চোখেই স্মৃতি হয়। জন্মায়, কাৎরায়। কেউ বুঝি হাসতে থাকে...

আসমা বীথি ও এমদাদ রহমান



১/ শে ষে র আ গে র ক্ত ও লে লি হা ন স্বা দ


সংবাদ
থাকি এক খাঁচায়। তার ভেতর আছে আরও এক খাঁচা, পাখিদের। সেখানেও শুরু হয়ে গেছে রক্তপাত। কাল রাতের অন্ধকারে, ওদের ঘুমন্ত নিরুপদ্রব জীবনে নেমে এসেছে ত্রাস। বিড়ালের থাবায় নিহত এক, আহত একাধিক। এক পোয়াতি পাখির নীল ডানা রক্তদাগে ভিজে আছে এখনও। পাখিসমাজ প্রতিরোধ গড়ে, করে কী যুদ্ধঘোষণা?
//আসমা বীথি

... তখন আর থাকে না কিছুই, শুধু এক কংকাল ছাড়া। থাকে কেবল মৃত্যুর দিকে ধাবমান বিপুল বিলুপ্তি। ভোর হয় শুধু নাকি রাত শেষ হয়? হে অনন্ত নক্ষত্র বীথি... এই দেখো, নমস্কার মুদ্রায় আমি কল্পিত তোমার ভঙ্গিমায়... এসো, দাঁড়াই এসে সুড়ঙ্গের অন্ধকার মুখে। আর, তারপর, ধী-রে, ধী-রে- বাজিকরের উড়িয়ে দেওয়া পায়রার মতো বেঁচে থাকি পুনর্বার। আহা, জীবনের এতোই স্বাদ, যাপনের, মুহূর্তের উদযাপনের... অন্ধকার, হে অনঙ্গ অন্ধকার... বিপন্ন বিস্ময় তুমি! এই যে তবে মুঠো খুলে ছেড়ে দিলাম সহস্র জীবন-মার্বেল, ম্যাজিশিয়ান আমি, এখনই, ঠিক এখনই, তোমাকে আশ্চর্য করে এক একটি মুখোশ হয়ে যাবে তারা। কে আমি? শুধুই এক ম্যাজিশিয়ান? ভেল্কিবাজ? ডুমুরখেকো মানুষ? এই দেখো, দেখো তুমি আমি সেই লোক, হ্যাঁ, আমিই, হাঁটতে হাঁটতে একদিন, ভরদুপুরে, একগাদা কাগজ ছিঁড়তে ছিঁড়তে উড়িয়ে দিতে দিতে চিৎকার করছিলাম- এই হলো ইতিহাস... এই যে আমি উড়িয়ে দিলাম... ইতিহাস তখন বাতাসে ডানা মেলে উড়তে উড়তে, হারানো মানুষের কথা বলছিল! চলে যাওয়া মানুষ ফেরে না আর...



২/ মা টি গ ন্ধ মা টি গ ন্ধ মা টি গ ন্ধ মা টি মা টি

ফলোআপ
সেই পাখিটা, যার ডানা ঘন নীল আর কিছুটা ধূসর ক্রমশ নির্জীব হয়ে আসছে। মুখে সূযমুখীর দানা তুলছে না, খুঁড়িয়ে হেঁটে শুধু মুখে তুলে নেয় জল। ডিমের শরীরে তা দেবে কি, তার শরীরই হিম হয়ে আসছে। তার ছেড়ে দেয়া ডানায় অন্য পাখিরা ঠোঁট খুঁটে দেয়। মেঘলা দিন, বৃষ্টিও এসেছে ঝাঁপিয়ে। সোঁদা গন্ধময় খাঁচা। ডিমগুলো সব নষ্ট হয়ে যাবে? পাখিসমাজে কি কোনো কবিরাজ নেই?
ঐদিকে ঘাতক বিড়াল লেজ উঁচিয়ে ঘুরছে আশেপাশেই, নতুন শিকারের ঘ্রাণ নিয়ে।

ভেবেছিলাম এখানেই শেষ। যা হবার তা হয়ে গেছে। ভাঙ্গা শিকগুলো জোড়া লাগানো হলো। যে-পথে ঢোকে বেড়াল, খোলা অংশ জুড়ে পুরোটাতে জাল বিছিয়ে দিলাম। যে ক’টা পাখি আছে এখনও ওরা বেঁচে-বর্তে থাকবে। একে অপরকে আরও ভালবাসবে। প্রজনন বাড়বে। কলকাকলিতে আবার পূর্ণ হয়ে উঠবে খাঁচা।
কিন্তু না। খুনের নেশা চেপেছে যে শিকারির তাকে দমিয়ে রাখার শক্তি কার। কাল রাতে সবাই যখন স্বস্তিতে চোখের দুটো পাতা এক করেছে তখনই ঘাতক এসেছিল। আরও দুটো পাখির শরীর ছিন্নভিন্ন, রক্তাক্ত করতে; সময় লাগল দুই থেকে চার মিনিট বা তারও কম। হত্যাকারী এবার আরও নিখুঁত, নৃশংস। কোথা দিয়ে যে ঢুকল আর কতটা জখম হলো; আলামত সংগ্রহ, জল্পনা চলছে এখনও।

এই খাঁচা আর নিরাপদ নয়।
পৃথিবীতে এমন কোন খাঁচা আছে ঢুকবে না আততায়ী, তেলাপোকা, বিষাক্ত লাল পিঁপড়া ?
তারচেয়ে বনেই উড়ে পালাই। খাঁচায় তো অনেকদিন হল।
সবচেয়ে প্রাজ্ঞ পাখি হাসল। তোমার পূর্বপুরুষের কেউ কোনোদিন বনের বাসিন্দা হলেও বহুকাল ধরে, তুমি ব্রিডিং বাজরিগার। বনের পাখির সাথে ব্যবধান ঘটে গেছে, পারবে বেঁচে থাকতে?
//আসমা বীথি


... তার পাশে কিছু শামুক, তার পাশে কিছু পাতা, গন্ধ আর ঘ্রাণ, স্মৃতি আর জীবন; বৃদ্ধা ইভলিন আর তার কুকুর,-- হ্যাম্পশায়ার-- গন্ধ আর ঘ্রাণ, স্মৃতি আর জীবনের। শমসের নগরের সঙ্গে হ্যাম্পশায়ার আজ একাকার।
এই ছিল দশ ঘণ্টা আগের খুব স্বাভাবিক এক জীবন, ঠিক যেন স্টিল লাইফ। এর মাঝে রয়েল মেইল পৌঁছে দিয়েছে বেকেটের জার্মান ডাইরি'জ ১৯৩৬-১৯৩৭। ধূসর মলাটের ওপর সবুজরঙে লেখা স্যামুয়েল বেকেট!
জীবনের তখন কী হয়? দেখো জীবন, কতকিছু শিখিয়েছ তুমি... বেকেটের ডাইরি! আশ্চর্য অনুভূতি হয়। মনে হয় কী যেন... কোথায়, কোন দেশে এই এখন, হত্যাকাণ্ড ঘটছে! তারপর, মনে হয়, পিটসবুরগের কনসার্টে গান গাইছে 'পোয়েটিক জাস্টিস', আর কবি জয় হার্জো স্যাক্সোফোন বাজাতে বাজাতে গাইতে শুরু করেছেন দ্য বার্ডস... এখনই জেগে উঠবে উইনচেষ্টার স্ট্রিট। একটা বই হাতে নিলে কতকিছু হয়। কত ভাঙচুর। এই যে একটি ভয়ানক অভিনয় দৃশ্যঃ
শুয়োরের বাচ্চারা, সাবধান হবি, সা আ আ আ আ ব ধা আ আ আ আ আ ন...
ধুপধাপ আওয়াজ হয়। বাতাসে গোঙানি। চাপা। গন্ধ আসে। গন্ধ যায়। ভেঙে যাওয়া থেঁতলে যাওয়া এক কণ্ঠস্বরঃ হরিদাস, হরিদাস... সাবধান হবি...
রাজা সাবধান করে দিয়েছেন। কেউ কারো মুখের দিকে তাকাবি না।
কেউ কারো মুখের ভাষা পড়বি না।
ঘেউ ঘেউ। দূরে। থেমে থেমে। ঘেউ ঘেউ।
বাতিগুলো নিভে যায়। আসলে, নিভে যেতে চায়।
এখন, উইনচেষ্টার স্ট্রিট জেগে উঠবে।
পাশের জানালা দিয়ে হ্যাম্পশায়ারের রাতের আকাশ দেখি। মেঘ করেছে। রাস্তায় যুবক-যুবতীরা, চুম্বনরত। আগস্টের শেষ দিকে হঠাৎ খুব ঠাণ্ডা নেমেছে। হাসান আজিজুল হককে মনে পড়ে, মানে তাঁর গল্পকে। এখন নির্দয় শীতকাল। ঠাণ্ডা নামছে হিম... এইসব। খোলা জানালার কারণে 'ঠাণ্ডা নামছে হিম' ব্যাপারটা ভয়ানকরকম টের পাওয়া গেল। বাইরের যুবকরা হাততালি দিচ্ছে, মেয়েরা চিৎকার করে গাইছে- ওলমৌস্ট হ্যাভেন... লাইফ ইজ ওল্ড দেয়ার... কান্ট্রি রোড টেইক মি হোম টু দ্য প্লেইস আই বিলঙ... ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া...
বুকটা হু হু করে উঠে। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া! 'ঠাণ্ডা নামছে হিম' আর 'ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া' আমাকে কোথায় নিয়ে যায়? ছোট বোন'টির কাছে? মায়ের কাছে? শমসেরনগরে? জানালা খোলাই থাকে। কোরাস ঢুকে পড়ে ১০ নম্বর উইনচেষ্টার স্ট্রিটের চূড়ায়। এক কুঠুরিতে।
আত্মজা ও একটি করবী গাছের 'ঠাণ্ডা নামছে হিম' এখন হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে আর খোলা জানালায় হ্যাম্পশায়ারের আকাশ! বাইরের রাস্তায় যুবক-যুবতীদের কোরাস- কান্ট্রি রোড টেইক মি হোম টু দ্য প্লেইস আই বিলঙ... ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া; আমি যেন শমসের নগর থেকে আমাদের গ্রামের পথে হাঁটছি!
সারারাত তারা এই গানটি গাইবে। তাদের কোরাসে উইনচেষ্টার স্ট্রিট আজ ঘুমাবে না!
ছাদের ওপর বসে থাকবে একজন। ফিডলার। হ্যাম্পশায়ারে রাতের শেষ হওয়া দেখে দেখে ভায়োলিন বাজাবে সে। ছাদের ওপর ফিডলার। নিঃসঙ্গতা! আহা, নিসঙ্গতা! গন্ধ ও ঘ্রাণ; স্মৃতি ও জীবন! বাবার খুব প্রিয় ছিল সূর্যমুখী ফুল। তার মৃত্যুর পর, ফুলগুলি কোথায় ফুটে? ভোরে, মা যখন বাবার কবরের দিকে তাকান, আমার স্থির বিশ্বাস সূর্যমুখী ফুলগুলি তখন তার বুকের ভিতর ফুটে।
ওলমৌস্ট হ্যাভেন... লাইফ ইজ ওল্ড দেয়ার... কান্ট্রি রোড টেইক মি হোম টু দ্য প্লেইস আই বিলঙ... ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া...
তাপস গায়েনের অনুবাদে, জয় হার্জো'র একটি দীর্ঘ কবিতার কয়েকটি পঙক্তি পড়ে ফেলা যাক-
'এইসব হলুদ পাখি, যারা ধূমায়িত আগ্নেয়গিরির ওপর
চক্রাকারে ঘুরে, তাদের সংলাপে জেগে ওঠে গান
এই পাথরের।'
শুয়োরের বাচ্চারা, সাবধান হবি, সা আ আ আ আ ব ধা আ আ আ আ আ ন... নতুন দিনের খবরের কাগজের শিরোনাম-- স্টপ দিজ ম্যাডনেস! ... আর, শিশুদের লাশ। বাবার সূর্যমুখী ফুল মায়ের বুকে ফুটছে! ভোর হচ্ছে হ্যাম্পশায়ারে, শমসের নগরে। ছাদের ওপর ফিডলার। ভায়োলিন বাজাচ্ছে। তখন, আলবেয়ার কামু তাঁর ডাইরিতে লিখছেনঃ আমি অস্তিত্বের অভিঘাতের দিকে অগ্রসর হতে অস্বীকার করি না, কিন্তু আমি এমন কোনও যাত্রাপথও আকাঙ্ক্ষা করি না, যা মানুষ থেকে দূরে সরে গেছে। আমরা কি আমাদের তীব্রতম অনুভূতিগুলোর শেষে ঈশ্বরকে খুঁজে পাব?



'জীবন গিয়েছে চলে...', মৃত্যুই অমোঘ নিয়তি তবে! 'কুড়ি কুড়ি বছরের পার...', তবে কি আমাদের ভেতর অন্তর্গত মৃত্যু-স্পর্শ-কাতরতা বাজছে শঙ্খের মত?
জানি না। এত জিজ্ঞাসা আমাদের- এই জীবনের কাছে! সে তবু নিশ্চুপ। বোবা। এই যে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে... এই যে শমশেরনগর স্টেশনে এসে থেমেছে কুশিয়ারা এক্সপ্রেস আর এই যে শনিবার শেষরাতে, দিনরাত্রির সঙ্গমে জেগে থাকতেছে উইচেস্টার স্ট্রিট... এই যে আমাদের মনে পড়েছে খোঁপার ফুল বিষয়ক প্রবন্ধের কথা... যেন এখন হাত বাড়ালেই ধরে ফেলা যাবে এমন নিঃস্পৃহ ভঙ্গি ডানায় এনে জানালার পাশেই বসেছে ক্লান্ত শঙ্খচিল। আমি কী করি এখন? মাঝে মাঝে তার পালক খসে পড়ে, দু-একটা। দূরে বহুদূরে খালি গলায় কেউ গাইতে লেগেছে- অমল ধবল পালে... কুশিয়ারা এক্সপ্রেস কি ভানুগাছ থেকে শ্রীমঙ্গলের পথ ধরেছে? কে দেবে এই তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর? আমার মন তো হাওয়াময়। মন তো কেমন মেঘ দেখতে দেখতে বেইজিংস্টক থেকে ফার্স্ট গ্রেট ওয়েস্টার্নে ইলিং ব্রডওয়ে... মন তখন কবিতার জন্য অপেক্ষা করে কিংবা করতেছিল অনন্তকাল ধরে। মাত্র দুইটি লাইন। মাত্র দুইটি!
As silent as a mirror is believed
Realities plunge in silence by...
কুশিয়ারা এক্সপ্রেস শ্রীমঙ্গলে পৌঁছে গেছে? বৃষ্টিতে ভিজতেছে আমার শমশেরনগর? জেগে থাকতেছে উইচেস্টার স্ট্রিট...কী মানে দাঁড়াচ্ছে তাহলে এই জীবনের? সাইলেন্ট। মিরর। রিয়েলিটি। সাইলেন্স... সাইলেন্স...
কোনও কোনও রাত প্রত্যাখ্যানের রাত হয়ে যায়। তখন, বুকের ভেতর থেকে সাইলেন্স সাইলেন্স বলে চিৎকার করে ওঠেন কবি...
Then, drop by caustic drop, a perfect cry... আমিই জীবন ছিলাম। আমি ও আমার অহং। জীবন। আহা জীবন... কোথায়, কোন জীবনে কখনও আলোর পাখি উড়বে না? কোথায় আজ কাগজের বুকে নকশা করবে কেউ নতুন মারণাস্ত্রের? আমাকে গুলিতে ঝাঁজরা করে দিয়ে, তুমি ভাবলে প্রেমিকাকে বার্তা পাঠানো দরকার, কিংবা- বয়লার বিস্ফোরণে মরে-যাওয়া শ্রমিকের জীবনের দাম মিটিয়ে তুমি- সিগারেট ধরালে...