সচরাচর যা লেখা হয় না

শুভ্রনীল সাগর ও সরোজ দরবার



পূর্বপ্রস্তুতি তবে নেহাত ছলনামাত্র। এই যে আরক্ত বেদনায় ফিরে যাচ্ছে একটা দিন, এর প্রস্তুতি কি ছিল লজ্জারুণ ভোরের চিবুকে? তবে সেই ভোরের প্রস্তুতিই বা ছিল কোথায়? সে তো একটা মুহূর্ত। তাকে কি আমরা পূর্বপ্রস্তুতি বলব! অথচ এই যে বেজে ওঠা তোমার আসরে, এই যে সামলে নেওয়া আক্রমণ, এর পিছনে নাকি থাকে প্রস্তুতির ইতিহাস। রিহার্সালও বলা যায়। বেশ, তবে প্রতিটি ভাঙা প্রেম তাহলে পরবর্তীর পূর্বপ্রস্তুতি মাত্র! প্রতিটি নতুন প্রেমে মিশে থাকে পুরনোর অভিজ্ঞতা! তাহলে এই যে প্রেম, এই যে ব্যথা, এ তবে সম্পূর্ণা নয়!
একটানা এত কেতাবি কথা বলে দম নেয় দুব্বো। কপালের টিপ তার কখন যেন পালটে ফেলেছে অবস্থান। হাত দিয়ে জোরে কপাল ঘষেছিল কি? মনে পড়ছে না। মনে পড়ছে না কখন জুড়িয়ে গেছে কফি। উষ্ণতা কতক্ষণ জিইয়ে থাকে, এই ঠাণ্ডা ঘরে, সেও জানে অভিজ্ঞরাই। সামনের চেয়ার ছেড়ে আচমকা...ইস চেয়ার বুঝি শুধু...সামনের জীবন ছেড়ে আচমকা প্রেম চলে গেলে, কী করে থাকতে পারে অভিজ্ঞরা। ভাবে দুব্বো। ওয়াশরুমে গিয়ে চোখেমুখে জল দেওয়া যায়। কটা মুহূর্তের ধুলো অন্তত ধুয়ে ফেলা যায়। আর তখনই চোখে পড়ে সরে গেছে টিপ। তখনই বলে ফেলা এত এত কথা। আসলে তো মুখ ফুটে একটা কথাও বলেনি দুব্বো। আঁচল গুছিয়ে ফিরে এসে শুধু দেখে ঠান্ডা কফির নীচে কে যেন টিস্যুতে লিখে রেখে গেছে:
যদি হৃদয় ভুল করে
ফের জিজ্ঞাসায় ফিরে এসো....

এদিক ওদিক তাকায় দুব্বো। কে লিখে গেল এ কথা? যে প্রেম চলে গেছে তার বুকপকেটে তো কোনওদিন কলম থাকত না!







*** *** *** ***

এটা সত্যি যে প্রত্যেক ফুলেরই একটা পাপড়ি থাকে-অদৃশ্য
ফুল ঝরে গেলেও তোমার জন্য রেখে যায় স্বপরাগ আরম্ভ..

সানগ্লাসটা চোখ থেকে খুলে টি-শার্টে ঝুলিয়ে দিল দুব্বো। ঝকমকে রোদ। সানগ্লাসটা থাকলে আরামই দেয়। তবু আজ মনে হল, এই মেঘ মেঘ দৃষ্টিতে সবকিছু বড় ঝাপসা লাগে। হয়তো পাশেই কেউ আছে, তাকে দেখেও দেখা হয় না।অথচ তাকে তো দেখতেই হবে। হ্যাঁ সে কাউকে খুঁজছে। প্রেম ঝরে গিয়ে তাকে দিয়ে গেছে এই আরম্ভ। আরেকটা প্রেমেরই! যদি নাও হয়, এই যে প্রেম আছে, আর খুঁজতে খুঁজতে সে প্রেমে পড়ছে নিজেরই, টের পাচ্ছে শরীরে মিশে আছে প্রেমের পরাগ, এই বা মন্দ কী! দুব্বো তো বুঝেছে, ভাঙা প্রেম আসলে মিথ। বরং এই প্রেমের খোঁজই মনে করে দেয়, সে প্রেমেই আছে।
দুব্বোর আচমকা কেমন মনে হয়, পুজো আসছে, আসছে। নিউ মার্কেট কি এখন তবে ভিড়ে ঠাসা? একটু শপিং করলে কেমন হয়! হুড়দুড় করে এটা ওটা কিনে ফেলে দুব্বো। তার দু হাতে ঢাউস বিগ শপার। একটু আগে বেশি ঝাল দিয়ে ফুচকা খেয়েছে। ঠোঁটে এখনও জিভ ছোয়াঁচ্ছে মাঝে মধ্যে। অল্প অল্প জ্বালাও। সেও আনন্দদায়ক। জিভের প্রতি আদরে রাঙা হচ্ছে ঠোঁট। আর কে যেন গোপনে লিখে রাখছে,

এর আগেও আকাশে লেগেছে শারদ
এর আগে আকাশ দেখা হয় নাই...



*** *** *** ***

একদিন আমাদের দেখা হবে
আর পাতার কোলে ফিরে যাবে
সব ঝরা ফুল...

পাতা সমস্ত বৃক্ষ নয়, দাগ
ওদের কাছেও প্রেম নিবেদন হোক!
তোমাকে বলিনি
সঙ্গে ছিল - চুমুফোটা ভোরের অন্তর...

একদিন, আমাদের দেখা হলো....

আর কতদিনই বা দেখা না হয়ে থাকবে! দুব্বো ভাবে, এবার এই খেলাটা থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। সত্যিই তো ভাঙা প্রেম বলে কোনওদিন কিছু ছিল না দুব্বোর। কোনওদিন কোনও প্রেমিক ছিল না তার। তবু মাঝে মধ্যে নিজের সংগে এই খেলাটা খেলতে ইচ্ছে করে তার। কোনও একটা গল্পের বই পড়ল। সেখানে কারও ছাড়াছাড়ি হল। অমনি দুব্বো নিজেকে মেয়েটার জায়গায় বসিয়ে দেয়। না হুটহাট অবশ্য এরকম করে না। আসলে মাঝে মধ্যে তার মনটা একেবারে কালো হয়ে ওঠে। অফিস টফিস বিস্বাদ লাগে। লোকে বলে ডিপ্রেসন। আর সে জানে তার খেলাটা শুরু। প্রথমে অফিসে ছুটি চায়। ঘ্যানঘ্যান করে ছুটির জন্য। মিলেও যায়। এইবার কফি শপে গিয়ে সে মনে মনে বলে, এইভাবে চলে যাবে? তার কফি ঠান্ডা হয়
নাকের ডগা সিঁদুরে হয়ে ওঠে। হাতের ঘষায় টিপ সরে যায়। আর সে ডুবে যায় খেলার ভিতর। সত্যি কি এরকম করে কেউ তার জন্য কবিতা লিখে রাখে? এই যেমন এখন সে দেখতে পাচ্ছে, তার পার্সে কে যেন গুঁজে দিয়ে গেছে চিরকুট। আর সেখানে লেখা,

অথচ আমি শুধু
তোমার বুকেই ছাপা হতে পারি!

আমি মানে -
বিস্তর সময়ের মধ্যে একটা অলক্ষ্য সময়।
লেবুতলা
নীরব মাটি
আবাল্য
পুকুর পাড়ের।

আমার ঠোঁটে -
ফাগুনী গাছের মতো কথা,
শুনবে?

লেখাটা পড়ে ফিক করে হেসে ফেলে দুব্বো। সত্যি কী মিনতি করেই না বলছে! আসলে সেও তো শুনতেই চেয়েছিল। বলার লোক তো কম ছিল না। তখন কলেজের দিন। তখন প্রতিটা দিনের গায়ে একফোঁটা যৌবনের গন্ধ ঘষে দেওয়া। আর আশেপাশে সকলের মূর্ছা অবধারিত। আসলে প্রতিটা নারী কোনো এক সম্রাজ্ঞী, তার নিজের দুনিয়ায়। অসংখ্য কুর্নিশ অপেক্ষা করে রাঙানো পাড়ে, দুব্বো জানে, সে সব দিনে আঁচলই প্রেমপত্রের পোস্টাপিস। দুব্বোরও ছিল এমন দিন। কত ইতিহাস যে ঝরা পাতার মতো খসে পড়ল তার চারপাশে। শুধু একবার মাত্র সে নিজে লিখে এনেছিল ইতিহাসে যা লেখা থাকে না। লিখেছিল,
দু-তিনটে আকাশ রেখে গেলো প্রেমের অস্ফুট
অপেক্ষার রেলপাড়ে।

(বিস্তর স্পর্শ পেরিয়ে
আমরা সন্ধ্যা এলাম)

যা কিছু নেওয়ার ছিলো নিয়েছে দুটো হাত
হাতের রেখার মতো রাত
এতো কাছে থেকে ঘেমে ওঠে
তবু আজও অপাঠ্য রয়ে গেছে।
সে লেখায় মিশিয়ে দিয়েছিল বুকের ওম। ঘাম আর ঘনযৌবন গন্ধে শব্দেরা যখন মুক্তির জন্য ছটফট করছে, দুব্বো দেখল, প্রতিটি সভ্যতার একটা পতনকাহিনি থাকে। ইতিহাস অনেক কিছু লিখে রাখে, যা লেখে না তা হল ব্যর্থ প্রেম। প্রতি সভতার পতনে মিশে থাকে প্রেমের ব্যর্থতা। দুব্বো জানে। আর তাই ভাঙা প্রেম দিয়ে সে তার সভ্যতা তৈরি করে। এই যেমন করছে, এই যেমন আবার ভেঙে দেবে মনস্থ করেছে।
*** *** *** ***

- রোজ রোজ ওর সংগে কথা বলো, কী বলে?
-বলে অফিসে ছুটি নিয়েছে।
- অফিস করত তো। ভাল চাকরি। সাজগোজ করে, সেন্ট ছড়িয়ে এই রাস্তা দিয়েই যেত। কী যে সব হয়ে গেল... আর কী বলে?
- কফিশপের গল্প..
- হুম, শেষের দিকে কার সংগে একটা দেখা করতে ঘন ঘন যেত...
- বলছে, কে ওর জন্য কবিতা রেখে গেছে..
- কে আবার রাখবে, ও নিজেই খারাপ লিখত নাকি? একটা ডায়রি ওই ছেঁড়াছুড়ি ব্যাগের মধ্যেই কোথাও আছে। আগে সর্বক্ষণ বুকে ধরে রাখত...
-শপিংয়ের কথা বলে খুব
- খুব শখ ছিল কি না...
-তা ডাক্তার-বদ্যি কিছু?
- কত হয়েছে। একবার হোমে পাঠিয়েও দেওয়া হয়েছিল। ভাল হয়েছিল সাময়িক। ফিরে আবার যেরকম ছিল, সেরকমই।
- কে খাবার দেয়? শাড়ি কে দিয়েছে? এত যে শাড়ি, আঁচল, পাড়ের কথা বলে..
-ওর তো সবই আছে, শুধু ঘরে থাকে না। রাস্তায় ওই কফি দোকানের সামনেটাই যেন ওর ঘর। তা তোমার এত জেনে কাজ কী বাপু!
- তা জেনে আপনারই বা কাজ কী মশাই!

*** *** *** ***
রাঙা রাস্তা ধরে ডানে
ঘরবাড়ি।

উল্লেখযোগ্য, কুয়ো
আর ছড়ানো মায়ার বাগান।
বাইরে জুতোখোলা জীবনের একতলায়
আসবাবের মতো প্রয়োজনীয় লোক, আর
এখানে-ওখানে ঝুলছে
অদেখা।
দেড়শো বছর ধরে
ঝুলছিল।

আশ্চর্য!
আমার হারানো শান্তির ভেতর -
তোমার গ্রাম....
সেই গ্রামে তালা দেওয়া থাকে। দুব্বো ইচ্ছে করলে তালা খোলে। গ্রামে প্রাণ জাগে। খেলা জমে ওঠে। খেলার ভিতর একটা পুরুষ হেঁটে আসে। আরও একজন... সাধে কি আর এ খেলাকে এত ভালবাসে দুব্বো! সে ডাগর চোখ তুলে তাকায়। হাত বাড়ায়। আর সে পুরুষ হাতে ধরিয়ে দেয় একটা মস্ত কাগজ। এতবড় কাগজে তার কী কাজ বাপু! ছেলেগুলো যে কি না! ফরফর করে কাগজের ভাঁজ খুলে ফেলে সে। আর দেখে, এ মা গো, কী বিচ্ছিরি এক পাগলির ছবি আঁকা। এত ময়লা কেন? পৃথিবী নিজে যখন এত্ত সুন্দর। এত আবিষ্ট করার রসদ যখন পৃথিবীতে রাখা, তখন কোন পাগলে, নোংরা নিয়ে মাথা ঘামায়!

বিছিয়ে রাখা কাগজের উপর একটা ফুল কুড়িয়ে এনে রাখে দুব্বো। আহা রে ওই ছবির পাগলিটা, না জানি কী আঘাত পেয়েছিল। নইলে সাধ করে কী আর কেউ এমন হয়! এই যদি তার সংগে হতো, তবে কীরকম হত? কী করত দুব্বো? কিন্তু সে তো কখনও পাগল হয়নি। না হোকগে, সবকিছুর পূর্বপ্রস্তুতি থাকে নাকি? ওই ব্যাপারটাই একটা ছলনা মাত্র! এই যে শুরু হল খেলা, এর কোনও প্রস্তুতি থাকে না। খেলা তো খেলাই। সত্যিই কি আর সে ওই ছবির পাগলি নাকি! কী আপদ! খিল খিল করে হেসে ওঠে দুব্বো। তবু শব্দ হয় না।
সভ্যতা পতনের শব্দও কি ইতিহাসে কান পাতলে শোনা যায়!
-0-