হৃদয়ে শ্যামাপোকা

অনিমিখ পাত্র ও সঙ্ঘমিত্রা হালদার



অ নি মি খ পা ত্র

দুঃখে কী আর ফোটে

দুঃখে কী আর ফোটে
তোমার মহিলামনে দূরে দূরে সন্ধ্যা দেখা যায়
কে কাঁদে অন্তরায়
তোমার পুরুষমনে গানগুলি তারা হয়ে ওঠে
যাওয়া আর আসা মিলে আসা যাওয়া ঘনিয়ে তুলেছে
কে কাকে তুলবে ভাবি, রোদ বৃষ্টি রোদে কার ব্যাটন কোথায়
মনে মনে সেই তো চিল ঘুরে ঘুরে উড়ে উড়ে কোথাও বসে না
দুঃখের অভিকর্ষে মাঝেমধ্যে এসে পড়ে আনন্দগ্রহটি
আর তাতেই গ্রহণ লেগে গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ছিটেফোঁটা শীতের আরাম
অন্য গোলার্ধে গেলে বাক্যটিরও রঙ চটে যায়
এ মনের ধ্বনিবীজ ওই মনে ধ্বনির অঙ্কুর
ও মনের পাখিবীজ ওই মনে পাখিটির ওড়া
মনের মানুষ, ওগো, তুমি কি সম্পূর্ণ ছবি মানুষের মনে ?
দেখি, চিন্তার বাঁকানো ছায়া এইমাত্র জলে পড়ে গেল
ছায়া লেগে জল কাঁপে। জলও কিছু ছায়াকে কাঁপায়



চিন্তার বাঁকানো ছায়া

চিন্তার বাঁকানো ছায়া জলে পড়ে গেল
দেখে, চিন্তাশরীর তার যথাসাধ্য চঞ্চু বাঁকায়, তবু
চিন্তামনকে তুলতে পারে না
জলে কোনো বিষ ছিলো, চিন্তামনের গায়ে আস্তে কাজ করে
সে ক্রমে দেহটি পালটে দ্যাখে সে চিন্তামণি, দ্যাখে তার আনন্দ হয়েছে

দেখে, চিন্তাশরীর খুব ধন্দে পড়ে গেছে। এই জল বুঝি অমৃতগরল !
শরীর মনকে জানে। মণি তার কে হয় ? কী হয় ?
চিন্তামণি নেচে নেচে জল ঠেলে এসে দ্যাখে
চিন্তাশরীর খুব অন্য মনে চিন্তা করিতেছে,
‘তবে, শরীরের কি মন হলো ? দোসরের দোসর ?’
প্রশ্নে আর প্রশ্নে তার আনন্দটি মৎস্যকন্যা
দুঃখের আঁশের নীচে মুক্তো হয়ে জমে, বৃহত্তর জল তাকে ডাকে

এইবার, যে প্রথম জলে পড়েছিলো
সে বিষয়ে একটু একটু চিন্তা করা যায়



প্রশ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে

আমিই তোমাকে দেবো নীল পাহাড়ের নিরাময়
স্নানের ঘরের মধ্যে শব্দহীন থাকার মহুয়া
তোমাকে ফেরার পথ এঁকে দেবো বাঁধানো রাস্তায়
অযথা চিৎকার থেকে তরুক্ষীর তুলে নিতে দেবো
তারপর তোমার মনে দেখবো অন্যমন গজিয়ে উঠেছে
তবে তো গ্রহান্তরে তোমার গ্রহণ রুজু হবে
শিরা উপশিরা ভরে ম্যাট্রিক্স শহর ও গ্রামের

তখন কোথায় আমি? আমার সময়বিন্দু জীবনগ্রাফের কোনখানে?

প্রশ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে তোমার পুরনো মনে আমি
শিস দিতে দিতে দোল খাই

*****



সঙ্ঘমিত্রা হালদার

সে দেখে যায়। দেখা দেয় না। দেখে যায় বলে তার চেয়ে থাকা, পলক ফেলা আমি টের পাই। কিন্তু দেখা যেহেতু দেয় না, তাই সে কায়া-রূপ ফোটে না কখনও। কিন্তু এই কায়াহীনতারও ভূমিকা থাকে। দোসর ভূমিকা। এই যেমন দুঃখ কী আর ফোটে—চোখে দেখা যায়? কিন্তু ‘ দুঃখ আরো বড় হলে/ তাকে নিয়ে ঘর করা যায় (প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত)। আসলে এই ঘর না-করে উপায়ই বা কী! আমার শ্বাস-প্রশ্বাস তো তখন তারই হেলানো আঙুলে বয় বা বয় না। পাথর যে চাপে তারও কারিগর সে। মতি হলে সে খন্ড সরায় বা কুঁদে কুঁদে মূর্তি তোলে। অথচ আমার আঙুলে তার পরিশ্রম! তবু সে চোখে পড়ে এমন দৃশ্যে আলো করে না। ফোটে না। কিন্তু জীবনকাল জুড়ে ফুটতে থাকে। পুরোটা ফোটে না বলেই সে খরস্রোতা, কখনও শুকায় না। তবু ফুটতে থাকে, ফুটতেই থাকে। এ এক নিরন্তর প্রসেস। রিলেরেসে হাত বদল হয়। তবু সে একটাই খেলা। একটাই খেলা বলে সে ফোটা কখনও সম্পূর্ণ নয়। নয় অস্তমিত। সে নিজে মজে আমাকেও মজায়। আমার অস্তিত্ব ও শিহরণ সে। তাই আনচান দিনমান। সূর্যের দিকে চেয়ে ফোটে যে সূর্যমুখী ফুল, সেই সংকেত আসে নিরবধি। সন্ধানী জন কুড়িয়ে পায় ঝরাপাতা। চিঠি। কুড়িয়ে আসলে পায় না কেউ। সে কান পাতে নিজের শরীরের রক্তে। যা তার, তবু পুরোটা দায় তার নয়। যে কাছে থেকেও দূরে। দূরে থেকেও স্পর্শের বড় কাছাকাছি। কোনও নির্দিষ্ট নামরূপ নেই তার। তবু অনেক নামের সমাহার। অনুভূতির বাটিটায় কেবলই সে গুলে আসে, কানায় কানায় জোয়ার হয়।

তবে কে না জানে ব্যক্ত থেকে অব্যক্তের ভার ঢের বেশি শ্বাসরোধী! এই অব্যক্তের ছায়া আছে বলেই ভাত-ডাল ছাদ-বিছানার বাইরে জাপটে আছে সে। তোমার একাকি জীবন। বুঝতে পারছ তুমি একা পড়ে গেছ। বুঝতে যে পারছ, তাই তো এত ঘাম ঝরিয়ে লগি ঠেলা। তাই এত পরিশ্রম আর ক্লান্তি সহ্য করে তোমার পেশী আর স্নায়ু তোমাকেই অভিবাদন জানাচ্ছে। নিজেকে তৈরি করে তোমাকেও প্রস্তুত করে তুলছে। তোমার প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অভিমুখ এমনকি এইভাবে নির্দিষ্ট হয়ে আছে। সারিয়ে হয়ত তারা তুলছে না, কেননা সারিয়ে তোলার সামর্থ্য তাদের নেই। আর সামর্থ্য নেই বলেই তো তুমি এত এত পথ—বাঁক অতিক্রম করবে। এক যৌথতার তরে। এক দোসরের লাগি। কেননা ততদিনে তুমি একা হয়ে গেছ। তুমি আর তোমার মধ্যে সে, তোমার অভাববোধ। তোমার আনন্দ। যার জন্য তোমার চামড়ায়—স্পর্শ আর ছ্যাঁকা-লাগার বাইরে অনুভূতির আনচান জাগবে। যার জন্য তুমি তাকে কামনা করবে সহস্রবার। মরবে একাকী। কারণে। অকারণে। সে দেখে ভাত নয়, থালা জুড়ে শিউলি ঝরে আছে। তার ধোঁয়া থেকে ঘ্রাণ মনে আসে। একলা স্নানের ঘরে ঘ্রাণ থেকে উবে আসে সুর। তার জন্মের সমানে ও বিপ্রতীপে বাড়ে এক আকাঙ্ক্ষার ফুল। আপনা মাংসে তখন হরিণা বৈরী। কে নেবে তার পাথর-ভার! রসিক জন বোঝে এ মুহূর্ত রসের আকর। মাটি থেকে, ঘ্রাণ থেকে, সুর থেকে, দৃশ্য থেকে চোখ চুঁইয়ে—চামড়া ফুঁড়ে রস আসে; ধমনী ফাটে। ছেনি-বাটালি হাতে ভাস্কর সে স্রোত ঢালে খাঁজে-অববাহিকায়, নড়ে ওঠে ভাস্কর্যের চোখ। সুরে সুরে হা-চৌচির রস-নাই সিক্ত হয়। শব্দ-অক্ষরে, বাক্য-বাঁকে বলা না-বলা ঘন যামিনী নামে। বোঝা না-বোঝার। প্রেম-বেদনার। সে বড় হয়, আর তার ক্যানভাসও বড় হয়। ঢুকে আসে একে অন্যের ভিতর। হাতে হাত রাখে। হৃদয়ের তন্ত্রী ছিঁড়ে একে অন্যের তার হয়। বাজে। একের মীড় চঞ্চল করে অন্যকে। ভ্রূ-ভঙ্গি ডাকে। তার-সপ্তক আকুতি ছোঁয়। হৃদয়ে শ্যামাপোকা বসে। বসে আর ওড়ে। লেখে, কাটে। তবু যায় না মনের ভার। অনেকদিন ধরে কেউ আসে। তবু কিছুতেই সে পুরোটা আসে না। মনে পড়ার আবছা হুইসেল এসে ঢোকে, তবু মনে-পড়া কামরা কিছুতেই তাকে তুলে নেয় না। সব ঘরে, সবার ঘরে তখন সে এক সম্রাট। তাই সে হাঁটে, তার দোসর জুতোও হাঁটে। ভেতরে প্রস্তুত হলে আরেকজনার নিঃশ্বাসের ভাপ গায়ে এসে লাগে। তার কায়ার সন্ধানে তখন সারাটি জীবন মাটি হয়, কিংবা শস্য ফলে। তাই এ দেহ, এ দেহ-আধার, এ আমি— খেলা-খেলা খেলার বেশি কিছু নয় আর। একেকসময় সে দেখে সে নিজের ভিতরে বসে থাকা মানুষটা ঠিকই, আবার নিজের ভিতরে সে ঠিক নেইও বটে—সে ভাবে সে তবে কে? সে তখন সে’কে খুঁজতে খুঁজতে অতিক্রম করে অনেক পথ, অনেকগুলো বাঁক।

According to Greek mythology, humans were originally created with four arms, four legs and a head with two faces. Fearing their power, Zeus split them into two separate parts, condemning them to spend their lives in search of their other halves. --Symposium: Plato

তাই কি আমি কিছুতেই আমাতে সম্পূর্ণ নয়—এ অনুভবের চেয়ে জীবন্ত গাছ রক্তে আর পোঁতা হয় না? এই একটি গাছের হরেক শাখা-গাছই কি সমূলে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে না? যত যাই সেও হাঁটে পায়ে পায়ে। সেই পথে যত যাই মনে হয় কে যেন পিছু নিচ্ছে পায়ে পায়ে! তাই তো ফিরে ফিরে চাই। ভয় পাই, তুমি আছ ভেবে নয়—তোমার থাকার কথা ছিল, অথচ নেই এই ভেবে। এই তুমি তো আমারই পরিপূরক। যাকে ভুলে থাকি জেনেশুনে। বুঝে, না-বুঝে। ভুলে থাকি, মনে পড়বে বলেই তো! ব্যথার মতো ব্যথা দিতে পারো, তাই তো এত ঋণী হয়ে আছি। আমি আছি— এই টের, এই সম্বিত ফিরে পাওয়ার জন্য ফিরে ফিরে তাই তো একটা তুমির স্পর্ধা খুঁজি! খুঁজে হারাই। হারিয়ে খুঁজি। তোমাকে কেন্দ্র করেই তো আমার আলম্বন-বিভাব। সঞ্চারী ও স্থায়ী। তাই তো ভেঙেচুরে- ব্যক্ত- অব্যক্তে কেবলই আমাতে প্রকাশিত হতে চাও। আমি আধার খুঁজে মরি। মরি আর বাঁচি। কখনও আমাদের শাদা বিছানাই সে প্রকাশভঙ্গির মেটাফর। প্রকাশযোগ্য সর্বোৎকৃষ্ট ক্যানভাস। কখনও আবার তুলির আঁচড়, রেখা- রঙ। ধ্বনি- সুর। কখনও বা শব্দ-পংক্তি খেয়াল। কারণে। অকারণে। জুতোর পেরেক নেমে গেলে তখন আবার ভুলে থাকি। তখন হয়ত তোমাকে তোমার করে দেখার অবসর মেলে। কিন্তু তখন তো দেরি হয়ে গেছে। তাই তো আক্ষেপ করি থেকে থেকে—কখনও তোমার করে তোমাকে ভাবি নি বলে। কিন্তু চোখে চোখ রেখে আয়নায় সহস্রবার আমাকে দেখার ছলে আসলে কি তোমাকেই খুঁজি না? কিংবা বালিশে কান চেপে শুনি যে ধুকপুক! তাই তো আমি হাঁটি, আর আমার পাশে পাশে হাঁটে এক অভাবিত ছায়া। মাথা তোলে এক অভাবের চারা। দোসরের বড়ভাই। যার দুটো হাত-পা, একটা মুখ হারিয়ে গেছে কোনও এক গেলবারের মেলায়। আমার অন্তর্ঘাতেও তাই তো শেষমেষ একটা আমিই পড়ে থাকি। আর আমার অভাব। তাই তো এক অর্ধনারীশ্বরের বিশ্বাস ঘুরে ঘুরে জলের মতো একা কথা বলতে দেখব জীবনানন্দের কবিতায়।

একটা কালো ক্যানভাসের হারিয়ে যাওয়া অর্ধাংশ তো আসলে এক টুকরো শাদা জমি। তাই তো শাদার এমন আবেগ কালোর প্রতি। কালোর শাদার প্রতি। তাই তো দোঁহে মিলে এমন সুজন। যারা কথা দেবে। তাই তো একটা শাদা ক্যানভাস-এ সর্বক্ষণই একটা কালোর অভাববোধ। একটা কালোর আধারে সে যতটা ফুটবে, অন্য কোথাও না। কালো উত্তুঙ্গরূপে ব্যক্ত ও সুখী কেবল তার শাদাতেই। তাই তো আমার অভাব-বোধই আমার দোসর। আমার একটা তুমি পাচ্ছে। আসলে আমার খানিকটা আমিও পাচ্ছে, নাহলে আমার যে কেবল তোমাকেই প্রয়োজন, তোমাকেই, আর কাউকে নয়— জানব কেমন করে! তোমাকে যে চাই জানার জন্য তো আমাকেও জানতে হবে! তাই তো এমন সমর্পণ চাই— যেখানে ভুলে যেতে পারি আমাকে, তুমি তোমাকে। কেননা তখন আকাশ ছেয়ে আছে আমি নয়, আমার চাওয়া—তোমার চাওয়া। আমরা তখন চাওয়ায় চাওয়ায় আস্ত শরোদ হয়ে গেছি। আমাদের চাওয়া তখন আমাদের গাইছে। একটাই রাগ বাজছে অনেকক্ষণ ধরে। আমরা এক শ্বাস-প্রশ্বাস তখন। কিছু নয় আর। কেউ নয়। তাই তো শুষে নিতে নিতে আচমকাই ভুল ভাঙে। কেননা খোঁজাটাই তুমি। খুঁজে পেলে তখন আচমকাই ভুল ভাঙবে। কেননা তোমাকে তো তোমার করে খুঁজিনি। তাই তো যাকে খুঁজেছি তার সঙ্গে আকাশ সমান দূরত্ব কখনও তোমার ঘুচবে না। তোমার করে খুঁজিনি কেননা আমিও তো পুরোটা আমার নয়! আমি তো একা সম্পূর্ণ নয় আমাতে! য়ার এই একার বোধ মানেই তো যৌথ আসরে আমি তার বাঁধছি, গলা সাধছি মাত্র। তুমি যোগ দিলে তবেই না গাওয়া হবে সে গান। স্বার্থপরের মতো ওই গানটুকুর জন্য চেয়েছি তোমাকে। গাওয়ার পর তোমার আমার মাঝে যে শূন্যতা, তার জন্য আমি প্রস্তুত নই। আবার তোমাকে যেতে দেওয়ার যে শূন্যতা তাকে নিয়ে যে কী করতে হয়, তাও জানিনা। তাই তো জুতোয় থেকে থেকে কেবলই পেরেক জেগে ওঠে। তাল কাটে। তবু তো পুরোটা কখনও তোমার করে দেখা হবে না। কেননা পুরোটা তোমার করে ভাবলে তো আমাকেই খোঁজা হবে না। আমার আমিই থাকব না। আর আমিই যদি নাই থাকি, আমার তুমি’তে কী বা যায় আসে। তাই তো হে আমি নিরন্তর সংশয়ে বাঁচি।


কবে থেকে আসছি তোমায় চেয়ে

তোমার লাগি এ মিলন। এ মিলন আমারও লাগি। এ মিলন দোঁহের তরে। দোঁহেতে তারা কী কুসুম করিল চয়ন, সে যৌথতা—সে শঙ্খ-অনুভবের তরেও আমার এ মিলন। শুধু মিলন নয়, মিলনের তরে যে শূন্যতা সেও রক্তের ভেতরে পাক খাক আমাতে। পূর্ণ মিলনের তরে যে ব্যাপ্ত বেদন সেও দোসর হোক। অপূর্ণতার কাঁটা না থাকলে পূর্ণ কী কখনও আমার হবে! অনেককাল আগে একবার এক বইতে পড়েছিলাম, গোষ্ঠীজীবনে বসবাসের কালে—যখন কথা দিয়ে ভাব বিনিময় শুরু হয়েছে সেই শুরুর দিকে কিছুকাল অব্দি মানুষের জীবনে কোনও ‘আমি’ ছিল না। ছিল না কোনও ‘আমি’র ব্যবহার । গোষ্ঠীগুলো ভাঙার পরে ‘আমি’র ব্যবহার এল, না ‘আমি’র চেতনা ও ব্যবহার আসার পর গোষ্ঠীগুলো ভাঙল সে কথা সেখানে স্পষ্ট করে বলা ছিল না। কিন্তু ভাবতে গিয়ে মনে হয়—উদ্বৃত্ত সময় যেমন হোমোসেপিয়েন্সকে বাকিদের থেকে পৃথক করেছে প্রথম ধাপে, তেমনি এই ‘আমি’র চেতনা তার সূক্ষ্ম চেতনার প্রথম গিঁট। এরপর যা সে সারাজীবন ধরে বাঁধতে বাঁধতে খুলবে। বা খুলতে খুলতে বাঁধবে। এই ‘আমি’ই তার সূক্ষ্মতর অপূর্ণতার প্রথম ধাপ। এই আমি আসলে এক অপূর্ণতার সংকলন। যা সারাজীবন ধরে জমতে থাকে। আর শোধ হতে থাকে। এই আমি এক তোমার লাগি সন্ধানে ঘুরে মরা। যে তুমি কিছুটা আমিও। আমাদের জীবন-সাগা—আমরা দুজনে মিলে শূন্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।

তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে

এক দোসর অভাবের বোধই আর সব বস্তুজগৎ থেকে আমাদের স্বতন্ত্র করেছে। কী খেয়াল গাইছে আমাদের ভাবি। শেষমেষ খেলাই তো। খেলিছে সে বিশ্ব লয়ে। না, এ কোনও ঈশ্বর বিশ্বাস সুলভ সে নয়। এ এক অজ্ঞানের প্রতি বিস্ময়। আমরা যেমন গানকে গেয়ে উঠি, পংক্তি’কে উপভোগ করি; অজ্ঞানের বিস্ময়ও আমাদের সেই রাগে গাইছে। একটা সুরের, একটা কবিতার দোসর—আকাঙ্ক্ষা। সুরের, কবিতার কার প্রতি আকাঙ্ক্ষা? যে তাকে ধারণ করতে পারে। যে সত্যিই তার আকাঙ্ক্ষার জন। সে সর্বোৎকৃষ্ট উপায়ে তার জন্য কাতর।

দোসর—যা কিনা একটা মিথ। অথচ তাকে খোঁজার জন্য ক্ষুৎপিপাসার বাইরে এক হেলানো জীবন-কাঠামো নির্দিষ্ট হয়েই আছে। তাই তো কবিতা, পংক্তি- পাতার শিরা ও জালিকায় অর্থ ছাড়িয়ে অর্থান্তর আছে। বাচ্যার্থকে অতিক্রম করা আছে। কখনও বা একটা সুরের বাষ্পবিন্দু জমে কিংবা হঠাৎ আটকে যাওয়া পলকে একটা পা টেনে টেনে হেঁটে বেড়ায় আমার ভেতরে। তার নুন-ছাল উঠে যাওয়া টের পাই অনেকদিন ধরে। শরতের শামিয়ানার তলায় কাফি ঠাটে নিধুবাবুর টপ্পা কিংবা দাড়িওলা লোকটার পূজা- পর্যায়ের গানগুলো শ্রবণতরঙ্গের চৌহদ্দিতে এসে পৌঁছলে মনে হয়—কে যেন অনাদি সময়প্রবাহ জুড়ে আমার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে চলেছে! এমনকি একাকী দ্বীপে এহেন আমার নির্বাসন চলবে না। কবে থেকে এক ষড়যন্ত্রী ফিসফিস করছে। ওই ফিসফিসটাই চিঠি। কিন্তু কেউ আমার হয়ে চিঠিটা ডাকে দিচ্ছে না। অথচ ডাক পাঠাচ্ছে সেই কবে থেকে!

আমি যারে ভালোবাসি
সে যদি ভালোবাসিত
তবে প্রেমে কী সুখ হত...
 রামনিধি গুপ্ত

তাই তো আমার বিরহ এমন আকাশ ছাওয়া! তাই তো আমার আকাঙ্ক্ষার সুখ এই ধুলোজীবন-নশ্বরজীবন পার করেও ঘ্রাণবাহী হয়ে জেগে থাকবে। তুমি ব্যতীত আমি আর কেউ নই। কিছু নই। আমার সকাল-সন্ধ্যার রাগে কেবল তোমারই অবতারণা। যত কাব্য-ভঙ্গি-সুর—সে তো এক চিরহরিৎ-এর তরে আমাদের একক আকাঙ্ক্ষার গান। আমরা চরিত্র শুধু। কেবল ওই আকাঙ্ক্ষার সুরই ধ্রুবক। সেই-ই যুগপৎ ম্যাটার ও অ্যান্টি-ম্যাটার। সকল শক্তির সমাহার।