চাঁদ ওঠে চোখে

রঞ্জন মৈত্র ও ভাস্বতী গোস্বামী



লোকাল লাইন

(১)
চড়া রোদের মধ্যে একটা ছাতা আঁকার তূলি
যখন আছো
যখন নেই
দত্তর ইস্কুল পাল-এর কোচিং পালিয়ে
চিঠি লিখতে চেয়েছিলাম
যখন সিমেন্ট বালি কল্লাচ
আমার হাত থেকে রোদ পড়ছে
ছায়া পড়ছে কলম থেকে
আর চিঠিগাছে মুকুলের মাস ওই আসি আসি
(২)
কে ঝাড়ু লাগায় অন্ধকারে
বারান্দা জানতো না
পায়ের তলা ফুঁড়ে বালি আসছে মাথায়
মাথা থেকে ফোঁটা ঝুলছে নয়নতারায়
দুমড়ানো লোহালক্কড় থেকে
রক্তমাখা কাচ থেকে
আমাকে কি বার করেছিলে
ভাত পেলে সিধে হবো
জল পেলে বালি খুঁড়বো না
ঘুম পেলে ঝাড়ুর অক্ষরে লেখা বারান্দাটি
পাশে এসে শোবে
*****
মেইন রোড

তুমি এলে
তো বৃষ্টি এলো
চেন চালক চাকা
মাত্র ধ্বনি থেকে এত কথা
ভাবতে ভাবতে
কাকে যেন রাস্তা করে রেখেছি বহুক্ষন
ভাবতে ভাবতে
তিনখানা চ খরচ হয়ে গেল
তিন ঋতু
দূরে দূরে ঘন্টি যাচ্ছে
ঘন নীল উড়তা সফেদ
দুমাত্রা তিনমাত্রা
কাস্তে হাসছে পাশে অবিশ্বাস্য ধান
হেমন্ত লাফিয়ে উঠছে
বিশ্বাসজনক ঘামে চতুর্থ চাকায়
হাওয়াকে দাওয়াত দেবো
জানলাগুলো খুলে আসি, যাই

লোকাল লাইন
(৩)
শোয়ামাকে এই ওঠাই এই বসাই
চলা চেয়ারে বাড়িটাই চলে
চলা বাড়িতে মা-কে শোয়া দেখতে দেখতে
চারটে চাকার জন্য
স্টিয়ারিং-এর জন্য
বস্তুত একটা চাবির খোঁজে মন খারাপ করে
শান্ত হও শান্ত হও
এই তো গরমকাল
এরপর বর্ষা তারপর কাশ
তারপর সোয়েটার পেরিয়ে
হারমোনিয়াম বেজে উঠবে না-দেখা গাছেও
এই তো হাত বোলাই গালে
আর আঙুলে জন্ম লেগে যায়



সেই জুতোজোড়া মনে পড়ে। জিষ্ণুর গোল গোল পায়ে ফিট্ হওয়া প্যাঁকপ্যাঁকে জুতো। পা ফেললেই আলো জ্বলে ওঠে আর সেই খুশী উপচে পড়ে শিশুর বিস্ময়ে। অতিচেতনার বিন্দু ছুঁয়ে থাকা সেই তো আলোতোয়া। কতবার শুনেছি কখনও নিছক ফাজলামিতে, কখনও কবির উদাসে “ আমাদের ছিল এক ভূতে পাওয়া আলো”। বুঝি “চলার বেগে পায়ের তলায় রাস্তা জেগেছে......... আমাদের খেপিয়ে বেড়ায় কে”। তো এই সেই অর্বিট যা কবিকে অন্ধকার থেকে আলোর গোলার্ধে প্রদক্ষিণ করায়। কবি সেই খ্যাপা পথের পথিক।

আলোর স্বরলিপি ছড়ানো যতদূর চোখ। এখন চড়া রোদ হাত থেকে পড়ছে। একটা তুলি, তাতে জলরঙ ছায়াই আঁকা যায় শুধু। নির্মাণ আর তার উপকরণগুলো গুছিয়ে নিই। শূন্যে ঘর। রোদ খেলছে ছায়া। খেলছে উঠে নেমে। চিঠির গায়ে দাঁড় করাই তোমাকে। গাছ ফেটে পড়ছে রং-বেরঙের পাশে। ওইখানে রয়ে গেছে আমাদের প্রতিমাপাড়া ------ ওইখানে মুখোমুখি ভালোবেসে দাঁড়িয়েছিলাম।

আমার দাঁড়ানোয় অন্ধকারও থমকে দাঁড়ায়। শালা অন্ধকার। ওর সাথে আমার বোঝাপড়াটা চিরকালীন। ধরব একবার শালার কলার, ঝেঁটিয়ে সাফ করে দেব। একটা ভীষণ আওয়াজ উঠছে, উল্টে যাচ্ছে ঘর, আমার দুয়ার। আঁধির ফোঁটা ফুলও ফোটে। তাকে দেখি না ------- তাকে দেখে না কেউ। যেদিন চোখ পড়ল দেখি দোমড়ানো লোহা-লক্কড়ে রক্তের ছোপ। কাচের ওপারেও অন্ধকার পড়ছে। ছোপ মুছে একটা কমিউনিকেশানের চেষ্টা করি। আমাকে কি টেনে আনে কেউ? এত বুলেট উড়ে এসেছে, এত ডিনামাইট গন্ধ আর দাঁড়াতে পারছি না। ঝিঁ ঝিঁ অন্ধকারে ঘুম ডাকছে আমায় “ হঁসে তো দো গালোঁ মেঁ , ভঁয়র পড়া করতে থে............ছোড় আয়ে হম্............”। কে এসে পাশে শোয়? বারান্দা, নয়নতারা না আঁধির ফোঁটা?

আসার তো শব্দ নেই কোন। তবু “ তুমি এলে” খাতার পাতায় পাতায় জল দাঁড়িয়ে গেল। বহুক্ষণ ধরে যে রাস্তা বানিয়েছি আর তার অনুষঙ্গগুলো, সে তো তুমি আসবে বলেই। বৃষ্টি পেরোলো, কাশও...... ওই নীলি...... নীলি অম্বরে। এখন হেমন্ত। কাস্তে হাসছে, স্বপ্ন মাঠের দোলে। ধ্বনি থেকে শব্দ, কথা। সে-ও তো আসে...... খোয়াব দ্যাখায়। স্বপ্ন এক চেতনা, যা কল্পে না দাঁড়ালে অসম্ভব। তো ওইখানে রয়ে গেল কথার পাঠানো সংকেত। কত খোঁজ বাকি রয়ে গেল অনুসন্ধানের চার পাশে।

জন্ম খুঁজছি। একটা চাবির জন্যে হাহাকার। চলার জন্যেও। সময়-সরণী জুম করে মা বদলে যায়। আকাশ, ঋতু এরাও বদলায়। এখন গাছ ভরছে হারমোনিয়ামের সুর। প্যানোরমায় চলতে চলতে দাঁড়িয়ে পড়ি সূত্রের খোঁজে। দৃশ্যফের হতে থাকে। ক্যামেরা রোল করে আমি এক শিশু। একদৃষ্টে তাকিয়ে। শব্দহীন, তবু এখুনি যেন দোল ছেড়ে বেরিয়ে আসবে উইণ্ডচাইমের টুং। আদর রাখি আমার শোয়ামার গালে। ওইভাবে জন্ম এসে আমার আঙুল ছুঁয়ে দিক।

কবি কে? প্রত্যেক দিনের খুঁটিনাটি লৌকিকতার জল-মাটি-বায়ূতে সরস হওয়া কেউ। যার তীব্র অনুভূতি থেকে বোধের জন্ম হয়, এবং দেখা না দেখা মিশিয়ে শব্দ-কল্প-দৃশ্যের আলোছায়া। কবিতা এমনই এক উৎসার। চেতনাপথের “সেই ছোট সরু আলোদার ব্যাটারি” যাদের “রসুল নেই তাম্রপত্র নেই”। দৈনিক সূর্যোদয় সূর্যাস্তের নির্জনতায় চাঁদ ওঠে চোখে।