত দিয়ে উপড়ে ফেলল। আহ্‌... আবার রক্ত বেরোবে, আবার অ্যান্টিসেপ্টিক। এটাও অভ্যেস হয়ে গেছে, সব ব্যথাই একসময় কমে যায়... কেউ আগে, কেউ পড়ে... কেউ এক দিনে, কেউ এক বছরে, কেউ... বারান্দায় ঝোলানো শাড়ী, ব্লাউজ, শায়া সব এমনিতেই স্যাঁতস্যাঁত করছে এখনও। শুধু পাজামা আর টি-শার্ট’টা কিছুটা শুকিয়েছে। নখের কোণে অ্যাণ্টিসেপ্টিকে ভেজানো তুলো চেপে আগে সেইগুলোই তুলে নিলো এক এক করে। রক্ত দেখে একবারই খুব ভয় করেছিল, সেই প্রথম বার... হঠাৎ করে পা বেয়ে গড়িয়ে পরা স্রোত! লাল রঙের কিংবা গাঢ় রঙের সব কিছু যেন বেশি বন্ধু হয়ে ওঠে, যখন রক্ত এসে ছোঁয়। যখন রক্ত এসে ছোঁয়, তখন হালকা সবই ভীষণ এড়িয়ে চলা। জানলাটা আলগা করেই খোলা ছিল, একটা দমকা হাওয়া ঘরে ভেতর টুকে দমাস করে বন্ধ করে দিলো। এবার ঝেঁপে বৃষ্টি আসবে। রক্ত, গাঢ় রঙ, এক একটা ভিজে যাওয়ার কথা উলটে পালটে হাওয়া উড়ছিলো, কপালের ওপর আছড়ে পড়া খোলা চুলের মত। বারান্দায় জলের ছাঁট আসছে, ঝেঁপে বৃষ্টি। দড়ি থেকে ক্লিপ খুলতে খুলতে স্যাঁৎস্যাঁতে কাপড়গুলো একে একে তুলে নিলো বিশাখা, তারপর ছুঁড়ে ফেলে দিলো ঘরের মেঝেতে। কিছু আসে যায় না। আর এক ঝলক দমকা হাওয়া জানলাটা দমাস করে খুলে দিলো, বেসিনের ওপর টাঙানো আয়নাটা পড়ে গেল শব্দ করে, কাঁচ খান খান। কিছু আসে যায় না। বারান্দার গ্রীলে স্বচ্ছ স্ফটিকের মত একের পর এক বৃষ্টিফোঁটার স্বাধীন হওয়া দেখতে দেখতে আবার চোখ গেল ছাতিম গাছটার দিকে। ছেলেটা সাইকেল নিয়ে এখনও ছাতিমের নিচে, গাছের গোড়ায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে... ভিজছে মাথা নিচু করে। তাহ’লে বৃষ্টি নয়... তাহ’লে বৃষ্টি নয়। বৃষ্টির ছাঁট বারান্দায় কিছুক্ষনের মধ্যেই যে ক্ষীণ তিস্তা সৃষ্টি করছে, গোড়ালিতে তার ছোঁয়া পেতেই বারান্দার গ্রীল ছেড়ে ধীরে ধীরে বারান্দার মেঝেতে বসে পড়ল বিশাখা। ধীরে ধীরে ভিজে মেঝের ওপর শুয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। অন্ধকার ঘর, বালিশের আড়াল, ছাতের কোণ... সব কিছু ছাপিয়ে এই বারান্দার মেঝে বিশাখার কাছে এক অন্য আশ্রয়। সন্ধে অবধি এক টানা বৃষ্টি পড়ল, সন্ধে অবধি কুলুকুলু বয়ে চলল তিস্তা, বারান্দার এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত... নোনা জল নিয়ে। নখের কোণে রক্ত? সে তো কখনই শুকিয়ে গেছে। একটা গভীর ব্যথা, সে যত পুরনোই হোক, এমন অনেক খচখচ করা যন্ত্রনাকে তুচ্ছ করে দিতে পারে।


... ... ... ...

এ বাড়িতে প্রথম আসার পর, বসার ঘরের সাজানো শো কেসগুলো অদ্ভুতরকম ভাল লেগেছিল। কত সুন্দর, সাজানো একের পর এক শো পিস্‌, পুতুল, ফুলদানী, চিনে মাটির কাজ... সাজানো, পরিষ্কার, স্পষ্ট যত্নের ছাপ। বুঝেছিল, এই বাড়ির লোকজনের একটা সুন্দরকে চেনার চোখ আছে... তার কদর আর যত্ন দু’টোই বেশ করতে জানে। যত্ন... বাড়তি গুরুত্ব, একটু বেশি করে নজর কাড়া... সে লোভ কার না থাকে? নিশ্চিন্ত যাপন আর নিরাপত্তা, সেও তো কোনও অন্যায় নয়? ভুলটা কোথায়?
কোনও ভুল নেই... সত্যিই এ’বাড়িতে সুন্দরকে চেনার আর তার কদর করার একটা চর্চা আছে। তর্জনী কেমন আসতে আবিষ্কার করে চলত এক সুদীর্ঘ আঁকাবাঁকা পথ ধরে। কোথাও বিশ্রাম, কোথাও আলাপ, কোথাও আরাম, কোথাও খনন... এইভাবেই তো প্রত্নতাত্ত্বিক জীবন একের পর এক দশা অতিক্রম করে পায় সহস্রাব্দ প্রাচীন অষ্টধাতুর যক্ষিনীকে! বেলুর মন্দিরের ভেতরে এক যক্ষিণীর ছবি দেখিয়েছিল ও। “কাঁধের ওপর পাখিটাকে দেখছ? মুখটা তোতার মত, আর ল্যাজটা ময়ূরের। কথা তোতাপাখির মত, নাচ ময়ূরের মত। আর শরীরের ভঙ্গ আর ভঙ্গিমাতো দেখতেই পাচ্ছো!” আঙুল নিয়ে যেতো ভঙ্গ, আঙুল খুঁজে নিতো ভঙ্গিমা। কোনও কোনও মুহূর্ত চুপ করে দেখতে... দু চোখ ভরে শুধু দেখতে যে কি ভাল লাগে!
তারপর শুধু ডুবে যাওয়ার ইতিহাস। নাকি ইতিকথা? ‘ইতি’ শব্দটাই বোধহয় ঠিক নয়। জাহাজ ডুবছে, নৌকো ডুবছে... ডোবা নিশ্চিৎ জেনে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাবুডাবু খেতে খেতে তল খোঁজার চেষ্টা। পায়ের নখে একটু মাটি লাগুক!
প্রথমে নুন-বালি দেহ ভেসে উঠুক বালির চড়ে। জ্ঞান ফিরুক শঙ্খ চিলের চিৎকারে। তারপর ধীরে ধীরে উলটেপালটে দেখা সেই ভিজে ন্যাতা হয়ে যাওয়া সেই মানচিত্র... যা এই অজানা দ্বীপে কোনও কাজেই আর লাগবে না। শুধু বোঝা যায়... খিদে পাচ্ছে, তেষ্টা পাচ্ছে, জুড়িয়ে আসছে দু’চোখ।

তারপর? তারপর আর কি? বিচ্ছিন্ন পরিচয়হীনতা নিয়েই যে দ্বীপের জন্মলগ্ন, তার ক’টা দিন আর ক’টা রাতের কথা কোন সৈকত ধরে রাখবে? বালি... কোথাও ধূ ধূ উড়ছে, কোথাও চিকচিক, কোথাও জোয়ার এলেই ডুব। শুধু একদিন দুপুরে একটা শাড়ী পাট করতে করতে মনে পড়ল, তিন বছর আগে বউভাতে পাওয়া। তারপর মনে পড়ল, মিরিকে... ঝুলন্ত শাঁকোর ওপর এই শাড়ী পরেই ছবি আছে। এরকম ভাঁজে ভাঁজে আর কী কী ভাঁজ করা আছে? আলমারি... সে তো শো কেস নয়, সাজানোর তাক নয়। যক্ষিণীদের ভাস্কর্যগুলো, একজনও এমন আঁচল জড়িয়ে শাড়ী পরে ছিল কি না... একদম মনে পড়ছে না। আয়না দেখা লাল জবাফুলের মত চোখ, ঠিক যেমন কুসুম লাল হয়ে সূর্য পাটে বসে বিচ্ছিন্ন দ্বীপটায়... পাটে বসত গৃদ্ধকূট পর্বতে, এক সুগভীর রক্তিম বলিরেখা নিয়ে... সেই চোখের সঙ্গে বোঝাপড়া মিটিয়ে নিজেকেও আলমারিতে পাট করে রেখে দিলো সেদিনের মত। লাল রেখাগুলোর মাঝে কতগুলো নদী শুকিয়েছে, ক’মাইল খরা... জানা নেই। শুধু মাঝে মাঝে ঝুরো বালি ওড়ে, উড়তেই থাকে। কর কর ওঠে চোখ, চিক চিক করে... ঠিক সেই দ্বীপের বালিয়ারিতে, যেমন অভ্র চিক চিক করত দুপুর রোদে। সবটাই পাট করা আছে... ভাঁজে ভাঁজে নৈঃশব্দ হয়।

অথচ, সেদিন রাতে কেন যে হঠাৎ চিৎকার করে উঠেছিল, তা বার বার জিজ্ঞেস করলেও বলেনি বিশাখা। শিরশির করছিল, কাঁপছিল তিরতির করে। সে তো মাঝে মাঝেই করে। তিন মাস পর এসে, এতদিন পরে... বিছানার ব্যবধানে আলাদা করে সম্পর্কের দোহাই দেওয়ার কিছু নেই। এমন মাঝে মাঝেই তিন মাস, কিংবা চারমাসের ভৌগলিক দূরত্ব আসে। কিন্তু দূরত্বটা সেই রাতে আর কিলোমিটার কিংবা মাইলের এককে মাপা হয়নি। চিৎকার দিয়েই মাপা হয়েছিল। শোবার ঘরে কী কথা হয়? তা কেবল বিছানাই জানে। চিৎকারটা কার কার কানে গেছিল... তা জানে সেই কানগুলোই। কিন্তু তিন মাস পর, উষ্ণতা দাবী করা মানুষটা একেবারেই জানে না - একটা বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়েছিল, কদমগাছের পেছনে ইঁট গাঁথা পাঁচিলের আড়ালে ভেজা ওড়নাটা সরিয়ে একটা ভেজা ঠোঁট যখন এগিয়ে এসেছিল... সেদিনও এমন চিৎকার শুনেছিল সেই পাঁচিল, কদমগাছ আর বৃষ্টিদিন। চুমু নয়, আপত্তি ছিল কাঁধের দুপাশে বসা সেই একজোড়া হাতে, যা ক্রমে থাবা হয়ে উঠছিল চাপতে চাপতে। পাথরের ভাস্কর্যগুলো এমনিতেই সহস্রাব্দ পার করে ক্ষয় চিনতে শিখে গেছে। আর পাথরের গায়ে কালশিটে... সেই বা কে কবে দেখেছে? বাদামী, নীলচে অথবা খয়েরী দাগগুলো আর তাদের নিচে জমে থাকা ব্যথাগুলো চেনানো খুব মুশকিল... তার থেকে চিৎকার, অনেক দ্রুত পৌঁছে যায়, দেওয়ালের ওপারে।

বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকক্ষণ, বারান্দাটাও ভাল করে মোছা হয়ে গেছে। তিস্তা এখন ফল্গু। নখের কোণ টা আবার এখন মনে করিয়ে দিচ্ছে সুযোগ পেলেই, সে ভাল নেই। টিউবলাইটের আলোয় দরজার এপার, আর ওপারে বারান্দা অন্ধকার। দরজাটা ইচ্ছে করেই বন্ধ করে দেয় বিশাখা। খোলা দরজার পর্দা হাওয়ায় উড়তে থাকলে বার বার সেদিকেই চোখ চোলে যায়। মনে হয় কেউ যেন ডাকছে বার বার। একটা মেলায় কেনা পুতুল, সেলাই করে দেওয়া একটা শার্টের বোতাম, এক জোড়া পায়ের নূপুর... এর মধ্যে কে যে পর্দার ওপারে এসে হাজির হবে, এটা ভেবেই শিউড়ে উঠল বিশাখা। রিমোট দিয়ে ধারাবাহিকের চরিত্রদের কণ্ঠস্বর আরও বাড়িতে দিলো বেশ খানিকটা। হে সন্ধে, তুমি স্বাভাবিক হও... একটা আচমকা বৃষ্টি, ভেজা সাইকেল, নূপুর... সবই ক্ষণস্থায়ী, তোমারই মতন।


... ... ... ...


গ্রীসের স্যান্টোরিনির মত অনেকটা জুড়ে শুধু সাদা আর সাদা নয়... তবুও অনেকটা জুড়ে একাই সাদা শার্ট। কলারের নিচে খোলা বোতামের ফাঁক থেকে উঁকি দেওয়া খানিকটা বুক, একটা আস্ত জগৎ হয়ে ওঠে... অথবা একান্ত নিজস্ব বাসা। স্যান্টরিনির মত সাদা ধবধবে ঘর। তার ভেতর গালে হাত দিয়ে চুপচাপ... একের পর এক ইশারার ক্লাস... ধবধবে সাদা ঘুঁড়ির ফরফর টান। ছোট ছোট চিরকুট, সাবানের বুদবুদের বাক্স, চুলের ফিতে, আঙুলে-আঙুল জড়ানো অঙ্ক খাতার সেই পাতাগুলো... সবই কি মিষ্টি একটা সাদায় ভরা... গাছ ভর্তি টগর ফুলের মত! এই টুকু মনে পড়লেই মনটা ভাল হয়ে যায় বিশাখার। সত্যি-ই তাই, যতটুকু মনকে ভাল রাখে, মনেরও ততটুকুই রাখা উচিৎ নিজের কাছে। কি রইল না, কে চলে গেল, কে ছেড়ে গেল... কতটা হারিয়ে গেল... সেগুলো ফিরিয়ে ফিরিয়ে গুমরোনোর কোনও মানে হয়? সেই যে সাইকেলটা, এত বছর পরে তাকে কি আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে? যাবে না! অথচ হ্যাণ্ডেলে বেঁধে দেওয়া মেরুন সিল্কের ফিতেটা চোখ বন্ধ করলে আজও দেখা যায়। স্কুলের জন্য অম্লানই এনে দিয়েছিল আকাশী, মেরুন আর হলুদ সিল্কের ফিতে। ওয়ার্ক এডুকেশনে লাগবে। মেরুনের যতটা বেঁচে গেল, প্রজাপতির মত থেকে গেলো সাইকেলের সাথে। তারপর সেই কদমগাছ, যাকে একা একা ভিজতে দেখলে মন খারাপ হয়ে যেত হঠাৎ। আবার গাছ ভর্তি কদম ফুল দেখলে মন ভালও হয়ে যেত হঠাৎ। স্কুলের দারোয়ান মোতিলালের ছেলে কদমফুল নিয়ে খেলত বলের মত। একটা ফুল নষ্ট হ’লে আর একটা ফুল কুরিয়ে লোফালুফি, ছোঁড়াছুঁড়ি শুরু হ’ত। কদমফুল অম্লানের পছন্দ ছিল না। কদমগাছের সাথেও বোধহয় ছিল একটা লেনদেনেরই সম্পর্ক। তবুও মাঝে মাঝে পড়ে থাকা কদমফুল গুলো কুড়িয়ে নিতো বিশাখা। অম্লানকে শুনিয়েই বলত, “তোমাকে দিচ্ছি না...”; আর তুলে দিতো মোতিলালের ছেলেটার হাতে। ‘ওই... এই নে!’। তারপর সেই... লোফালুফি, ছোঁড়াছুঁড়ি, ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া।

সাইকেলটার আবার দেখা পাওয়ার প্রত্যাশা কোনওদিনই ছিল না। কিন্তু কদমগাছটা সেখানেই রয়ে গেছে। ঠিক আগে যেমন ছিল। তার পেছনের ইট গাঁথা দেওয়ালটা ভেঙে একটা একতলা বাড়ি হয়েছে। তার সামনের দেওয়ালটাও ধবধবে সাদা। হয়ত খুব শিগগির কোনও পার্টির ছেলে নিজেদের চিহ্ন এঁকে দিয়ে যাবে। সে দিক... এখন তো সাদা! সেদিনের ভেজাটা বারান্দা বন্দী নয়। বাপের বাড়ি এসেছিল বিশাখা তিন-চারদিনের জন্য। রিক্সা করে ঘুরে গেল স্কুলের পাড়াটা। স্কুলের কাছাকাছি গলি আর রাস্তাগুলো। কদম গাছের সামনে আসতেই বুঝতে পেরেছিল, এইবার ব্যাগ থেকে ছাতাটা বার করতে হবে। মোতিলালের ছেলেটাকে কোথাও দেখা গেল না। মোতিলালের বউ বিশাখাকে দেখে হাসল। চিনতে পেরেছে কি? কোনওদিন ওর সাথে কথা হয় নি... একটা ‘কেমন আছ?’ বলার আগেই মেঘ ডেকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে টিপ টিপ করে বৃষ্টি। রিক্সা মুখ ঘুরিয়ে নিলেও পেছন ফিরে দেখল বিশাখা, কদমগাছের কাছাকাছি মোতিলালের বউ। এখনও একই রকম আছে। বৃষ্টির জন্য আঁচল টেনে মাথা ঢেকেছে। দাঁতের মাঝে কামড়ানো আঁচল, তখনও হাসি লেগে আছে। সমস্ত শরীর একটা জরিপাড় গেরুয়া শাড়ীতে ঢাকা, ভিজে যাচ্ছে। শুধু এই হাসির জন্য বিশাখার খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়... এই কাপড়ের নীচে কোনও লুকনো দাগ নেই। কোনও বাদামী কিংবা খয়েরী দাগ জন্ম নেয় নি... নিলেও তাড়াতাড়ি মরে গেছে, একদম মরে গেছে!

বিশাখার ছাতাটা একহাতে মাথায় ধরে তাড়াতাড়ি প্যাডেল করতে শুরু করল রিক্সাওয়ালা। হলুদ স্কুলবাড়ি ঝাপসা হয়ে গেল খুব তাড়াতাড়ি। যেভাবে সাইকেল করে সাদা ঘরটা দ্রুত দূরে সরে গেছিল, ভিজতে ভিজতে... সেইভাবেই। ঝাপসা পর্দার ওপারে দেখা যাচ্ছে না কিছুই। পর্দা বেয়ে ধীরে গড়িয়ে পড়া ধারা, হঠাৎ-জন্ম পাহারী ঝোড়ার মত। আর চোখে মুখে লাগা বৃষ্টির ছাঁট। মেঘ ডাকলে এখনও ভাল লাগে, বিদ্যুৎ চমকালে সচেতন হ’তে হয়... আর, আকাশে উড়ে যাওয়া বিমানের শব্দ শুনলে, আর কারও কথা মনে পড়ে না।

নখটা এবারে বেশ ক’দিন ভোগাবে। মাঝেই মাঝেই টন টন করে উঠছে ব্যথাটা। নিজের প্রতি একটা চাপা বিরক্তি নিয়ে হাত জড় করে অভ্যাসমত প্রণামকরে নিলো বিশাখা, চোখ টা বন্ধ করে। ঘন্টা বাজছে পাড়ার জাগ্রত কালী মন্দিরে, আরতি হচ্ছে। কোনও ঘন্টার আওয়াজই স্কুলের সেই ছুটির ঘন্টার মত নির্মল আনন্দটা দিতে পারল না।


... ... ... ...


সাইকেল, আর রিকশা পার করে একবারই নেমেছিল নদীতে। শুধু একবারই। নৌকোর ছাউনিতে যে কী করে সেদিন কেবল দু’জনই ছিল... তা কিছুতেই বুঝতে পারেনি। অম্লান বলেছিল – মাঝে মাঝে এমন হয়। সেই ‘মাঝে মাঝে’-টাও এসেছিল একদিনই। সেদিন কিন্তু একদম বৃষ্টি ছিল না। শুধু মেঘ... ভেলার মত ভেসে যাওয়া মেঘ। নৌকোটাও ধীরে ধীরে ডাঙা থেকে সরিয়ে নিলো মাঝি। এক ঘণ্টার জন্য কত টাকা দিয়েছিল অম্লান? জানা হয় নি। তার থেকেও বেশি জানতে ইচ্ছে করছিল... মানুষের ঠোঁট কি সত্যিই কখনও গোলাপের পাপড়ির মত হ’তে পারে? কানের কাছে পাপড়ি নিয়ে এসে কত কিছু গুন গুন করে বলেছিল অম্লান। রোজই তো কত কিছু বলে, তবু সেদিন কেমন অন্যরকম... জড়িয়ে আসা শব্দগুলো একটানা হালকা সুরে গাঁথা। সেই কথাগুলো ভাবলে এখনও কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যায় বিশাখা। কানের কাছে গোলাপের পাপড়িগুলো কত কী বলে গেল... ধীরে ধীরে সিক্ত হ’ল লতি, তারপর ঘাড় আর গলা। মেঘ করে ছিল নৌকোর ছাউনিতেই। নাহ’লে ওভাবে টিপ টিপ জলের ফোঁটা এলো কোথা থেকে? সেদিন অনেক কিছুই পেয়েছিল প্রথমবার। এমন অনেক কিছুই গচ্ছিত রাখা আছে, যা জীবনে কেবল একবারই হয়ত পাওয়া যায়। আস্ত একটা গীতিকাব্য থেকে গেছে সেই নৌকার কোলে। মাঝির পকেটের টাকাগুলো খরচ হয়ে গেছে খুব শিগগির। নৌকাটাও কি এখনও ও-ই বায়? নাকি সেও হাতবদল? গীতিকাব্যটাই আর কেউ খুঁজে পেলো না। মেঘ হয়ে মাঝে মাঝে ঝরে ঝরে পড়ে, আর বয়ে যায় ইচ্ছে মতন। সেই নৌকো আসলে স্মৃতি নয়, নৌকোই বাস্তব। অনেক চেষ্টা করেও বিছানা কখনও নৌকো হ’তে পারে না... দুই পাশে বয়ে চলা কোনও স্রোত নেই বলে! যাদের বিছানা নৌকো হয়েছে... তারা পরম ভাগ্যবান, এই পৃথিবীর বিরল প্রজাতি।

অন্যমনস্ক হ’তে অজুহাত লাগে না। দাঁতের কোণে আটকে থাকা ছিবড়ে মুরগীর মাংসই যে হঠাৎ মনের কতটা আটকে রাখতে পারে... তা কখনও ভেবে দেখেছে কেউ? কথা শুনতে শুনতে যখন মনে হয় আর ভাল লাগছে না... কাঁটা চামচে গেঁথে নিতে ইচ্ছে করে ভিজে কদমফুল। এর মধ্যে একেবারেই কোনও হতাশা নেই। শুধু নিজের ভাললাগা আর ভালবাসাগুলো কে আলাদা আলাদা করে পাটে পাটে গুছিয়ে রাখা। মাঝে মাঝে দুধ উৎলে গেলে পোড়া গন্ধ জন্মায়। পোড়া গন্ধ ফিরিয়ে আনে একেবারে ঘরের মাঝখানে। সিঁদুর দিয়ে ধরে রাখা ঠিকানার মাঝে। অথচ সেদিন রাতেও দুধ উতলে গেছিল, স্টোভ নেভাতে গিয়ে রান্নাঘরে আগুন... ছুটে এসেছিল পাড়ার লোক। সেদিন রাতের ট্রেনেই দেবীপুর থেকে কলকাতার জন্য রওনা দিয়েছিল অম্লান। চলে যাবে জানাই ছিল। স্টেশনে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠেনি... অম্লানও নিয়ে যেতে চায় নি। ঘরে দাউ দাউ আগুন। শুনেছিল, প্লেনে করে অনেক দূর চলে যাবে, বোম্বে... তারপর দুবাই। স্টেশন নাগালের কাছে ছিল তবু, এয়ারপোর্ট তো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তবু আকাশে কোনও প্লেন উড়ে যেতে দেখলে... চোখ জ্বালা করত খুব, কেরোসিনের ধোঁয়া, নাকি হঠাৎ আছড়ে পড়া রোদের ঝিলমিল? রান্নাঘরে আগুন লেগেছিল ঠিকই... তবে মেয়ের কাঁচা সোনার মত রঙ এতটুকু জ্বলেনি। তাই চোখ জ্বালার মত ব্যাপার নিয়েও কেউ আর বিব্রত হয়নি কখনও।

ওই বইয়ের শেষ পাতাটুকু পড়া হয়ে গেছে। যতটুকু আছে, তাকে আর টানাটানি, কাটাছেঁড়া করতে মন চায় না। অম্লান কোনওদিন আই এস ডি করেনি। দেশে ফিরেছে কি না সেই খোঁজও নেয়নি বিশাখা। যে আই এস ডি করার, সে ঠিকই করে নিয়মিত। কর্তব্যের আদান প্রদান, এবং প্রবাহ সব ঠিকই আছে। পোড়া দুধের গন্ধ মন ফিরিয়ে আনল আবার। রান্নাঘরে কেউ নেই। রিমোট দিয়ে টিভির আওয়াজ কমিয়ে রান্নার লোক সবিতাদির নাম ধরে জোরে একটা হাঁক দিলো বিশাখা।
- “সবিতাদিইইইইইই... দুধটা উথলে পুড়ে গেল যেএএএএ... থাকো কোথায় তোমরা?”
শাশুড়ির ঘরের টিভিটা চলছিল, বন্ধ হ’ল। ‘যাই’ বলে সবিতা দি ছুটে যাচ্ছে রান্নাঘরের দিকে। বাড়িতে কেউ নেই। বেলা আড়াইটে নাগাদ খবর এলো, শাশুড়ির দাদা মারা গেছেন। সবাই যাবে শ্মশানে, ওনার শেষকৃত্য করতে। শাশুড়ি গেছে দাদার বাড়ি। শেষ দেখা... সান্ত্বনা দিতে আর নিতে। বিশাখা যায়নি... শেষ দেখা ব্যাপারটা এমনিতেই ভাল লাগে না। অভিজাত পরিবারের শাশুড়ি অবাক হয়ে গেল বউয়ের ‘না’ শুনে... কিন্তু তাও বিশেষ কিছু বলতে পারল না। এটা দেখেই সন্তুষ্ট হয়েছে বিশাখা। ‘না’-এর জোর বাড়ছে, এ বড় ভাল লক্ষণ। তার ওপর এখন কেমন একটা সংস্কারবদ্ধ হয়ে পড়েছে, বরং বলা যায় কুসংস্কারগ্রস্তই। শ্মশানযাত্রীদের ধারে কাছে ঘেঁষতে মন চাইল না আজ। ভেতর থেকেই কেউ বারণ করল যেন – ‘যেখানে দাহ হয়, ছাই ওড়ে... সেখান থেকে দূরে থাকো তুমি।’ হ্যাঁ... আজকাল মাঝে মাঝেই মনে হয়, ভেতর থেকে কারও কথা শুনতে পাচ্ছে বিশাখা। আসলে এটা ভাবতেও বোধহয় বেশ ভাল লাগে – ভেতর থেকে কেউ বলছে। শাশুরিও জানে না... ওকেও এখনও জানায়নি ইচ্ছে করেই। জীবনের অনেকটা লগ্নি হওয়া, ব্যবহার আর হ্রাস-বৃদ্ধি পর... জীবনবীমার প্রিমিয়ামটা হঠাৎ করেই যে তার বড় প্রাপ্য হয়ে উঠতে পারে... এটা বুঝতে পেরেছে বিশাখা। সেই প্রিমিয়াম একটু একটু কর বড় হবে তার শরীরে। সেই প্রিমিয়াম শুধু তারই।

পোড়া দুধের গন্ধটা থেকে দূরে সরে আসতে আসতে আবার বারান্দায় ফিরে এলো বিশাখা। চোখ বন্ধ করে একবার দু’টো হাত দিয়ে স্পর্শ করল নিজের তলপেট। কদম গাছ, সাইকেল, নৌকো, যক্ষিণী... কিচ্ছু নেই। শুধু সে একা... আবার একটু একটু করে বড় হচ্ছে। অন্ধকার বারান্দায় ভিজে হাওয়ার ঝাপটা এসে পড়তেই অস্ফুটে বলে উঠল বিশাখা – “চোখ খোল... তবে একটু আশ্বস্ত হই।” বৃষ্টির ছাঁটগুলোও আবার বারান্দায় ঢুকে একসাথে বলে উঠলো – “চোখ খোল... তবে একটু আশ্বস্ত হই।”