ফুল তুমি ও দিওতিমা

মাসুদুজ্জামান ও অনন্যা



দিওতিমা – ১

দিওতিমা প্রিয়তমা আমার,
হৃদয় কুসুমিত বৃষ্টিপাত। দিনের অনেকটা সময় পাতার ভাঁজে ভাঁজে গুঞ্জরিত হলো জলপতনের শব্দ। একটু একটু করে তখনই খুলে গেল আমার হৃদয়। কুসুমিত হলো ফুল্ল একটা মুখ। বৃষ্টিস্নাত, স্নিগ্ধ, সুন্দর। এই যে মানবজনম, চিহ্নহীন মনোদীপ কেটে গেছে কত দিন। মানবের উষাকাল থেকে এই যে প্রেমানুভব, উপলব্ধি করছি আমি। মানুষ, কত বিচিত্র অনুভব তার। এই মুহূর্তে যেমন আমার করোটির ভিতরে ঝাঁঝা শূন্যতা, অন্ধকার। শব্দহীন মুহূর্ত। শৈশবের নির্জন ঘর। একা আমি। খাঁ খাঁ এক-একটা দুপুর। জানালার কাছে স্তব্ধ বসে আছি। ঠিক যেন অমলের মতো। থেকে থেকে কিসের যেন ধূসরিত স্বর, পাখির ডাক। ছাইরঙা, একটা ঘুঘু। একাকী সে, অবিরাম ডেকে চলেছে। সুদূর কোনো প্রান্তরে ক্ষীণ হয়ে আছড়ে পড়ছে তার স্বর। কী নির্লিপ্ত বিষণœতা। আমি নির্বাক, নিবিড়। ছায়াময় ঘরের জানালার পাশে দাঁড়ানো। ধাতব লোহার শিক মুঠিতে চেপে কান পেতে শুনছি ঘুঘুর কান্না। পাঁজড়ে কী নিবিড় দাঁড়ের শব্দ Ñ ছলাৎ ছল, ছলাৎ ছল। নৌকার অবিরাম চলা। অমল, আমি কী অমল? নাকি সেই বালক যে ছেলেবেলায় খাঁচার পায়রাদের আকাশে উড়িয়ে দিত যদি তারা সুদর কল্পলোক থেকে ডালিম পেড়ে আনে! পায়রারা এতসব বুঝতো না, পাক খেয়ে আবার ফিরে আসতো করতলে! প্রান্তরে কাঁপতে থাকতো ঘুঘুদের বিষণœতা আর রৌদ্রের শিখা। কিন্তু এই শ্রাবণের দিনে বৃষ্টির জল আমার হৃদয়গহনে কুসুমিত হলো। এই জলপুষ্প, এই নির্ঝর তোমাতেই নিবেদিত, প্রিয়তমা। তুমি কি নেবে না এই অর্ঘ্য, বাসনার পাপড়িমঞ্জরী? প্লেটো তো আমার কথা লিখেই গেছে, নির্বিশেষ সৌন্দর্যের ধ্যানই মানবের প্রকৃত লক্ষ্য। এতেই মানব জন্মের চরিতার্থতা, তৃণ ও তর্পণ। এভাবেই মানুষ পায় অমরত্ব। তুমি আমার হৃদয়ে কুসুমিত হেমকান্তি প্রেম। তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা।
ভালোবাসা নিরন্তর, ইতি…



দিওতিমা – ২

দিওতিমা, প্রিয় আমার,
হে নক্ষত্রবীথি, হে অনন্ত নীলিমা, তোমার নীলটুকু তুমি আমাকে দেবে? আমি তাকে নীলাভ করে ওই নিঃসীম দিগন্তে নির্জন নদীকুলে নিয়ে যাব। কিংখাবে মোড়ানো উজ্জ্বল তোমার দেহ। তরঙ্গিত, স্রোতস্বিনী, তিমির তটিনী। এই যে অমারাত্রি, শ্বেতপ্রভাহীন। চারদিকে ঘন অন্ধকার। এরই মাঝে খুব নিবিড়ভাবে তোমার কাছে এসে দাঁড়াতে ইচ্ছা করছে। প্রিয়সখা, প্রিয়তমা আমার! কিন্তু হাত বাড়ালেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে শূন্য বাতাস, বর্ণহীন ঘাস, রক্তবর্ণ ফুল। আঙুলে জড়িয়ে যায় অন্ধকারের দীর্ঘশ্বাস। কে যেন আমার কাছ থেকে ক্রমশ হারিয়ে যায়। দূর থেকে আরও দূরে, শূন্যে, মহাশূন্যে। যে শরীর আমি একদিন ছুঁয়ে দিয়েছিলাম, যার হৃদয় ছিল নীলিমা, সে আজ অদৃশ্য অনন্ত নক্ষত্রবিন্দু। চোখের সীমায় তুমি নেই। তুমি আছ ত্বক অস্থি আর আঘ্রাণের বুনো সম্মোহনে, সংরাগে। যদি তুমি ফিরে আসো, তোমার আখিপল্লব ছুঁয়ে নীলিমাকে আমি কাছে টেনে নেব। অবাধ্য বাতাসে উড়ন্ত চুল এসে ঝাপিয়ে পড়বে তোমার কপালে। চিবুকে তখন কালো রেশমের ঝিলিমিলি, কালো জ্যোৎস্নার বিভা। পৃথিবীতে কত যে বসন্ত ঋতু। কত হর্ষ। কিন্তু একটিমাত্র জীবনের ভিতরে এই ঋতুগুলি টিকতে পারে না, ম্রিয়মান হয়ে আসে। আমার ক্ষতগুলি দেখ, কতটা উজ্জ্বল আর দাহ্যপ্রবণ। তুমি নিয়ে যাও এই বুনো গোলাপ, সোনালি নক্ষত্র আর মর্মরশিলা। আমি শুধু আমার ক্ষতের ভিতরে পাথরকুচি আর অজস্র সূচ বিঁধিয়ে রাখি। হোক রক্তপাত। আজ নয়, একদিন তুমি ফিরে আসবেই। উদ্যানে তখন অজস্র বরষাপীড়িত ফুল, তোমার পায়ের পাতা চুম্বন করে উদ্যানেই মরে যাবে। আমার অস্থি, দেখতে পাবে, কুসুমিত আর তোমার শরীরে ছড়িয়ে দিচ্ছে শ্বেতপ্রভা, কেটে যাব অমা, প্রিয়তমা।
ইতি তোমার প্রিয়তম

দিওতিমা – ৩

প্রিয়তমা দিওতিমা,
জিরাফের নাভীমূল থেকে কুসুম ঝরে পড়ার দিনে তুমি আমার কাছে উড়ে এসেছিলে। শরীর জুড়ে ভীমপলশ্রী, কাঠবাদামের পাতার ঘ্রাণ। রুদ্ধ ছিল একটা গীতিময় তৃণভূমি। আবিশ্ব রূপালি রোদ্দুরের শান্ত স্নানঘর থেকে তখনও তুমি কিছুটা দূরে। পিপাসার্ত সুন্দর কবিতাবিষাদ।
চোখে পড়ল সে দাঁড়িয়ে আছে ভবিষ্যতের অলীক একটা সবুজ সেতুর উপর। উন্মোচিত হচ্ছে নদী ও দিগন্ত। খুলে যাচ্ছে শূন্য ঝরোখা। ডানা মেলে একটা পরী উড়ে আসছে। তার শরীরে অগ্নিস্রোত, লাভা। অন্ধকারের বিচ্ছুরণ ও আবর্ত। বিষাদ ও ঐকতানের পাশে একজন কবি ও কাঠুরিয়া। কবি তার দৃষ্টি দিয়ে রূপকথার ওই দৃশ্যগুলোকে মুছে দিলেন। এই তো চারণভূমি, তৃণের পোশাক, সোনালি শস্যপ্রপাত। আমাদের পৃথিবীর উপরে কারুকার্য়ময় অস্তগামী কিছু হরিণ। বিকেল নেমে আসছে, মূর্চ্ছিত আমার ঘর। বনভূমি থেকে ধ্বনির মৃদু তরঙ্গ তুলে তুমি ওই ঘরে ঢুকে পড়লে। খুলে গেল আবিষ্ট দুই বাহু। সয়ম্বর সভায় প্রতিধ্বনি উঠল, তুমি আমাকে আলিঙ্গন করলে। চাঁদ তখন আকাশশিখরে। জ্যোৎস্নার তাঁবুতে রচিত হলো প্রথম প্রণয়।
ইতি তোমারই আমি

*******



এই যে প্রদীপ জ্বলে নিশাহীন রাত আর কিছু অন্ধকার লেগে থাক, চেয়ে চেয়ে দেখি একি তুমি? নাকি তার চেয়েও কিছু বেশি? মুহূর্তে নেচে ওঠে গাছের শৈশব পাড়া গা পার হলেই প্রবাদ দেখাযায়। তেমনই এক নির্জন দুপর নাকি রাত? আলোর সীমানা হয়নি তখনো কেবল কিছু ছায়াপথ পাড় করে হেটে চলে কার যেন পা, ছলাত্ ছলাত্ নুপূরে আতরের গন্ধ মাখা... সেই হলো দিওতিমা... তার শরীর জুড়ে নিস্তব্ধ দুপুর, জলের ভেতর পড়ে থাকে শুকনো কিছু পোড়া। দিওতিমা। উজ্জ্বল দেহে বিষন্নতার ছাপ কিছু পরমানু এসেছে কালরাতে, ঘরবাড়ি পেয়ে তাদের নিজস্ব উতপাতে এক রক্তিম আসন্নতা... এই কাল ছিল আমাদের সহবাস.. এই হলো আজ আমাদের জীবাশ্ম.. এভাবেই স্তর থেকে স্তরে ভ্রমণ দিয়ে বেড়ায় দু:স্বপ্নরা... নীবিড়ে কোনো এক দিওতিমা আমায় মেখে যায়। এরপরই দেখাযায় কিছু শূন্য পাহাড়, শূন্য নয় শূন্যাকৃতি... শূন্যের ভেতর যে শূন্যেরা বাস করে সেখানে যদি প্রবল পাওয়া যায়... দিওতিমা, একটা হাত কেবল নরম পেতে চাইছে তুমি ওকে ছাওনি মাখিয়ে নাও। ভূলে যাও তোমাদের ব্যাবধান আছে। ব্যাবধান কেবল একটা নাম। এই যে শরীরে এতো কনাকানি এই যে ভারী একখানা মন তার সর্বস্ব তোমাদের শাকো দিয়ে যাক। অস্থিরের ওপর বাসরঘর সেজে উঠুক। ফুলেরা দাবী করুক নিজেদের অস্তিত্ব। তারপর তোমাদের রাত রাত খেলা, পর্বত পার করে কিছু রুপোলী সবুজ... দুটি দেহ দুটি মনের মতো সবুজ আস্ত পড়ে থাকে সিন্দুকে পড়ে থাকে নাকছাবিতে যেমন। ওকে বিষাদ দাও... দাও আনন্দ মাখা জ্যোছনা। রাত ফুরোলেই অন্ধকার মেখে নিও.. ফুল তুমি ও দিওতিমা