কবিতা বড় সহজ

চান্দ্রেয়ী বসু ও সিদ্ধার্থ বসু



মিথ্যে নয় তেমন কালো যতটা তুমি ভাবো। বাৎসরিক পাহাড় ভ্রমণে বিশ্বাস করো কোনো স্বর্গীয় ভবের উদ্রেক হয় না আর । গিরিশিখরের প্রথম রবিকিরণও আমাকে সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ করে না। সত্যাসত্য সম্পর্কিত নীতিজ্ঞান খাদে ছুঁড়ে ফেলে বাজি ধরি আমি , যদি পারো বলো দেখি কতটুকু ফাঁকি ! নদীতে পায়ের পাতা স্পর্শ মাত্রে একুশ বছরের প্রেম জাগে না এখন বরং বিশদ জ্যোৎস্নায় আপাদমস্তক হিসেবি মন কেবলই মুক্তির ফন্দি ফিকির খুঁজি। রাত পোহালে সব কিছু ফের নিয়মমাফিক , তোমার সাথে কানামাছি... দিনভর তামাশা শেষে অন্ধকারের চেয়েও বেশি অন্ধকার সে ঘরখানিতে ফিরে মোমবাতির দুপ্রান্ত জ্বালিয়ে চারপাশে পাহারার প্রাচীর তুলি । যতক্ষণ আলোটুকু, সে ঘরে কেবল তোমার প্রবেশ অবাধ ।

তোমার তল্লাট

রাতের ঘর মানেই তোমার তল্লাট
তোমার চিবোনো কথায় গাঁথামালার স্তূপ
তোমার চোখের দিকে তাকানোর নিরুপায়তায়, ছেড়ে দেওয়া ওষুধের খোসা
সটান চিতবুক ঘুমিয়ে পড়লে
স্বপ্নে সেই তুমি এসে জ্বালাতন কর
যন্ত্রপাতির দোষে দূরত্ব ঘুচেছে--
নিতান্ত তফাতে থেকেও তুমি দখল নিয়েছ সমগ্রের
আর আমি ,যন্ত্রানুষঙ্গে, স্রেফ তোমার আন্দাজে
একটু একটু করে উবে গেছি
তোমার আপিসঘরে তুমি গড়ে তুলেছ নিসর্গ
নগরপত্তন হয়েছে লহমায়, জলের সাপ্লাই সহ যাবতীয় জরুরির
নিরসন করেছ নিপুন
তবকে মোড়ানো সুষ্ঠু ভালবাসা নিয়ত পাঠাচ্ছ আমাকে
তোমার তল্লাটে আমি বাধ্য প্রজা
প্রতিটি রাতের পেটে প্রতিরাতে ধার্য মিহি খুন


উপলব্ধিজাত সত্যগুলি কতকটা যেন সেই নিমতলাঘাট স্ট্রীটের কপাট ভাঙা খাঁ খাঁ বাড়িটার মতো। ছাদে ভাঙাচোরা পরী, কমনীয় কোমল । পলেস্তারা খসা হা ক্লান্ত দেওয়াল বেয়ে নেমে আসা অশ্বত্থ ঝুরি। সদরে মুণ্ডুহীন সিংহ ... ইঁটের খাঁজে খাঁজে লুকোনো মায়া পায়রার পাখসাটে একেকদিন মাথাচাড়া দিলেও বসবাস অযোগ্য । আপ্রাণ চেষ্টা চালাই ভালোবাসা আঁকড়ে সাঁতরে যাওয়ার কিন্তু ক্রমেই বিকেল সন্ধের দিকে গড়িয়ে চলে , গঙ্গায় ভাঁটা আসে । একটা দুটো তিনটে করে জানলাগুলোয় বিষণ্ণ আলো জ্বলে ওঠে ... আমার মনে পড়ে ঘরে ফিরে আজ দশমিকের পাঠ শেখানোর পালা । আসলে দিন যত পুরোনো হয় তার তাল কেটে যেতে থাকে। ক্লান্তিতে শরীর মাটির দিকে ঝুঁকে পড়লেও নিজের অক্ষমতা স্বীকার করতে অহংবোধে বাধে, পাছে প্রেমের পবিত্রতাবোধ বিন্দুমাত্র টাল খায় ...অথচ আমারও সাধ ছিল জীবনের অন্তত একটা সূর্যোদয় তোমার সাথে হোক । তবু বলি, সূর্যাস্তের আলোও কিছু কম বিপজ্জনক নয়... গত মাসে হাতে পায়ে ধুলোমাখা আমি যেই নদী থেকে এক আঁজলা গোধূলি তুলেছি দেখি জলে ও কার ছায়া ! সে তো তুমি নও আদৌ ! সেই থেকে আমার ভিতর আবার আগের মতো অসুখ ।

কাহাবত
ভালবাসা একটা অভিনয়: ভালবাসতে চাওয়াটা সত্যি,ভালবাসতে পারাটা নয়| কিম্বা সত্যি-ই | কিন্তু সত্যি অভিনয় | ঘৃনা সত্য| রাগ সত্য | কোনো সংকল্প সত্যি নয় | আত্মবিশ্লেষণ মিথ্যের মনিমানিক্যে পূর্ণ হয়ে থাকে | আমরা সাধারণত যে অর্থে ব্যবহার করি,তাতে মিথ্যে জীবন যাপনের মত চরম সত্যি আর কিছু হয় না | কাউকে কোনো কথা না দেয়াই উচিত,কারণ কথা রাখতে গেলে জীবন আরো অনেক বেশি মিথ্যেয় ভরে ওঠে |
ভয় পাওয়া সত্যি | অস্থিরতা সত্যি| স্থৈর্য একটা উঁচু দরের অভিনয়| ঔদাসীন্য বলে আসলে কিছু হয় না| নিরুপায় বা অতি সুরক্ষিত মানুষেরাই শুধু উদাসীনতার ভান করে |
প্রেমে পড়া একটা দুর্দান্ত সত্যি| একসঙ্গে থাকাও | কিন্তু এ দুটোর সমাপতন একটা বিরল ঘটনা, প্রায় কসমিক কোনো দুর্ঘটনার মতই ব্যতিক্রমী |
শেষ পর্যন্ত ভয় আর বিপন্নতাই টিকে থাকে | শেষতক হিংসা আর স্বার্থচিন্তাই জয়ী হয় | শুধু খিদে মেটানোর মতন যথেষ্ট রসদ জোটাতে না পারলে মানুষ টেসে যায় |

এইসব যদ্‌যাবতীয় কথা বলে যেতে পারি তেমন আপনার আর কেই বা আছে আমার কেবল ঐ ফণীমনসা ছাড়া ! ঘরময় ছড়ানো ছিটানো আসক্তি নির্লিপ্তি কুড়িয়ে একেকরাতে ছাদের ফণীমনসার পাশটিতে চুপটি হয়ে বসে থাকি । প্রথমদিকে একটা বাধো বাধো ভাব ছিল । সেই কবে কোন কালে মাথায় মুকুট রাজার ছাপছবি দেওয়া কয়েনখানা খোওয়া গেছে বলে এখন কি আর অনুতাপ সাজে ! তাছাড়া গাছের বুকেও তো কম বিষাদ জমে নেই ... কিন্তু যেদিন ঘরভর্তি লোকের মাঝে হাতের মুঠো থেকে সব বালি নুড়ি পাথর মেঝেময় ছড়িয়ে পড়ল সেদিন ফণীমনসার কাছে সব কবুল করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না আমার । সেই থেকে একে একে সব... ট্রেনের জানলায় দেখা ধূ ধূ মাঠে একলা টেলিগ্রাফ পোস্ট, জানবাজারের সেই কানাগলি এমনকি মাড়োয়ারি হাসপাতালের বারান্দার হেমন্ত বিকেল... সব কিছু বলে দিলাম । তারপর বলতে বলতে একসময় চোখ ঘুমে ভারী হয়ে এলে তলিয়ে যাওয়ার শেষ মুহূর্তের ঠিক আগে কপালে ফণীমনসার স্পর্শ পেলাম ... তারপর আর কিছু মনে নেই ।

না লেখা
যা কখনো লিখব না,
তাই আজ লিখব ভেবেছি
ভাঙা হাট নিজেরই বিছানা
ক্ষণে ক্ষণে ঝাপসা হয়ে গুলোচ্ছে নিশানা
কবে যেন..কীভাবে...কী ভেবে...
লিখে রাখতে চেয়েছিলাম, যত্নে ধরে ধরে
সবই ভুলে গেলাম কীকরে?

কখনো হবে না লেখা যেইসব
কখনই দেখবে না কেউ পড়ে পড়ে

কবিতা বড় সহজ
কবিতা বড় সহজ, আমার সহজ চলায় মন লাগছে না
তোমার স্মৃতি চটুল, আমার সস্তা সুরে প্রাণ বাজছে না
সেয়ানা এই শহর, আমার ওপরচাল সইছে না হে আর
যেদিকে চাই হলকা, আমি শুশ্রুষা চাই আগুন জুড়োবার
আমি ভুলতে চাই তোমায়, তুমি জীবনপ্লাবী মৃত্যুগন্ধী বিষ
আমার শরীর জুড়ে বাঁশী, দুই কানে অধীর হাওয়ার ফিসফিস
যুদ্ধে যারা গেল, আমি গেয়ে বেড়াই তাদের রোশনাই
আমি রয়ে গেলাম পিছে, শুধু বয়ে গেলাম জন্মভীরুতাই

সার্কাস দেখতে আমার যে আর ভালো লাগে না তার জন্য ঐ জোকারটা ছাড়া আর কাউকেই দায়ী করা যায় না। কি দরকার ছিল তার বিকেলের শো শুরুর আগে তাঁবুর পিছনে অমন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার ! সেই থেকে কি যে হয়ে গেল আমার ! চিড়িয়াখানায় ভয়, রবীন্দ্রজয়ন্তীতে ভয়... বসন্ত উৎসবেও ভয়... শুধু জাদুঘর আর স্মৃতিসৌধের ভিতর নিশ্চিন্তে চলাফেরা করি । সুশীতল ছায়াময় । একটা থামের আড়ালে সিঁধিয়ে যেতে পারলেই স্বস্তি। সেই যেবার আমরা ঠিক করলাম ধর্মতলা থেকে বাস ধরে দু’জন দু’দিকে চলে যাব ... সেই যে তুমি ক্যানিং এর বাসে উঠে বসলে আর আমি কোথাকার যেন একটা টিকিট কাটতে গিয়ে দেখি শহীদ মিনারের খোলা মাঠে আশ্চর্য সব ভেলকি... দড়ির ব্যালান্স, আর ঠিক তার পিছনে সারা শরীরে আগুন জ্বেলে একা অমলতাস ... সেই যে কী একটা হয়ে গেল , আর শহর ছাড়া হল না আমার ।