ইনফার্নো থেকে মরবিড আপেলের দিকে

আসমা অধরা ও হাসনাত শোয়েব



পর্দা ও ঋণসমগ্র
১.
প্রথম আলো ভেদ করে যায় লাল আর গাঢ় বাদামী রঙের ভারী পর্দা; চকিতে মনে পড়ে যায় এমনি এক লাল ভারী পর্দার আড়াল থেকেই চঞ্চল ফিঙের মতো উড়ে গিয়েছিল তীব্র কষ্টে দু’পাটি দাঁতে চেপে রাখা ঠোঁট কামড়ে রক্তাক্ত করা বিশ্বাসেরা।

বিস্ফোরিত চক্ষুদয় দেখেছিল, মঙ্গলসূত্র ও সিঁদুরের একাগ্র উপাসনায় মত্ত থাকাকালীন; সদ্য পুজোঘরের হাট হয়ে খুলে যাওয়া দোরের ন্যায়-- সিঁথি জুড়ে অগ্নি অলকানন্দার মতো যে দেবতা উজ্জ্বল হয়ে থাকে, সে’ই ভিন্ন আঁচলে ট্রুথ এণ্ড ডেয়ার খেলে বেড়াচ্ছে। সেই তখন থেকেই পৃথিবীর সমস্ত ভারী পর্দার কাছে আজীবন ঋণী হয়ে থাকা।

বিশ্বাস মানেই উড়ে যাওয়া পাখী,
সেই পর্দা উড়িয়ে দেয়া উদ্ভিন্ন বাতাস
আর দিবালোক, যে ক্রাইম জার্নালিষ্টের মতন
আচমকা ফাঁস করে দ্যায় বেঈমানের উদ্ধত মুখাবয়ব।

দুঃখ গুলো সহজলভ্য হয়ে যাবার পর বুকের ভেতরে ঝরে পড়ে বিরহী ঘুঘুর গা থেকে খসে পড়া এক একটা ছাই রঙ কষ্টপালক; কাছের মানুষদের অপর নাম রাখা হলো দুঃখ সওদাগর। যেন সায়েন্স ফিকশনের থ্রি ডাইমেনশনাল স্ক্রিন থেকে বিদ্যুৎবেগে ছুটে আসা গলিত সূর্যের বিধ্বংসী স্প্লিন্টার, ভয়ানক তোলপাড় এক অগ্নিপিণ্ড বুক বরাবর ধেয়ে এসে নিমেষেই নিঃশেষ করে যায় শ্বাসযন্ত্র।

ও সওদাগর, তুমি জানোনাই-
ভালোবাসি বল যারে,
যে বলে ভালোবাসি;
নিশিদিন বুকের ভেতর ডাহুকের ডাকের
মতোই নির্জন করে রাখে আপদমস্তক;
দুপুরের রঙে…
সে রঙকেই আবার মায়া ও দয়াহীন
হয়ে প্রজাপতির ডানায় ফেরী করে দেয়া!

অনুভূতি নির্দ্বিধা হলে অনুভবেরা আপনাতেই ঋণাত্মক হয়ে যায়,পালায় সুখ ও অন্যান্য নিঃশ্চিন্তালেখ্য। পোড়াই হৃদয় শিরোনামে অলিন্দ ও নিলয় নামের দু’প্রকোষ্ঠ কামরা; ক্লিষ্ট জীবাশ্ম হৃদচুল্লীর পেটে। আর সেই থেকে তার ধোঁয়া অবয়ব স্পষ্ট হতে থাকে। কেউ বিষুব বরাবর তুলে রাখে ঘুমবাড়ী; আর চকিত আলোয় তন্দ্রা ছুটে যাবার পর মেরুরেখার এপ্রান্ত হতে ঘুম খুলে খুলে পড়তে থাকি নিদ্রাজড়িত ভাঁজসমগ্র। যেন প্রাচীন পুঁথি এক; কোন দূর থেকে ভেসে আসে কান্নার মতো সুর, চোখ বুজলেই কল্পনায় দৃশ্যমান হয় সদ্য বিধবা এক নব্য যুবতী যেন খুব দুলে দুলে পড়ে যায় ইনানো বিনানো শ্লোকগাঁথা।

কষ্ট জ্বালাই,
কষ্ট পোড়াই,
কষ্ট ওড়াই…
আহা সূচাগ্র শেকড়মুখ!
উর্ধ্বমূখী হয়ে ছুটে এসো উল্কাবৎ ক্ষীপ্রতায়-
ফুঁড়ে দাও; ছিন্ন করো দু’স্তবকে মধ্যবর্তী শরীরকাব্য-
বিচ্ছিন্ন শির ও নয়নযুগল অর্পণ করি সেই প্রস্তরবৎ পদতল ও তন্ত্রমন্ত্রঘোরে!

বেদনা সমুদ্রের নীচে যে চোরা আগ্নেয়গিরি ফুঁসে ওঠে তার দিব্যি, লাল পর্দা উড়ে যাওয়ার নাম ছিল নীলকষ্ট। আর প্রেম বেনিয়া পাড়ার মনোহারি দোকানের নাম। সে প্রেমিক হরেকরকম কলজে উপড়ে এনে ফেরী বেড়ায়,
এ-বুক, সে-বুকের খালি পড়ে থাকা পাঁজড়ে রোপন করে ফেরে সবুজ- হলুদ- বেগুনী সব কলজেচেরা আখ্যান। এই করতে করতে সে শিখে নিল দারুণ ভালোবাসা, সাম্পান ভেড়ানো সুখ সুখ পাড়ে তখন ছলাৎ ঢেউ আছড়ে পড়ে।

ঠিক তারপরপরই
আবার কোন এক ঘরে প্রথম
আলোর সাথেই হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে
উশৃঙ্খল বাতাসের দঙ্গল,
উড়ে যায় লাল আর গাঢ় বাদামী রঙের
ভারী পর্দা; ঋণী করে রাখে জীবনভর!

২.
শ্যামাপাখীঃ মৃত্যুপূর্ব তিন সেকেণ্ড

ডুবতে ডুবতে ঠিক যখন মাথার উপরে উঠে যায় জল, তখনও তার ছলছল অম্বরের ছায়া ফেলা উপরিতলের দিকে পেতে থাকা দু’চোখ জানে- জল মূলত জলজ ছাড়াও সমস্ত প্রাণের জন্যই এক জীবনের নাম। আর জলে ডুবে যাওয়া প্রাণীদেহের কাছে মৃত্যুবৎ এক শীতল জাল। তার মধ্যে থেকে স্পিরিট ঘষে দেয়া জ্বালাময়ী চোখ চেয়ে থাকে সেই উপরিতলের হাস্য ও লাস্যময় মুখের জরুলটায়, দেখে দেখেই শ্বাস ছেড়ে যাক দেহবল্লরী।

ওই যে উজ্জ্বল শ্যামাবৎ চামড়ার নীচে শিরাবিন্যাস কালচে লাল থেকে নীলচে কালো হয়ে যাচ্ছে, সেও এক উপাসনার নাম। ডুবে যেতে যেতে মনে পড়ে দেশলাইকাঠি কিভাবে তার উদ্ধত অহংকারী শরীর ফস করে জ্বালিয়ে দেয় সোডিয়াম ফসফেট এর নিচে চলতে থাকা উদ্বায়ী বার্নারের সলতের মতো। সে অহংগরীমায় অসহ্য হিংসেয় জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায় দামী মলাটের ভেতর বন্দী দ্বি-সহস্র পাতার গল্পসমগ্রটি।

শ্যামাপাখী ঘুম চায়, অতল গহীন। ঘুম চায় চোখের পলক ঢেকে দিয়ে ছাইরঙ পালকে। ঘুম চায় কুণ্ডলাকৃতি জঠরের অন্ধকারে তিল তিল করে জমে ওঠা জন্মবৃত্তান্তের মতন। অথচ সেই চেয়ে থাকা ভাবলেশহীন চক্ষু দেখছে জলের উপরে ছেয়ে যাওয়া ধীর কেরোসিনের নীলরঙ ধারণ করে জলকপট, আর অহংকারী এক দেশলাইকাঠির এগিয়ে আসা ঔদ্ধত্য।

ঝাপসা থেকে ক্রমেই বিলীন হতে থাকে জ্ঞান, ধ্যান ও সেই প্রার্থনা। ক্ষয়ে আসা দৃষ্টি জানে ওই যে আবছা হয়ে আসা মুখ তার, তীক্ষ্ণদৃষ্টি আর অদ্ভুত হাসি মনে করিয়ে দেয় প্রবল চন্দ্রগন্ধা এক রাত, ঘুর্ণিঝড়ের সমুদ্রতটে পা ছুঁয়ে যাওয়া ফেনিল জলোচ্ছ্বাস। সে রাতেও ছিল উন্মাদ রক্তপাত, ছিল কৃষ্ণচাঁদের এগিয়ে আসা ধীরজ ছায়াবৃত্তে গ্রাস হয়ে যাওয়া অস্ফুট আর্তনাদ।

আমি জানি, আমি জানি! এই কায়া বিস্মৃত হলেই মুছে যাবে নাম, শিয়রের কাছে রাখা যে যত্নের কস্তুরিপুরাণ- তারে যত্ন করে মখমলে জড়াবে না কেউ। আহা মরে যাবার আগে রন্ধ্রে রন্ধ্রে শোর- জলের অতলে কি তীব্র তন্দ্রাঘোর, রক্তের ভেতর উদ্দাম রেষ্টলেস সিনড্রোম, আর সে একই ঘোর একই নাম, ছেয়ে যায় টক্সিক ঐকতান।

মনে পড়ে চকিতে বিবিধ ঘ্রাণ, দীর্ঘশ্বাস ও ঘুঙুরের শব্দ। স্বল্প ও দীর্ঘ কায়া, এগিয়ে এসেই পিছিয়ে যায় প্রলম্বিত ঢেউসমেত। মৃত্যুর সময় কি কেউ হাত ধরার সাহস করেনা- ভাবতেই দেখি দেয়ালে ঝোলানো পেইন্টিং এর গাছটি খুব গাঢ় ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছে মাটিতে। মিলন নেই, বিরহ নেই; গাছটি কোনদিন পেরিয়ে যেতে পারেনি ছবিটা।

যাবতীয় ঘুমের চাপ, তল, ভার, ভঙ্গি ও নিমগ্নতা নিয়ে ডুবে যাচ্ছে শ্যামাপাখী ধ্যানরত সন্ত’র মতন। চোখের পাতায় লক্ষ জোনাক জ্বলছে নিভছে, নাকে তীব্র কস্তুরীঘ্রাণ, রেটিনার কোনে সামান্য কম্পন, কালো ফ্রেমের রিডিং গ্লাস আর দূর থেকে ভেসে আসে, “অইযে অইটা!”

--এক্সকিউজ মি, এইখানে সামান্য কারেকশান হবে, ‘অইযে’ না ‘ওইযে’!

--উহু! আমার ‘অইযে’ টাই ভালো লাগে! যতবার লিখি ততবার একটা কারেকশান আসে।

দৃশ্য থেকে মুছে যেতে যেতে ন্যানো সেকেণ্ডের ক্রিয়ায় এত দৃশ্য, কথা, হাসি, ঝড়, আর একটাই আদম সুরত প্রকট হয়। ডার্ক বটল গ্রীন সার্টিন সিল্ক; অবিশ্বস্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে যায়, নিকষ হয় দুধের সরের মতো ফেটে যাওয়া জোছনা।

ঘর, দোর, অন্দর, বাহিরে, এই যে তলিয়ে যাবার সময়টুকুর ক্ষুদ্র ভগ্নাংশে সেই মুখ। ডুবে যেতে যেতে তার সমস্ত মুখের ভাঁজগুলো জপ করতে করতে শেষবার জলের উপরিতলের দিকে বাড়িয়ে দেয়া হাতটা কেউ ধরেনা। মৃত্যু নিশ্চিত হলে কেউ বাড়িয়ে দেয়া হাত ধরেনা, মরণাক্রান্তের হাতে যদি মৃত্যু লেগে থাকে!

অথচ মরে গেলে ক’দিন গীর্জার গায়ে ঝোলানো বড় দেয়াল ঘড়িটার পেণ্ডুলামের মতো দুলে দুলে কেঁদে ভুলে যাবে। তারপর সেই রুটিন মাফিক কালো ফ্রেমের মধ্য দিয়ে আধবোজা চোখে দেখবে ঠিক লোরকা’র মতো চেহারার এক মায়াবী কিশোর একাগ্রে ঝড় তুলছে গীটারে। জ্বলে যাচ্ছে এম্পলিফায়ার।

--- কেমন আছো?
--- এইতো, তুমি?
--- তুমি এইতো হলে, আমিও এইতো
--- এটা কি কথা! আচ্ছা আমি তবে ভালো
--- তাহলে আমি কি বলবো? ভালো? আচ্ছা, আমি কি মিথ্যে বললাম তাহলে?
--- বলো, একজনের ভালো থাকার জন্য তা যদি হয়
--- তাহলে অন্যজন তো আসলে খারাপ রইল
--- রইলোই বা , একজন অন্তত ভালো থাকলো
--- তাহলে আমিই মিথ্যে বলি..
--- না, হবেনা
--- কেন?
--- একজনেরই তো থাকার কথা ছিল
--- সেটা আমি
--- হ্যাঁ, সেটা তুমি বলেই তো আমাকে মিথ্যে বলতে হবে
--- না আমি বলি , তুমি ভালো থাকো
--- না হবেনা, তুমি ভালো থাকো
--- তারচেয়ে চলো দিনরাত ভর দু’জন দু’জনকে এগিয়ে দিই
--- তারপর তো ভ্রমনকাহিনীর সেই প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পর্যন্ত তোমারই নাম থাকুক..
--- উঁহু, হবেনা..
--- সন্ধ্যের কপালে বড় করে তিলক এঁকে বলেছি আজ নাহয় রাজটীকা দিলুম, তাই বলে আর এসোনা অন্দরমহল, তোমার ঠিকানা বা'র
বাড়ী অব্দি!
--- আমার ও ঠিকানা বার বাড়ি অবধি?
--- :)
--- বেশ! বলো পুরুষ সম্পর্কে তোমার ধারণা কি?
--- পুরুষ মানে শুধুই পুরুষ…


শ্যামাপাখীর হাত ধীরে ধীরে জলের তালে দোল খেয়ে শরীরের চেয়ে ক্ষণকাল পরে লুটিয়ে পড়ে স্বচ্ছ অথচ গভীর জলাধারের তলদেশে। অথচ, হৃদযন্ত্রের শেষ ক্রিয়া ও প্রস্থানোদ্যত অন্তিম নিঃশ্বাস; অতঃপর মৃত্যু পরবর্তী সময়েও একমাত্র সেই প্রিয় মুখ দেখার প্রত্যাশায় নিথর দৃষ্টি চেয়ে ছিল উর্ধ্বমুখে…

৩.
প্রশ্ন ও অপভ্রংশ সমূহ
যখন--
সারারাত কুয়াশায় ভিজে আরো কমনীয় হয় বেতফল, একফোঁটা শিশির ধরে রাখা প্রান্ত প্রিজম হয়ে যায় প্রথম রোদ্দুরে। যতখানি শীতার্ত আবেদন ধরে রাখে আবছায়া ঘোলাটে ভোর, ততখানি মায়া ছড়ায় সূর্যালোক।

তখন--
ভেতর-বাড়ীর ঘাটে উজ্জীবিত হয় গ্রীস্মের শুকনো শ্যাওলা, গাঢ় সবুজাভ আঁধার ঘনীভূত হয় সজনে তলায় আর ক্রমশঃ পিচ্ছিল হয়ে যাওয়া ঘাটে গাভীর হতে থাকে কূলবঁধুর রূপোর আংটি পরানো পায়ের ছাপ।

আর তারপর--
চাঁদের বিধবা আলো, ম্লান ল্যাম্পপোষ্ট হাতড়ে যায় প্রান্তরের সীমানা; যতটুকু শ্রান্তি সঞ্চিত হয় প্রাণে, সেখান থেকে ক্ষণিক বিশ্রাম অবধী- অথবা শহর থেকেশুরু করে সীমান্তের কাঁটাতার পর্যন্ত, প্রথম প্রেমের মতো প্রার্থনায় নত হয়- এতটুকু উষ্ণতার জন্য।

অথচ--
প্রয়াণ অথবা প্রণয় দুটোই অবস্যম্ভাবী, নিমজ্জিত করে রাখে কাল অথবা সময়ে- তারপর ভুলে যায় মানুষ, পৃথিবী। যৎসামান্যই মলাট বন্দী হয় যোগ্যতা বা বিশেষ অযোগ্যতায়।

কখনো--
অপরাজিতার জন্য গাঢ় প্রেম বর্ষিত হয় বেগুনী
বোতামজুড়ে। অথচ হারিয়ে যাবার পর জড়পদার্থের প্রাণ পোড়েনা ভালবাসার জন্য, রোদ সরে যায় -নেমে আসে অপরূপ জোছনা, সেও চলে যাবার ইতিহাস পুনঃরাবৃত্তি করে প্রতিদিন।

যদিও--
চিরায়ত বিষাদ অথবা নৈরাজ্যরা আবাসিক হ্যালুসিনেশনের মতো ভাসতেই থাকে কর্ণিয়ার আঁধার কোনে; অথচ, কবিতা যেদিন থেকে প্রথম প্রেম হলো- জলোচ্ছাস লিখেছি অবিরল। লিখেছি সুখ-দুঃখ অর্গ্যান সম্বন্ধীয় সবকিছু আর সাবলীল চন্দ্রে ঝরে যাওয়া অদ্ভুত বৃষ্টিও।

জানা হয়না--
জানার যতটুকু বাকী ছিল,
ঐ প্রথম প্রণয় থেকে শেষাবধী
হেরেমের কথকতা- কোনকিছুই।





৪.
পৌরাণিক পরিমিতি
ডাহুক বুক জানে বিরহ, বসন্ত বহ্নি ও
ধ্বনি, প্রতিধ্বনিত ব্যথা যায় ফিরে
ফিরে ডাহুকীর বুক, সেই দরিয়া তীরে-
ফিসফিস বালি যার ঠিকানা দিয়েছিল প্রেমিকেরে...

হেঁটে হেঁটে অনেক এগিয়ে যাই, পেছন লাল পোখরাজের মতো তাকিয়ে থাকে পথ; স্মৃতির ডায়রিটাই পাতা উল্টে যায় কেবল, স্বমহিমা ভুলে- ঝাপসা কিছু কষ্টের দল, সাথে ততোধিক ঝাপসা হয়ে আসা মুখের আদল…

জমা কান্না গো,
থেমে যাও-
থেমে যাও!
মস্তিষ্ক ঠুকরে খায় নক্ষত্র বিদ্যুৎ
ম্যামথের মতো, অথবা লার্ভা
কি গভীর চুমু খায়, স্বত্বায়।

বুক ভর্তি প্রাচীন জাহাজ, বোঝাই হয়ে থাকা বেলী ফুলের ঘ্রাণ। যেন দরোজার ওপাশটাতেই জমাট বাঁধা সুখ; দাপাদাপি ফাগুন বাতাসে উলটে যাওয়া অনিচ্ছার পাতায় বন্ধ হয় এক এক করে সমস্ত স্মৃতিচারণ ।

তবুও না ভুলে যাওয়া সেই অতীত নিয়ে হেঁটেই যাওয়া বহুদুরের পথে সন্ধ্যে ঘনায়, ধীর পায়ে রাতও ; মাঝরাতে বিছানায় ভেঙ্গেচুরে যেতেই
নির্ঘুমেরা আয়তন বাড়াতে থাকে আর্দ্রতায়। গৎবাঁধা স্ক্রিপ্টের মতোই নিয়মমাফিক প্রস্থান ও প্রত্যাবর্তন;

রাত হোক থেকে থেকে আরো কালো
স্বপ্নেরাও কাছ থেকে ততোধিক আপন
ভেজা চোখ- সীমা ছাড়ানো লবনাক্ততায়
রাত্রির লহরী, হরিৎ বৃত্তায়ন, পোড়া ছাই
ভর্তি রাতেদের অ্যাশট্রে ও হৃদয় পরিখায়
যন্ত্রনাদের সিন্দুকের লেবেল এঁটে দিয়ে
নতুন ডায়রিটার পাতাও ভরে উঠবে ফিসফাস কথায়!

*******



আমরা হাঁটি এবং দেখি। অথবা আসলে কিছুই দেখি না। বিশ্বাসসহ যে পাখি উড়ে গেছে তাকে দেখা যায়না। সে নিশ্চয় বিশ্বাস ভেঙে দিয়ে গেছে সময় ও সন্তানের সদ্ভাবের। আমরা আরো হাঁটি। আমাদের হাঁটতে হবে কিংবা পালাতে হবে? কিন্তু কোথায়? ক্রমশ অন্ধকারের দিকে ঝুলে পড়া আকাশকে ফেলে রেখে আমরা কোথায় পালাব? আদৌ পালানো সম্ভব কিনা? যেহেতু আকস্মিক অপরধাপ্রবণতার দিকে আমাদের সন্ধ্যাগুলো জমা পড়ে আছে। আর যেকোন সহজলভ্য জিনিসই দুঃখের নামে বিক্রি হয়ে যায় অহর্নিশ। তুমি যতই আগুনের কাছে গিয়ে শ্লোক আওড়াতে থাকবে; দেখবে, আগুন ক্রমশ লবণের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে।তবে কী আমাদের যাত্রা লবণের দিকে? আগুন আর লবণের যৌথতায় আমরা আসলে কতদূর পালাতে পারি?
তারপরও কী জারি থাকে না আমাদের আলোর সন্ধান? আমরা কেবল আলোর সাথে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়তে চাই। যার পৃষ্ঠে কেবল উশৃঙ্খল বাতাসের দঙ্গল। আমি তার হাত ধরে বহুদূর হাঁটতে চাই। যে যাত্রা কেবল কষ্টের দিকে, একাকিত্বের দিকে এবং দান্তের ইনফার্নোর সেই আগুনের দিকে। গা ঘেসে আগুনের হলকার আসে। আমরা প্রচণ্ড উত্তাপ বোধ করি, কিন্তু আমরা তবুও হাঁটি। প্রচণ্ড আগুনমুখা এই অনুভূতি। সঙ্গে লেপ্টে থাকা কিছু প্রহসন এবং বিদ্রুপও। বারবার আমরা এগিয়ে চলি এবসার্ডিটি এবং ডিপ্রশনের ভিতরে। এই আগুনের দিকে। আগুনই শেষ পর্যন্ত কেবল সত্য।
আমি জানিনা জল সে আগুন নেভাতে পারে কিনা। কিন্তু আমরা তো ধরতে চাই পাখি কিংবা ফুলের মাঝামাঝি কিছু একটা কিংবা আমরা হতে চাই দুই সুন্দরের মাঝামাঝি কিছু একটা। আমি জানি, আমি জানি। আমরা কি আসলে জানি, পুরুষ মানে শুধুই পুরুষ? পুরুষ মানে একদল মরবিড ড্রাকুলা? কেউ কেউ নিশ্চয় জানেন অথবা জানার ভান করেন। যিনি জানেন অত্যাশ্চর্যের চেয়েও মৃত কোন ফলের সন্ধান। একাকি হাঁটার সমূহ যন্ত্রণা অথবা গাঢ় সবুজ আপেল।
প্রশ্ন এবং অপভ্রংশের ঘোরে আটকে থাকা অনেক কিছুই যা আমরা হয়তো কখন জানবোনা। যা সত্যি হয়েছে বারবার তা কেবল আক্ষেপ এবং বেদনার। কেউ একজন জোছনার মত প্রতিদিন একা করে দিয়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে? সেই আগে বাতাসের উশৃঙ্খল দঙ্গলের কথাই মনে পড়ে। এসবের ভিতর দিয়েই সেই ঘোরগ্রস্ত পাহাড়ি যুবকের মতো যেতে হয় না জানা পর্যন্ত। সুদূরের সেই সবজু আপেল গাছ অবধি। যেকোন আপেল গাছ মূলত অনুসিদ্ধান্তমূলক। যেমন আমাদের অনুভূতিগুলোও।
অতীত না ভুলতে পারার দু:সহ যন্ত্রণা থেকে আসলে কি কোন নিস্তার আছে? যা রাতকে আরো কালো করে দিতে চাচ্ছে। যে রাতে মানুষ মানুষের কাছে ঈশ্বর হয়ে আসেন। তবুও ঈশ্বরেরও তাকে বিবিধ হৃদয় আর একটি বিষাদময় আপেল গাছ। যা আপনাকে কেবলই মিশিয়ে দিতে চাচ্ছে ডায়েরির পাতার সাথে। যেখানে কেবল মৃত্যু লেখা হয় কিংবা জন্ম। আগুনের বাইরে যা সত্য তা হলো, জন্ম এবং মৃত্যু। মৃত্যু এবং জন্ম।একের পর এক। যেখানে থাকে কেবল যুগপৎ আত্মমৈথুনের আনন্দ এবং যন্ত্রণা।
এত এত দৃশ্য ক্রমশ মুছে যাচ্ছে আমাদের কি সত্যিই কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই ।আমরা কি জানি দৃশ্য এবং শব্দের বিভাজনগুলো। আমরা জানি, শব্দের আসলে কোন ভাঁজ নেই। ভাঁজ নেই মৃত্যুরও।যা আছে তা হলো গীর্জার আড়ালে থাকা নিরন্তর মৃত্যুর পতন, মানুষের পতন।
অতপর সুদীর্ঘ কথোপকথন। অসংখ্যা শব্দ সারি সারি মেঘের মতো সাজিয়ে। শব্দের পর কি? কথার পর কী? মৃত্যু নাকি অন্য কিছু? নাকি কষ্ট? আমরা আবার ভাবি। ধীরে ধীরে সমস্ত অস্তিত্ব ফসিলস হয়ে পড়ে। আবারো সন্ধ্যা আসবে।নদীগুলো ধীরে ধীরে সমুদ্রে ডানা বিস্তার করবে। আমাদের পথ এবং একাকিত্ব যুগপৎ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে।